https://www.prothomalony.com/
12437
north-america
'রাজনীতি' শব্দটির সঙ্গে মানুষের মিশ্র প্রতিক্রিয়া জড়িয়ে আছে। একদিকে, রাজনীতি সমাজ পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, যেখানে নীতি-নির্ধারণ, জনকল্যাণ এবং ন্যায়বিচারের আদর্শ বাস্তবায়নের সুযোগ থাকে। অন্যদিকে, অনেকের কাছে রাজনীতি মানেই ক্ষমতার লড়াই, প্রতারণা, দুর্নীতি এবং স্বার্থপরতার প্রতিচিত্র।
রাজনীতির ধারণা হেলেনিস্টিক যুগ থেকে উৎপত্তি লাভ করে এবং পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে এটি নানা রকম ব্যাখ্যা ও পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে। ব্যাখ্যা যাই হোক, রাজনীতিতে এমন কিছু নীতি থাকে, যেসব নীতি অনুসরণের মাধ্যমে একটি রাষ্ট্র পরিচালিত হয়ে থাকে। সম্ভবত রাজনৈতিক তত্ত্বের প্রথম ও অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবদানকারী ছিলেন গ্রিক দার্শনিক, যুক্তিবিদ ও বিজ্ঞানী অ্যারিস্টটল। এথেন্সে অবস্থানকালে তিনি পলিটিকস এবং নিকোমাখিয়ান এথিকসসহ বহু গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ রচনা করেন, যা আধুনিক রাজনৈতিক দর্শন ও নৈতিকতার ভিত্তি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। পলিটিকস এবং নিকোমাখিয়ান এথিকস উভয় গ্রন্থেই অ্যারিস্টটল রাজনীতিকে মূলত নীতিশাস্ত্র ও মূল্যবোধের অধ্যয়ন হিসেবে বর্ণনা করেছেন—যা সঠিক ও ভুলের ধারণা, কী হওয়া উচিত এবং কী হওয়া সম্ভব, সে সম্পর্কে আলোচনা করে। অ্যারিস্টটল মনে করতেন যে, রাজনীতি হচ্ছে প্রধানতম বিজ্ঞান, কারণ মানুষ স্বভাবগতভাবেই একটি রাজনৈতিক প্রাণী, এবং তারা সচেতন বা অচেতনভাবে প্রতিটি কর্মের মাধ্যমেই রাজনীতিতে যুক্ত থাকে, যত ছোট বা গুরুত্বহীন সেই কাজই হোক না কেন।
সভ্যতার সূচনালগ্ন থেকেই আমরা দেখেছি, মতাদর্শগত বিভেদ, স্বার্থের সংঘাত এবং ক্ষমতার লড়াই রাজনীতিকে একসময় সংঘর্ষমুখী করে তুলেছে। অথচ প্রকৃত রাজনীতির উদ্দেশ্য হওয়া উচিত ন্যায়, সমতা, এবং সর্বোপরি সহনশীলতার ভিত্তিতে সমাজকে পরিচালিত করা।
বহু দার্শনিক ও চিন্তাবিদরা রাজনীতির নৈতিক ভিত্তি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। 'থমাস হবস' সামাজিক ও রাজনৈতিক শৃঙ্খলার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন যেখানে 'স্টেট অফ ন্যাচার' ধারণার মাধ্যমে দেখান যে সংঘাত এড়াতে এবং শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠনের জন্য একটি সর্বোচ্চ সার্বভৌম ক্ষমতার প্রয়োজন। তাঁর মতে, নৈতিকতা ও রাজনীতি একে অপরের সাথে গভীরভাবে সংযুক্ত, এবং মানুষের স্বভাবই নির্ধারণ করে রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রকৃতি।
'জন রলস' ন্যায়বিচারকে রাজনীতির মূল ভিত্তি হিসেবে দেখান। তার 'জাস্টিজ এজ ফেয়ারনেস' তত্ত্ব অনুযায়ী, একটি সমাজে সবাইকে সমান অধিকার দিতে হবে এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থাও হতে হবে সাম্যবাদী। ব্যক্তি স্বাধীনতা ও সামাজিক সাম্য একসঙ্গে বিদ্যমান থাকবে-এমন রাজনৈতিক কাঠামোর পক্ষে ছিলেন তিনি।
'জর্জ লেকোফ' রাজনীতিতে ভাষার প্রভাব এবং চিন্তার কাঠামো কেমন করে বাস্তবতাকে সংজ্ঞায়িত করে তা বিশ্লেষণ করেছেন। তার মতে, রাজনৈতিক ভাষা ও বর্ণনা শুধু তথ্য প্রচার করে না, বরং মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতিকে নিয়ন্ত্রণ করে। তিনি দেখিয়েছেন কিভাবে নৈতিক কাঠামো আমাদের রাজনৈতিক ভাবনাগুলোর ভিত্তি তৈরি করে। এই দার্শনিকদের চিন্তা, রাজনীতির নৈতিক কাঠামো ও সামাজিক চুক্তির ধারণাকে বিশ্বজুড়ে বহুভাবে সমৃদ্ধ করেছে, যা আজও সমসাময়িক রাজনৈতিক বিশ্লেষণে গুরুত্বপূর্ণ।
আজকের বিশ্বে আমরা রাজনৈতিক মেরুকরণ, ঘৃণার ভাষা এবং সহিংসতামূলক কৌশলের বিস্তার দেখছি। যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, বাংলাদেশসহ বহু দেশে রাজনৈতিক বিভক্তি সমাজকে দুর্বল করে তুলছে। সমাজমাধ্যমের অপব্যবহার, অপপ্রচার এবং ভুল তথ্য ছড়িয়ে বিদ্বেষকে উসকে দেওয়া হচ্ছে। অথচ একটি গণতান্ত্রিক সমাজে বিভিন্ন মত ও পথের সহাবস্থান নিশ্চিত করাই রাজনীতির প্রকৃত সৌন্দর্য।
