https://www.prothomalony.com/

12244

north-america

উত্তর আমেরিকা

উত্তরের সাহিত‍্য

প্রকাশ: ২৩ জানুয়ারী ২০২৫ ০২:২৬

তুঁহু-তুঁহু

শঙ্খশুভ্র পাত্র

সেই তো 'নয়ন'-এ এসে ছোটোদের ভালবাসা ঢের

হৃদয়ে লালিত হল৷ বাখরাবাদে এসে সংকেত

ফোনালাপে সাঙ্গ৷ অথচ সংগীতপ্রীতি আমাদের

চিরকালই৷ কালী৷ শ্রীরামকৃষ্ণের কাছে অভিপ্রেত

ব্যক্ত করি৷ বক্তা সাজি৷ যেন মন পণ্ডিতপ্রবর!

ওই যে 'শ্রীম'-র বিমা, সীমাহীন, ভক্তিপ্রদ, শুভ...

গঙ্গাতীরে সংঘারাম, তোতাপুরী, আশ্চর্য খবর৷

নরেনেই নান্দনিক— শিকাগো, স্বীকার করি, ধ্রুব৷

 

'নয়ন', আশ্চর্য, চর্যা— বয়নে সে ফুল্ল, কুসুমিত৷

চয়নে কোমল, সাধু৷ শয়নে, শ্রী, স্বপ্নাধিক ডানা৷

তুল্যমূল্য ভুলে গিয়ে একান্তে সহজ হও, প্রীত৷

সাধনার সিদ্ধি এই— আত্মানং বিদ্ধি, মহারানা৷

পাথেয়, পৃথিবী, প্রাণ— পরিণতি, প্রণয়, প্রণাম

তৃতীয় নয়ন জানে— 'তুঁহু-তুঁহু', ভুলেছি 'স্বনাম'৷

 

 

 

ধর্ম বাহক

পিনাকী রঞ্জন মিত্র

প্রলুব্ধ আশায় ধর্মের নাম দিয়ে কঠোর বিধি নিষেধ গুলো 

পায়ে বেড়ির মতো মনে বেড়ি পরিয়ে রাখার জন্য 

গারদের চেয়েও শক্তিশালী। 

ধর্ম যদি ঈশ্বরের কাছে যাওয়ার রাস্তা হয় 

আর ঈশ্বর যদি বন্ধনের মুক্তি হয় 

তবে বন্ধন থেকে মুক্তি দিতে এতো বিধি নিষেধ

এতো বেড়ি পরিয়ে রাখার ব্যবস্থা আর এতো 

গোঁড়ামি ও এতো লড়াই কেন? 

সাড়া পৃথিবী জুড়ে ঈশ্বরের পথ আর 

ধর্মের বিধি নিষেধ গুলো পরস্পর বিরোধিতায় 

সদায় যুদ্ধে ব্যস্ত 

ধর্মের দোহাই দিয়ে গোঁড়ামিকে হাতিয়ার করে 

আর কতদিন ঈশ্বরকে দূরে রাখবে -

হে, ধর্ম ঝাণ্ডাবাহক?

 

 

 

