https://www.prothomalony.com/
12591
search
প্রকাশ: ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৫ ০৫:৪০
২০২৫ সালে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা বড় ধরনের পরিবর্তনের পূর্বাভাস দিচ্ছেন, যেখানে জিওপলিটিক্যাল অনিশ্চয়তা ও বাণিজ্যিক টানাপোড়েন আন্তর্জাতিক বাজারকে নতুনভাবে গঠিত করছে। অনেকেই মনে করছেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পুনরাগমন যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের উত্তেজনা বাড়াতে পারে, যা অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা, সুরক্ষাবাদী নীতি এবং বৈশ্বিক বিভাজন সৃষ্টি করতে পারে। এ বছর জিওপলিটিক্যাল দৃশ্যপট আরও অস্থির হতে পারে, কারণ উভয় দেশ একটি জটিল এবং ক্রমবর্ধমান শত্রুতাপূর্ণ সম্পর্কের মধ্যে রয়েছে। ট্রাম্পের অধীনে যুক্তরাষ্ট্র সুরক্ষাবাদী অবস্থান তীব্র করবে, আর চীন তার ব্রিকস অংশীদারিত্বগুলো শক্তিশালী করার চেষ্টা করবে।
এছাড়া, যুক্তরাষ্ট্র-চীন উত্তেজনার মধ্যে বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ মানবিক সংকটের মুখে রয়েছে সুদান। দুর্ভিক্ষ ও গণবসতিচ্যুতি ক্রমেই বাড়ছে, অথচ সহায়তা অপ্রতুল। অন্যদিকে, সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদের পতনের পর দেশটি এক অনিশ্চিত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
তবে কিছু সংঘাতের অবসান ঘটতে পারে বলে আশাবাদী বিশেষজ্ঞরা। ২০২৫ সালে তিন বছরে গড়ানো রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শেষ হওয়ার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি এসেছে ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে গাজা যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে। জানুয়ারি ২০২৫-এ স্বাক্ষরিত চুক্তি ১৫ মাসের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর কিছুটা স্বস্তি এনে দিয়েছে।
এর পাশাপাশি, ২০২৫ সালে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। কানাডা, জার্মানি, বেলারুশ, ফিলিপাইন ও অস্ট্রেলিয়ার নির্বাচন বিশ্ব রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিভিন্ন অর্থনৈতিক বিশ্লেষণের ভিত্তিতে বিশেষজ্ঞরা ২০২৫ সালের মুদ্রাস্ফীতি, সুদের হার এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির বিষয়ে কিছু সাধারণ পূর্বাভাস দিয়েছেন। এই পূর্বাভাস ডাটাবেজে ৮০০টিরও বেশি পূর্বাভাস রয়েছে, যা বিভিন্ন প্রতিবেদন, সাক্ষাৎকার, পডকাস্ট ও অন্যান্য উৎস থেকে সংগৃহীত। এটি পূর্বাভাস সম্মিলনের ষষ্ঠ বছর যা ইনিগো ইনস্যুরেন্স দ্বারা উপস্থাপিত ২০২৫ গ্লোবাল ফরকাস্ট সিরিজের একটি অংশ।
বিশেষজ্ঞরা আশা করছেন যে, ২০২৫ সালে বিশ্বব্যাপী মুদ্রাস্ফীতি কমার প্রবণতা অব্যাহত থাকবে। ২০২৪ সালের ৫.৮ শতাংশ থেকে কমে ২০২৫ সালে এটি ৪.৩ শতাংশ হতে পারে। তবে কিছু বিশেষজ্ঞের মতে, শুল্ক বৃদ্ধির কারণে ব্যবসাগুলো বাড়তি খরচ ভোক্তাদের ওপর চাপিয়ে দিলে নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে তীব্র মূল্যস্ফীতি দেখা দিতে পারে। এছাড়া, ২০২৫ সালে ফেডারেল রিজার্ভ ও ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুদের হার কমার সম্ভাবনা রয়েছে।অন্যদিকে, ব্যাংক অব জাপান ২০২৫ সালে সুদের হার ২৫ বেসিস পয়েন্ট বাড়ানোর পরিকল্পনা করেছে এবং ইতোমধ্যেই তা ০.৫০ শতাংশে পৌঁছেছে, যা ২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের পর সর্বোচ্চ।
