https://www.prothomalony.com/

13827

opinion

অভিমত

ভোটের নামে অপরাধ: প্রবাসে কি আমরা পুরনো অভ্যাসেই আছি?

প্রকাশ: ২১ জুন ২০২৫ ১৩:০৯

আমাদের জাতিগত স্মৃতি আর সংগ্রামের গভীরে এক শব্দই বারবার ফিরে আসে—ভোট। এই ভোটের অধিকার পাওয়ার জন্য, ধরে রাখার জন্য, সম্মানিত করার জন্য আমরা কতো কিছু করেছি! জন্মের পর থেকেই আমাদের পূর্বপুরুষরা লড়েছেন এই একটি মৌলিক অধিকারের জন্য। মনে পড়ে, পরাধীন বাংলার সেই উত্তাল দিনগুলো। ১৯৭০ সালের নির্বাচন যেন এক জাতীয় উৎসব, এক গণজাগরণের উন্মাদনা। নিজেদের প্রতিনিধি বেছে নেওয়ার অধিকারকে জীবন দিয়ে হলেও রক্ষা করার লড়াই আমরা করেছি বারবার।

ভোটের অধিকারের সঙ্গে আমাদের ভালোবাসার সম্পর্ক, গর্বের সম্পর্ক। এই অধিকার ছাড়া আমাদের অস্তিত্বের একটা বড় অংশ অপূর্ণ থাকে। কিন্তু এই অধিকার নিয়েই আমাদের সংগ্রাম কখনও থামেনি। একাত্তরের স্বাধীনতার লড়াইয়ের পরও আমাদের ভোটের অধিকার বহুবার কেড়ে নেওয়া হয়েছে। কখনো জোর করে, কখনো কৌশলে, কখনো ষড়যন্ত্র করে। আমরা সেই প্রতিটি মুহূর্তের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছি, লড়েছি। এমনকি প্রাণ দিয়েছি। কারণ ভোট আমাদের কাছে শুধু কাগজে ছাপা একটা প্রতীক নয়, এটি আমাদের আত্মমর্যাদার অংশ।

তাই যখন দেখি, ভোটের মতো পবিত্র অধিকারের সঙ্গে কেউ প্রবাসে প্রতারণা করছে, তখন বুকের ভেতর কিছুটা যেন ভেঙে পড়ে। সম্প্রতি পেনসিলভানিয়া রাজ্যের বৃহত্তর ফিলাডেলফিয়া অঞ্চলে ভোট জালিয়াতির দায়ে দুই বাংলাদেশি আমেরিকান দণ্ডিত হয়েছেন। আরও একজনের বিচার চলছে। খবরটা প্রথমে বিশ্বাস করতে পারিনি। অবাক লাগেনি, কিন্তু ভীষণ ব্যথা লেগেছে।

সামাজিক মাধ্যমে স্বদেশি অনেকেই তাদের ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন। কেউ লিখেছেন, "পুরনো অভ্যেস যায় না।" কেউ আবার টেনে এনেছেন রবীন্দ্রনাথের বিখ্যাত ও ব্যঙ্গাত্মক উচ্চারণ—"রেখেছ বাঙালি করে।" যেন এই অপরাধের মধ্যে আমাদের জাতিগত অপবাদ লেগে আছে।

দুঃখের বিষয়, এটাই প্রথম ঘটনা নয়। নিউ জার্সির প্যাটারসন শহরে বাংলাদেশিদের বিরুদ্ধে আগেও ভোট জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছিল। এমনকি লন্ডনের টেমসের তীরেও, যেখানে বহু বছর ধরে বাংলাদেশিরা এক সমৃদ্ধ কমিউনিটি গড়ে তুলেছেন, সেখানে পর্যন্ত ভোট নিয়ে কারচুপির অভিযোগ উঠে এসেছে। এমন পর্যায়ে গিয়েছিল যে স্থানীয় প্রশাসন বাধ্য হয়েছিল ভোটার আইনে পরিবর্তন আনতে।

প্রশ্ন জাগে, কেন এমন হয়? কেন প্রবাসেও কেউ কেউ এই পুরনো, নোংরা অভ্যাসটা ধরে রাখে? দেশে যারা এসব করতেন, তারা তো অনেক সময়ই প্রভাবশালী, তথাকথিত এলিট। তারা আইনের চোখকে ফাঁকি দিতে পারতেন। কিন্তু প্রবাসে এসে এই আইন ফাঁকি দেওয়া এত সহজ নয়। এখানে আইন শুধু লেখা কাগজে নয়, প্রতিদিনের জীবনে বাস্তবতার কষ্টি পাথরে যাচাই হয়।

