https://www.prothomalony.com/

13507

opinion

অভিমত

শরীর আমার, সমাজও আমার: যৌন স্বাধীনতায় দ্বন্দ্বটা কোথায়?

প্রকাশ: ২২ মে ২০২৫ ০২:২৬

আমাদের সমাজে নারী ও পুরুষ—উভয়েই মানুষ। এবং প্রত্যেক মানুষের নিজের শরীর ও জীবনের ওপর সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার থাকা উচিত। যেভাবে একজন পুরুষ নিজের জীবনসঙ্গী, বিয়ে বা যৌনতা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে পারে, তেমনই নারীর ক্ষেত্রেও সেই অধিকার থাকা স্বাভাবিক। এটি কোনো বিলাসিতা নয়—বরং একটি মৌলিক ন্যায্যতা।

তবে যৌন স্বাধীনতা আসলে কী? এটি কোন কোন বিষয়ে প্রযোজ্য? এবং আমাদের মতো মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে—যা ইউরোপ বা আমেরিকা নয়—এই স্বাধীনতার চর্চা ও গ্রহণযোগ্যতা কোন সীমারেখায় আবদ্ধ?

যৌন স্বাধীনতা বলতে বোঝায় একজন ব্যক্তি—নারী বা পুরুষ—নিজের শরীর, যৌন আচরণ, সম্পর্ক ও যৌন পছন্দ সম্পর্কে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার। এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিস্বাধীনতা, শারীরিক ও মানসিক নিরাপত্তা, সম্মতি, অবাঞ্ছিত স্পর্শ বা জোরপূর্বক যৌন সম্পর্কের বিরোধিতা, নিরাপদ যৌনতা ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবার প্রাপ্যতা এবং নিজের যৌন পরিচয় প্রকাশের অধিকার।

আমাদের সমাজে ‘যৌন স্বাধীনতা’ শব্দটি অনেক সময় বিভ্রান্তিকর ব্যাখ্যায় ব্যবহৃত হয়। অনেকেই এটিকে অবাধ বা দায়িত্বহীন যৌনাচারের সমার্থক হিসেবে ভাবেন। বিশেষ করে আমাদের মতো ধর্মপ্রাণ, সংস্কারনির্ভর সমাজে যৌন স্বাধীনতার ধারণা পরিষ্কার নয় এবং সেটি ব্যাখ্যার প্রয়োজন রয়েছে।

আমরা যখন বলি, যৌন স্বাধীনতা মানে অবাধ যৌনতা নয় কিংবা সামাজিক-পারিবারিক মূল্যবোধকে উপেক্ষা করা নয়—সেই মুহূর্তেই দ্বন্দ্ব শুরু হয়। কারণ, যৌন স্বাধীনতাকে অনেক সময় ভুলভাবে দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে মিশিয়ে ফেলা হয়—কেউ একে দেখে অপরাধ হিসেবে, কেউ দেখে ব্যক্তি-অধিকার হিসেবে, আবার কেউ দেখে একান্ত ব্যক্তিগত মালিকানা হিসেবে—যেমন, ‘আমার শরীর, আমি যাকে খুশি তাকে দেব’। এই শেষোক্ত দৃষ্টিভঙ্গিটিই সবচেয়ে বিতর্কের জন্ম দেয়। কেন? সেটিই ব্যাখ্যা করছি।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, যেখানে ধর্মীয় ও সামাজিক কাঠামো গভীরভাবে প্রোথিত, সেখানে যৌন স্বাধীনতা মানে কখনোই এককভাবে ব্যক্তিগত ইচ্ছামতো চলা নয়। এখানে যৌন সিদ্ধান্ত নিতে হয় নিজেকে এবং সমাজকে সম্মান জানিয়ে, পারস্পরিক সম্মতি ও দায়িত্বশীলতার ভিত্তিতে। অনেক সময় ধর্মীয় বা সামাজিক গোষ্ঠী যৌন স্বাধীনতাকে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ বা নিয়ন্ত্রিত রাখতে চায়, ফলে নারীরা বঞ্চিত হন তাঁদের স্বাভাবিক অধিকার থেকে। এখানে নারী বা পুরুষ—উভয়কেই ‘না’ বলার অধিকার থাকতে হয়, সম্মতি না থাকলে।

