https://www.prothomalony.com/

11979

opinion

অভিমত

সম্পাদকীয়: সড়ক দুর্ঘটনা ও তার প্রতিকার

প্রকাশ: ২৬ ডিসেম্বর ২০২৪ ০৩:২১

বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা বর্তমানে একটি ভয়াবহ জাতীয় সংকটে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন পত্রিকা কিংবা সংবাদমাধ্যমে যে মর্মান্তিক দুর্ঘটনার খবর আমরা পাই, তা কেবল ক্ষুদ্র অংশ। বাস্তবতায় এর পরিমাণ আরও বেশি। প্রাণহানি, আহতদের দীর্ঘস্থায়ী শারীরিক ক্ষতি এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর মানসিক ও আর্থিক বিপর্যয়—এসব মিলে সড়ক দুর্ঘটনা আমাদের সমাজের জন্য এক ভয়ানক বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সড়ক দুর্ঘটনার প্রকৃতি ও এর কারণ বিশ্লেষণ করে প্রতিকারের পথ খুঁজে বের করাই এখন সময়ের দাবি।

বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ফিটনেসবিহীন যানবাহন এবং অদক্ষ চালক। এমন বহু যানবাহন প্রতিদিন রাস্তায় চলছে, যেগুলো কোনোভাবেই নিরাপদ নয়। তদুপরি, অনেক চালকেরই প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ নেই এবং তাদের ড্রাইভিং লাইসেন্স থাকার পরও সেগুলো বৈধ কিনা তা প্রশ্নবিদ্ধ। ড্রাইভিং প্রশিক্ষণের ঘাটতি এবং লাইসেন্স ইস্যুতে অব্যবস্থাপনার ফলে সড়কে প্রতিদিন দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন অসংখ্য মানুষ।

দ্বিতীয়ত, বেপরোয়া গতি এবং ট্রাফিক আইন না মানার প্রবণতা সড়ক দুর্ঘটনার একটি বড় কারণ। চালকদের মধ্যে ট্রাফিক আইনের প্রতি অজ্ঞতা কিংবা ইচ্ছাকৃত অবজ্ঞার কারণে অনেক সময় দুর্ঘটনা ঘটে। মহাসড়কে গতি নিয়ন্ত্রণে আধুনিক প্রযুক্তির অভাবও এ ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখে।

তৃতীয়ত, দেশের সড়ক অবকাঠামোর মান অত্যন্ত নিম্ন। অধিকাংশ রাস্তাই নিয়মিত মেরামত করা হয় না, ফলে সেগুলো চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। তদুপরি, ট্রাফিক সিগন্যাল, রোড সাইন ও পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা না থাকায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি আরও বাড়ে। বিশেষত শহরাঞ্চলে যানজট এবং গ্রামীণ অঞ্চলে রাস্তার সরু ও খারাপ অবস্থার কারণে দুর্ঘটনা সাধারণ ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই সমস্যাগুলোর পেছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো প্রশাসনিক দুর্নীতি এবং তদারকির অভাব। ট্রাফিক আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে জবাবদিহিতার ঘাটতি এবং ঘুষের বিনিময়ে নিয়ম ভঙ্গকারীদের ছাড় দেওয়া—এসব প্রভাব সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এ সমস্যার সমাধানে দীর্ঘমেয়াদী এবং কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। প্রথমত, অদক্ষ চালক এবং ফিটনেসবিহীন যানবাহন রোধে প্রশাসনিক উদ্যোগ নিতে হবে। ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রে কঠোর নিয়মাবলী মেনে চলা এবং লাইসেন্স প্রাপ্তির আগে বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। ট্রাফিক আইন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক কার্যক্রম আরও শক্তিশালী করতে হবে এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, সড়ক অবকাঠামো উন্নত করার দিকে বিশেষ মনোযোগ দেওয়া দরকার। রাস্তার মেরামত এবং সংস্কার নিয়মিত করতে হবে। পাশাপাশি, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ করা এবং ট্রাফিক সিগন্যাল, রোড সাইন, এবং পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকারি এবং বেসরকারি খাতের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

তৃতীয়ত, জনগণের মধ্যে সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করা অপরিহার্য। চালক, যাত্রী এবং পথচারীদের ট্রাফিক আইন মেনে চলার জন্য প্রশিক্ষণ ও প্রচারণা চালানো যেতে পারে। গণমাধ্যম, সামাজিক সংগঠন এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে সচেতন করার মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এ বিষয়ে দায়িত্বশীল করে গড়ে তোলা সম্ভব।

এ ছাড়া, সড়ক দুর্ঘটনার শিকারদের জন্য জরুরি চিকিৎসা সহায়তার ব্যবস্থা করতে হবে। প্রতিটি বড় সড়কে এম্বুলেন্স ব্যবস্থা চালু করা এবং দুর্ঘটনাস্থলে দ্রুত সেবা দেওয়ার জন্য বিশেষ দল গঠন করা প্রয়োজন।

সড়ক দুর্ঘটনা কেবল প্রশাসনিক সমস্যাই নয়; এটি আমাদের সামগ্রিক সামাজিক ব্যবস্থার একটি বড় ঘাটতি। প্রতিকার নিশ্চিত করতে হলে প্রশাসন, জনগণ এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিটি পক্ষের মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে যে ক্ষতি আমরা এখন সহ্য করছি, তা প্রতিরোধযোগ্য। যথাযথ পরিকল্পনা, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে আমরা একটি নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারি। নিরাপদ সড়ক কেবল উন্নয়নের প্রতীক নয়, এটি একটি সভ্য ও মানবিক জাতির পরিচায়ক।

অভিমত থেকে আরো পড়ুন