https://www.prothomalony.com/

13160

opinion

অভিমত

সম্পাদকীয়

নির্বাচনের গণ্ডি পেরিয়ে: বাংলাদেশের জন্য জাতীয় ঐক্য কেন জরুরি

প্রকাশ: ১৯ এপ্রিল ২০২৫ ০২:১৬

বাংলাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্র যেন বারবার ফিরে আসে এক চেনা চক্রে। প্রতিটি নির্বাচনের আগে উত্তেজনা, সহিংসতা, পরস্পরকে অস্বীকার, এবং নির্বাচনোত্তর একটি ধোঁয়াটে স্থবিরতা। দশক পেরিয়ে গেছে, প্রজন্ম বদলেছে, কিন্তু এই পুনরাবৃত্ত চিত্রপট বদলায়নি। নির্বাচন যেন রাজনৈতিক জীবনের একমাত্র উচ্চতা। যেখানে পৌঁছানোই সবার অভিলাষ, এবং তাতে না পৌঁছাতে পারলে শুরু হয় বিদ্বেষ ও অবিশ্বাসের এক অসীম যাত্রা। অথচ প্রশ্ন উঠতেই পারে, শুধু একটি নির্বাচনই কি পারে একটি জাতির ভাগ্য নির্ধারণ করতে? কিংবা তার চেয়েও বড় প্রশ্ন, যখন জাতীয় জীবনের মৌলিক প্রশ্নগুলোর উত্তর আমরা একসাথে খুঁজে বের করতে পারি না, তখন নির্বাচন কেবল এক মুখোশ হয়ে ওঠে না কি?

গণতন্ত্র মানে কেবল নির্বাচন নয়, বরং একটি সহনশীল সংস্কৃতি। যেখানে মতবিরোধ থাকা সত্ত্বেও সবাই মেনে নেয়, ‘আমরা এক রাষ্ট্রের নাগরিক’। বাংলাদেশে আজ সেই ধারণাই চ্যালেঞ্জের মুখে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিরোধ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, তারা পরস্পরকে বৈধ প্রতিপক্ষ হিসেবে স্বীকার করতেও নারাজ। এই মানসিকতা কেবল রাজনীতিকেই সংকুচিত করে না, সমাজকেও বিভক্ত করে দেয় দুই বিপরীত শিবিরে। রাজনৈতিক দলগুলোর দ্বন্দ্ব ব্যক্তি থেকে পরিবার, শিক্ষাঙ্গন থেকে পেশাজীবী মহল। সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে।

এমন এক সমাজ তৈরি হয়েছে, যেখানে মত প্রকাশ মানে পক্ষ নেওয়া, যেখানে প্রশ্ন মানেই বিদ্রোহ। যে দেশে ছাত্ররাজনীতি ছিল আদর্শচর্চার ক্ষেত্র, সেই দেশে আজ তা হয়ে দাঁড়িয়েছে দখল ও সহিংসতার প্রতীক।
গণমাধ্যমকেও পক্ষ নিতে হয়, বুদ্ধিজীবীদেরও নিরাপদ অবস্থান খুঁজতে হয়। এই বাস্তবতায়, শুধু একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন চাওয়াটা যেন সমুদ্র পেরোতে গিয়ে কেবল নৌকার কথা ভাবার মতো।
এই রাজনৈতিক অস্থিরতা কি নতুন? না। এর গভীর শিকড় রয়েছে আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসে।

স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে রাষ্ট্রগঠন প্রক্রিয়ায় যে অবিশ্বাস, প্রতিহিংসা, এবং মতপার্থক্যের সূচনা হয়েছিল। তা কখনোই পরিপূর্ণভাবে নিরসন হয়নি। বরং তা উত্তরাধিকারসূত্রে এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে সঞ্চারিত হয়েছে। ইতিহাসের ব্যাখ্যা নিয়ে বিতর্ক, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে দ্বিধা, ধর্ম এবং জাতীয়তাবাদকে ঘিরে আলাদা অবস্থান—এসব মিলিয়ে এক অনিরসনযোগ্য জাতীয় দ্বন্দ্ব রূপ নিয়েছে। তার ফলে, একটিও এমন রাজনৈতিক ঐকমত্য গড়ে ওঠেনি যা একটি দেশের ভিত্তি গঠনে সহায়ক।

এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, বিশ্ব ইতিহাসে বহু দেশ রাজনৈতিক মতপার্থক্যের মধ্য দিয়েই এগিয়েছে। কিন্তু তারা একটি ন্যূনতম জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে পেরেছে। জাতীয় নিরাপত্তা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সংস্কৃতি, এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতার মতো বিষয়ে। বাংলাদেশে এইসব মৌলিক ক্ষেত্রেও দলীয় প্রভাব এতটাই প্রকট যে, রাষ্ট্র যেন কখনোই ‘জনগণের প্রতিষ্ঠান’ হয়ে উঠতে পারেনি। বরং এটি হয়েছে ক্ষমতার হাতিয়ার।

