https://www.prothomalony.com/

12474

opinion

অভিমত

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক : পারস্পরিক স্বার্থের

প্রকাশ: ১৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৫ ১২:৫৬

বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক কেবল ভৌগোলিক প্রতিবেশী হওয়ার কারণে নয়, বরং ইতিহাস, সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও রাজনীতির ক্ষেত্রেও গভীরভাবে সংযুক্ত। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার ফলে দুই দেশের মধ্যে যে বন্ধন সৃষ্টি হয়েছিল, তা আজও বহাল রয়েছে। স্বাধীনতার পর থেকে উভয় দেশ অর্থনীতি, নিরাপত্তা, জ্বালানি ও কূটনৈতিক নানা ক্ষেত্রে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা চালিয়ে আসছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কে কিছু টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়েছে, যা ভবিষ্যতে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বাংলাদেশ ও ভারতের অর্থনৈতিক সম্পর্ক দিন দিন প্রসারিত হচ্ছে। ভারত বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার এবং বাংলাদেশের বাজারে ভারতীয় পণ্যের আধিপত্য ক্রমশ বাড়ছে। অন্যদিকে, ভারতীয় বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, ওষুধ, পাটজাত পণ্য এবং কৃষিজাত পণ্যের প্রবেশাধিকার বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা চলছে। ভারত-বাংলাদেশ ট্রানজিট সুবিধা বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের সংযোগ স্থাপনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে, যা ভারতীয় স্বার্থকে আরও জোরদার করেছে। তবে বাংলাদেশে বাণিজ্য ভারসাম্য নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে, কারণ ভারত থেকে আমদানি অনেক বেশি হলেও রপ্তানির পরিমাণ তুলনামূলক কম।

জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতেও বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্ক উল্লেখযোগ্য। ভারত থেকে বাংলাদেশ বর্তমানে প্রায় ১১৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করছে এবং আরও বড় আকারে নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। মৈত্রী তেল পাইপলাইন চালু হওয়ায় জ্বালানি সরবরাহ সহজ হয়েছে। তবে এলএনজি আমদানিতে ভারতীয় বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনার অগ্রগতি ধীরগতিতে চলছে, যা সম্পর্কের টানাপোড়েনের একটি দিক নির্দেশ করে।

নদী ও পানি বণ্টন ইস্যু দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ৫৪টি অভিন্ন নদীর মধ্যে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলেও তিস্তা চুক্তি এখনও ঝুলে রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের আপত্তির কারণে ভারত সরকার এখনো চুক্তি সম্পাদন করতে পারেনি, যা বাংলাদেশের জন্য একটি প্রধান উদ্বেগের কারণ। বাংলাদেশ সরকার অন্যান্য নদীর পানি বণ্টন নিয়েও আলোচনা চাইলেও ভারতের পক্ষ থেকে এখনও কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।

সীমান্ত নিরাপত্তা ইস্যু বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে দীর্ঘদিনের আলোচ্য বিষয়। সীমান্ত হত্যা, অনুপ্রবেশ ও চোরাচালান নিয়ে দুই দেশের জনগণের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) গুলিতে বাংলাদেশি নাগরিকদের মৃত্যু সম্পর্ককে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করছে। যদিও দুই দেশের সীমান্ত রক্ষীবাহিনী বিভিন্ন সময়ে যৌথ সমন্বয় বৈঠক করেছে, তবে বাস্তবে এর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কে কিছু টানাপোড়েন দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতের দীর্ঘদিনের প্রভাব রয়েছে এবং আওয়ামী লীগ সরকার ভারতের অন্যতম ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত। তবে ২০২৪ সালের জানুয়ারির নির্বাচনের আগে ও পরে ভারতের ভূমিকা নিয়ে কিছু বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

প্রথমত, নির্বাচনের আগে ভারতের কূটনৈতিক অবস্থান ছিল আওয়ামী লীগ সরকারের প্রতি দৃশ্যমান সমর্থনমূলক। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হওয়ার পর ভারত কিছুটা সংযত অবস্থান নিয়েছে, যা রাজনৈতিক মহলে নানা ব্যাখ্যার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে, ভারতের কিছু কৌশলগত অংশীদার বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে নতুন সমীকরণ তৈরির চেষ্টা করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

দ্বিতীয়ত, অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও কূটনীতিতে ভারতের ভূমিকা নিয়ে বাংলাদেশের বিরোধী দলগুলো বরাবরই সমালোচনা করে আসছে। অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর ভারতের প্রতিক্রিয়া কিছুটা মিশ্র ছিল। ভারতের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে সরকারের প্রতি সমর্থন থাকলেও, পর্দার আড়ালে নানামুখী আলোচনা চলছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

তৃতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক নতুন কৌশলগত অবস্থানে যাচ্ছে, যা ভারত-বাংলাদেশ কূটনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে। অন্তর্বর্তী সরকারের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা, মানবাধিকার ইস্যু ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া নিয়ে আন্তর্জাতিক চাপ থাকলেও ভারত এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে কঠোর অবস্থান নেয়নি। তবে ভবিষ্যতে এই চাপ বাড়তে থাকলে ভারত কৌশলগত দিক পরিবর্তন করতে পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক সবসময় পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে এগিয়ে এসেছে এবং ভবিষ্যতেও এই সম্পর্ক টিকে থাকবে। তবে সাম্প্রতিক টানাপোড়েন এবং রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পরিবর্তনগুলো এই সম্পর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করতে হলে পারস্পরিক আস্থা বাড়ানো, অর্থনৈতিক ভারসাম্য আনা, নদীর পানি বণ্টন সমস্যা সমাধান করা, সীমান্ত হত্যা বন্ধ করা এবং রাজনৈতিক সংলাপ বাড়ানো প্রয়োজন।

পরিশেষে, বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক শুধু দুই দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ওপর নির্ভরশীল নয়, বরং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতাও এই সম্পর্ককে প্রভাবিত করে। ভবিষ্যতে দুই দেশ যদি কৌশলগত সহযোগিতা বজায় রেখে, পারস্পরিক স্বার্থ রক্ষা করে এবং আস্থার সংকট দূর করতে পারে, তাহলে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হবে এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত হবে।

অভিমত থেকে আরো পড়ুন