পথ ও নদী

শেখর ভট্টাচার্য

পথেরা অতন্দ্র, দিগন্তের শেষ সীমান্তে দেখা যায় পথের 

শেষ রেখা

বৃক্ষ, তরুলতা, আকাশ কাঁঠালচাঁপা, কখনো বা নদী 

সঙ্গী হয় পথের।

বুকে সুগন্ধী, সতেজ স্রোত, ঝড়ের উদ্যম নিয়ে দূর 

দিগন্ত রেখায় 

আকাশের সাথে মিশে যায় নদী। পথ ও নদী, বালি 

আর জলকণা। 

সূর্যরশ্মি গিলে খায় জলকণা, জলের অন্তরে স্বপ্নীল 

নক্ষত্র বাগান

মাটির অন্তরে ঘর, নৈঃশব্দ্য পিয়াসী, হৃদয় কোঠরে 

নৈঃশব্দ্য বাইরে পদধ্বণি

সরব পথ এগিয়ে যায় ধামাইলের অপূর্ব ছন্দে, জ্বলন্ত 

সূর্য, চাঁদ, মেঘ

নক্ষত্রের রাত জাগা গল্প শুনে পৌছে যায় পথ দৃষ্টি 

সীমানার বাইরে।

তারা জ্বলা রাত, চাঁদের সৌন্দর্যের হাহাকার, বৃষ্টিকে 

আলিঙ্গন করে

গন্তব্যরেখা অদৃশ্য হতে হতে দৃশ্য পট থেকে উবে যায় 

কল্লোলিনী নদী,

পথ ও নদী, জলকনা বালি, উবে গেলেও মত্ত হয় 

আলিঙ্গনে মাটির গভীরে।

 

 

কেমন আছি

সু শা ন্ত  হা ল দা র 

জানতে চেয়েছ, কেমন আছি?

আকাশে মেঘ, বৃষ্টি নাই 

খড়খড়ে মাটি, এমনই দিনে কি করে বলি

সবুজ শ্যামলীমায় ভরে ওঠেছে আমারই জন্মভূমি? 

 

মরণের ফাঁদ সাথে নিয়ে ঘুরি 

নদী বিস্তৃত এই যে হরিহরদিয়া চর, মেন্দিপুর, সুতালড়ী 

জন্মেই ত দেখেছি ভরা যৌবন নিয়ে হুঙ্কারিত পদ্মা নদী

যার বুকে বুক রেখে কতদিন বলেছি

'বিন্দাস আছি,'

ওগো কালো মেঘের শ্বেত-শুভ্র শ্রাবণ দিনের অভিমানী 

কুমারী-সাতচল্লিশ রেখে গেলে, বাহান্ন দেখনি

কি করে বলি

অর্জিত স্বাধীনতায় এখনও ঘসেটির 'পলাশী'? 

 

জানতে চেয়েছ, কেমন আছি? 

সুদীর্ঘ কাল যেখানে নদী বয়ে যায় সমুদ্র অভিমুখী 

মায়ের মতো জননী যদি হয় 'জন্মভূমি'

তবে শত মরণেও জেনে রেখ....

'ভালো আছি' ওগো অভিমানী শ্বেতশুভ্র কুমারী! 

 

 

 

দ্বিকোষ

কোমল দাস 

গুণির স্বভাবও হয়ে গেছে অবচয়, 

অঢেল জ্ঞানীও চলে গেছে অবতলে।

সাধুরও এখন বিনা দোষে সাজা হয়,

হযবরলতে যেন সবকিছু চলে।

 

বনমোরগের পদধ্বনির নাদে,

কাচের বোতলে দেহত্যাগ করে হাওয়া।

ভয় দেখিয়েও না হেসে ভূতেরা কাঁদে, 

সুখতারা করে চাঁদের উপরে ধাওয়া।

 

মাছেরা জানে না কত ধানে কত চাল,

চিৎকার ছাড়ে থাকবো না আর জলে।

তীরে উঠে বলে টেনে পিপীলিকা হাল,

ভেজা জমিতেও এখন লাঙল চলে।

 

 

 

এই সব দিনযাপন 

আ ই না ল  হ ক 

রোজ গ্লাসে ঢেলে নিরাপদ রাত্রি পান করি

বারান্দায় ঘুমদের অবাধ পায়চারি আর 

ঘুমাতে দেয় না।

মধুর সমস্যার মুখোমুখি 

নাগরিক জীবন ঠাঁই দাঁড়িয়ে থাকে গাছের মতন,

সার্জিক্যাল টেবিলে চেতনার ক্ষতবিক্ষত মৃত দেহ

দুর্বিষহ স্থির চিত্রের প্রদর্শনী রূপে উপস্থাপন করে;

ঘটনাচক্রে সময় হয়ে ওঠে কিংকর্তব্যবিমূঢ় সৈনিক। 

এক ঢুক অপেক্ষা কালের সাক্ষী হয়ে 

আর কত গলায় আটকে থাকবে?