এই বাস্তবতায় প্রশ্ন আসে—উপায় কী? শুধু রাজনৈতিক সংস্কার কি যথেষ্ট? না। প্রয়োজন আরও গভীর কিছু। প্রয়োজন এমন এক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐক্য, যা রাজনীতির ঊর্ধ্বে অবস্থান করে। কারণ সমাজের ভিত্তি যদি মজবুত না হয়, সংস্কৃতি যদি হয়ে পড়ে বিভক্ত, তাহলে রাজনীতির কোনো পরিবর্তনই স্থায়ী ফল দিতে পারে না।

সাংস্কৃতিক ঐক্য মানে একরকম চিন্তা ভাবা নয়, বরং ভিন্নমতের সহাবস্থান, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও স্বাতন্ত্র্যের প্রতি সম্মান। আমাদের সাহিত্য, সংগীত, চলচ্চিত্র, লোকশিল্প। এসব একসময় সমাজকে এক সুতোয় বেঁধে রাখত। আজ সেসবও দলীয় পরিচয়ে বিভক্ত। গানের অনুষ্ঠানে দর্শক আসবে কি না, তা নির্ধারিত হয় শিল্পীর রাজনৈতিক ঘরানা দেখে। কবির কবিতা মূল্যায়িত হয় তার ফেসবুক পোস্ট দেখে। এই সংকীর্ণতার মধ্যে কখনোই একটি সমাজে স্বাভাবিকতা ফিরতে পারে না।

আমাদের সাহিত্যজগতে জীবনানন্দ দাশ কিংবা শামসুর রাহমান কোনোদিন দলীয় কবি ছিলেন না। তারা ছিলেন জাতির কবি। আজ তেমন জায়গা তৈরি হচ্ছে না, কারণ বিভাজন এতটাই গাঢ় হয়েছে যে, শিল্পও নিরাপদ নয়। এই বাস্তবতায় সামাজিক ঐক্য ছাড়া রাজনৈতিক স্থিতি সম্ভব নয়।

তাহলে কিভাবে গড়ে উঠবে এই ঐক্য? প্রথমত, শিক্ষা ব্যবস্থায় সংস্কৃতি, সহনশীলতা ও যৌথ পরিচয়ের পাঠ বাড়াতে হবে। আমাদের পাঠ্যপুস্তকে শুধু রাজনৈতিক ইতিহাস নয়, সংস্কৃতির বহুমাত্রিকতা, ভাষার সংগ্রাম, ধর্মীয় সহনশীলতার ইতিহাস—এসব অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, গণমাধ্যমকে দলনিরপেক্ষ কণ্ঠস্বর হিসেবে দাঁড়াতে হবে। আজকের গণমাধ্যম অনেকটাই দলীয় প্রভাবাধীন। একে সত্য ও বিশ্বাসযোগ্যতার জায়গায় ফিরিয়ে আনতে না পারলে সমাজে মতপার্থক্য আরও ঘনীভূত হবে।

তৃতীয়ত, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের মধ্যে কমপক্ষে কিছু মৌলিক বিষয়ে সংলাপ শুরু করতে হবে। যেমন: নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা, বিচার বিভাগের নিরপেক্ষতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, শিক্ষা নীতিতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ না করার অঙ্গীকার। এসব বিষয় নিয়ে রাজনৈতিক দলের মধ্যে একটি চুক্তি হওয়া দরকার, যেটি ‘জাতীয় চুক্তি’ বা ন্যাশনাল কনসেন্সাস হিসেবে কাজ করবে।

বাংলাদেশ আজ উন্নয়নশীল দেশের কাতারে। মাথাপিছু আয়, অবকাঠামো, প্রযুক্তি, রপ্তানি। সবখানে অগ্রগতি চোখে পড়ে। কিন্তু জাতীয় জীবনের মনস্তত্ত্বে আজও অস্থিরতা, অবিশ্বাস আর বিভাজন। আমরা কি এই টানাপোড়েন নিয়েই এগিয়ে যাব? নাকি এখানেই থেমে একটি নতুন চুক্তির সূচনা করবো?

রাজনীতি চলুক, নির্বাচন হোক, মতবিরোধ থাকুক। কিন্তু তার চেয়েও জরুরি, একটি অন্তর্নিহিত ঐক্য। আমরা সবাই এই দেশের সন্তান। আমাদের ভাষা এক, মাটি এক, কষ্ট ও স্বপ্ন এক। সেই সত্যকে স্বীকার না করলে, কোনো নির্বাচনই আমাদের সমস্যার সমাধান নয়। বরং, একটি সদিচ্ছা, একটি সমঝোতা, একটি অন্তরাত্মার ঐক্যই পারে বাংলাদেশকে সত্যিকারের প্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে।

অভিমত থেকে আরো পড়ুন