https://www.prothomalony.com/

10818

bangladesh

বাংলাদেশ

সম্পাদকীয়ঃ ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পরে প্রজন্মের প্রাপ্তি ও প্রত্যাশা

প্রকাশ: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ০৪:০৮

বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন, উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ, নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং শেষমেশ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন একেকটা নতুন ইতিহাসের জন্ম দিয়েছে। আমাদের এই বর্তমান জেনারেশনকে জেন জি বলা হচ্ছে এবং ডিজিটাল এই যুগে দেশের তরুণসমাজ বিভিন্ন নেশায় আসক্ত, ফোন বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসক্ত বলেই সবার ধারণা। ঠিক যেই জেনারশন নিয়ে সুশীলসমাজের এত উদ্বিগ্নতা ছিল, সেই জেনারশনই এক প্রকারর বাধ্য করল দেশের বৈষম্য দূর করতে, স্বৈরাচারের পতন ঘটাতে। ঘুমন্ত জাতিকে জাগিয়ে তুলতে। কীভাবে একটি স্বৈরাচারী শাসকের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হয়- রংপুরের শহীদ আবু সাইদের বুক পেতে গুলিবিদ্ধ হওয়া আমাদের প্রতিবাদী চেতনার এক চূড়ান্ত প্রতিফলন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসক্ত তরুণসমাজ এই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করেই তাদের আন্দোলন বেগবান করেছে। কেন্দ্রীয় সমন্বয়কদের বার্তা এবং আন্দোলন কৌশল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই প্রচারিত হতো। এক দিনের জমায়েতের ছবি পরের দিনের জমায়েতের জন্য অনুপ্রেরণা দিত। ফেসবুকে নিমগ্ন তরুণসমাজ ফেসবুক দিয়েই আন্দোলন চালিয়ে গেছে। তবে হ্যাঁ, এটাও বলার অপেক্ষা রাখে না যে দীর্ঘ সপ্তাহ ধরে দেশের পুরো নেটওয়ার্ক অচল হলেও আন্দোলন দমাতে পারেনি। এর অর্থ কী দাঁড়াল? শুধু ইন্টারনেটনির্ভরতাও না। আসলে এই ছাত্রসমাজের আন্দোলনকে শক্তি জুগিয়েছে সেই বৈষম্যবিরোধী চেতনা, যা এই ছাত্রসমাজ দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে দেখে এসেছে। জোর করে চাপিয়ে দেওয়া চেতনা তারা গ্রহণ করেনি। কোনটা অতিরিক্ত, কোনটা ভুল, কোনটা বৈষম্য তা ছাত্র ও তরুণসমাজ বুঝতে পেরেছে। বাংলাদেশে ছাত্র আন্দোলন-২০২৪ রিজিম পরিবর্তন করে সফল হয়েছে। তবে এ আন্দোলনের প্রভাব আরো অনেক গভীর ও ব্যাপক। কেউ কেউ এ আন্দোলনকে তাৎক্ষণিক স্বার্থগোষ্ঠী হিসেবে চিহ্নিত করলেও শিক্ষার্থীরা সংঘবদ্ধ স্থায়ী স্বার্থগোষ্ঠী এবং রাজনৈতিক সামাজিকীকরণের অনুঘটক। তাদের ঐক্য ও আন্দোলনের বিস্তৃত ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব থাকে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বৈশিষ্ট্য হলো, এ আন্দোলনে প্রাথমিকভাবে অংশ নিয়েছিলেন সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ এমনকি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার্থীরা। পরবর্তী