প্রবাসী বাংলাদেশিদের পরিচয় কিন্তু ভিন্ন। আমরা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বাংলাদেশিদের চিনেছি পরিশ্রমী, সৎ,  আইন মেনে চলা মানুষ হিসেবে। গার্মেন্টসে কাজ করা নারী থেকে শুরু করে রেস্টুরেন্টে কাজ করা তরুণ, হাসপাতালের সেবিকা থেকে শুরু করে ট্যাক্সি ড্রাইভার—প্রবাসে আমাদের পরিচয় সৎ ও সংগ্রামী মানুষের। অথচ, এমন কিছু অপরাধ, যা জাতির গর্বকে ম্লান করে দেয়, প্রবাসে এসে সেই কাজ যারা করেন, তারা কি বুঝতে পারেন কী অপূরণীয় ক্ষতি তারা আমাদের করছেন?

আরও দুঃখের ব্যাপার হলো, সাধারণ প্রবাসী কখনো এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকেন না। যারা নিজেদের ‘লিডার’ বা ‘কিছু হয়ে উঠেছি’ বলে দাবি করেন, তারাই এ ধরনের অপকর্মের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। যেন প্রভাব বিস্তারের নেশা, ক্ষমতার ক্ষুদ্র রাজনীতির মোহ প্রবাসেও পিছু ছাড়ে না।

আমরা কি কখনো ভেবেছি, বহুজাতিক এই সমাজে আমাদের কমিউনিটির ভাবমূর্তি কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এই ধরনের ঘটনায়? আমরা কি জানি, একেকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা পুরো কমিউনিটিকে কত বড় কলঙ্কের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়?

ভোটের প্রতি আমাদের যে ভালোবাসা, সেই ইতিহাস কি তারা জানেন না? ভোট মানে তো আমাদের আত্মপরিচয়। ভোট মানে তো আমাদের অধিকার রক্ষা, আমাদের কণ্ঠস্বর পৌঁছে দেওয়া। আমরা যারা প্রবাসে, আমাদের দায়িত্ব আরও বেশি। কারণ আমরা বহুজাতিক সমাজে এক নতুন বাংলাদেশের প্রতিনিধি।

প্রতিটি পাসপোর্টে, প্রতিটি প্রবাসী চেহারায় আমাদের জন্মস্থানের নাম লেখা আছে, কিন্তু প্রতিটি আচরণে কি আমরা বাংলাদেশের মর্যাদা ধরে রাখতে পারছি? এই প্রশ্ন সবার আগে আমাদের নিজেদের করতেই হবে। প্রবাসে আইন মেনে চলার গুরুত্ব যেমন আমাদের বোঝা উচিত, তেমনি বোঝা উচিত—এখানে ভুল করলে পুরো প্রজন্মের মুখ পুড়ে যায়।

আমাদের নতুন প্রজন্ম, যারা এখানেই বড় হচ্ছে, তাদের কি পরিচয় দেব? তারা কি আমাদের দেখিয়ে বলবে, ‘তোমরা তো ভোটে কারচুপি করতে জানো?’ না কি তারা বলবে, ‘তোমরা সৎ, দায়িত্বশীল, আইন মানা মানুষ’?

আমরা কোন পরিচয় রেখে যেতে চাই? অধিকার ও আইনের  প্রতি শ্রদ্ধা থাকা উচিত। দেশে হোক বা প্রবাসে— আমাদের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হোক এমন কাজ থেকে নিজেকে বিরত রাখতে হবে। অভ্যাস পুরনো হতে পারে, কিন্তু আমাদের চেতনা নতুন হতে হবে। ভুল থেকে শিক্ষা নিতে হবে। শুধু নিজেদের জন্য নয়, দেশের জন্য, কমিউনিটির জন্য, নতুন প্রজন্মের জন্য।

কলঙ্কজনক ঘটনাগুলো আমাদের চোখ খুলে দিয়েছে। সময় এসেছে প্রবাসে বাংলাদেশি কমিউনিটির ভেতর থেকেই সচেতনতা গড়ে তোলার। যারা সত্যিকারের কমিউনিটি লিডার—তাদের এগিয়ে আসতে হবে।

অভিমত থেকে আরো পড়ুন