https://www.prothomalony.com/

10642

bangladesh

বাংলাদেশ

সম্পাদকীয়ঃ বিদ্বেষ নয়, ধৈর্য ও সমঝোতা নিয়েই দেশ গড়তে হবে

প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২৪ ০৩:১০

জুলাই-আগস্ট ২০২৪। একটি ইতিহাসের নাম। বৈষম্যবিরোধী ছাত্রসমাজের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে শিশু, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের শত প্রাণের বিনিময়ে বাংলার ইতিহাসে সংযোজিত হলো নতুন এক অধ্যায়।  বর্তমান প্রেক্ষাপটে সরকারের উপর প্রত্যাশার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত হলো আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও আপামর জনতার প্রয়োজন/চাহিদাসমূহ নিরূপণ করা। আন্দোলনকারীদের বক্তব্য, স্লোগান, ব্যানার, ফেস্টুন ও প্ল্যাকার্ডের বার্তা থেকে সহজেই তাদের প্রয়োজন/চাওয়া বোঝা গিয়েছিল। শিক্ষক, অভিভাবক, শিল্পী, আইনজীবী, অবসরপ্রাপ্ত সেনা ও সরকারি কর্মকর্তা, সুশীল সমাজ ও পেশাজীবী এমনকি শ্রমজীবী মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ দেখা যায়। আন্দোলনের শুরুতে কোটা সংস্কারের বিষয়টিই প্রাধান্য পেয়েছিল। তারুণ্যশক্তি আজ জেগে ওঠেছে। এ শক্তির আবেগ অতি প্রবল। যত্নের সঙ্গে সঠিক পথে পরিচালনা করতে পারলে সমস্যা সংস্কারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারে। তাদের সঙ্গে নিয়েই সব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে সংস্কার করতে হবে। গুরুত্বের ক্রমানুসারে একেকটি প্রতিষ্ঠানকে জবাবদিহিতার সংস্কৃতিতে সাজাতে হবে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে জনগণের সত্যিকার বন্ধু হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। সরকারি কর্মচারীরা যেন নিজেদের শাসক না ভেবে সেবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, সেভাবে আইনের সংশোধন জরুরি। প্রকৃত গণতন্ত্রের জন্য চাই নিয়ন্ত্রণমুক্ত, রাজনৈতিক পরিচিতি ও প্রভাবমুক্ত শক্তিশালী সংবাদ মাধ্যম সরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহের উপর সঠিক নজরদারি করতে সক্ষম হবে। ২০২৪ সালে এসেও আবু সাঈদ, মুগ্ধ, রিয়া গোপের মতো ছোট্ট শিশুসহ যারা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকে বিভিন্নভাবে উজ্জীবিত ও অনুপ্রাণিত করেছেন তারা প্রত্যেকে এক একজন নূর হোসেন। শোষণ, বঞ্চনা আর বৈষম্যের বিরুদ্ধে তারুণ্যের প্রতিবাদে সৃষ্ট গণজোয়ারে নতুন যুগে পদার্পন করেছে বাংলাদেশ। এখন রাষ্ট্র সংস্কারের পালা। আর সেই গুরুদায়িত্ব পালনে পাঞ্জেরীর ভূমিকায় তরুণরা। তাদের ঘিরে ১৮ কোটি মানুষের প্রত্যাশা যেন একটু বেশিই। তরুণরাও ঢেলে সাজাতে চান বাংলাদেশকে। বর্তমানে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৩১ শতাংশের বেশি রয়েছে তরুণরা। তাই দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ, উন্নয়ন সবকিছু তরুণদের উপর নির্ভর করছে। তরুণরা রাজনীতিতে এলে মেধাবীরা তার প্রাপ্ত যোগ্যতা পাবে, রাজনৈতিক সহিংসতা বন্ধ হবে, ভোটাধিকার থাকবে সবার, দারিদ্র্য বিমোচনে তারা কাজ করার পাশাপাশি শিক্ষার মানও নিশ্চিত করতে পারবে। বিভিন্ন সড়কসহ দেয়ালে দেয়ালে শিল্পকর্ম আঁকছেন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা। বিজয়ের পর ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ, বিভিন্ন এলাকা পরিষ্কার করার পাশাপাশি লিখন ও মোছার কার্যক্রম চালাচ্ছেন তারা। দেয়ালে নতুন করে আঁকছেন বিভিন্ন শিল্পকর্ম। সেই সঙ্গে দেশ সংস্কারের স্লোগানও লিখছে তারা। রং নিয়ে ব্রাশের মাধ্যমে সব সড়ক রঙিন করে তুলছে তারা। দেয়ালগুলো শিক্ষার্থীরা রঙিন করে সাজাতে চান। দেশের বিরত্বগাঁথা দিয়ে ভরে ফেলতে চান। দেশটাকে তারা তাদের মতো করেই সাজিয়ে তুলতে চান। জেঁকে বসা দলীয় লেজুড়বৃত্তির ছাত্ররাজনীতির অবসান ঘটাতে চান তরুণরা। ছাত্র অধিকার প্রতিষ্ঠায় শিক্ষাঙ্গনে ছাত্র সংসদ সক্রিয় করার পরিকল্পনা তাদের। জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে সংস্কার করতে চান শিক্ষা ব্যবস্থার, ঢেলে সাজাতে চান স্বাস্থ্য খাতও।
