https://www.prothomalony.com/
13509
new-york
প্রকাশ: ২২ মে ২০২৫ ০২:৩৬
নিউইয়র্কের কুইন্সে বসতে যাচ্ছে রন্ধনশিল্পের এক অনন্য আয়োজন—আমেরিকান কারি অ্যাওয়ার্ডস ২০২৫। রুচি, সংস্কৃতি ও সৃজনশীলতার এক অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটাতে চলেছে এই আয়োজন। যা নিয়ে প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটিতে তৈরি হয়েছে উৎসবমুখর পরিবেশ। শনিবার(২৪ মে ) টেরেস অব দ্য পার্ক-এ অনুষ্ঠিতব্য এই জমকালো অনুষ্ঠানে রন্ধনশিল্পী থেকে শুরু করে উদ্যোক্তা, রাজনীতিক, ব্লগারসহ নানা পেশার মানুষের মিলন ঘটবে।
বর্ণিল অনুষ্ঠান ঘিরে খরচ ধরা হয়েছে প্রায় ২ লাখ ডলার। যার মধ্যে ভেন্যু খাতে খরচ হয়েছে ৪৫ হাজার ডলার। এছাড়াও শিল্পীদের পারিশ্রমিক, আন্তর্জাতিক অতিথিদের আনাগোনা ও আনুষঙ্গিক অন্যান্য খরচ মিলিয়ে এটি পরিণত হয়েছে বছরের অন্যতম ব্যয়বহুল অনুষ্ঠানে। আয়োজক প্রতিষ্ঠান খলিল গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ এবং আশা গ্রুপ সংবাদ সম্মেলনে জানান, এই উদ্যোগ শুধু প্রতিযোগিতার জন্য নয় বরং প্রবাসীদের রন্ধন প্রতিভা ও সংস্কৃতিকে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরার জন্য।
এদিকে আমেরিকান কারি অ্যাওয়ার্ডসের অংশ হিসেবে গত ১৮ মে ব্রঙ্কসে অনুষ্ঠিত হলো ‘বেস্ট হোম শেফ’ প্রতিযোগিতা। খলিল বিরিয়ানি হাউসে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে প্রাথমিকভাবে বাছাইকৃত অর্ধশতাধিক প্রতিযোগী অংশ নেন। ‘এবার আপনিও হবেন শেফ’ স্লোগানে আয়োজিত প্রতিযোগিতায় ঘরোয়া পরিবেশে তৈরি নানান পদের খাবার পরিবেশন করেন প্রতিযোগীরা। বিচারকদের রায়ে সেরা রন্ধনশিল্পীদের বেছে নেওয়া হয়। যাদের মূল আয়োজনে তিনটি ক্যাটাগরিতে সেরা বাছাইয়ের মাধ্যমে দেওয়া হবে বেস্ট হোম শেফ অ্যাওয়ার্ডস।
এই অ্যাওয়ার্ডস শুধু রন্ধনশিল্পে সীমাবদ্ধ নয়। স্বীকৃতি দেওয়া হবে মোট ৯টি ক্যাটাগরিতে। সেগুলো হলো— বেস্ট রেস্টুরেন্ট, বেস্ট শেফ, বেস্ট ফুড ব্লগার, বেস্ট এন্টারপ্রেনিউর, শেফ অব দ্য ইয়ার, পারসোনালিটি অব দ্য ইয়ার, কারি লিজেন্ড অ্যাওয়ার্ডস, লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ডস, এবং বেস্ট হোম শেফ।
অনুষ্ঠানের বিচারকমণ্ডলীতে রয়েছেন বিশ্বের খ্যাতনামা শেফরা। ভারত, মালয়েশিয়া, সৌদি আরব, জর্ডান, বাহরাইন ও বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বে থাকছেন রন্ধনশিল্পের গুণীজনরা। তালিকায় আছেন—বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় শেফ টনি করিম খান, ভারতের বিশিষ্ট রন্ধন বিশেষজ্ঞ ও কালিনারি ফোরামের সদস্য ড. ইজ্জত হুসেন, মালয়েশিয়ান কালিনারি বিশেষজ্ঞ রসাহম বিন রুসলি, সৌদি আরবে ওয়ার্ল্ড কালিনারি অ্যাসোসিয়েশন (ডব্লিউএসি) এর সার্টিফাইড প্রশিক্ষক মনতাসির মাসউদ, বাহরাইনের বিখ্যাত কালিনারি বিশেষজ্ঞ ও হসপিটালিটি কনসালটেন্ট সিলভারস্টার রোজারিও, জর্ডানের পেশাদার কালিনারি বিশেষজ্ঞ মাহমুদ ইয়াসিন, ব্রিটিশ-বাংলাদেশি ক্যাটারিং ব্যবসায়ী অলি খান এমবিই, যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স এন্ড টেকনোলজির সহকারী অধ্যাপক মো. গোলাম মোস্তফা, বাংলাদেশের সফল নারী উদ্যোক্তা, রন্ধনশিল্পী ও টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব রাহিমা সুলতানা রীতা, আন্তর্জাতিক রন্ধনশিল্পী, রান্নার সৃজনশীল উদ্ভাবক ও লেখক শাহেদা ইয়াসমিন, কালিনারী বিশেষজ্ঞ মেরীনা খন্দকার এবং কালিনারী বিশেষজ্ঞ লবি রহমান।
এছাড়া অতিথি হিসেবে থাকছেন কনটেন্ট ক্রিয়েটর আদনান ফারুক হিল্লোল ও জনপ্রিয় ফুড ব্লগার নুসরাত ইসলাম (জলটান বিডি)। উপস্থিত থাকবেন ডেফোডিল ইউনিভার্সিটির চেয়ারম্যান ড. সবুর খান, এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্টেটের রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃবৃন্দ।

