https://www.prothomalony.com/
12882
opinion
প্রতিবারের মতো এবারও রমজানের আত্মিক পবিত্রতা ও সংযমের মাস পেরিয়ে এলো ঈদুল ফিতর—সুখ, সমৃদ্ধি ও সাম্যের বার্তাবাহী এক উৎসব। শাওয়ালের চাঁদ শুধু নতুন একটি দিনের সূচনা করেনি, বরং এনেছে মানবতার প্রতি অঙ্গীকারের পুনর্বাসন। রোজার সিয়াম সাধনার মাধ্যমে আত্মশুদ্ধি, সংযম ও সহমর্মিতার যে শিক্ষা আমরা অর্জন করি, ঈদুল ফিতর তারই বাস্তব প্রতিফলন। এটি কেবল ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং সামাজিক বন্ধন দৃঢ়করণ, আর্থিক বৈষম্য হ্রাস ও মানবিক মূল্যবোধের জাগরণের অনন্য উপলক্ষ।
রমজান মাস মুমিনের জীবনে আত্মিক পুনর্জাগরণের সময়। সিয়ামের মাধ্যমে আমরা ক্ষুধা-তৃষ্ণার যন্ত্রণা অনুভব করি, যাতে দরিদ্রের কষ্ট উপলব্ধি করতে পারি। এই শিক্ষাকে ঈদুল ফিতর বাস্তব কর্মে রূপ দেয়। ঈদের নামাজ, সদকাতুল ফিতর ও পারস্পরিক ক্ষমা চাওয়া—সবকিছুর মূলে রয়েছে সামাজিক দায়বদ্ধতা। ইসলামের দৃষ্টিতে ঈদুল ফিতর কেবল উৎসব নয়, এটি একটি সামাজিক সমাধান। সদকাতুল ফিতরের বাধ্যতামূলক বিধান ধনী-দরিদ্রের মধ্যে সম্পদ পুনর্বণ্টনের একটি ব্যবস্থা, যা অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষায় সহায়ক। বাংলাদেশে এই প্রথা গ্রামীণ সমাজ থেকে শহুরে জীবনে এখনও প্রাণবন্ত, যা সামাজিক সংহতির প্রতীক।
ঈদের নামাজের বিশেষত্ব হলো—এখানে ধনী-গরিব, উঁচু-নিচু, ক্ষমতাবান-নিরীহ সবাই এক কাতারে দাঁড়ান। ঈদগাহের এই দৃশ্য সাম্যের এক জীবন্ত উদাহরণ। সমাজে যেখানে শ্রেণি-বৈষম্য প্রকট, সেখানে ঈদের দিনটি যেন সমস্ত বিভেদ মুছে দেয়। কবি কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায়, *“ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ”*—এই গান শুধু উৎসবের আবেশই বহন করে না, বরং তা সমাজের সর্বস্তরে ঈদের আনন্দ ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানায়। বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজে আজও ঈদের দিনে প্রতিবেশীর বাড়িতে মিষ্টি বিতরণ, নতুন পোশাক আদান-প্রদান ও দরিদ্রদের জন্য খাবারের আয়োজন চোখে পড়ে। এটি শুধু সংস্কৃতি নয়, বরং ইসলামের শিক্ষারই প্রতিফলন।
ঈদুল ফিতরের অন্যতম শিক্ষা হলো হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া। আজকের বাংলাদেশে যেখানে রাজনৈতিক বিভাজন, ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা ও সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়াচ্ছে, সেখানে ঈদের এই বার্তা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। ঈদ আমাদের শেখায়—অন্যের ধর্ম, মতাদর্শ ও পরিচয়কে সম্মান করতে। বাংলাদেশের ইতিহাসে ঈদের উদারতা সর্বদাই দৃষ্টান্তমূলক: হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের মানুষও ঈদের আনন্দে শরিক হন, মুসলিমরা পালন করেন তাদের উৎসব। এই সহাবস্থানই আমাদের জাতীয় শক্তি।