সময়ে সীমিত পরিসরে সরাসরি যুক্ত হয়েছেন শিক্ষক, অভিভাবক ও অন্যান্য সামাজিক শ্রেণী। চূড়ান্ত পর্যায়ে এ আন্দোলনে সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো সমর্থন জ্ঞাপন করেছে। কারফিউ ও পরবর্তী সময়ে অর্থাৎ দ্বিতীয় ধাপে শাসক শ্রেণী ও তাদের লেজুড়বৃত্তিকারী ছাড়া বাকি সব নাগরিকের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সমর্থন ও অংশগ্রহণ ছিল এ আন্দোলনে। শোষণ, বঞ্চনা আর বৈষম্যের বিরুদ্ধে তারুণ্যের প্রতিবাদে সৃষ্ট গণজোয়ারে নতুন যুগে পদার্পন করেছে বাংলাদেশ। এখন রাষ্ট্র সংস্কারের পালা। আর সেই গুরুদায়িত্ব পালনে পাঞ্জেরীর ভূমিকায় তরুণরা। তাদের ঘিরে ১৮ কোটি মানুষের প্রত্যাশা যেন একটু বেশিই। তরুণরাও ঢেলে সাজাতে চান বাংলাদেশকে। জেঁকে বসা দলীয় লেজুড়বৃত্তির ছাত্ররাজনীতির অবসান ঘটাতে চান তরুণরা। ছাত্র অধিকার প্রতিষ্ঠায় শিক্ষাঙ্গনে ছাত্র সংসদ সক্রিয় করার পরিকল্পনা তাদের। জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে সংস্কার করতে চান শিক্ষা ব্যবস্থার, ঢেলে সাজাতে চান স্বাস্থ্য খাতও। ছাত্রদের সঙ্গে সঙ্গে এ গণঅভ্যুত্থানে সবচেয়ে বলিষ্ঠ ও সংগ্রামী ভূমিকা পালন করেছে শহরের শ্রমজীবী-মেহনতি সাধারণ মানুষ। এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন শিক্ষক, শিক্ষার্থীদের অভিভাবক, আর নানা শ্রেণি-পেশার বিক্ষুব্ধ লাখ লাখ মানুষ। যে এক-দেড় হাজার (সঠিক সংখ্যা এখনো জানা যায়নি) মানুষ শহিদ হয়েছেন, তার মধ্যে শিক্ষার্থীদের বাইরে শহরাঞ্চলের সর্বহারা-আধা সর্বহারা শ্রেণির মানুষের সংখ্যাই বেশি। এ মানুষদের হারানোর কিছু ছিল না। কিন্তু তাদের শত বঞ্চনা, বেকারত্ব, না খাওয়া আর মানবেতর জীবনের গ্লানি তাদের গণপ্রতিরোধ-গণঅভ্যুত্থানের মিছিলে শামিল করেছে। বাংলাদেশে ২০২৪-এর এ গণঅভ্যুত্থান ছাত্র-তরুণদের প্রায় সমগ্র একটি প্রজন্মকে রাতারাতি বড় করে তুলেছে, করে তুলেছে দায়িত্বশীল। রংপুরের শহিদ আবু সাঈদের বীরোচিত আত্মদান হাজারো, লাখো তরুণকে জুলুম আর জালেমশাহি রাজত্বের বিরুদ্ধে দেশাত্মবোধের চেতনায় জাগিয়ে তুলেছে। তাদের অনেকের কাছে এটি ছিল মুক্তিযুদ্ধে শামিল হওয়ার মতো গৌরবের বিষয়। হাজার হাজার তরুণ শিক্ষার্থী, নারী-পুরুষ আবু সাঈদের মতো আত্মদানে গুলির মুখে দাঁড়িয়ে গিয়েছে। এ শক্তিকে কে পরাজিত করে! অভ্যুত্থানের পর তারা যেভাবে সারা দেশে ট্রাফিক পুলিশের দায়িত্ব পালন করেছে, ডিবি অফিস, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, থানাগুলোকে পরিষ্কার করেছে, থানা থেকে শুরু করে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের মন্দির ও অঞ্চলগুলোকে পাহারা দিয়ে আসছে, তা দায়িত্ব ও সম্প্রীতির নতুন ইতিহাসের জন্ম দিয়েছে। কোমলমতি বলে যাদের ছোট করা হতো, প্রয়োজনে তারা কীভাবে অভিভাবকের ভূমিকায় আবির্ভূত হলো, তা রীতিমতো বিস্ময়কর। আমাদের সব যে শেষ হয়ে