 

 

 

অন্তর্ধান

শ্যামল বণিক অঞ্জন

এই ধূলোমাখা নির্জন মেঠোপথ ধরেই একদিন

চলে যাবো অন্তর্ধানে -

ফিরবো না আর কস্মিনকালেও তোমাদের অভিজাত রঙ্গশালায়।

চাকচিক্যময় আলো রোশনাই হাসি আনন্দ হৈ-হুল্লোড়ে- 

আর কখনোই থাকবে না বিবর্ণ ম্যাড়ম্যাড়ে নিস্প্রভ উপস্থিতি।

 

মানুষের জীবনটা বড্ড বৈচিত্রময় -

ক্ষণে ক্ষণে রং বদলায় শত সহস্রবার।

তোমার আমার মতো -

ভাঙা-গড়ার খেলায় কেউ জয়ী, কেউ-বা পরাজিত,

তবুও থেমে থাকে না জীবন শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত, 

চলতে হয় ইচ্ছায় অথবা অনিচ্ছায়।

তেমনি করে চলতে চলতে আজ আমি বড্ড ক্লান্ত

পরিশ্রান্ত এক পথিক,

তারপরেও চলতে হবে শেষ গন্তব্যে পৌঁছাবার জন্য।

 

কোনো একদিন চির নিদ্রায় শায়িত হবো আমি-

ছায়া সুনিবিড় শান্তির ওই নীড়ে হিজল গাছের তলে।

 

 

 

হিউয়েন সাঙ

মারুফ আহমেদ নয়ন 

প্রিয়তমা পাখির ঠোঁট মনে পড়ে। বিস্ময়কর

রজনীতে মহুয়া অরণ্যে টুরিস্ট আমি। মদের

সাগরে সাঁতার কাটি। রচনা করি ফুগুর আয়ু।

বলো, কি লাভ হয়েছে মানুষ জন্ম পেয়ে। মন 

সাদা হাঙ্গর হয়ে হেসে ওঠে। আমার পাখিজন্ম

সারসের ভঙ্গিমায় জলে শিকার খোঁজে। মাছের

পোনা চঞ্চুতে নিয়ে ফিরে যাবে ঘরে। তোমাকে 

হৃদয়ে আশ্রয় দিয়ে সেজেছি এক পরিব্রাজক। 

বামিয়ানের বুদ্ধমূর্তির পাশে স্থির দাঁড়িয়ে থাকি।

পামির মালভূমিতে দেখছি হিন্দুকুশ পর্বতমালা।

মনে পড়ে, বন্ধুবর হিউয়েন সাঙ তাম্রলিপ্তির

পথে চলিয়া গিয়েছেন৷ আমি কোথায় যাবো, 

কর্ণসুবর্ণ। আমার শরীর মাটিতে মিশে গেছে। 

 

 

 

 

ফুলকুঁড়ি 

আলিফা তাবাচ্ছুম শিখা 

একদিন স্কুল শেষ হওয়ার পর সুবর্ণা ম‍্যাম বাসায় ফেরার পথে ফুল খুঁজছিলেন। কারণ আজ তাঁদের বিবাহ বার্ষিকী। তাই তিনি মহারাজকে ফুল উপহার দিবেন। 

হঠাৎ, দেখতে পেলেন, একটি শিশু, বয়স আনুমানিক দশ হবে, পথে ফুল বিক্রি করছে। কিছুটা দুর থেকে তিনি ডাকলেন, 'এই মেয়ে শোন।' 

মেয়েটি ফুল হাতে নিয়ে বটগাছের নিচে ম‍্যামের কাছে এগিয়ে আসলো। ম‍্যাম রজনী আর গোলাপ নিলেন। টাকা দিতে গিয়ে বললেন, 'এই মেয়ে তোমার নাম কী?'

সে বললো, 'ফুলকুঁড়ি।'

ম‍্যাম শুনে বললেন, 'তাই বুঝি তুমি ফুল বিক্রি করো?'

ফুলকুঁড়ি বললো, 'না আপা! আমার আম্মা বলছেন তাই বিক্রি করি।'

'তুমি রোজ ফুল বিক্রি করো? আর কোথায় যাও'

'কোনদিন রাস্তায়, কোনদিন পার্কে। নদীর ধারেও যাই ফুল বেচতে।' 

ম‍্যাম এর জানার আগ্রহ হলো তাই তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, 'তোমার বাবা কি করেন?' 

