https://www.prothomalony.com/

11728

opinion

অভিমত

সম্পাদকীয়ঃ বাংলাদেশের নির্বাচন ও নির্বাচন কমিশনের সংস্কার

প্রকাশ: ০৪ ডিসেম্বর ২০২৪ ০৬:১০

নির্বাচন একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মৌলিক স্তম্ভ। এটি জনগণের ক্ষমতা প্রয়োগের প্রধান মাধ্যম। তবে বাংলাদেশে নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক দীর্ঘদিন ধরে চলমান। বিশেষ করে গত কয়েকটি জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ ইসির প্রতি জনগণের আস্থা কমিয়ে দিয়েছে। এসব পরিস্থিতিতে নির্বাচন কমিশন এবং পুরো নির্বাচনী প্রক্রিয়ার সংস্কার এখন সময়ের দাবি।

নির্বাচন কমিশন সংবিধান অনুসারে একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হলেও এর কার্যক্রম প্রায়শই সরকারের প্রভাবের আওতায় পরিচালিত হয়েছে। ইসির স্বাধীনতা শুধু আইনের ধারায় নয়, কার্যকারিতায়ও নিশ্চিত করতে হবে। বাস্তবে কমিশন অনেক সময়ই সরকার ও প্রশাসনের হস্তক্ষেপের শিকার হয়েছে। ফলে কমিশনের নিরপেক্ষতা ও কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।

বাংলাদেশের ভোটের পরিবেশ নানা অনিয়মের শিকার হয়েছে। ভোটকক্ষ দখল, ভুয়া ভোট প্রদান, এমনকি রাতের ভোটের মতো ঘটনাগুলো দেশে গণতান্ত্রিক চর্চার ভিত্তিকে দুর্বল করেছে। এ ধরনের চর্চা শুধু ভোটারদের অধিকার ক্ষুণ্ন করে না, বরং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় অনাস্থা তৈরি করে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে অতীতের অনিয়মগুলো নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে চিহ্নিত করে দোষীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

নির্বাচনে প্রযুক্তির ব্যবহার, বিশেষত ইভিএম (ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন), নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। ইভিএম প্রযুক্তি উন্নত ও সম্ভাবনাময় হলেও এর ব্যবহার নিয়ে বিরোধীদল ও ভোটারদের মধ্যে আস্থা সংকট দেখা দিয়েছে। ইভিএম ব্যবহারের আগে এর স্বচ্ছতা এবং নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে, এটি চালু করার আগে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য তৈরি করা প্রয়োজন।

নির্বাচনী অনিয়মের আরেকটি বড় কারণ হলো প্রশাসনিক পক্ষপাত। নির্বাচনকালীন সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা না গেলে সুষ্ঠু নির্বাচন অসম্ভব। এর পাশাপাশি প্রার্থীদের দ্বারা পেশীশক্তির ব্যবহার, টাকার প্রভাব এবং মনোনয়ন বাণিজ্য বন্ধ করতে কার্যকর আইন ও নিয়মাবলী প্রণয়ন করা জরুরি।

নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কারে তিনটি স্তরে কাজ করা প্রয়োজন। প্রথমত, আইনি কাঠামো সংস্কারের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। সংবিধানে নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রমকে সরকারের প্রভাবমুক্ত করার বিধান অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, প্রশাসনিক সংস্কারের মাধ্যমে নির্বাচনী কর্মকর্তাদের নিরপেক্ষ ভূমিকা নিশ্চিত করতে প্রশিক্ষণ এবং শক্তিশালী নজরদারির ব্যবস্থা করতে হবে। তৃতীয়ত, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং আন্তরিক সহযোগিতা ছাড়া কোনো সংস্কার দীর্ঘমেয়াদী ফল দিতে পারে না।

নির্বাচনী সংস্কারে স্বচ্ছ ভোটার তালিকা প্রস্তুত, নির্বাচনী অপরাধ দমন এবং রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র নিশ্চিত করা বিশেষ গুরুত্ব পেতে হবে। নির্বাচনে পর্যবেক্ষণ সংস্থাগুলোর অংশগ্রহণ এবং তাদের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা আনার মাধ্যমে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানো সম্ভব। এ ছাড়া নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতাকে নিশ্চিত করার পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।

সংস্কারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো জনমতের ওপর ভিত্তি করে নির্বাচন কমিশনের কাঠামো পুনর্গঠন। অতীতে নির্বাচন কমিশন গঠনের পদ্ধতিগুলো বারবার বিতর্কিত হয়েছে। তাই কমিশন গঠনের জন্য নির্দিষ্ট বিধান তৈরি করতে হবে যা রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত এবং স্বচ্ছ।

নির্বাচন কমিশনকে একটি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোকে নির্বাচনকালীন সময়ে সহনশীল আচরণ বজায় রাখার জন্য নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে জাতীয় ঐকমত্য অত্যন্ত জরুরি। রাজনৈতিক বিভাজন দূর করে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন ব্যবস্থা গড়ে তোলা কেবল বর্তমান সংকট নিরসন করবে না; এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি টেকসই গণতান্ত্রিক কাঠামো গড়ে তুলবে।

বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থার উন্নতি শুধু একটি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়; এটি দেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির সঙ্গেও জড়িত। সুষ্ঠু নির্বাচন একটি কার্যকর গণতন্ত্রের প্রথম শর্ত। তাই এখনই সময় নির্বাচন কমিশন ও নির্বাচনী প্রক্রিয়া পুনর্গঠন করে জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনার।

নির্বাচনী ব্যবস্থার সংস্কার কোনো সাময়িক পদক্ষেপ নয়, এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। এর জন্য প্রয়োজন সমন্বিত প্রচেষ্টা। বাংলাদেশে একটি গ্রহণযোগ্য এবং কার্যকর নির্বাচন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হলে আইনি, প্রশাসনিক, এবং রাজনৈতিক পর্যায়ে সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। এখন সময় ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার মাধ্যমে একটি শক্তিশালী এবং টেকসই গণতান্ত্রিক কাঠামোর ভিত্তি স্থাপনের।

অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে কয়েক দফায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও জোটের সঙ্গে বৈঠক করে। সেসব বৈঠকসহ বিভিন্ন সভা সমাবেশে রাষ্ট্রের নানা ক্ষেত্রে সংস্কারের পাশাপাশি নির্বাচনি রোডম্যাপ ঘোষণা করতে সরকারকে তাগিদ দেয় রাজনৈতিক পক্ষগুলো।তবে সংস্কার আগে নাকি নির্বাচন আগে তা নিয়ে বিএনপি ও বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনের মধ্যে মতবিভেদ ক্রমশ স্পষ্ট হতে থাকে।

গত তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন ব্যাপকভাবে বিতর্কিত হওয়ার পর দেশের নির্বাচন ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে বলে অভিযোগ করে আসছিলো বিরোধী দলগুলো। যে কারণে 'ভোটের অধিকার' ও 'গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা'র মত শব্দগুলো জোরেশোরে আলোচিত হচ্ছে। নির্বাচন আয়োজনের মূল দায়িত্বটা থাকে কমিশনের। সংবিধান অনুযায়ী সরকার তাদের 'সহায়তা' করার কথা।

সংবিধান, নির্বাচন ব্যবস্থা, জনপ্রশাসন ও পুলিশ সংস্কারে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে কাজ শুরু করেছে বাংলাদেশে অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে গঠিত বেশ কয়েকটি ‘সংস্কার কমিশন’। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে প্রয়োজনীয় কিছু সংস্কার শেষেই দ্রুততম সময়ের মধ্যে নির্বাচন আয়োজনের পথে হাটতে চান তারা।

সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য সর্বজনীন ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন কমিশনের কোনো বিকল্প নেই। নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী ও স্বাধীনভাবে সংস্থাটির দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে সংবিধান ও নির্বাচনী আইনের বেশ কিছু সংযোজন– বিয়োজনের প্রয়োজন রয়েছে।  নির্বাচন কমিশন, নির্বাচনী আইন এবং নির্বাচনী ব্যবস্থাপনার সংস্কার নিয়ে প্রথম যে বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সেটি হলো, নির্বাচন কমিশন গঠনপ্রক্রিয়া। কাজেই সর্বজনীন ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন কমিশন এবং সুষ্ঠু নির্বাচনের কোনো বিকল্প নেই। গ্রহণযোগ্য, বিশ্বাসযোগ্য এবং স্বেচ্ছায় ভোটার উপস্থিতির দ্বারা নির্বাচনের মাধ্যমেই জবাবদিহিমূলক সরকার গঠিত হতে হবে। নির্বাচনী আইনেও প্রচুর সংশোধনীর প্রয়োজন রয়েছে। বেশ কিছু অসামঞ্জস্য রয়েছে, যা দূর করা প্রয়োজন। নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করতে হলে সংস্কার প্রস্তাবনায় নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। গণতন্ত্র ছাড়া একটি গণতান্ত্রিক ও মানবিক রাষ্ট্র গঠন সম্ভব নয় এবং একাধারে সুষ্ঠু বা মানসম্পন্ন নির্বাচন ছাড়া গণতন্ত্রও প্রতিষ্ঠা করা যায় না। গণতন্ত্র যেহেতু জনপ্রতিনিধিত্বমূলক শাসনব্যবস্থার নাম, তাই নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়া ও জনগণের মধ্যে তার গ্রহণযোগ্যতা অর্জন খুবই জরুরি। উচ্চ মানসম্পন্ন নির্বাচন অনুষ্ঠানে আমাদের নির্বাচনপদ্ধতি ও নির্বাচনসংশ্লিষ্ট সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানগুলোর মৌলিক সংস্কার এ মুহূর্তে জাতীয় অগ্রাধিকার। এ জন্য বিদ্যমান ব্যবস্থার সার্বিক পর্যালোচনা করে কোথায় কোথায় কী কী পরিবর্তন বা সংশোধন আনয়ন করা যায়, তা নির্ধারণে ব্যাপক জনমত যাচাইয়ের প্রয়োজন। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে প্রয়োজনীয় কিছু সংস্কার শেষেই দ্রুততম সময়ের মধ্যে নির্বাচন আয়োজনের পথে হাটতে চান তারা।

অভিমত থেকে আরো পড়ুন