‘আমার শরীর, আমি যাকে খুশি তাকে দেব’—এই বাক্যটি যৌন স্বাধীনতার চরমতম প্রকাশ। এটি ব্যক্তি-অধিকারের দিক থেকে আত্মনিয়ন্ত্রণের ঘোষণামূলক হলেও, বাংলাদেশের মতো ধর্ম ও সমাজনির্ভর কাঠামোয় সহজে গৃহীত হয় না। এখানে যৌন সম্পর্ককে বিবাহবন্ধনের ভেতরে সীমিত রাখার সংস্কৃতি রয়েছে। যৌনতা শুধু ভালোবাসা বা আনন্দের বিষয় নয়—এটি পরিবারের সম্মান, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রতিফলন।

এমন বক্তব্য সমাজে নারীকে অসম্মান বা সহিংসতার ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। যদিও একই আচরণ পুরুষের ক্ষেত্রে অনেক সময় স্বাভাবিক বলে বিবেচিত হয়, সেটাও অনুচিত।

বিবাহিত সম্পর্কে যৌনতা সমাজ ও ধর্ম দ্বারা অনুমোদিত হওয়ায় সেখানে যৌন স্বাধীনতা তুলনামূলক স্বাভাবিক। কিন্তু অবিবাহিত কারও ক্ষেত্রে একই স্বাধীনতা দাবি করলে সমাজ তা সহজে গ্রহণ করে না। সমাজ যৌনতাকে এখনো একান্ত ব্যক্তি বিষয় হিসেবে নয়, বরং সম্মিলিত সামাজিক-নৈতিক কাঠামোর অংশ হিসেবেই দেখে।

এদেশে স্বাধীনতা মানে ইচ্ছেমতো চলার ছাড়পত্র নয়। স্বাধীনতার সঙ্গে জড়িত থাকে দায়িত্ব—নিজের শরীরের প্রতি, সঙ্গীর প্রতি, পরিবারের প্রতি এবং সমাজের প্রতিও। সুতরাং, ‘আমার শরীর, আমি যাকে খুশি তাকে দেব’ তখনই অর্থবহ, যদি তাতে থাকে পারস্পরিক সম্মতি, স্বাস্থ্য সচেতনতা, নৈতিক দায়বদ্ধতা এবং সমাজ-সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাবোধ।

যৌন স্বাধীনতা নিয়ে কথা বলতে গেলে ‘দায়িত্ব’ ও ‘পরিণতি’—এই দুটি বিষয় এড়িয়ে যাওয়া যায় না। একাধিক সঙ্গীর সঙ্গে সম্পর্ক, গর্ভধারণ, যৌনরোগ, মানসিক চাপ—এই সবই বাস্তবতা। অবিবাহিত কেউ গর্ভবতী হলে পরিবার ও সমাজে জটিলতা তৈরি হয়। পুরুষ পালিয়ে যেতে পারে, কিন্তু নারীকে হয় হয় এককভাবে দায়িত্ব নিতে, না হয় সমাজের চোখে অগ্রহণযোগ্য হতে।

যৌন স্বাধীনতা তখনই বাস্তব হয়ে ওঠে, যখন তার পরিণতি আমাদের ঘরের দোরগোড়ায় এসে দাঁড়ায়। আমাদের সন্তান যদি অবাধে যৌন সম্পর্কে জড়ায়, গর্ভধারণ করে বা করায়, তখন সেই স্বাধীনতা আর শুধু ব্যক্তিগত থাকে না—তা হয়ে দাঁড়ায় পারিবারিক ও সামাজিক চ্যালেঞ্জ।

সুতরাং, যৌন স্বাধীনতা নিয়ে আলোচনা করতে হলে শুধু ‘অধিকার’ নয়, ‘পরিণতি’ এবং ‘সমাজ-সংসার’–এর প্রভাবও বিবেচনায় রাখতে হবে। স্বাধীনতা তখনই টেকসই হয়, যখন তার সঙ্গে থাকে বিবেচনা, মূল্যবোধ ও দায়িত্বশীলতা।

যৌন স্বাধীনতা মানে এই নয় যে কেউ সমাজ, সংস্কৃতি বা ধর্মীয় মূল্যবোধকে অস্বীকার করবে। বরং এই স্বাধীনতা তখনই গ্রহণযোগ্য, যখন তা গড়ে ওঠে সম্মতি, দায়িত্ব ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে। সুস্থ যৌন স্বাধীনতা মানে নিজের শরীর ও সিদ্ধান্তের ওপর অধিকার, কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত যেন নেওয়া হয় মানবতা ও সামাজিক সৌহার্দ্য বজায় রেখে। যৌন স্বাধীনতা যেন হয়ে ওঠে অরাজকতার নয়, বরং সচেতনতা ও ন্যায্যতার প্রতীক—এই হোক আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি।

অভিমত থেকে আরো পড়ুন