দুই বছর আগে ৫ আগস্টের যে বিকেলে শেখ হাসিনা হেলিকপ্টারে চড়ে গণভবন ছেড়েছিলেন, ঠিক সেই দিন থেকেই ঢাকা আর নয়াদিল্লির মধ্যে একধরনের বরফ জমতে শুরু করেছিল। যা গলার কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি দীর্ঘদিন। মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি ভারতের অস্বস্তি ছিল প্রায় প্রকাশ্যই। নয়াদিল্লির মূল ক্ষোভ ছিল ব্যক্তি ইউনূসকে ঘিরেই, তাঁর পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সখ্য এবং ভারতবিরোধী বলে পরিচিত কিছু বক্তব্যের কারণে। মোদি-ইউনূস বৈঠকের জন্য ঢাকার বারবার অনুরোধ প্রত্যাখ্যাত হয়েছে, নিরাপত্তার অজুহাতে বাংলাদেশিদের ভিসা কার্যক্রম স্থগিত হয়েছে, সীমান্ত পারাপারের ট্রেন যোগাযোগ বন্ধ থেকেছে মাসের পর মাস — প্রতিটি পদক্ষেপই যেন জানান দিয়েছে, সম্পর্কটা আসলে কতটা ভেঙে পড়েছিল।
তবে গত কয়েক মাসে এই চিত্রে একধরনের পরিবর্তনের আভাস দেখা যাচ্ছে। তার কেন্দ্রে আছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির বড় জয়ের পরপরই নরেন্দ্র মোদি বাংলা ভাষায় বার্তা পাঠিয়ে দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানান। সঙ্গে একটি গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল প্রতিবেশী হিসেবে বাংলাদেশের পাশে থাকার আশ্বাসও দেন। এরপর থেকে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর তৎপরতা চোখে পড়ার মতো। তিনি প্রকাশ্যেই বলেছেন, দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীই "জনবান্ধব ব্যক্তি"। তারেক-মোদি সরাসরি আলোচনায় বসলে অনেক জমে থাকা সমস্যার সমাধান সম্ভব। সবচেয়ে সাম্প্রতিক ঘটনা হলো, গত মঙ্গলবার নয়াদিল্লিতে দীনেশ ত্রিবেদী স্বয়ং মোদির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার বিষয়ে নির্দেশনা নিয়েছেন। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ঝুলে থাকা তিস্তা পানিবণ্টন চুক্তি নিয়েও নতুন করে আশাবাদ তৈরি হয়েছে। কারণ এখন ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার ও পশ্চিমবঙ্গ — দুই জায়গাতেই একই রাজনৈতিক দলের শাসন, যা এত দিনের রাজনৈতিক জটিলতা কিছুটা হলেও কমাতে পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
কিন্তু এই ইতিবাচক আবহের মধ্যেও একটা কাঁটা রয়ে গেছে, যার নাম শেখ হাসিনা। ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজেই একরকম স্বীকার করে নিয়েছেন এই দ্বিধার কথা। নয়াদিল্লি একদিকে "হাসিনা কার্ড" খেলার সুযোগ হাতছাড়া করতে চায় না। আবার একই সঙ্গে ঢাকার নতুন সরকারের সঙ্গেও বন্ধুত্ব চায়। যা তাঁর ভাষায় স্পষ্টতই "দুটো বিপরীতমুখী" লক্ষ্য। এই দ্বন্দ্বটা গত সপ্তাহেই আরেকবার প্রকাশ্যে এসেছে, যখন ৫ আগস্ট নয়াদিল্লিতে ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাবের এক আয়োজনে অডিও-বার্তায় হাসিনা ঘোষণা দেন, ডিসেম্বরে তিনি দেশে ফিরবেন — মৃত্যুদণ্ডাদেশ মাথায় নিয়েও। ঢাকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাৎক্ষণিক বিবৃতিতে এই আয়োজনকে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের জন্য "ক্ষতিকর" আখ্যা দেয়। বিএনপি নেতারাও প্রশ্ন তোলেন, দুই বছর পার হওয়ার পরও ভারত কেন তাঁকে এই মঞ্চ দিল। ভারত অবশ্য বরাবরের মতোই আনুষ্ঠানিক দূরত্ব বজায় রেখেছে — বলেছে, এটি বেসরকারি আয়োজন, সরকারের কোনো সম্পৃক্ততা নেই, আর হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়া হয়েছিল নিছক নিরাপত্তাজনিত কারণে, রাজনৈতিক কারণে নয়। তবে কূটনীতির ভাষায় নীরবতাও একধরনের বার্তা — ভারত তাঁকে থামায়নি, ফেরতও পাঠায়নি।
এখানেই আসলে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের আসল পরীক্ষা। একদিকে নতুন সরকার গঠনের পর সম্পর্ক স্বাভাবিক করার আন্তরিক ইচ্ছা দুই পক্ষেই দৃশ্যমান। কূটনৈতিক সফর বাড়ছে, উচ্চপর্যায়ের বার্তা বিনিময় হচ্ছে, তিস্তার মতো বহু পুরোনো ইস্যুতেও নতুন সম্ভাবনার কথা শোনা যাচ্ছে। অন্যদিকে হাসিনাকে ঘিরে ভারতের নীতিগত দ্বিধা এখনো স্পষ্ট হয়নি। তাঁকে প্রত্যর্পণের কোনো উদ্যোগ নেই, অথচ তাঁর রাজনৈতিক তৎপরতা বন্ধ করারও কোনো লক্ষণ নেই। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের কাছে এই দ্বিচারিতা একটা বড় প্রশ্নবোধক চিহ্ন হয়েই থেকে যায়। প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবে ভারত সত্যিই যদি নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে আন্তরিক হয়, তবে যাঁর বিরুদ্ধে দেশের নিজস্ব আদালতে মানবতাবিরোধী অপরাধের রায় ঘোষিত হয়েছে, তাঁকে রাজনৈতিক মঞ্চ ব্যবহারের সুযোগ দেওয়াটা কীভাবে সেই আন্তরিকতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়?
বাস্তবতা হলো, দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে বাংলাদেশ ও ভারতের একে অপরকে ছাড়া চলার সুযোগ সীমিত। বাণিজ্য, পানি বণ্টন, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, আঞ্চলিক নিরাপত্তা — সবকিছুতেই দুই দেশ পরস্পরের ওপর গভীরভাবে নির্ভরশীল। তাই তারেক রহমান ও নরেন্দ্র মোদির মধ্যে সরাসরি সংলাপের যে সম্ভাবনার কথা কূটনীতিকরা বলছেন, তা নিছক সৌজন্যতার বাইরে গিয়ে বাস্তব ফলাফলে রূপ নিলে তা দুই দেশের জন্যই মঙ্গলজনক হবে। কিন্তু সেই সংলাপ অর্থবহ হতে হলে ভারতকে স্পষ্ট করতে হবে, হাসিনাকে ঘিরে তাদের অবস্থান আসলে কী — নিছক মানবিক আশ্রয়, নাকি ভবিষ্যতের কোনো রাজনৈতিক বিকল্প হিসেবে রেখে দেওয়ার কৌশল। যত দিন এই প্রশ্নের স্বচ্ছ উত্তর না মেলে, তত দিন ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের ওপর জমে থাকা বরফ হয়তো কিছুটা গলবে রোদের ছোঁয়ায়, কিন্তু পুরোপুরি গলে যাওয়ার আগে বারবার তা জমে যাওয়ার আশঙ্কাও থেকে যাবে।
অভিমত থেকে আরো পড়ুন