https://www.prothomalony.com/
10756
bangladesh
বন্যায় ভেসে যাচ্ছে বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি জেলা। চারদিকে বন্যাদুর্গত মানুষের হাহাকার। স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যায় কুমিল্লা, ফেনী, নোয়াখালীসহ পার্বত্য চট্টগ্রাম ভেসে যাচ্ছে। বিদ্যুৎ ও সবরকম যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন এসব এলাকার মানুষ এখন পর্যন্ত সারা দেশ থেকেও বিচ্ছিন্ন রয়েছে। স্থানীয় মানুষের ভাষ্য, বিগত ৫০ বছরে এ রকম বন্যা, পানি, পানির স্রোত তারা দেখেননি। প্রায় ২৫ লাখ মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন আশ্রয়কেন্দ্রসহ নিকটস্থ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, নির্মাণাধীন ভবন, কমিউনিটি সেন্টার, হাসপাতাল প্রভৃতি স্থানে। আবার অনেক এলকায় যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ও পানির অত্যধিক স্রোতের কারণে বন্যা কবলিত প্রত্যন্ত অঞ্চলে উদ্ধারকারী দল পৌঁছাতে না পারায় সেসব অঞ্চলের মানুষ গাছের ডালে, টিনের ছালে, বাড়ির ছাদে, গাছপালা, খড়কুটা, কলা গাছের ভেলা ধরে বাঁচার আপ্রাণ চেষ্টা করছে। আবার অনেক মানুষ ও গবাদিপশু ভাসছে পানিতে। এবারের ভয়াবহ বন্যা ও স্মরণকালের বন্যায় এসব জেলায় দেখা দিয়েছে মানবিক বিপর্যয়। তবে বয়স্ক, শিশু, নারী এবং গর্ভবর্তী মহিলা রোগীদের অবর্ণনীয় দুর্ভোগে পড়তে হয়। এখন জরুরি ভিত্তিতে বন্যা কবলিত মানুষের জন্য শুকনা খাবার, পানি, ওষুধ, স্যালাইন, কাপড়সহ প্রয়োজনীয় সহায়তা দরকার। বর্ষাকাল পেরিয়ে শরৎ ঋতুতে পা দিতেই হঠাৎ অতিবৃষ্টি ও উজানের ঢলে তলিয়ে গেছে দেশের উত্তর-পূর্ব, পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বের জেলাগুলো। ১১ জেলায় মোট ক্ষতিগ্রস্ত লোকসংখ্যা ৫৬ লাখ ১৯ হাজার ৩৭৫ জন। পানিবন্দী পরিবার ১২ লাখ ৭ হাজার ৪২৯টি। ৭৪ উপজেলা বন্যা প্লাবিত এবং ক্ষতিগ্রস্ত ইউনিয়ন/পৌরসভা ৫৪১টি পড়েছে বলে জানিয়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়। বন্যায় দেশের পূর্বাঞ্চলের ১১ জেলায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ২৭ জন হয়েছে। সপ্তাহখানেক ধরে চলমান নজিরবিহীন বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ৫৬ লাখ ১৯ হাজার ৩৭৫ জন মানুষ। সর্বস্তরের মানুষ অতীতের মতোই একতাবদ্ধ হয়েছেন সব মতভেদ, বিবাদ–বিসংবাদ ভুলে। সর্বশক্তি নিয়ে দেশের এই ভয়ানক প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় নেমেছেন। যে যেভাবে পারছেন- অর্থ, খাদ্য, বস্ত্র, চিকিৎসা, উদ্ধার, আশ্রয়, শুশ্রূষা দিয়ে, কায়িক শ্রম দিয়ে ত্রাণকাজে সহায়তা করছেন। দুর্যোগ–দুঃসময়ে ঐক্যবদ্ধভাবে বিপন্ন মানবতার পাশে দাঁড়ানোর মহৎ গুণটি এ দেশের মানুষ রপ্ত করেছেন অনেক আগেই। সিডর, আইলা থেকে শুরু করে বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, শৈত্যপ্রবাহ কিংবা অগ্নিকাণ্ড, ভবনধ্বস এমনকি মহামারির সময় সর্বস্তরের মানুষ নিজনিজ সাধ্যানুযায়ী মানবিক কাজে সক্রিয় থেকেছেন। সবাই মিলে দুর্যোগ অতিক্রম করে জীবনের বুনিয়াদ অব্যাহত রাখতে অবদান রেখেছেন। এবারও ত্রাণ নিয়ে বন্যার্তদের পাশে দাঁড়িয়েছেন সর্বস্তরের মানুষ। এদিকে কোনো আলোচনা ছাড়াই বাঁধ খুলে দেওয়ায় ভারতের সমালোচনাও করেন সুশীল সমাজসহ বিভিন্ন স্তরের মানুষ। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে ট্রাকে করে নৌকা-স্পিডবোট করে বন্যায় প্লাবিত এলাকার মানুষজনকে উদ্ধারে যাচ্ছেন স্বেচ্ছাসেবীরা। অনেকে কাভার্ডভ্যান, ট্রাক, পিকআপ ভরে নিয়ে যাচ্ছেন শুকনো খাবার, জরুরি ওষুধ, নিরাপদ পানি, চাল-ডাল। কিছু জায়গায় বানভাসিদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে নগদ অর্থ। আবার বন্যার্তদের সহযোগিতায় অনেক সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার কর্মীরা একদিনের বেতন দান করেছেন। লাইন ধরে দাঁড়িয়ে দাতা প্রতিষ্ঠানে সামর্থ্য অনুযায়ী সহযোগিতা পৌঁছে দিতেও দেখা গেছে। যে যার জায়গা থেকে যেভাবে পারছেন সেভাবেই দাঁড়াচ্ছেন বানভাসি মানুষদের পাশে। অনেকেই বলছেন, দুর্যোগ ঘিরে এমন ‘একতাবদ্ধ বাংলাদেশ’ আগে দেখেননি তারা। দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের জেলাগুলোতে ভয়াবহ বন্যা দেখা দিয়েছে। বন্যা সবচেয়ে ভয়ংকর রূপ ধারণ করেছে ফেনীতে। এছাড়া চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, নোয়াখালী, সিলেট, মৌলভীবাজার, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, লক্ষ্মীপুর, খাগড়াছড়ি এবং কক্সবাজার জেলাও বন্যাকবলিত হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের পাশে দাঁড়াতে সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছেন সাধারণ বেসামরিক মানুষজনও। এর সাথে বিভিন্ন রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক দল, সামাজিক-স্বেচ্ছাসেবী। ভয়াবহ বন্যায় দেশের কমপক্ষে ১২ জেলার প্রায় ৩৬ লাখ মানুষের জীবনে নেমে এসেছে চরম দুর্গতি। বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ বাংলাদেশের মানুষের জন্য নতুন কোনো অভিজ্ঞতা নয়। কিন্তু এবার বন্যার আঘাত এসেছে কিছুটা আকস্মিকভাবে। কয়েক দিনের প্রবল বর্ষণ এবং ভারতের ত্রিপুরা থেকে নেমে আসা ঢলে ফেনী, কুমিল্লা, নোয়াখালী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চট্টগ্রাম, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, কক্সবাজার, লক্ষ্মীপুর, সিলেট, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জের বিস্তীর্ণ অঞ্চল তলিয়ে গেছে। একদিকে দুর্গত মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া, তাদের জন্য খাবার সরবরাহে যেমন সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে নানা উদ্যোগ লক্ষ করা যাচ্ছে, অন্যদিকে তেমনি এই নজিরবিহীন বন্যা নিয়ে রাজনীতিও দেখা যাচ্ছে। রাজধানীসহ সারা দেশে পথে পথে দেখা যাচ্ছে ত্রাণ সংগ্রহের কাজ। তবে এখন ত্রাণ তহবিল ও অন্যান্য সামগ্রী সংগ্রহ, ত্রাণকাজে নানা রকম উপকরণ দান ও সরাসরি অংশ নিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বড় ভূমিকা রাখছে। বিশেষ করে ফেসবুক ত্রাণকাজে নিয়োজিত ব্যক্তিদের যোগাযোগ, অভিজ্ঞতা বিনিময়, পরামর্শ, ত্রাণসামগ্রী বিতরণ ও সংগ্রহের অন্যতম মাধ্যম হয়ে উঠেছে। ফেসবুকের দেয়াল জুড়ে এখন ত্রাণকাজের ছবি, ভিডিও আর এ–সংক্রান্ত হরেক রকম আবেদনে। বিভিন্ন গ্রুপ, সংগঠন, সংস্থা, প্রতিষ্ঠান, এমনকি ব্যক্তিগত উদ্যোগেও মানুষ এই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুলে ধরেছেন তাঁদের আহ্বান, অনুরোধ, অভিমত, অভিজ্ঞতা। মুঠোফোন নম্বর, ব্যাংকের সঞ্চয়ী হিসাব নম্বর, যোগাযোগের ঠিকানা—এসব তুলে দিচ্ছেন। মানুষ তাতে সাড়াও দিচ্ছেন। তবে বন্যার্তদের পাশে দাঁড়ানোর তৎপরতায় এবার একটি নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে, যা আমাদের ভীষণভাবে আশাবাদী করে তুলেছে। মানবিকতার অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি হয়েছে। সর্বস্তরের তরুণের মধ্যে ত্রাণ তৎপরতায় অংশ নেওয়ার জন্য যে উদ্দীপনা দেখা গিয়েছে , তা অতীতের সব রেকর্ড