https://www.prothomalony.com/
11602
opinion
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তার ‘কেউ কথা রাখেনি’ কবিতায় লিখেছিলেন,
'কেউ কথা রাখেনি, তেত্রিশ বছর কাটলো,
কেউ কথা রাখেনি,/বাবা আমার কাঁধ ছুঁয়ে বলেছিলেন, দেখিস, একদিন আমরাও.../বাবা এখন অন্ধ, আমাদের দেখা হয়নি কিছুই।’
সত্যি বলতে কী, আমাদের স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল দিন বদলের। কিন্তু সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে সুর মিলিয়ে বলতে হয়-‘কেউ কথা রাখেনি’। দুর্নীতির বিরুদ্ধে যে জিরো টলারেন্সের কথা আমরা সবসময় শুনে এসেছি, সাবেক সরকারের পতনের মাত্র তিন দিনের মধ্যেই আমরা গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যে দেখলাম, দেশ থেকে যে পরিমাণ টাকা পাচার হয়ে গেছে, তা দিয়ে আমরা সত্যিই দিন বদল করতে পারতাম। তাহলে জিরো টলারেন্স নীতি কাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়েছিল? দৃশ্যমান কিছু মেগা প্রজেক্ট হলেও সেগুলো কতটা স্বচ্ছতার মধ্য দিয়ে হয়েছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ছাত্র আন্দোলনের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের এমন এক অবস্থায় পতন হয়েছে, যখন বাংলাদেশের অর্থনীতি সবচেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। অর্থাৎ অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যখন দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিল, তখন তাদের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে রিজার্ভ সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রাজনৈতিক প্রভাবে ধুঁকতে থাকা আর্থিক প্রতিষ্ঠান কিংবা সামগ্রিক অর্থনীতির নানামুখী সংকটকে উতরে নেওয়ার বড় চ্যালেঞ্জ। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জন্য হয়তো সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জই হবে ভঙ্গুর অর্থনৈতিক অবস্থা থেকে দেশকে ঘুরে দাঁড় করানো।
বাংলাদেশের এত বছরের রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনা তো হুট করে আমূল পরিবর্তন সম্ভব নয়, তবু আশা করব, এ সরকার, বিশেষত গত আন্দোলনে উজ্জীবিত-জাগ্রত এই ছাত্রসমাজ এবং গণমানুষ রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনার ওই সংস্কার শুরু করবে, যেখান থেকে বাংলাদেশের রাজনীতি একটি সুস্থ ধারায় ফিরবে এবং যেখানে একজন সাধারণ মানুষ রাজনীতিতে অংশ নিয়ে জনসাধারণের জন্য কাজ করতে পারবে।
কিন্তু এ সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে ‘রাজনৈতিক সংস্কার’। উন্নত দেশগুলোতে রাজনীতির যে ব্যবস্থা, স্বাভাবিকভাবেই আমরা তা অনুসরণ করি না। যুক্তরাজ্য-যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশগুলোতে রাজনীতি একটা সামাজিক সেবার মতো—সাধারণ পেশাজীবী মানুষ রাজনীতি করছেন।
সুশীল সমাজের নাগরিকেরা অথবা পেশাজীবীরা রাজনীতির চরমতম বাজে দিকগুলোর কারণে রাজনীতিতে যুক্ত হন না বা যুক্ত হতে চানও না। অথচ সাধারণ জনগণের জন্য সবচেয়ে ভালো কাজ করতে পারবে সাধারণ মানুষ হিসেবে জনসাধারণের সমস্যাগুলোর সম্মুখীন হওয়া একজন সাধারণ মানুষই...!
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ফলে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে আন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়েছে। রাজনৈতিক ব্যবস্থার সংস্কারের মাধ্যমে দেশ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে সরকার এগিয়ে চলেছে। বাংলাদেশের জনগণের দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষা হলো গণতন্ত্র এবং সুশাসন। এ দেশের রাজনৈতিক দলগুলো যখন যারা ক্ষমতায় থেকেছে তারাই বাঙালি জনগণকে সব সময়ের জন্য একটি বুঝ দিয়ে আসছে যে, তারা গণতন্ত্রে বিশ্বাসী এবং সুশাসন তাদের অন্যতম লক্ষ্য। কিন্তু গণতন্ত্র এমন একটি ব্যবস্থা যা কেবল একটি সরকারকে নির্বাচিত করবে না। বরং নির্বাচিত সরকার হবে আইনের শাসন সংবলিত, ক্ষমতা স্বতন্ত্রীকরণের ধারক, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সংরক্ষক, সমবেত হওয়ার সুযোগের নিশ্চয়তাদানকারী, নিজ নিজ পছন্দমতো ধর্মচর্চা করার সুযোগদানকারী এবং সম্পত্তির সংরক্ষক। কিন্তু বাংলাদেশে রাজনৈতিক দলগুলো যেকোনো উপায়ে নির্বাচনী বৈতরণী পারি দেওয়াকেই গণতন্ত্র রক্ষার একমাত্র লক্ষ্য মনে করে। কিন্তু তারা অন্যান্য শর্তপূরণ করে না বললেই চলে। প্রতি পাঁচ বছর পরপরই নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে সংকটের আবির্ভাব হয়। নির্বাচন-পরবর্তী কোনো গণতান্ত্রিক অঙ্গীকারই রাজনৈতিক দলগুলো মানতে চায় না। কেউ একবার ক্ষমতা গেলে, ক্ষমতা ছাড়তে চায় না। অনেক সময় আমরা এদেশে দেখেছি নির্বাচনের নামে প্রহসন।
রাজনৈতিক দলগুলো গণতান্ত্রিক পরিবেশ রক্ষার্থে প্রতিশ্রুতি দেয় ঠিকই কিন্তু তা রক্ষায় তাদের সফলতার পরিমাণ খুবই কম। সরকারের স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে গণতান্ত্রিক পরিবেশ রক্ষায় নাগরিক সমাজের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের কথা থাকলেও দলতন্ত্র ও ফায়দাতন্ত্রের লাগামহীন চর্চার ফলে তারা যথাযথ ভূমিকা পালনে ব্যর্থ হয়েছে। সংগঠিত নাগরিক সমাজের অধিকাংশ আজ প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর অনুগত। ১৯৯০-এর গণ-আন্দোলনের সময়ে একতাবদ্ধ শিক্ষক, ডাক্তার, আইনজীবী, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক কর্মী ও অন্য পেশাজীবীদের অনেকেই তাদের অতীতের নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে সরে এসে এখন দলীয় অঙ্গ কিংবা সহযোগী সংগঠনের খাতায় নিজেদের নাম লিখিয়েছে।
রাজনৈতিক দলগুলো গণতান্ত্রিক পরিবেশ রক্ষার্থে প্রতিশ্রুতি দেয় ঠিকই কিন্তু তা রক্ষায় তাদের সফলতার পরিমাণ খুবই কম। সরকারের স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে গণতান্ত্রিক পরিবেশ রক্ষায় নাগরিক সমাজের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের কথা থাকলেও দলতন্ত্র ও ফায়দাতন্ত্রের লাগামহীন চর্চার ফলে তারা যথাযথ ভূমিকা পালনে ব্যর্থ হয়েছে। সংগঠিত নাগরিক সমাজের অধিকাংশ আজ প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর অনুগত। ১৯৯০-এর গণ-আন্দোলনের সময়ে একতাবদ্ধ শিক্ষক, ডাক্তার, আইনজীবী, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক কর্মী ও অন্য পেশাজীবীদের অনেকেই তাদের অতীতের নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে সরে এসে এখন দলীয় অঙ্গ কিংবা সহযোগী সংগঠনের খাতায় নিজেদের নাম লিখিয়েছে।
রাজনীতিতে অনৈতিকতার অবসান ঘটলেই রাজনৈতিক সংস্কৃতি বদলের পথ সুগম হবে। রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিবর্তনের জন্য একই সঙ্গে প্রয়োজন হবে গণতান্ত্রিক রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করার জন্য উপযুক্ত ডিজাইন গ্রহণ করা। একটি সুন্দর পদ্ধতিই দুর্নীতিবাজ-দুবৃর্ত্তদের রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে বিতাড়িত করবে। সেই সঙ্গে রাজনীতিতে সহিষ্ণুতা ও শিষ্টাচারসহ রাজনীতিতে অনৈতিকতার অবসান, রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় নিয়মতান্ত্রিকতার প্রতিষ্ঠা পাবে। এখন আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের জন্য আরও প্রয়োজন সময়োপযোগী বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা চালু করা।
বর্তমানে দেশে যে ধরনের রাজনৈতিক স্থিতিশীল পরিবেশ বিরাজ করছে, তাতে রাজনৈতিক দলগুলোর সংস্কার অনেক সহজ হবে বলে ধরে নেওয়া যেতে পারে। শুধু দরকার দলগুলোর আন্তরিক ইচ্ছা ও সহযোগিতা।
বেশির ভাগ রাজনৈতিক দল রাষ্ট্র সংস্কার ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিয়ে দাবি তুললেও নিজেদের দলের সংস্কার নিয়ে তেমন কোনো আগ্রহ প্রকাশ করছে না। অথচ রাষ্ট্র সংস্কারের মতো রাজনৈতিক দলগুলোর সংস্কারও অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ প্রতিটি গণতান্ত্রিক দেশেই রাজনৈতিক দলের সক্রিয় উপস্থিতি অপরিহার্য। গণতন্ত্রের স্বার্থেই দেশে বিরোধী বা একাধিক রাজনৈতিক দল থাকা দরকার। রাজনৈতিক দলের সংস্কারের মাধ্যমে এখন দরকার অপরাজনীতি নিয়ন্ত্রণ। রাজনীতি নয়, অপরাজনীতি নিয়ন্ত্রণে রাজনৈতিক দলগুলোর সিদ্ধান্ত ও সহযোগিতা দরকার। নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে প্রদর্শিত তথ্যমতে, দেশে ৪৮টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল রয়েছে। সাধারণ মানুষের কত অংশ নিবন্ধিত সব রাজনৈতিক দলের নাম জানেন, তা এক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। রাজনৈতিক দলের সংখ্যা যাই থাকুক না কেন, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিটি দলের মধ্যে গণতান্ত্রিক চর্চা অব্যাহত রাখা। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে গণতান্ত্রিক নিয়মনীতির ব্যত্যয় ঘটিয়ে রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এভাবে দেশে গণতান্ত্রিক ভিত্তি মজবুত করা সম্ভব নয়। গণতান্ত্রিক পরিবেশের সুরক্ষায় রাজনৈতিক দলগুলোর সহযোগিতা ছাড়া রাজনৈতিক সরকার নিজেও এ ধরনের চেষ্টায় সফল হতে পারবে না। কারণ গণতন্ত্রের সাফল্য শুধু সরকারের একক কর্তৃত্ব ও সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করে না। এজন্য জনগণের প্রতি ক্ষমতাসীন সরকারি দলসহ সব রাজনৈতিক দলের কমিটমেন্ট থাকতে হয়।
ছাত্রসমাজের এই বিপ্লবে জনগণ পূর্ণ সমর্থন দিয়ে নিজেদের অবস্থান ব্যক্ত করেছে। তাই একই সঙ্গে অনেক চ্যালেঞ্জ আর অনেক সম্ভাবনার এই সময়ে প্রত্যাশা করব ‘রাজনৈতিক সংস্কারের’...!
অভিমত থেকে আরো পড়ুন