যায়নি, ‘জেন জি:-এর এ প্রজন্ম তা দেশবাসীকে ভালোভাবে বুঝিয়ে দিয়েছে। ছাত্র-জনতার এ গণআন্দোলন-গণঅভ্যুত্থান অনেক বিপ্লবী উপাদানের জন্ম দিয়েছে, বিপ্লবী সম্ভাবনার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। এ গণঅভ্যুত্থান রাষ্ট্রের বলপ্রয়োগের শক্তিকে পরাজিত করেছে, ছাত্র-জনতার গণকর্তৃত্ব, বিশেষ করে বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক ও নৈতিক গণক্ষমতারও এক ধরনের উত্থান ঘটিয়েছে। ছাত্র-তরুণরা বৈষম্যের বিরুদ্ধে যে জাগরণ সৃষ্টি করেছে, পুরোনো শাসনব্যবস্থা, পুরোনো জমানা পরিবর্তনে যে জনমত তৈরি করেছে, তার মধ্যে বিপ্লবী সম্ভাবনা রয়েছে। যেসব দেশে গণতন্ত্র নেই এবং যেসব দেশে কর্তৃত্ববাদী শাসন রয়েছে, সেসব দেশের চেয়েও বাংলাদেশে দুর্নীতির মাত্রা বেশি। যেখানে প্রতিটি শাখার রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি, অনিয়ম ও ঘুষ বাণিজ্যে সয়লাব, সেখানে এহেন অভ্যুত্থান অবশ্যম্ভাবী ছিল। স্বৈরাচারী শাসন ব্যবস্থা কায়েম, প্রশাসনিক সহায়তায় দানবীয় রাষ্ট্র গঠনের উদ্যোগ, পুলিশ বাহিনীর শোষণ, বিচার ব্যবস্থায় দলীয়করণসহ সকল অনিয়ম উচ্ছেদ হোক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কার্যকরী পদক্ষেপে। বাংলাদেশে আর কখনো স্বৈরতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা কায়েম হবে না এমনটাই প্রত্যাশা আপামর জনতার। ছাত্র-জনতার এ উত্থান হোক দুর্নীতি বিরোধী উত্থান, সংস্কারের উত্থান, বৈষম্যবিরোধী উত্থান। দেশকে ঢেলে সাজানোর সময় ও সুযোগ তৈরি হয়েছে শিক্ষার্থীদের এ অভ্যুত্থানের মাধ্যমে। এ গণঅভ্যুত্থান সমাজের প্রতিটি অংশ, রাষ্ট্রের প্রতিটি অংশকে প্রবলভাবে ধাক্কা দিয়েছে, অনেক কিছু ভেঙেচুরে দিয়েছে। কেবল স্থাপনা নয়; প্রচলিত ধারণা, অচলায়তন, চিন্তা-দর্শন, মূল্যবোধ, গতানুগতিক রাজনীতি, সংস্কৃতি ইত্যাদি বহুক্ষেত্রে সুদূরপ্রসারী আলোড়ন সৃষ্টি করেছে; অযুত ইতিবাচক সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত করেছে। কিন্তু বাস্তবে এসব সম্ভাবনা কতখানি কী কাজে লাগানো যাবে, তা অনেক কিছুর ওপর নির্ভর করছে। যেহেতু রাষ্ট্রীয় বৈষম্যমূলক নীতির প্রতিবাদেই জন্ম নিয়েছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, তাই তরুণ ছাত্রসমাজকে প্রতিটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকাটাও বাঞ্ছনীয়। দেশের সকল শাখার দুর্নীতির বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান দৃঢ় হওয়াটাও সময়ের দাবি। মুক্তিযোদ্ধা ও বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থী আন্দোলনের  সব শহীদদের সত্যিকার অর্থে স্মরণ করতে হবে, এই প্রজন্মকে সকল শহীদদের যথাযথ মূল্যায়নেও দৃঢ়তার পরিচয় দিতে হবে। ছাত্র-জনতার এই অভ্যুত্থানকে ব্যর্থ হতে দেওয়া যাবেনা, দেশকে নূতন করে গড়ে তোলার কাজে ঐক্য বদ্ধ প্রচেষ্টার হউক জয়। 
 

বাংলাদেশ থেকে আরো পড়ুন