ভেঙেছে, একে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া বলেই মনে হয়। সব সময়ই যে কোনো প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে আর্তের পাশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক, সাধারণ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে আসে। এবার এ মাত্রাটি বহুগুণ বেশি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অতীতে উপকূলে ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে বিপন্ন মানুষদের জন্য রিলিফ টিম গঠিত হয়েছে, শীতবস্ত্র সংগ্রহ করে শীতার্তদের কাছে ছুটে গেছে শিক্ষার্থীরা। বন্যার মতো নানা দুর্যোগে ওরা সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছে। তবে এবার ছাপিয়ে গেছে অতীতের সব অভিজ্ঞতা। আগে প্রধানত বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের ব্যানারেই ত্রাণ তৎপরতা চলত-এবার এর পরিধি অনেক বেড়ে গেছে। কেউ ব্যক্তিগত গাড়ি ভর্তি করে নিয়ে এসেছেন শুকনা খাবার। কেউ রিকশা-ভ্যান বোঝাই করে নিয়ে আসছেন পানি, চাল, তেল, ডালসহ নানা ধরনের খাবার। কেউ আবার এসেছেন নগদ টাকা নিয়ে। বন্যার্ত মানুষের জন্য সবাই যে যার সাধ্যমতো সহায়তা নিয়ে হাজির হচ্ছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রে (টিএসসি)। নির্বিশেষে সব শ্রেণির মানুষ অংশ নিচ্ছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকে ‘গণত্রাণ’ কার্যক্রমে। তৈরি হয়েছে মানবতার সেবায় দশে মিলে ঝাঁপিয়ে পড়ার এক অনন্য ছবি। টিএসসিজুড়ে সহায়তা দিতে আসা মানুষ, স্বেচ্ছাসেবীদের ব্যস্ততা—সব মিলিয়ে এলাহি কাণ্ড। প্রতিদিন সকাল থেকে টিএসসির মূল ফটকের সামনে দেখা যায় জরুরি পণ্যসামগ্রী নিয়ে হাজির হওয়া মানুষের ভিড়। খাবার, কাপড়, ওষুধ, শিশুদের জন্য গুঁড়া দুধ থেকে নারীদের জন্য স্যানিটারি ন্যাপকিন—সব কিছুই রয়েছে জমা পড়া পণ্যের তালিকায়। অনেককে নগদ অর্থ কিংবা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে আর্থিক সহায়তা দিতেও লম্বা লাইনে দাঁড়াতে দেখা যায়। দাতার সংখ্যা অনেক হওয়ায় ত্রাণসামগ্রী সংগ্রহ করতে গিয়ে হিমশিম খেতে হয় ছাত্রদের। একাধিক লাইন করে হাতে হাতে এসব ত্রাণ নিয়ে টিএসসির ভেতর নির্ধারিত স্থানে রাখা হয়। সেনাবাহিনীর একটি হেলিকপ্টারে করে ত্রাণ নিয়ে যাওয়া হয় বন্যাদুর্গত অঞ্চলে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি রাজধানীর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা টিএসসির মাঠে বসে মধ্যরাত পর্যন্ত ত্রাণসামগ্রী প্যাকেটিং করেন। প্যাকেট শেষে প্রতিদিন রাতেই সহায়তা নিয়ে বন্যাদুর্গত কুমিল্লা, ফেনী, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, সিলেট ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকার উদ্দেশে রওনা হচ্ছে ট্রাক। এসব ত্রাণপণ্য প্যাকেটজাত করতে শিক্ষার্থীদের সহায়তা করছেন বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ। এই দেশ অসংখ্য দুর্যোগের সঙ্গে লড়াই করে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। এবারও সবাই একতাবদ্ধ হয়ে মানুষের জন্য কাজ করছে সবাইকে নিরাপদ ও ভালো রাখবে বলে। আরেকটা কথা মনে রাখতে হবে, বন্যার তাৎক্ষণিক ধাক্কা সামলানোই শেষ কথা নয়। পানি নেমে যাওয়ার পর দুর্গতদের পর্যাপ্ত খাদ্যের ব্যবস্থা করতে হবে, ওষুধের ব্যবস্থা করতে হবে, বাসস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। সেই দায়িত্ব আমাদের সবার। সবাই মিলেই চেষ্টা করব তাদের আবার সুন্দর ও স্বাভাবিক জীবন উপহার দেওয়ার জন্য।
বাংলাদেশ থেকে আরো পড়ুন