প্রবাসীদের মাঝে ব্যাপক উৎসাহ
আমেরিকান কারি অ্যাওয়ার্ডস নিয়ে নিউইয়র্ক প্রবাসী বাংলাদেশিদের মাঝে বিরাজ করছে ব্যাপক উৎসাহ ও উদ্দীপনা। অনুষ্ঠানটি ঘিরে যেমন রন্ধনশিল্প সংশ্লিষ্টদের মধ্যে তৈরি হয়েছে প্রতিযোগিতার আবহ তেমনি সাধারণ প্রবাসীরাও নিজেদের সংস্কৃতিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলে ধরার এই উদ্যোগে গভীরভাবে যুক্ত হচ্ছেন। কেউ রেজিস্ট্রেশনের মাধ্যমে সরাসরি অংশ নিচ্ছেন, কেউবা স্বজনদের উৎসাহ দিতে হাজির হচ্ছেন রান্নার মহা-আয়োজনে।
নিউইয়র্কের জ্যামাইকায় বসবাসরত রেস্টুরেন্ট কর্মী মঈনুল হোসেন বলেন, অনেক দিন পর এমন একটি আয়োজন হচ্ছে যেখানে শুধু খাবার নয়, আমাদের সংস্কৃতি, দক্ষতা ও প্রবাসজীবনের সংগ্রাম উঠে আসবে। আমরা গর্বিত। এদিকে হোম শেফ হিসেবে প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া একজন বলেন, এটা আমার জীবনের বড় সুযোগ। এত দিন শুধু বন্ধুদের জন্য রান্না করেছি, এবার বিচারকরা আমার রান্না চেখে দেখবেন—এটাই ভাবতেই গর্ব হচ্ছে।
অনুষ্ঠান উপলক্ষে নিউইয়র্কসহ আশপাশের শহরগুলোর প্রবাসীরা নিজেদের মতো করে প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কেউ টিকিট কেটে রাখছেন, কেউ অংশ নিচ্ছেন আয়োজনের স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে। যুক্তরাষ্ট্রের অন্য স্টেট থেকেও অনেকে এই অনুষ্ঠানে অংশ নিতে নিউইয়র্কে আসার পরিকল্পনা করেছেন।
বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত তরুণ উদ্যোক্তা নাহিদ কামাল বলেন, এই অ্যাওয়ার্ডস আমাদের নতুন প্রজন্মের জন্য বড় অনুপ্রেরণা। যারা মনে করেন রন্ধনশিল্প কোনো বড় মঞ্চে পৌঁছাতে পারে না, তাদের জন্য এটি একটি জবাব।
বিশেষত নারীদের অংশগ্রহণ এই আয়োজনে আলাদা মাত্রা যোগ করেছে। অনেক হোম শেফই বলছেন, এই প্রতিযোগিতা তাদের আত্মবিশ্বাস অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। রান্না এতদিন পারিবারিক দায়িত্ব হিসেবে বিবেচিত হলেও এখন তা হয়ে উঠছে স্বীকৃতির মাধ্যম।
রন্ধনশিল্পকে মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে যাওয়ার আশা
আয়োজক খলিলুর রহমান ও আকাশ রহমান জানান, এই আয়োজন তাদের দীর্ঘদিনের স্বপ্নের বাস্তবায়ন। যুক্তরাষ্ট্রে রন্ধনশিল্পকে একটি মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে যেতে এবং প্রবাসী বাঙালিদের প্রতিভা ও সৃজনশীলতাকে আন্তর্জাতিক পরিসরে তুলে ধরতেই তারা এই ব্যতিক্রমধর্মী উদ্যোগ নিয়েছেন।
তারা জানান, রন্ধনশিল্পে যারা নিরবে বছরের পর বছর কাজ করে যাচ্ছেন, তাদের সাফল্য ও অবদানকে সামনে আনতেই মূলত এই ‘কারি অ্যাওয়ার্ডস’র পরিকল্পনা। বিশেষ করে হোম শেফদের অংশগ্রহণ তাদের সবচেয়ে আনন্দিত করেছে। কারণ, প্রথাগত রেস্টুরেন্ট পেশার বাইরে থাকা এই প্রতিভাবান নারীরা এবার সামনে এসে নিজেদের তুলে ধরতে পারছেন।
রন্ধনশিল্পী মো. খলিলুর রহমান বলেন, অনেক দিন ধরে ভাবছিলাম প্রবাসে এমন একটা আয়োজন হওয়া উচিত যেখানে আমাদের রান্নার ঐতিহ্য, প্রতিভাবান শেফ এবং হোম কুকরা স্বীকৃতি পাবেন। অবশেষে সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নিচ্ছে। এমন আয়োজন শুধু প্রতিযোগিতা নয়, এটা প্রবাসীদের সম্মান জানানোর একটি প্ল্যাটফর্ম।
ব্যবসায়ী আকাশ রহমান বলেন, প্রথমবার হলেও আমরা চাইছি যেন আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে অনুষ্ঠানটি করা যায়। তাই পরিকল্পনার শুরু থেকেই আমরা প্রতিটি খুঁটিনাটি বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে দেখেছি। বিচারক নির্বাচন থেকে শুরু করে ভেন্যু, ট্রফি ডিজাইন, গেস্ট লিস্ট—সবকিছুতেই বৈচিত্র্য ও পরিপূর্ণতা রাখার চেষ্টা করেছি।
নিউইয়র্ক থেকে আরো পড়ুন