https://www.prothomalony.com/

13737

new-york

নিউইয়র্ক

নিউইয়র্কে ভাড়াটিয়াদের জন্য স্বস্তির খবর: ব্রোকার ফি’র বোঝা শেষ

নতুন আইন কার্যকর

প্রকাশ: ১৩ জুন ২০২৫ ১০:৪১

নিউইয়র্ক শহরে বাড়ি ভাড়া নেওয়া সবসময়ই ব্যয়বহুল। বাসা খোঁজার শুরুতেই জমা দিতে হয় বিপুল অগ্রিম অর্থ—প্রথম মাসের ভাড়া, জামানত এবং সবচেয়ে কষ্টসাধ্য বিষয়, দালাল ফি। দীর্ঘদিন ধরেই নিউইয়র্কের বাসিন্দারা এই অতিরিক্ত ফি নিয়ে ক্ষুব্ধ ছিলেন। অবশেষে সেই বোঝা থেকে মুক্তির পথ উন্মুক্ত হয়েছে।

 

বুধবার থেকে নিউইয়র্কে কার্যকর হয়েছে ‘অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়ার ব্যয়সংক্রান্ত ন্যায্যতা আইন’। এই আইনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে—যিনি দালাল নিয়োগ করবেন, তিনিই তার ফি পরিশোধ করবেন। অর্থাৎ, ভাড়াটিয়ারা যদি নিজেরা কোনো দালাল নিয়োগ না করেন, তবে তাদের আর কোনো ফি দিতে হবে না।

 

এই নিয়ম দীর্ঘদিনের দাবি ছিল। নিউইয়র্ক কিংবা বোস্টনের মতো শহরে এমনকি যেসব ভাড়াটিয়া নিজেরাই বাসা খুঁজে বের করতেন, তাদেরও অনেক সময় দালাল ফি গুনতে হতো—যা এক থেকে দুই মাসের ভাড়ার সমান।

 

এই আইনে বলা হয়েছে, এখন থেকে শুধু সেই ভাড়াটিয়ারাই ফি দেবেন, যারা নিজেরা দালাল নিয়োগ করবেন। অন্যথায়, ফি দেওয়ার দায়িত্ব থাকবে বাড়ির মালিকের। আইন ভঙ্গ করলে দালাল বা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য রয়েছে জরিমানার বিধান—প্রথমবার ৭৫০ ডলার, দ্বিতীয়বার ১ হাজার ৮০০ ডলার এবং পরবর্তী প্রতিটি ক্ষেত্রে দুই হাজার ডলার জরিমানা। ভাড়াটিয়ারা ৩১১ নম্বরে ফোন করে কিংবা নগর কর্তৃপক্ষের ওয়েবসাইটে অভিযোগ করতে পারবেন।

 

এই আইনের অন্যতম উদ্যোক্তা ব্রুকলিনের নগর পরিষদের সদস্য চি ওসে নিউইয়র্কবাসীদের আহ্বান জানিয়েছেন—“চিত্র তুলে রাখুন, প্রতিবাদ করুন, অভিযোগ জানান”—আইনের কার্যকর বাস্তবায়নে সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে।

 

এই আইন প্রণয়নের মূল লক্ষ্য, ভাড়াটিয়াদের বাসা বদলের খরচ কমানো। ২০২৪ সালে নিউইয়র্ক শহরে গড়ে ১৩ হাজার ডলার অগ্রিম খরচ হতো একটি বাসা নিতে। নতুন আইনের ফলে দালাল ফি বাদ পড়ায় এই খরচ কমে গড়ে ৭,৫০০ ডলারে নামতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

 

শুধু সাধারণ বাসিন্দারাই নন, এই আইনের ফলে নিউইয়র্ক শহরের সরকারও সাশ্রয়ী হবে। গত দুই বছরে শহরের জরুরি আবাসন সহায়তা এবং ভাড়ার কুপনের আওতায় দালাল ফি বাবদ খরচ হয়েছে প্রায় ১৪ কোটি ১০ লাখ ডলার। একই সময়ে কুপনের পেছনে খরচ হয়েছে ১৩৪ কোটি ডলার।

 

তবে এই আইনের ভবিষ্যৎ এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত নয়। নিউইয়র্কের জমি-বাড়ি ব্যবসায়ী বোর্ড এবং কয়েকটি দালাল সংগঠন ইতিমধ্যে এই আইনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে। যদিও নগর সরকার মামলাটি বাতিলের আবেদন করেছে, বিচারক তা খারিজ করেননি।

 

সংগঠনটির সভাপতি জেমস হুইলান জানিয়েছেন, “আমরা হতাশ যে আদালত আমাদের সাময়িক নিষেধাজ্ঞার আবেদন নাকচ করেছেন এবং এই আইন কার্যকর হয়েছে। নিউইয়র্কবাসীরা শিগগিরই এর নেতিবাচক প্রভাব দেখতে পাবেন—বাড়ির তালিকা কমে যাবে, ভাড়া বেড়ে যাবে। আমরা আইনগত লড়াই চালিয়ে যাব।”

 

তবে সংগঠনটি ইতোমধ্যে তাদের সদস্যদের নতুন আইন মেনে চলার নির্দেশ দিয়েছে। অন্যদিকে বাসা খোঁজারত ভাড়াটিয়ারা এই আইনের প্রতি আশাবাদী।

 

ব্রুকলিনের ফ্ল্যাটবুশ এলাকার বাসিন্দা, তথ্য বিশ্লেষক ট্যাবি গ্রিনের অভিজ্ঞতায় এই নতুন আইনের বাস্তব চিত্র ফুটে ওঠে। আগামী ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে তাকে বাসা ছাড়তে হবে। তিনি বেনসনহার্স্ট এলাকায় দেড় হাজার ডলারের একটি একক কক্ষের ফ্ল্যাটের বিজ্ঞাপন দেখেন। কিন্তু দালাল তাকে জানান, এর জন্য এক মাসের দালাল ফি দিতে হবে।

 

গ্রিন আইন অনুযায়ী ফি দিতে অস্বীকৃতি জানালে দালাল বলেন, “আপনি হয় একবারে দালাল ফি দেবেন, অথবা প্রতিমাসে অতিরিক্ত ভাড়া দেবেন।” তার ভাষ্য, “এটা শুধুই নির্বুদ্ধিতার রাজনীতি।”

 

পরে গ্রিন দেখতে পান, ওই ফ্ল্যাটটির ভাড়া বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ৮৫০ ডলার—যা তার সাধ্যের বাইরে। তিনি বলেন, “আমি যদি দালাল নিয়োগ না করি, তাহলে কেন ফি দেব?”

 

দালালরা আগে থেকেই আশঙ্কা করছিলেন, এই আইনের ফলে বাড়িওয়ালারা ভাড়ার মধ্যেই দালাল ফি যুক্ত করবেন। কুইন্স এলাকার এক ভাড়াটিয়া জানান, তিনিও এই নিয়ে উদ্বিগ্ন।

 

তিন বছর ধরে খারাপ অবস্থার একটি ফ্ল্যাটে থাকলেও, অতিরিক্ত খরচের ভয়ে বাসা বদলাতে পারছিলেন না। তিনি বলেন, “আগে মনে হতো, যত খারাপই হোক, এখানেই থাকতে হবে। কারণ নতুন বাসার অগ্রিম খরচ অনেক বেশি। এখন ভাবছি, যদি দালাল ফি দিতে না হয়, তাহলে আগামী বছর বাসা বদলানো যেতে পারে।”

 

একটি অনলাইন বাসা খোঁজার প্ল্যাটফর্মের তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল মাসে যেসব ফ্ল্যাটে দালাল ফি বাদ দেওয়া হয়েছে, সেগুলোর ভাড়া বেড়েছে গড়ে ৫ দশমিক ৩ শতাংশ। অন্যদিকে, অন্যান্য ফ্ল্যাটের ভাড়া বেড়েছে ৪ দশমিক ৬ শতাংশ। অর্থাৎ বাড়িওয়ালারা পুরো দালাল ফি ভাড়ার মধ্যে যুক্ত করছেন না।

 

২০২৪ সালে, দালাল ফি ছাড়ের ফ্ল্যাটগুলোর ভাড়া গড়ে ৪ দশমিক ২ শতাংশ বেশি ছিল। অর্থনীতিবিদ কেনি লি জানান, “আসলে ভাড়ার হার নির্ধারণে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে বাজারের চাহিদা ও জোগান। বাড়িওয়ালার খরচের চেয়ে বাজার পরিস্থিতি বেশি গুরুত্বপূর্ণ।”

 

এই আইন নিউইয়র্ক শহরের ভাড়াটিয়াদের জন্য একটি বড় স্বস্তি এনে দিয়েছে। তবে এর আইনি লড়াই, বাস্তব প্রয়োগ এবং ভাড়ার ওঠানামা—সবকিছু মিলিয়ে পরিস্থিতির দিকে নজর থাকবে সবার।

 

নিউইয়র্ক থেকে আরো পড়ুন