বিশেষজ্ঞরা বাজার নিয়ে আশাবাদী, তারা বলেন 'এসএন্ডপি-৫০০' এর লাভ ১০ শতাংশ থেকে ২০ শতাংশ হতে পারে এবং 'মেগানিফিসেন্ট সেভেন'(সাতটি বড় প্রযুক্তি কোম্পানি যা মার্কিন স্টক মার্কেটে বিশাল প্রভাব রাখে) ছাড়াও আরও লাভ আশা করা হচ্ছে। 'এসএন্ডপি-৫০০' একটি স্টক মার্কেট সূচক যা যুক্তরাষ্ট্রের ৫০০টি বৃহত্তম কোম্পানির শেয়ারের মূল্য নির্দেশ করে এবং মার্কিন স্টক মার্কেটের অবস্থার পরিমাপক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। পূর্বাভাস অনুযায়ী, মার্কিন শেয়ারবাজার আয় বৃদ্ধিতে এগিয়ে থাকবে, ইউরোপ পুনরুদ্ধারের পথে থাকবে, আর এশিয়ার বাজার কিছুটা দুর্বল হতে পারে।
স্বর্ণের দাম এই বছর আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা এটিকে জিওপলিটিক্যাল ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার বিরুদ্ধে একটি কার্যকর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং বিনিয়োগ পোর্টফোলিও বৈচিত্র্যকরণ হিসাবে বিবেচনা করছেন।
অন্যদিকে, বিটকয়েন ও ক্রিপ্টোকারেন্সিরও বৃদ্ধির আশা করা হচ্ছে, কারণ ট্রাম্প প্রশাসন ক্রিপ্টো-সহায়ক নীতিগুলি প্রবর্তন করছেন এবং বিশ্বব্যাপী অর্থনীতিগুলি ডিজিটাল সম্পদের জন্য আরও সংগঠিত নিয়ন্ত্রক কাঠামো তৈরি করছে।
২০২৫ সালের দিকে বৈশ্বিক বৃদ্ধির হার স্থিতিশীল থাকতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। বৈশ্বিক জিডিপি বৃদ্ধির পূর্বাভাস ২.৭ শতাংশ থেকে ৩.২ শতাংশের মধ্যে থাকতে পারে, যা আইএমএফ-এর ১০ বছরের গড় (২০১৫-২০২৪) ৩.১ শতাংশের কাছাকাছি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীন উভয় দেশেই ২০২৫ সালে ধীরগতির বৃদ্ধির পূর্বাভাস রয়েছে। আইএমএফ অনুযায়ী, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জিডিপি (মোট দেশীয় উৎপাদন) বৃদ্ধির পূর্বাভাস ২.৭ শতাংশ যা ২০২৪ সালের তুলনায় ০.১ শতাংশ পয়েন্ট কম। চীনের জিডিপি বৃদ্ধির পূর্বাভাস ৪.৬ শতাংশ যা গত বছরের তুলনায় ০.২ শতাংশ পয়েন্ট কম।
২০২৫ সালে 'এআই' প্রযুক্তিতে বড় অগ্রগতি আশা করা হচ্ছে, যার মধ্যে রয়েছে 'এজেন্টিক এআই' সিস্টেম এবং 'আর্টিফিশিয়্যাল জেনারেল ইন্টিলিজেন্ট (এজিআই)'। 'ওপেনএআই' সিইও স্যাম অল্টম্যান, 'টেসলা' সিইও এলন মাস্ক এবং 'অ্যানথ্রোপিক সিইও দারিও আমোদেই বলেছেন, এই প্রযুক্তিগুলি শিগগিরই বাস্তবায়িত হতে পারে, হয়তো এই বছরেই। এছাড়াও, এই জানুয়ারিতেই, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প স্টারগেট প্রজেক্ট ঘোষণা করেছেন, যা ওপেনএআই, সফটব্যাঙ্ক, ওরাকল এবং এমজিএক্স-এর নেতৃত্বে ৫০০ বিলিয়ন ডলারের 'এআই' অবকাঠামোগত একটি উদ্যোগ, এর লক্ষ্য 'এআই' প্রযুক্তিতে আমেরিকান নেতৃত্ব নিশ্চিত করার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ডেটা সেন্টার তৈরি করা, যার প্রাথমিক ১০০ বিলিয়ন ডলারের স্থাপনা টেক্সাস থেকে শুরু হবে।