বাংলাদেশে ঈদুল ফিতরের প্রাক্কালে সদকাতুল ফিতর আদায়ের প্রথা এখনও টিকে আছে, তবে এর তাৎপর্য ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে। শহুরে জীবনে অনেকেই এই ফিতরা আদায়কে ফরমালিটি হিসেবে দেখেন, অথচ এর মূল উদ্দেশ্য হলো দরিদ্রদের ঈদের আনন্দে শরিক করা। পবিত্র কোরআনে সূরা বাকারায় বলা হয়েছে,“তাদের সম্পদে অভাবগ্রস্ত ও বঞ্চিতদের অধিকার রয়েছে।” (৫১:১৯)। ঈদের দিনে দরিদ্র শিশুদের নতুন জামা, ক্ষুধার্তের জন্য খাবারের ব্যবস্থা—এই ছোট ছোট উদ্যোগই সামাজিক নিরাপত্তা বলয় গড়ে তুলতে পারে। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে সদকাতুল ফিতরের সঠিক বণ্টন নিশ্চিত করলে তা অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখতে পারে।
বর্তমান বাংলাদেশে ঈদের আনন্দ ম্লান হয় রাজনৈতিক কোন্দল, মূল্যস্ফীতি ও বেকারত্বের যন্ত্রণায়। ঈদের কেনাকাটায় নিম্ন আয়ের মানুষের দুঃখ, পথশিশুরা নতুন জামা থেকে বঞ্চিত—এসব চিত্র আমাদের সমাজের অন্ধকার দিক। অথচ ইসলামের দৃষ্টিতে ঈদ হলো সেই দিন, যখন কোনো মানুষই অভুক্ত থাকবে না। এই লক্ষ্য অর্জনে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক উদ্যোগ জরুরি। এজন্যই ঈদুল ফিতর কেবল ব্যক্তির নয়, সমষ্টির উৎসব।
ঈদুল ফিতরের মর্মবাণী সদাই প্রাসঙ্গিক, কারণ এটি শেখায়: ধনী-দরিদ্রের বিভেদ মুছে দেওয়া। পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন দৃঢ় করা। দুর্বলের পাশে দাঁড়ানো। আত্মকেন্দ্রিকতা ত্যাগ করে সমাজের জন্য কাজ করা।
এই শিক্ষাগুলোকে কাজে লাগিয়ে আমরা একটি সুন্দর সমাজ গড়ে তুলতে পারি। উদাহরণস্বরূপ, করোনাকালে অনেকেই ঈদের আনন্দ ভাগ করে নিয়েছেন দরিদ্রদের মধ্যে খাদ্য বিতরণ করে। এটি ঈদের চেতনারই প্রতিফলন।
ঈদুল ফিতর কেবল একটি দিনের উৎসব নয়, এটি একটি জীবনদর্শন। এই দর্শন আমাদের শেখায়—পার্থক্য ভুলে ঐক্যবদ্ধ থাকতে, সম্পদে দরিদ্রের অধিকার স্বীকার করতে এবং হিংসার স্থলে প্রেম স্থাপন করতে। বাংলাদেশের মতো একটি বহুসংস্কৃতির দেশে এই শিক্ষা অপরিহার্য। আসুন, ঈদের এই পবিত্র দিনে আমরা অঙ্গীকার করি: ব্যক্তিগত স্বার্থ ত্যাগ করে সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখব, দরিদ্রের মুখে হাসি ফুটাব এবং জাতীয় সংহতি সুদৃঢ় করব। মহান আল্লাহ আমাদের সকলকে ঈদের প্রকৃত বার্তা বুঝে তা বাস্তবায়নের তৌফিক দিন। ঈদ মোবারক!
ঈদের আলোয় উদ্ভাসিত হোক প্রতিটি হৃদয়। মহান আল্লাহ আমাদের জীবনকে সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধিতে পূর্ণ করুন। সকলের জন্য বয়ে আনুক ঈদের অনাবিল আনন্দ।
অভিমত থেকে আরো পড়ুন