খতীব, নূরে মদীনা জামে মসজিদ, সীতাকুণ্ড, চট্টগ্রাম।
প্রকাশ: ১৮ আগস্ট ২০২৬ ০০:২১
এ বিশ্বের উন্নতি ও সমৃদ্ধি নিহিত ইলমের বিস্তারে, আর ধ্বংস নিহিত অজ্ঞতার প্রসারে। যে শহর বা অঞ্চলে দ্বীনি ইলমের ব্যাপক বিস্তার ঘটে, সেখানে অন্যায়-পাপাচার হ্রাস পায় এবং মানুষের জীবনযাত্রা সুশৃঙ্খল থাকে। পক্ষান্তরে দ্বীনি ইলম গৌণ হয়ে পড়লে সেখানে অরাজকতা বাড়তে থাকে, মানুষের গতি স্থবির হয়ে যায় এবং দ্বীনের নামে মানুষ নানা বিদ‘আত ও বিজাতীয় অপসংস্কৃতিতে জড়িয়ে পড়ে। যে এই সত্য অনুধাবনে ব্যর্থ হয়, সে তাদের অন্তর্ভুক্ত যাদের জন্য আল্লাহ কোনো আলো রাখেননি। ইমাম আহমাদ রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, ইলম না থাকলে মানুষ পশুর মতো হয়ে যেত। তিনি আরও বলেন, মানুষের পানাহারের চেয়ে ইলমের প্রয়োজন অধিকখাদ্য দিনে একবার-দুবার প্রয়োজন হলেও ইলমের প্রয়োজন হয় প্রতিটি নিঃশ্বাসে।
ঈমান-আক্বীদা, ইবাদত-বন্দেগী, হালাল-হারাম, আল্লাহর হক, বান্দার হক এবং চারিত্রিক ভালো-মন্দের বিদ্যা অর্জন প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর উপর ফরয। সাহাবায়ে কেরাম সর্বাধিক সৎপথপ্রাপ্ত বিদ্বান হয়েও চাষাবাদ, ব্যবসা-বাণিজ্যের পাশাপাশি দ্বীনি ইলম অর্জন করতেন এবং যেখানেই থাকতেন সেখানেই ইসলাম প্রচার করতেন। দ্বীন মানুষের জীবনে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, তাই দ্বীনি ইলম ছাড়া অন্য বিদ্যায় ব্যস্ত থেকে এই ক্ষেত্রে অজুহাত দেখানো বিজ্ঞ মানুষের কাজ হতে পারে না।
ইসলামী পরিভাষায় ফরয দুই প্রকার—ফরযে কিফায়া (সমষ্টিগত ফরয) ও ফরযে আইন (ব্যক্তিগত ফরয)। সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের ইলম শেখা ফরযে কিফায়া, যা সমাজের একটি অংশ শিখলেই দায়িত্ব পূরণ হয়ে যায়। আর প্রত্যেক মুসলিমের ব্যক্তিগত জীবন পরিচালনার জন্য আবশ্যক ইলম শেখা ফরযে আইন। আল্লামা ইবনু আব্দিল বার্র তাঁর গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, বিদ্বানগণ একমত যে এক ধরনের ইলম প্রত্যেক মুসলিমের উপর ফরযে আইন, আর অন্য ধরনের ইলম ফরযে কিফায়া, যা কেউ একজন অর্জন করলে বাকিদের উপর থেকে তা রহিত হয়ে যায় (ইবনু আব্দিল বার্র)।
ইবনুল ক্বাইয়িম রাহিমাহুল্লাহর মতে ফরযে আইন ইলমের মধ্যে রয়েছে ঈমানের মূলনীতি, শরীআতের বিধান যেমন ওযু-সালাত-সিয়াম-হজ্জ, হারাম বিষয়সমূহের জ্ঞান এবং মুআমালাত-মুআশারাতের ইলম (ইবনুল ক্বাইয়িম)। এ প্রসঙ্গে ইমাম নববী রাহিমাহুল্লাহও বলেছেন, দ্বীনের যেসব বিষয় ব্যক্তির উপর ফরয, তা কার্যকর করার জন্য প্রয়োজনীয় বাহ্যিক জ্ঞান অর্জনও ফরযে আইন—যেমন সালাতের শর্ত ও রুকন না জানলে সালাত আদায় সম্ভব নয়; যার যাকাতযোগ্য সম্পদ আছে তাকে যাকাতের বিধান জানতে হবে; যিনি যে পেশায় যুক্ত তাকে সেই পেশার শরয়ি বিধান জানতে হবে (ইমাম নববী)।