তবে, কোম্পানিগুলো যখন তাদের 'এআই' কার্যক্রম সম্প্রসারিত করছে, তখন মূলধন ব্যয় ও জ্বালানি খরচ বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ কারণে 'এআই' প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ টেকসই করতে এবং পরিবেশগত লক্ষ্যগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে জ্বালানি দক্ষতা ও নবায়নযোগ্য শক্তির উন্নতির প্রয়োজন হবে। এছাড়া, রোবটিক্স ও স্বয়ংক্রিয় যানবাহন প্রযুক্তিও উন্নতি অব্যাহত রাখবে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ২০২৫ সালের মধ্যে স্বয়ংক্রিয় যানবাহন প্রযুক্তি নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য হয়ে উঠবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান শহরগুলোতে এটি বেশ প্রচলিত হয়ে যাবে।
২০২৫ সালে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে জিওপলিটিক্যাল, অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দৃশ্যমান হচ্ছে। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়, যখন বিশ্বব্যবস্থা পুনর্গঠিত হচ্ছে—প্রচলিত কাঠামো চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে, নতুনভাবে কল্পনা করা হচ্ছে এবং পুনর্বিন্যাস করা হচ্ছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের হোয়াইট হাউজে ফিরে আসা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক ও অর্থনৈতিক নীতিতে নাটকীয় পরিবর্তন আনতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে, বিশেষ করে বাণিজ্য ব্যবস্থা এবং সুরক্ষামূলক কৌশলগুলির উপর গুরুত্ব দিয়ে। তার প্রশাসনের নীতি আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে বদলে দিতে পারে, যা অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা ও বৈশ্বিক বিভাজন বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে, দেশীয় বাজার চাঙ্গা করতে এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটাল প্রযুক্তির উন্নয়নে সহায়ক নীতি গ্রহণ করা হতে পারে।
তবে, বিশ্ব অর্থনীতি সতর্কতার সঙ্গে ভারসাম্য পুনরুদ্ধার করছে। মুদ্রাস্ফীতি ধীরে ধীরে কমছে, বাজারে ইতিবাচক মনোভাব দেখা যাচ্ছে, এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো কৌশলগতভাবে সুদের হার সমন্বয় করছে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মতো বড় অর্থনীতির ধীরগতির পূর্বাভাস থাকা সত্ত্বেও বৈশ্বিক জিডিপি প্রবৃদ্ধি স্থিতিশীল রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন প্রযুক্তি, বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-যা প্রযুক্তিতে রূপান্তরকারী এবং বিঘ্নকারী শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। 'এআই' অবকাঠামোতে বিপুল বিনিয়োগ এবং 'আর্টিফিশিয়্যাল জেনারেল ইন্টিলিজেন্ট (এজিআই)' সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী প্রযুক্তিগতভাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপের ইঙ্গিত দিলেও চীনের ওপেন সোর্স 'ডিসপিট আর ওয়ান' মডেলের মতো উদ্ভাবন 'এআই'-এর দক্ষতা ও খরচের বিষয়ে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২৫ বছরটি হবে কৌশলগত অভিযোজনের সময়, যেখানে দেশ, বাজার এবং প্রযুক্তি নিজেদের পুনরায় সামঞ্জস্য করে আমাদের জটিল পৃথিবীর চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করবে।
অনুসন্ধান থেকে আরো পড়ুন