এমন বাংলাদেশ চাই, যেখানে কোনো তরুণ আর বিদেশে পাড়ি জমানোর স্বপ্ন দেখবে না। তারা দেশের স্বার্থে প্রাণ দিতে সর্বদা প্রস্তুত থাকবে। এমন বাংলাদেশ চাই যেখানে শান্তির হাওয়া বইবে। যেখানে আর কোনো জুলুম, নির্যাতন, সন্ত্রাস, স্বৈরাচার স্থান পাবে না। শিক্ষাঙ্গনে অসুস্থ রাজনীতি বন্ধ করা এখন সময়ের দাবি। শিক্ষার্থীরা আর কোনো শিকলে বন্দি থাকতে চায় না।  পৃথিবীর কোনো শক্তি বাংলার তরুণ, মেধাবী ছাত্র সমাজকে দমাতে পারবে না। বাঙালি শান্তিপ্রিয় জাতি। অতএব শান্তি আমাদের একান্ত কাম্য। তরুণদের মধ্যে উদ্যোগী হওয়ার প্রবণতা বাড়াতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে যুক্ত করতে হবে। তরুণদের মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা বাড়াতে হবে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থানের মতো মৌলিক চাহিদা পূরণে সরকারকে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। দুর্নীতি দমন করতে হবে। আইনের সঠিক শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। একটি উন্নত দেশ গড়তে হলে শিক্ষাব্যবস্থাকে দৃঢ় করতে হবে। শিক্ষাব্যবস্থায় প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। অনলাইন শিক্ষা, মোবাইল অ্যাপস, ভার্চুয়াল রিয়েলিটি, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) সহ এইসব যুগান্তকারী প্রযুক্তি ব্যবহার করে আমরা শিক্ষাকে আরও আকর্ষণীয় এবং কার্যকর করতে পারি। শিক্ষাব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে হবে। শুধু তত্ত্ব নয়, ব্যবহারিক জ্ঞান অর্জনের উপর জোর দিতে হবে। নতুন বাংলাদেশ হিসেবে সর্বপ্রথম চাহিদা বৈষম্যহীন সমাজ গড়ে তোলার। সব ধর্ম, বর্ণ, জাতি সবার নির্বিশেষে একই অধিকার থাকবে। মানুষে মানুষে কোনো তফাৎ বা পার্থক্য থাকবে না। সবাই মানুষ সবার অধিকারও এক। ভোটের অধিকার আবার কার্যকর করে তুলতে হবে, প্রাপ্তবয়স্ক সবার ভোটদান নিশ্চিত করে গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।  শিক্ষা ক্ষেত্রে উন্নয়ন এনে দেশকে মেধাশূন্য হওয়ার হাত থেকে বাঁচাতে হবে। চাকরির ক্ষেত্রে সুপারিশ নয় বরং যোগ্যতার মূল্যায়ন করতে হবে। সরকারি কার্যক্রমগুলো সাধারণ জনগণের জীবনমুখী করতে হবে। পোশাক শিল্পকে করতে হবে নিজ দেশমুখী। পর্যটন কেন্দ্রসমূহের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে জনগণের হয়রানিমূলক কার্যকলাপ বন্ধ করার বিষয়ে বিশেষ নজরদারি রাখতে হবে। পুলিশ প্রশাসন দ্বারা সাধারণ জনগণের হয়রানিমূলক কার্যক্রম দমন করতে হবে। আর এ সবকিছু তখনই সম্ভব হবে যখন দেশের প্রধান হবেন সৎ ও ন্যায় ব্যক্তিত্বের। ধর্মীয়, সামাজিক কিংবা রাজনৈতিক পরিচয় ছাপিয়ে ‘মানুষ’ পরিচয় হবে সবচেয়ে বড় পরিচয়। খুন, রাহাজানি, ছিনতাই, লুটপাট থাকবে না বাংলাদেশে; দেশের মানুষ পাবে ন্যায়বিচার। সুশিক্ষায় গড়ে উঠবে একেকটি প্রজন্ম, নিজ দেশকে সুন্দরভাবে চালানোর মতো যোগ্য নেতৃত্ব গড়ে উঠবে। দরকার আমাদের শিক্ষা কারিকুলামে পরিবর্তন। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রয়োজন গবেষণার পর্যাপ্ত সুযোগ তৈরি করে দেওয়া, মুক্তচিন্তা বিকাশ হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা। দেশের ছেলেমেয়েরা হবে বিজ্ঞানী, হবে অর্থনীতিবিদ, কিংবা হবে রাজনীতিবিদ এবং জয় করবে পুরো বিশ্ব।

বাংলাদেশ থেকে আরো পড়ুন