আজকের বাংলাদেশের রাজনীতিতে যখন বিভক্তি, বিদ্বেষ ও অসহিষ্ণুতা ভয়াবহ আকার ধারণ করছে, তখন অতীতের শিক্ষা ও দার্শনিক ব্যাখ্যা থেকে আমরা কিছু মূল্যবান দৃষ্টান্ত নিতে পারি।
ইউরোপের বহু দেশ যখন জাতীয়তাবাদী বিদ্বেষের পথে হেঁটেছে, তখন সেখানকার সমাজে কট্টরপন্থার উত্থান ঘটেছে। কিন্তু স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোতে আমরা দেখি সহনশীলতা ও সংলাপের মাধ্যমে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জন সম্ভব হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসেও আব্রাহাম লিংকনের নেতৃত্বে গৃহযুদ্ধোত্তর আমেরিকায় পুনর্মিলনের চেষ্টা ছিল সহনশীল রাজনীতির এক উজ্জ্বল উদাহরণ।
প্রাচীন গ্রীসের অ্যাথেন্স ও স্পার্টার রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব কিংবা মধ্যযুগের ধর্মযুদ্ধগুলো দেখায়, যখন সহনশীলতা হারিয়ে যায়, তখন সমাজে বিশৃঙ্খলা ও ধ্বংস নেমে আসে। ভারতের ইতিহাসও আমাদের সহনশীল রাজনীতির উদাহরণ দেয়। মহাত্মা গান্ধীর অহিংস নীতির মাধ্যমে স্বাধীনতা আন্দোলন পরিচালনার দর্শন আজও বিশ্বের নানা প্রান্তে অনুপ্রেরণার উৎস। আবার বিপরীত দিকে, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও জাতিগত সংঘাত আমাদের দেখিয়েছে যে বিদ্বেষের রাজনীতি কেবল ধ্বংস ডেকে আনে।
রাজনীতি কীসের জন্য? এই প্রশ্নের অন্যতম ক্লাসিক উত্তর হলো, রাজনীতি নির্ধারণ করে কে কী পাবে, কখন এবং কীভাবে পাবে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে, রাজনীতি মূলত বস্তুগত সম্পদের বণ্টন সংক্রান্ত প্রতিযোগিতা নিরসনের বিষয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে এটি রাজনীতির যথাযথ চিত্র হতে পারে—যে সময়ে কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রের মাধ্যমে প্রগতিশীল কর ব্যবস্থা ও কল্যাণমূলক সুবিধাগুলোর সম্প্রসারণ ঘটেছিল এবং ঐতিহ্যগত বাম-ডান মতাদর্শিক বিভাজনের ভিত্তিতে দলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল। মূলত
রাজনীতি তখন থেকেই বিদ্যমান, যখন থেকে মানুষ সম্পদের অভাবের সম্মুখীন হয়েছে, বিভিন্ন বিশ্বাস ও পছন্দ পোষণ করেছে এবং সীমিত সম্পদ বণ্টনের সময় এই পার্থক্যগুলোর সমাধান করতে হয়েছে। যতদিন এই মানবিক শর্তগুলো টিকে থাকবে, ততদিন রাজনীতিও থাকবে—অর্থাৎ চিরকাল। রাজনীতি মানুষের অস্তিত্বের একটি মৌলিক উপাদান।
দার্শনিক জন রলস তার 'থিওরি অফ জাস্টিস'-দেখায়, ন্যায় ও সমতার ভিত্তিতে গঠিত রাজনৈতিক ব্যবস্থা কেবল সুশাসনই নিশ্চিত করে না, বরং দীর্ঘমেয়াদে সমাজের স্থিতিশীলতা বজায় রাখে। ফ্রেডেরিক নীৎশে, কার্ল মার্কস কিংবা অ্যারিস্টটলের মতবাদ থেকে আমরা শিখতে পারি, যে কোনো মতাদর্শগত লড়াইয়ে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও বোঝাপড়ার মাধ্যমেই সমাজ এগিয়ে যেতে পারে।
রাজনীতিতে ভিন্ন মত থাকবেই, মতাদর্শগত সংঘর্ষও অনিবার্য, কিন্তু সেই মতের সংঘাত যেন শত্রুতায় রূপ না নেয়। তাই প্রয়োজন গণতন্ত্রের শক্তিশালী কাঠামো, যেখানে ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা থাকবে, সংলাপের সুযোগ থাকবে, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—সহনশীলতার জায়গাটি অটুট থাকবে।
বিদ্বেষের রাজনীতি সাময়িকভাবে কিছু গোষ্ঠীর স্বার্থসিদ্ধি ঘটালেও, দীর্ঘমেয়াদে তা সমাজ ও রাষ্ট্রকে দুর্বল করে দেয়। আজকের বিশ্বে আমাদের সামনে দুটি পথ—একটি বিভাজনের, অন্যটি সংহতির। ইতিহাস সাক্ষী, যারা সহনশীলতার পথে হেঁটেছে, তারাই টিকে থেকেছে, এগিয়ে গেছে। তাই আমাদের সময়ের রাজনৈতিক নেতাদের, জনগণকে এবং সমাজের সকল স্তরের মানুষকে একসঙ্গে ভাবতে হবে—সহনশীলতাই রাজনীতির মূলমন্ত্র হওয়া উচিত। সহনশীল রাজনীতিই আমাদের আগামীর সুন্দর ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনে সহায়তা করবে।
উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন