https://www.prothomalony.com/
13019
north-america
প্রকাশ: ০৬ এপ্রিল ২০২৫ ০৮:৩৫
মিয়ানমার সরকার ১ লাখ ৮০ হাজার জনকে ফেরতের জন্য চিহ্নিত করলেও পুরোপুরি আস্থাশীল হতে পারেননি সাধারণ রোহিঙ্গারা। মূলত রাখাইন রাজ্যের (আরাকান) ৯০ শতাংশের বেশি এলাকা জান্তা সরকারের নিয়ন্ত্রণে না থাকায় 'প্রত্যাবাসন ঘিরে' তৈরি হয়ে রয়েছে নানামুখী জটিলতা ও শঙ্কা। এমন পরিস্থিতিতে রাখাইন রাজ্যে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে ‘সেইফ জোন’ স্থাপনের দাবি জানিয়েছেন রোহিঙ্গারা। এদিকে রোহিঙ্গাদের ফেরত নেওয়ার সম্মতিকে মিয়ানমারের কূটনৈতিক কৌশল বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেছেন, বাস্তবতার ভিন্নতা রয়েছে; প্রত্যাবাসন ইস্যুতে বাংলাদেশকে আরও কৌশলী হতে হবে।
দয়া নয় মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন চান রোহিঙ্গারা
বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গার মধ্যে মাত্র ১ লাখ ৮০ হাজার রোহিঙ্গাকে প্রত্যাবাসনে রাজি হওয়ার বিষয়টি ইতিবাচক। কিন্তু রাজ্যটির বর্তমানে নিয়ন্ত্রণে থাকা আরাকান আর্মির হাতেও রোহিঙ্গারা নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। তবে তারা দয়ায় বেঁচে থাকার চেয়ে মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনকে প্রাধান্য দিচ্ছেন। তাই জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে সেইফ জোন প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি পেলে রোহিঙ্গারা স্বদেশে ফিরে যাবেন।
কথা হয় উখিয়ার লম্বাশিয়া ক্যাম্প-১-এ বসবাসরত রোহিঙ্গা মোহাম্মদ হোসেনের সঙ্গে। তিনি জানান, রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠী হিসেবে স্বীকৃতির পাশাপাশি নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের নিশ্চয়তা পেলে তারা স্বদেশে ফিরে যাবেন।
একই ক্যাম্পের অপর বাসিন্দা মাওলানা আবদুল হামিদ বলেন, আমরা বাংলাদেশ সরকারের দয়ায় বেঁচে থাকতে চাই না, আমরা মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন চাই। কারণ আমাদের জীবন এই ঘনবসতিপূর্ণ শিবিরে আটকে আছে।
কুতুপালং ২-ইস্ট নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা আব্দুল আজিজ বলেন, ২০২৩ সালে, যখন মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর আমন্ত্রণে একদল রোহিঙ্গাকে রাখাইন পর্যবেক্ষণের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।
তখন এসব রোহিঙ্গা প্রতিনিধি দলটির সদস্যরা টেকনাফ জেটিতে ফিরে এসে বলেছিলেন, সেখানে তাদের জন্য নিরাপত্তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। তারা সেখানে যেতে রাজি নন। এই কারণে আমি বলছি, এটি বাংলাদেশকে বিভ্রান্ত করার একটি কৌশল মাত্র।
যেখানে আরাকান অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ কার্যত মিয়ানমারের জান্তার হাতে নেই। ওই ভূখণ্ডের ৯০ শতাংশ এলাকা এখন আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে। এমন পরিস্থিতিতে জান্তা কীভাবে ১ লাখ ৮০ হাজার রোহিঙ্গাকে প্রত্যাবাসন করবে? কোথায় করবে? আরাকান আর্মি কী বসে বসে দেখবে —এসব প্রশ্ন টেকনাফের ২৬ নম্বর শালবাগান রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা বদরুল ইসলামের।
বর্তমান পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সম্ভব নয়
রাখাইন রাজ্যের অধিকাংশ এলাকা আরাকান আর্মির দখলে হওয়ায় প্রত্যাবাসনে আস্থা রাখছেন না রোহিঙ্গা নেতা ও বিশ্লেষকরা। এ ছাড়া রোহিঙ্গাদের ফেরানো হলে কিভাবে? কোথায় রাখা হবে সেসব বিষয়ও স্পষ্ট করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর (অব.) এমদাদুল ইসলাম বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সম্ভব নয়। রাখাইনের পরিস্থিতি অত্যন্ত অস্থিতিশীল, যেখানে নিরাপত্তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।
জাতিসংঘের মহাসচিবের বক্তব্যের বরাতে তিনি বলেন, রাখাইনে স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হলেই প্রত্যাবাসনের কথা বিবেচনা করা হবে। প্রথমত রোহিঙ্গাদের বসবাসের জন্য বাড়িঘর নেই। দ্বিতীয়ত, যেসব এলাকায় রোহিঙ্গাদের বসতি ছিল, সেসব এখন আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে।
এমন পরিস্থিতিতে কীভাবে প্রত্যাবাসন সম্ভব হবে? কখন, কীভাবে, কার ক্লিয়ারেন্সে তা সম্ভব হবে—এসবই অনিশ্চিত বলে মন্তব্য করেন এ নিরাপত্তা বিশ্লেষক।
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সংগ্রাম পরিষদের চেয়ারম্যান মাহমুদুল হক চৌধুরী বলেন, প্রত্যাবাসনের জন্য টেকনাফ ও ঘুমধুমে ক্যাম্প প্রস্তুত রয়েছে। ওই ক্যাম্প থেকে রোহিঙ্গা ফেরত সম্ভব কী-না? যেখানে মিয়ানমারে আরাকান আর্মির যুদ্ধে পালিয়ে আসা জান্তা সদস্যদের ফেরতের জন্য বঙ্গোপসাগর ব্যবহার করতে হয়েছে ওখানে স্থল ও নাফনদী ব্যবহার করতে আরাকান আর্মি দেবে কী-না? রোহিঙ্গা নিয়ে কোথা রাখা হবে এসব বিষয় আলোচনার পর প্রত্যাবাসন। এর আগে জটিলতা কোনভাবে কাটছে না।
আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জোবায়ের বলেন, আগেও প্রত্যাবাসনের জন্য অনেক চেষ্টার কথা শুনেছি। কিন্তু নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের নিশ্চয়তা না পাওয়ায় রোহিঙ্গারা যেতে রাজি হননি। আমরা চাই, রোহিঙ্গা সমস্যার স্থায়ী সমাধান। এক্ষেত্রে জান্তা সরকার প্ধান যদি স্পষ্ট করে বলে, রোহিঙ্গাদের জন্য আলাদা নিরাপদ জোন করে বিশ্ববাসীকে জানানো হতো তাহলে অন্তর থেকে খুশি হতাম।
ফেরতের সম্মতি কূটনৈতিক কৌশল?
চলতি বছরের ডিসেম্বরে অথবা ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে বলে জানিয়েছেন জানিয়েছেন মিয়ানমারের সামরিক জান্তা প্রধান মিন অং হ্লেইং। ২০২১ সালে অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের পর এই প্রথম নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করল জান্তা সরকার।
এমন পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন ইস্যূতে সম্মত হওয়াকে কূটনৈতিক কৌশল বলে মন্তব্য করেছেন কেউ কেউ। আবার কারও মতে এটি ইতিবাচক এবং বাংলাদেশের অন্তবর্তী সরকারের অন্যতম সফলতা।
রোহিঙ্গা বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর বলেন, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের দুই পক্ষের যে চুক্তি তা নিয়ে আগেও প্রত্যাবাসনের কথা এসেছে। তা ব্যর্থ হয়েছে। আবারও আলোচনায় এসেছে। কিন্তু এখন রাখাইন রাজ্য তো মিয়ানমারের সরকারের হাতে নেই। তাদের এখন কোথায় নিয়ে যাবে?
আসিফ মুনীর বলেন, মিয়ানমারের সীমান্ত পরিস্থিতি যুদ্ধময়। ওখানে কী রোহিঙ্গারা যাবেন? নাকি রোহিঙ্গা পরিস্থিতি বুঝে মিয়ানমারের জান্তা একটি কূটনৈতিক কৌশলী কথা বললেন আগের মতো। এর মধ্যে মিয়ানমারের জান্তা নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেছেন। তারিখ ঘোষণা ও প্রত্যাবাসনের সম্মতি আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি বিভ্রান্তির কৌশল কী-না তাও ভেবে দেখা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
কক্সবাজার সিভিল সোসাইটির সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী বলেন, প্রত্যাবাসনে আশার আলো সৃষ্টি হয়েছে। রোহিঙ্গাদের ফেরতে সম্মতি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কূটনৈতিক সফলতা। সুতরাং প্রত্যাবাসন নিয়ে মিয়ানমার সরকারের আরও বিস্তারিত জানাতে হবে। রোহিঙ্গাদের কোথায় রাখা হবে—এটি মিয়ানমারকে পরিষ্কার করে বলতে হবে।
ফেরাতে প্রস্তুত বাংলাদেশ
এদিকে এ বিষয়টিকে বাংলাদেশের জন্য বড় ধরণের কূটনৈতিক সাফল্য বলে মন্তব্য করেছেন কক্সবাজারস্থ শরণার্থী ত্রাণ প্রত্যাবাসন কমিশনের অতিরিক্ত কমিশনার আবু সালেহ মোহাম্মদ ওবায়দুল্লাহ। তিনি বলেন, প্রত্যাবাসনের বিষয়ে আমরা প্রস্তুত আছি। প্রত্যাবাসন সেন্টার অনেক আগেই করা হয়েছে। তালিকা হাতে আসলেই পরিবারগুলোকে শনাক্তের পর নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রত্যাবাসন কার্যক্রম শুরু হবে।
প্রসঙ্গত, ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর থেকে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে সেনা বাহিনীর গণহত্যা ও নির্যাতন-নিপীড়নের মুখে পালিয়ে আসে ১৪ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা। শুরু থেকেই রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠাতে বাংলাদেশ সরকার আন্তর্জাতিকভাবে নানা কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে এসেছে। রোহিঙ্গাদের ফেরাতে দু’দেশের মধ্যে চুক্তিও হয়েছিল। কিন্তু নানা ছলচাতুরীর মাধ্যমে মিয়ানমার একজন রোহিঙ্গাকেও ফেরত নেয়নি। এতে বাংলাদেশের ওপর এই বোঝা কেবলই বেড়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে আশ্রিত ৮ লাখ রোহিঙ্গার তালিকা থেকে ১ লাখ ৮০ হাজার রোহিঙ্গাকে 'ফেরত নেওয়ার জন্য যোগ্য' হিসেবে চিহ্নিত করেছে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ। এটিকে কূটনৈতিকভাবে বাংলাদেশের 'বড় অগ্রগতি' মনে করলেও পুরোপুরি আশান্বিত হতে পারেননি রোহিঙ্গা ও রোহিঙ্গা সংশ্লিষ্টরা।
উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন