https://www.prothomalony.com/

11361

opinion

অভিমত

সম্পাদকীয়: মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের দামামা বাজতেই আছে

প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৪ ০২:১২

এক বছর ধরে মধ্যপ্রাচ্যে আগুন জ্বলছে। এই সময়ে ৪১ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নাগরিক ইসরায়েলি হামলায় নিহত হয়েছেন। গাজার দুই মিলিয়ন বা ২০ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। পশ্চিম তীরে নিহত হয়েছেন আরও ৬০০ জন। এই ধ্বংসযজ্ঞের রেষ ছড়িয়ে পড়েছে লেবাননেও। সেখানে ইসরায়েলি হামলায় দুই হাজারের বেশি মানুষ নিহত ও অন্তত ১০ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।

ইরানের বিভিন্ন স্থানে ইসরায়েলের হামলা মধ্যপ্রাচ্যে নতুন পরিস্থিতির সূচনা ঘটিয়েছে। সেই সঙ্গে তেহরান ও তেল আবিবের মধ্যে কয়েক দশক ধরে চলা দ্বন্দ্বেও এক ভয়ানক মাত্রা যোগ করেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, আপাতত মনে হচ্ছে, দু’পক্ষ একটি সর্বাত্মক যুদ্ধ এড়িয়ে যেতে পেরেছে। কারণ, তাৎক্ষণিকভাবে ইরান কোনো পাল্টা হামলা চালানোর হুঁশিয়ারি দেয়নি।

বছরের পর বছর ধরে চলা ছায়াযুদ্ধ শেষ হয়ে সংঘাত এখন পুরোপুরি খোলামেলা পর্যায়ে পৌঁছেছে, যদিও আপাতত একটি লড়াই ঠেকানো গেছে।

ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে সংঘাতের মাত্রা তীব্রভাবে বেড়েছে। এটি একটি চক্রাকারের মতো মনে হচ্ছে এবং পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে সহিংসতা বন্ধ হবে না যতক্ষণ না একটি স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা হয়। 

ইসরায়েল সম্প্রতি হিজবুল্লাহর শীর্ষ নেতা হাসান নাসরাল্লাহসহ লেবানন ও গাজায় হামাসের নেতাদের হত্যা করে সংঘাতকে আরও জটিল করে তুলেছে। ইসরায়েল জানিয়েছে, তারা হামাস নেতা ইয়াহিয়া সিনওয়ারকে এক বছরের চেষ্টার পর গত সপ্তাহে গাজায় হত্যা করেছে। তবে ইসরায়েলি নেতারা স্পষ্ট করেছেন, হামাসের সামরিক সক্ষমতা সম্পূর্ণ নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ বন্ধ হবে না।

কয়েক সপ্তাহ ধরে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে আক্রমণ সীমিত করার জন্য চাপ দিয়ে আসছে। চলতি মাসের শুরুতে ইসরায়েলে ইরান একঝাঁক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে। জবাবে ইসরায়েল ইরানের সংবেদনশীল পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ স্থাপনা এবং তেলক্ষেত্রে আঘাতের পরিকল্পনা নেয়।

উত্তেজনা হ্রাস পেলেও সাম্প্রতিক ঘটনা ইরান ও ইসরায়েলকে একটি নিয়ন্ত্রণহীন সংঘাতের দিকে আরও এগিয়ে নিয়ে গেছে। বছরের পর বছর ধরে দুটি পক্ষ গোপন লড়াইয়ে লিপ্ত। তারা একে অন্যের স্বার্থকে ক্ষুণ্ন করেছে; অন্যের বিরোধীদের সমর্থন দিয়েছে; আক্রমণ করলেও তার দায় অস্বীকার করেছে। গত বছর গাজায় ইরানের মিত্র হামাসের সঙ্গে ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরু হলে সেই গোপন সংঘাত প্রকাশ্য সংঘর্ষে রূপ নেয়। 

ইরান ও দেশটির মিত্ররা সিনওয়ারের মৃত্যুকে তাদের দৃঢ়তার প্রতীক হিসেবে অভিহিত করেছে। এর আগে হামাস নেতাদের হত্যার ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও গোষ্ঠীটিকে পুরোপুরি ধ্বংস করা যায়নি।

ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে ২০০৬ সালের সংঘাত শেষে গৃহীত জাতিসংঘের প্রস্তাব ১৭০১ অনুযায়ী দক্ষিণ লেবাননকে যে কোনও অস্ত্র বা বাহিনীর উপস্থিতি থেকে মুক্ত রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে দুই পক্ষই প্রস্তাব বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়েছে। গত এক বছর ধরে সীমান্তে হিজবুল্লাহর রকেট হামলার জবাবে ইসরায়েল সামরিক অভিযান চালিয়েছে।

গাজার পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। সেখানে ইসরায়েলি বাহিনী উত্তরাঞ্চলের শরণার্থী শিবির ও হাসপাতালগুলো ঘিরে রেখেছে। জাবালিয়া শরণার্থী শিবিরে এক বিমান হামলায় পাঁচজন নিহত হয় এবং কয়েকজন আহত হয়েছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। 

এদিকে দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে গাজা যুদ্ধ বন্ধের প্রচেষ্টায় আবারও আলোচনায় বসার ইঙ্গিত দিয়েছে হামাস ও ইসরায়েল। যুদ্ধ বন্ধে আগের অনেক চেষ্টা ব্যর্থ হলেও এখন ইসরায়েল ও হামাস উভয়পক্ষ গাজা যুদ্ধ বন্ধ নিয়ে ফের আলোচনায় আগ্রহের কথা জানিয়েছে।

গত বছরের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামলায় চালিয়েছিল হামাস। ওই হামলায় ১ হাজার ২০৬ জন নিহত হন। জিম্মি করে গাজায় নিয়ে যায় প্রায় ২৫০ জনকে। জবাবে সেদিন থেকেই গাজায় নির্বিচারে হামলা শুরু করে ইসরায়েল। সেই হামাসবিরোধী অভিযান এখন স্পষ্ট গণহত্যায় রূপ নিয়েছে। তবু আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ইসরায়েলকে থামাতে কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না বলে অভিযোগ।

এটা মনে করা ঠিক হবে ন যে নেতানিয়াহু ইসরায়েলের রাজনৈতিক মূলধারার বাইরে গিয়ে কাজ করছেন। সেজন্য হেজবুল্লাহর ওপর শক্ত আঘাত হানার চাপ বাড়তে পারে, এমনকি ইরানের বিরুদ্ধেও। ইরানে ইসরায়েলের হামলা প্রত্যাশিত হলেও সামনে আরও বেশি কিছু দেখা যাবে কি না সেটা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। স্পষ্টতই নেতানিয়াহু শুধুমাত্র ইমেজের জন্য এটা করেননি, তার আরও কোনো স্বার্থ রয়েছে। এটি আসলেই তার জন্য সুযোগ। কারণ, আমেরিকান প্রশাসন আক্ষরিকভাবেই এখন সবচেয়ে দুর্বল অবস্থায় আছে।

অভিমত থেকে আরো পড়ুন