একজন মুসলিমের ফরযে আইন ইলমের মধ্যে রয়েছে তাওহীদের জ্ঞান আল্লাহর একত্ব, তাঁর কোনো শরীক না থাকা, তিনিই স্রষ্টা ও সব কিছুর ফিরে যাওয়ার স্থান; মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর বান্দা, রাসূল ও শেষ নবী হওয়ার সাক্ষ্য; মৃত্যুর পর পুনরুত্থান ও প্রতিফল লাভের বিশ্বাস; কুরআন আল্লাহর বাণী হওয়ার সাক্ষ্য এবং তদনুযায়ী আমল করা; সালাত, সিয়াম, যাকাত ও হজ্জের বিধি-বিধান জানা; এবং হারাম-মাকরূহ বিষয়াবলি যেমন যিনা, মদপান, সুদ-ঘুষ, চুরি, মিথ্যা সাক্ষ্য, জুলুম ইত্যাদি থেকে বাঁচার জ্ঞান অর্জন করা।
আমাদের সমাজে এই ফরযে আইন পরিমাণ বিদ্যা অর্জনের বাস্তব চিত্র অত্যন্ত হতাশাজনক। পরিবারগুলো সন্তানদের স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসায় পড়ানোর প্রতি যতটা আগ্রহী, ইসলাম সংক্রান্ত হাতে-কলমে শিক্ষাদানে ততটাই উদাসীন। অনেক পরিবার কেবল শাব্দিক উচ্চারণে কুরআন পড়া শেখায়, কিন্তু অর্থ বোঝানোর প্রতি গুরুত্ব দেয় না। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন, বল, আমি আল্লাহর ইবাদত করি একনিষ্ঠভাবে; নিশ্চিতরূপে ক্ষতিগ্রস্ত তারাই যারা কিয়ামতের দিন নিজেদের ও পরিবারের সর্বনাশ করে, আর সেটাই সুস্পষ্ট ক্ষতি (যুমার: ১৪-১৫)। আল্লাহ আরও বলেন, তোমরা দুনিয়াবী জীবনকে অগ্রাধিকার দিয়ে থাক, অথচ আখেরাত উত্তম ও চিরস্থায়ী (আ'লা: ১৬-১৭)।
ঈমান-আক্বীদার ক্ষেত্রে হাদীছে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, প্রত্যেক শিশু ফিতরাতের বা ইসলামের উপর জন্মগ্রহণ করে, অতঃপর তার মাতা-পিতা তাকে ইহুদী, খ্রিষ্টান বা অগ্নিপূজারী বানিয়ে তোলে (বুখারী: ১৩৮৫, মুসলিম: ২৬৫৮)। এই হাদীছ থেকে বোঝা যায়, সন্তানের ধর্মীয় পরিচয় গঠনে মাতা-পিতার প্রভাব সুদূরপ্রসারী, অথচ অধিকাংশ মুসলিম কুরআন-সুন্নাহর সাথে মিল আছে কি না তা যাচাই না করেই বাপ-দাদার অনুসৃত রীতি অন্ধভাবে মেনে চলে। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, যখন তাদের বলা হয় আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তার অনুসরণ করতে, তখন তারা বলে বরং আমরা বাপ-দাদাদের যা পেয়েছি তারই অনুসরণ করব, যদিও তাদের বাপ-দাদারা কিছুই জানত না এবং সুপথপ্রাপ্তও ছিল না (বাক্বারাহ: ১৭০)।
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনী ও হাদীছ পাঠে আমাদের আগ্রহের যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে, অথচ তাঁকে না জেনে তাঁর আদর্শ অনুসরণের দাবি কেবল মুখের কথায় সীমাবদ্ধ থাকে। আখেরাতের প্রতি বিশ্বাসও একইভাবে উপেক্ষিত। আল্লাহ বলেন, হে মানবজাতি! তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে ভয় কর এবং সেই দিনকে ভয় কর যেদিন পিতা পুত্রের কোনো কাজে আসবে না এবং পুত্র পিতার কোনো কাজে আসবে না; পার্থিব জীবন যেন তোমাদের ধোঁকায় না ফেলে (লুকমান: ৩৩)। অথচ আমাদের নিত্যদিনের আলোচনা দুনিয়াকেন্দ্রিক কে ক্ষমতাবান হলো, কার চাকরি হলো, কার সন্তান পড়াশোনায় এগিয়ে এসব নিয়েই কেটে যায়, আখেরাতের চিন্তা প্রায় অনুপস্থিত।
আজ সমাজে খুন-ধর্ষণ, চুরি-ডাকাতি, সুদ-ঘুষ, মদ-জুয়া, ভেজাল-নকল, জুলুম-অত্যাচার দিন দিন বেড়েই চলেছে, যা প্রমাণ করে আখেরাতের জবাবদিহিতার বিশ্বাস আমাদের কাজে প্রতিফলিত হচ্ছে না। সালাত আমাদের কাছে প্রায় ঐচ্ছিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে, এবং যারা আদায় করে তাদের অধিকাংশও সঠিক নিয়মে তা শেখেনি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তোমরা আমাকে যেভাবে সালাত আদায় করতে দেখেছ সেভাবেই আদায় করো (বুখারী: ৬৩১)। রামাযানের সিয়াম পালনেও অনেকে অবহেলা করে, যাকাতের হিসাব-নিকাশ ও যথাযথ বণ্টন নিয়েও সচেতনতার ঘাটতি রয়েছে। হজ্জ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তোমরা আমার থেকে হজ্জের নিয়মাবলি শিখে নাও (মুসলিম: ১২৯৭), অথচ অনেকে হজ্জ পালন করেও সঠিক পদ্ধতি জানার আগ্রহ দেখান না।
হাক্কুল ইবাদ তথা মানুষের অধিকার সম্পর্কে জ্ঞান অর্জনও ফরযে আইন, কারণ অধিকার সম্পর্কে না জানলে তা যথাযথভাবে আদায় করা সম্ভব নয়। কারও প্রাপ্য অধিকার সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও পরিশোধ না করলে তা গুনাহের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। মাতা-পিতা, সন্তান, স্বামী-স্ত্রী, প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, মালিক-শ্রমিক, ধনী-গরিব, মুসলিম-অমুসলিমসহ সবার অধিকারের কথা কুরআন ও হাদীছে বারবার বলা হয়েছে। এছাড়া পেশাগত জ্ঞানেরও দুটি দিক রয়েছে নিজ পেশার সাথে জড়িত হালাল-হারাম জানা এবং পেশা সংক্রান্ত মৌলিক দক্ষতা অর্জন করা। আমাদের সমাজে দ্বিতীয় দিকটি নিয়ে যথেষ্ট তৎপরতা দেখা গেলেও পেশার সাথে জড়িত ইসলামী বিধি-নিষেধ জানার আগ্রহ প্রায় অনুপস্থিত। আদব-আখলাক বা শিষ্টাচারের বিদ্যাও একইভাবে গুরুত্বপূর্ণ আল্লাহ ও রাসূলের সাথে আদব, পিতামাতা-সন্তান-প্রতিবেশীর সাথে আদব, পানাহার-গৃহে প্রবেশ-ঘুম-পোশাকের আদব ইত্যাদি জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্র জুড়ে বিস্তৃত। ইমাম বুখারী রাহিমাহুল্লাহ এ বিষয়ে ‘আল-আদাবুল মুফরাদ’ নামে একটি স্বতন্ত্র হাদীছগ্রন্থ সংকলন করেছেন। শিশুকাল থেকে ইসলামী আদবে অভ্যস্ত করে তোলা গেলে বড় হয়ে তারা সহজেই এসব দিক আয়ত্ব করতে পারবে ইনশাআল্লাহ।
হালাল-হারামের জ্ঞান অর্জনও ফরযে আইন। আক্বীদা ও ইবাদতের ক্ষেত্রে কুরআন-সুন্নাহ যা নির্দেশ দিয়েছে তা-ই হালাল, বাকি সব হারাম। কিন্তু দুনিয়াবি বস্তু, কাজকর্ম ও আচরণের ক্ষেত্রে মূলনীতি হলো সব হালাল, তবে কুরআন-সুন্নাহ যা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে কেবল তা-ই হারাম। যেহেতু হারামের তালিকা সীমিত, তাই এই জ্ঞান অর্জন করা কঠিন নয়।
প্রকৃতপক্ষে ইসলাম মুজাহাদা বা চেষ্টা-সাধনার নাম। মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণের মূল্য অস্বীকার করা যায় না, কিন্তু ইসলাম সম্পর্কে আমাদের নির্বিকার উদাসীনতাকেও উপেক্ষা করা যায় না। মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা, তিনি যেন আমাদের ঈমানী ও আমলী দুর্বলতা দূর করে ইসলামের সঠিক পথে ফিরিয়ে নেন এবং দ্বীনি ইলম অর্জনে দৃঢ় সংকল্প নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার তাওফীক্ব দান করেন। আমীন!
অভিমত থেকে আরো পড়ুন