ফুলকুঁড়ি বললো, 'বাবার অসুখ কাজ করেন না।'

'তোমার বড় ভাই বা বোন নেই?'

'একটা বোন আছে তিন বছরের আর ভাইয়া হোটেলে কাজ করে। কিন্তু টাকা দেয়না। শুধু ভাই খাওয়ায়।'

কথাগুলো শুনে সুবর্ণা ম‍্যামের মন খারাপ হলো। তাই তিনি কৌতুহলবশত আবার জিজ্ঞাসা করলেন, 'তোমার পড়তে ইচ্ছা করেনা?'

ফুল বললো 'হ-করে। খুব করে। কিন্তু আমরাতো গরিব।'

এ কথা শুনে তিনি ভাবলেন, আমি তো আর্থিকভাবে স্বচ্ছল, চাইলেই আমি ফুলকুঁড়িকে পড়াতে পারি! 

তিনি ফুলকুঁড়িকে বললেন, 'আগামীকাল দশটায় আমি এখানেই তোমার সাথে দেখা করবো। এসো কিন্তু।'

ফুলকুঁড়ি বললো, 'আচ্ছা আপা,' বলেই চলে গেল।

 

পরেরদিন দশটায় ফুলকুঁড়ি চলে এলো একই জায়গায়। তারপর ম‍্যাম তার সাথে তার বাসায় গেলেন। ফুলকুঁড়ির বাবা মায়ের সাথে সাক্ষাৎ করে বললেন, 'আমি ওকে পড়াতে চাই। সব খরচ আমি দেবো।'

ফুলকুঁড়ির মা কিছুটা বিচলিত হলেন। বললেন, 'ও স্কুলে গেলে আমাগো সংসার চলবো কি কইরা?'

ম‍্যাম বললেন, 'প্রতি মাসে আমি আপনাদের তিন হাজার করে টাকা দেবো। আর ফুলকুঁড়ির পড়াশোনার সব খরচ দিব। আপনি আমার বাসায় সপ্তাহে তিন দিন কাজ করে দিবেন।'

ফুলকুঁড়ি ও তার পরিবার রাজি হলো, খুশীতে কেঁদে ফেললো ফুলকুঁড়ির মা।

 

এরপর ‌অনেকগুলো বছর পেরিয়েছে। আজ সেই ফুলকুঁড়ির গোলাপের সৌরভ ছড়িয়েছে। আজ সে ইউনিভার্সিটিতে পড়ছে আর টিউশনি করে নিজের ও তার পরিবারের হাল ধরেছে।

 

বাইরে ঝিরিঝিরি বাতাস বইছে। সুবর্ণা ম্যাম জানালার বাইরে তাকিয়ে ভাবছেন, 'আমরা যদি সবাই নিজেদের স্বার্থের গণ্ডি পেরিয়ে একবার অন্তত অন্যের দিকে হাত বাড়াই, তাহলে হয়তো পৃথিবীটা আরও সুন্দর একটা জায়গা হয়ে উঠতে পারে।'

ফুলকুঁড়ির চোখের আনন্দমাখা মুখটা বারবার ভেসে উঠছে তার মনের পর্দায়। ফুলকুঁড়ির মায়ের হতাশ চোখের পরিবর্তে আজ সেই চোখে নতুন স্বপ্নের আলো। 

সুবর্ণা ম্যাম ভাবেন, 'মানুষ তো অর্থ, সম্পদ, আর ক্ষমতার জন্য সারাজীবন ছুটছে। কিন্তু অন্যের জীবনে কিছু পরিবর্তন আনতে পারার মধ্যে যে সুখ, তা হয়তো আমরা অনেকেই বুঝতে পারিনা। গোলাপ, বেলি আর জুঁই নয়, হাজারো কোমল শিশু -কুঁড়ির মতো সমাজে অঝোরে ঝরে পড়ছে শুধু একটু সুযোগের অভাবে।'

 

সুবর্ণা ম্যাম ভাবেন, এই পরিবর্তন শুধু এক পরিবারের নয়; এটি সমাজে আশা ও পরিবর্তনের বীজ বপন করার সূচনা।

উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন