অভিমত

প্রাকৃতিক দুর্যোগে মুমিনের করণীয়

খতীব, নূরে মদীনা জামে মসজিদ, সীতাকুণ্ড, চট্টগ্রাম।

প্রকাশ: ১৪ জুলাই ২০২৬ ০২:১৩

দুনিয়াতে মানুষের জীবনে যেমন খুশি, আনন্দ ও সুখের উপলক্ষ আসে, তেমনি আচমকা হানা দেয় বিপদাপদ, মুসিবত ও দুঃখ-বেদনার কালো মেঘ। এই নশ্বর পৃথিবীতে এমন কোনো মানবের আগমন ঘটেনি যিনি চিরকাল কেবল সুখ, শান্তি আর অনাবিল আনন্দ উপভোগ করে গেছেন। এমনকি আল্লাহর প্রেরিত প্রিয় নবীগণও এর ব্যতিক্রম ছিলেন না; তাঁদেরও জীবনের বিভিন্ন বাঁকে কঠিন থেকে কঠিনতর পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হয়েছে। মূলত বিপদ-আপদ আর বালা-মুসিবতের আবর্তেই মানুষের এই পার্থিব জীবন আবর্তিত, আর এটাই এই ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ার চিরন্তন স্বভাব। মহান আল্লাহ তায়ালা এই ধরাধামকে সুখ-দুঃখের মিশ্রণেই সাজিয়েছেন। তবে দুনিয়ার এই কষ্ট কিংবা আনন্দ, কোনোটিই স্থায়ী নয়। তাই জীবনের কঠিনতম বিপদে যেমন ভেঙে পড়া বা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া যাবে না, তেমনি বড় কোনো প্রাপ্তিতে আত্মহারা কিংবা অহংকারী হওয়াও একজন মুমিনের পক্ষে সমীচীন নয়।

মহান আল্লাহ তায়ালা বিভিন্ন কারণে বান্দাদের উপর বিপদাপদ ও বালা-মুসিবত আপতিত করেন। অনেক সময় এটি আসে বান্দার জন্য এক মহাজাগতিক পরীক্ষা স্বরূপ, যাতে যাচাই করা যায় বান্দা কঠিন সংকটে পড়েও আল্লাহর প্রতি আস্থা হারায় কি না, চরম ধৈর্যের পরিচয় দিতে পারে কি না এবং আল্লাহর পথে নিজের জান-মাল বিলিয়ে দিতে প্রস্তুত থাকে কি না। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলেন, তিনি অবশ্যই মানুষকে কখনো ভয়-ভীতি, কখনো ক্ষুধা এবং কখনো জান-মাল ও ফল-ফসলের ক্ষয়ক্ষতি দ্বারা পরীক্ষা করবেন, আর ধৈর্যশীলদের জন্য রয়েছে সুসংবাদ (সূরা বাকারা: ১৫৫)। অপর আয়াতে বলা হয়েছে, ভালো-মন্দ অবস্থা দ্বারা মানুষকে পরীক্ষা করা হয় যাতে সে সঠিক পথে ফিরে আসে (সূরা আ'রাফ: ১৬৮)। বিপদ-আপদের আরেকটি কারণ হলো আল্লাহর দরবারে বান্দার মর্যাদা বৃদ্ধি করা; তিনি তাঁর প্রিয়জনদের বেশি বেশি পরীক্ষা নিয়ে থাকেন, আর হাদিসে এসেছে সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা হয় নবীগণের, তারপর মর্যাদা অনুযায়ী তাঁদের পরবর্তীদের (ইবনে মাজাহ: ৪০২৩)।

এর পাশাপাশি মানুষের নিজস্ব গুনাহের প্রাদুর্ভাবের কারণেও যমীনে নানাবিধ আসমানী ও যমীনী মুসিবত নেমে আসে; এই দুর্যোগগুলো মূলত মানুষের নিজের হাতের কামাই। কুরআনে বলা হয়েছে, মানুষের যে বিপদ দেখা দেয় তা নিজ হাতের কৃতকর্মেরই কারণে, আর আল্লাহ অনেক কিছুই ক্ষমা করে দেন (সূরা শূরা: ৩০)। সমাজে যখন নির্দিষ্ট কিছু গুনাহ ও পাপাচার চরম আকার ধারণ করে, তখন বন্যা, সুনামি, দুর্ভিক্ষ, মহামারী, অনাবৃষ্টি, অতিবৃষ্টি, ভূমিকম্প, ভূমিধস ও যালিম শাসকের নিপীড়নের মতো ভয়াবহ গজব নেমে আসে। এর একটি প্রধান কারণ আল্লাহর স্মরণ থেকে বিমুখতা ও তাঁর বিধান লঙ্ঘন করা। আল্লাহ বলেন, যে তাঁর স্মরণ থেকে বিমুখ থাকে তার জীবন-যাপন সংকুচিত হয়ে যায় এবং কিয়ামতের দিন তাকে অন্ধ অবস্থায় উত্থিত করা হবে (সূরা ত্বহা: ১২৪-১২৭)। ইমাম কুরতুবি এই আয়াতের ব্যাখ্যায় লিখেছেন, যে আল্লাহর স্মরণ হতে উদাসীন থাকে যামানা তার উপর যুলুম করে, তার রিযিকে ঘাটতি দেখা দেয় এবং জীবন সংকুচিত হয়ে পড়ে (তাফসিরে কুরতুবি: ১১/২৫৯)।

একইভাবে সমাজে অঙ্গীকার ভঙ্গ, অবিচার আর কুরআনিক বিচারব্যবস্থার অনুপস্থিতি দেখা দিলে আল্লাহ সেখানে যালিম শাসক নিযুক্ত করেন এবং রক্তপাত বাড়িয়ে দেন (মুয়াত্তা মালেক: ৯২৭)। অঙ্গীকার ভঙ্গের কারণে বিজাতীয় দুশমন ক্ষমতাসীন হয় এবং শাসকরা আল্লাহর বিধান অনুযায়ী ফয়সালা না করলে তাদের মাঝে যুদ্ধ বেধে যায় (ইবনু মাজাহ: ৪০১৯)। সমাজের বিত্তশালীরা ঠিকমতো যাকাত না দিলে আসমান থেকে রহমতের বৃষ্টি বন্ধ হয়ে যায়, যা দুর্ভিক্ষ ডেকে আনে (মুসতাদরাক হাকিম: ২৫৭৭)। ব্যভিচার ও বেহায়াপনা বৃদ্ধি পেলে প্লেগ ও নিত্যনতুন দুরারোগ্য ব্যাধির প্রাদুর্ভাব ঘটে যা পূর্বসূরিরা কখনো দেখেনি, আর যিনার আধিক্যে মৃত্যুহারও বেড়ে যায় (ইবনু মাজাহ, মুয়াত্তা মালেক)। সুদি লেনদেনের কারণে দুর্ভিক্ষ নেমে আসে আর ঘুসের কারণে মনে দুশমনের ভয় ঢুকে যায় (মুসনাদে আহমাদ: ১৭৮২২)। ওজনে কম দেওয়া ও পরিমাপে কারচুপির কারণেও দুর্ভিক্ষ, শাসকের নিষ্ঠুরতা এবং বৃষ্টি হ্রাস পায় (ইবনু মাজাহ: ৪০১৯)।

প্রাকৃতিক দুর্যোগের এই কঠিন মুহূর্তে মুমিনের প্রধান করণীয় হলো সমস্ত গুনাহ ছেড়ে দিয়ে আল্লাহর দরবারে বেশি বেশি তাওবা করা। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নির্দেশ দিয়েছেন যেকোনো ভীতিপ্রদ পরিস্থিতিতে দ্রুততার সঙ্গে আল্লাহকে স্মরণ করে তওবা করতে (বুখারি: ১০৫৯)। পাশাপাশি দুর্যোগের সময় বেশি বেশি দোয়া করা উচিত; বৃষ্টি হলে নবীজি দোয়া করতেন যেন তা উপকারী হয় (বুখারি: ১০৯২), অতিবৃষ্টির সময় দোয়া করতেন আশেপাশে বর্ষণের জন্য, নিজেদের উপর নয় (বুখারি: ১০১৫), আর বজ্রপাতের সময় ক্ষমা প্রার্থনা করতেন (তিরমিযী: ৩৪৫০)।

বিপদ-আপদে মুমিনের আরেকটি বড় আমল সবর বা ধৈর্য ধারণ করা। আল্লাহ বলেন, ধৈর্যশীলদের জন্য সুসংবাদ, যারা মুসিবত দেখা দিলে বলে ওঠে "ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন", তাদের প্রতি রয়েছে বিশেষ করুণা ও হিদায়াত (সূরা বাকারা: ১৫৫-১৫৭)। লুকমান আলাইহিস সালাম তাঁর সন্তানকে বিপদে ধৈর্যের উপদেশ দিয়েছিলেন (সূরা লুকমান: ১৭), আর ধৈর্যশীলদের অপরিমিত সওয়াব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে (সূরা যুমার: ১০); নবীজি বলেন সবরের প্রতিদান জান্নাত (শুয়াবুল ঈমান: ৩৩৩৬)। বিপদের সময় মুমিনের হৃদয় আল্লাহর দিকে ধাবিত হয়, একে বলা হয় রুজু ইলাল্লাহ (সূরা আ'রাফ: ১৬৮)।

এছাড়া প্রতিটি মুমিনের জন্য তাকদিরের উপর পূর্ণ সমর্পণ জরুরি। আল্লাহ বলেন, প্রতিটি মুসিবত ঘটার আগেই লওহে মাহফুযে লিপিবদ্ধ থাকে, যাতে মানুষ হারানোর জন্য দুঃখিত না হয় এবং প্রাপ্তিতে উল্লসিত না হয় (সূরা হাদীদ: ২২-২৩)। এই বিশ্বাস মুমিনকে শত বিপদেও সান্ত্বনা দেয় এবং আত্মহত্যার মতো জঘন্য পথে পা বাড়াতে দেয় না।

বর্তমান সময়ে দুর্যোগ কবলিত অসহায় মানুষের সাহায্যে এগিয়ে আসা প্রতিটি সামর্থ্যবান মুসলমানের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। নবীজি বলেন, যে মুসলিম ভাইয়ের প্রয়োজন পূরণ করে আল্লাহ তার প্রয়োজন পূরণ করেন, বিপদ দূর করলে কিয়ামতে তার বিপদ দূর হবে (বুখারি: ২৪৪২)। ভাইয়ের সহযোগিতায় থাকা পর্যন্ত আল্লাহ বান্দার সহযোগিতায় থাকেন (মুসলিম: ২৬৯৯)। দয়াশীলদের প্রতি আল্লাহ দয়া করেন (আবু দাউদ: ৪৯৪১), আর মুমিনরা একে অপরের সঙ্গে এক দেহের মতো, একজন আক্রান্ত হলে গোটা দেহ অনুভব করে (মুসলিম: ২৫৮৬)। খাদিজা রাযিয়াল্লাহু আনহা নবীজিকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিলেন যিনি আত্মীয়ের হক আদায় করেন ও দুস্থদের দায়িত্ব নেন, আল্লাহ তাঁকে লাঞ্ছিত করবেন না (বুখারি: ৩)। অসহায়ের সাহায্যে চলাফেরা করা একমাস ইতিকাফের চেয়েও প্রিয় (আত-তারগীব: ৩৯৮৫), আর দান-সাদাকা আল্লাহর ক্রোধ প্রশমিত করে ও অপমানজনক মৃত্যু রোধ করে (তিরমিযী: ৬৬৪)।

দুর্যোগে কষ্ট হলেও এতে মুমিনের গুনাহ মাফ হয় ও মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। নবীজি জ্বরাক্রান্ত অবস্থায় বলেছিলেন রোগে গুনাহ এমনভাবে ঝরে যায় যেমন গাছ থেকে পাতা ঝরে (বুখারি: ৫৬৪৭)। সামান্য কাঁটা বিঁধলেও গুনাহ মাফ হয় ও মর্যাদা বাড়ে (মুসলিম: ২৫৭), আর মুমিনের উপর, তার সন্তান ও সম্পদের উপর বিপদ লেগেই থাকে যাতে সে গুনাহমুক্ত অবস্থায় আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করে (তিরমিযী: ২৩৯৯)।

দুনিয়ার এই ক্ষণস্থায়ী বিপদাপদ আখিরাতের সেই ভয়াবহ ও স্থায়ী মুসিবতের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়, যেদিন মানুষ তার ভাই, পিতা-মাতা, স্ত্রী-সন্তান থেকেও পালাবে, কেননা সেদিন প্রত্যেকের নিজস্ব দুশ্চিন্তাই তাকে ব্যস্ত রাখবে (সূরা আবাসা: ৩৪-৩৭)। অতএব আমাদের কাজ হবে দুনিয়ার এই ছোট মুসিবত থেকে শিক্ষা নিয়ে আখিরাতের ভয়াবহ পরিণতি থেকে বাঁচতে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকা। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে দুর্গতদের সাহায্যে এগিয়ে আসার তাওফিক দিন এবং দুনিয়া-আখিরাতের সব বিপদ-আপদ থেকে হেফাজত করুন। আমীন, ইয়া রাব্বাল আলামীন।

শিরক ক্ষমার অযোগ্য এক মহা অপরাধ

আব্দুল্লাহ শোয়াইব

শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম।

মানবজীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ ও ধ্বংসাত্মক অপরাধ হলো আল্লাহর সাথে শিরক করা। শরিয়তের পরিভাষায় একে আকবারুল কাবাইর বা সবচেয়ে বড় গুনাহ বলা হয়েছে। দুঃখজনক হলেও সত্য, বর্তমান মুসলিম সমাজে অবচেতনভাবেই এই মারাত্মক ব্যাধির প্রবণতা দিন দিন বেড়ে চলেছে। অনেকে মনে করেন, মূর্তিপূজা না করলে বুঝি শিরক থেকে মুক্ত থাকা যায়, অথচ শিরকের জাল এতই সূক্ষ্ম যে মানুষ নিজের অজান্তেই এতে জড়িয়ে পড়ে। তাই কুরআন, হাদিস ও সমাজবাস্তবতার আলোকে শিরকের সামগ্রিক রূপ বোঝা আজ সময়ের দাবি।

আল্লাহ তায়ালা কুরআনে স্পষ্ট করে বলেছেন, তিনি শিরকের গুনাহ কখনো ক্ষমা করবেন না, তবে অন্যান্য গুনাহ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করে দেবেন (সুরা নিসা: ১১৬)। নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবিদের সতর্ক করে বলেছেন, সবচেয়ে বড় গুনাহ তিনটি আল্লাহর সাথে শরিক করা, পিতা-মাতার নাফরমানি করা এবং মিথ্যা বলা বা মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া (মুসলিম: ১৪৩)। এই তালিকায় শিরককে সর্বাগ্রে রাখা প্রমাণ করে যে আল্লাহর অবাধ্যতার মধ্যে শিরকের চেয়ে বড় অপরাধ আর নেই।

আল্লামা ইবনুল কাইয়্যুম আল-জাওজিয়্যাহ তাঁর মাদারেজুস সালেকিন গ্রন্থে লিখেছেন, শিরক দুই প্রকার— শিরকে আসগর বা ছোট শিরক এবং শিরকে আকবর বা বড় শিরক (মাদারেজুস সালেকিন: ১/৩৩৯)। শিরকে আসগর হলো আল্লাহর সন্তুষ্টির পাশাপাশি অন্য উদ্দেশ্যে ইবাদত করা, অর্থাৎ রিয়া বা লোক-দেখানো আমল, যাতে মানুষ পুরোপুরি কাফের না হলেও তার ইবাদত নষ্ট হয়ে যায় এবং শাস্তির উপযুক্ত হয়। আর শিরকে আকবর হলো আল্লাহর সত্তা ও গুণাবলিতে অন্য কাউকে অংশীদার সাব্যস্ত করা, যার পরিণতি ইসলাম থেকে বিচ্যুতি বা কুফর।

বর্তমান যুগে বাহ্যিক ইবাদত, দান-সদকা ও ধর্মীয় প্রাতিষ্ঠানিক কাজের জাঁকজমক বাড়লেও লৌকিকতার কারণে তা ভেস্তে যাচ্ছে; আমল যত গোপন হয়, কবুলিয়াত তত বাড়ে। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, যে লোক-দেখানোর উদ্দেশ্যে নামাজ, রোজা কিংবা দান-সদকা করে, সে মূলত শিরক করে (মুসতাদরাক: ৮১৫২, আহমদ: ১৭১৪০)। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই প্রবণতাকে দাজ্জালের ফিতনার চেয়েও ভয়ংকর বলে আখ্যায়িত করেছেন এবং বলেছেন, এটি গোপন শিরক— যেমন কেউ নামাজে দাঁড়িয়ে অন্যের নজর টের পেয়ে তা আরও সুন্দর করে ফেলে, এটাও শিরক (ইবনে মাজাহ: ৪২০৪)।

শিরকে আকবরের প্রথম দিক হলো সত্তাগত শিরক, অর্থাৎ আল্লাহর জাতের মধ্যে কাউকে শরিক করা। ইহুদিরা উজায়েরকে আর খ্রিস্টানরা ঈসাকে আল্লাহর পুত্র দাবি করেছিল, অথচ আল্লাহ সন্তানাদি ও পিতা-মাতা থেকে পবিত্র (সুরা তওবা: ৩০)। ফেরাউনও নিজেকে শ্রেষ্ঠ রব দাবি করেছিল, যার পরিণতিতে আল্লাহ তাকে দলবলসহ লোহিত সাগরে ডুবিয়ে মেরেছেন। আধুনিক যুগেও এর ভিন্ন রূপ দেখা যায়  কোনো দুর্যোগ বা মহামারি থেকে দেশ রক্ষা পেলে আল্লাহর শুকরিয়া আদায়ের বদলে রাষ্ট্রীয় বা প্রযুক্তিগত বাহাদুরি প্রকাশ করা হয়, যা প্রকারান্তরে ফেরাউনি মানসিকতারই প্রতিধ্বনি।

দ্বিতীয় দিকটি জ্ঞানগত শিরক, অর্থাৎ আল্লাহর জ্ঞানে কাউকে শরিক করা। একমাত্র আল্লাহই অদৃশ্যের সব বিষয়ের নিরঙ্কুশ জ্ঞাতা, এতে কেউ শরিক নেই; নবী কিংবা কোনো ওলি-বুজুর্গকে এই গুণে শামিল করা স্পষ্ট শিরক। কুরআনে বলা হয়েছে, অদৃশ্যের চাবিকাঠি একমাত্র আল্লাহরই কাছে (সুরা আনআম: ৫৯), আর নবী নিজেই বলেছেন আল্লাহ ছাড়া কেউ গায়েব জানে না (বুখারি: ৭৩৮০)। ফিকহের কিতাবেও এসেছে, বিবাহের মজলিসে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে যৌথভাবে গায়েবি সাক্ষী রেখে বিয়ে করলে ঈমান চলে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে, কারণ নবীকে সর্বত্র হাজির-নাজির ও অন্তর্যামী মনে করা আল্লাহর গুণের অবমাননা (ফতোয়ায়ে কাজিখান: ৮৮৩)।

তৃতীয় দিকটি ক্ষমতাগত শিরক, অর্থাৎ আল্লাহর একক সর্বময় ক্ষমতায় কাউকে শরিক করা। সমাজের অনেকেই মাজার-দরগায় গিয়ে মৃত ওলি-বুজুর্গের কাছে সন্তান, আরোগ্য, চাকরি বা ব্যবসায় উন্নতির প্রার্থনা করে, অথচ যা কেবল আল্লাহর কাছেই চাওয়া সম্ভব তা সৃষ্টির কাছে চাওয়া মূর্তিপূজার নামান্তর; মাজার পূজা আর মূর্তি পূজায় কাঠামোগত পার্থক্য থাকলেও মৌলিক আকিদায় কোনো পার্থক্য নেই। চতুর্থ দিকটি ইবাদতগত শিরক, অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে সেজদা করা। পীর বা মাজার তো দূরের কথা, স্বয়ং নবিকে সেজদা করাও সম্পূর্ণ হারাম। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবিদের নিজের প্রতি সেজদা করতে নিষেধ করে বলেছেন, তোমরা তোমাদের রবের ইবাদত করো এবং আমার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করো (মুসনাদ: ৩২৭০, মাজমাউয যাওয়ায়েদ: ৭৬৫৪, আল বেদায়া ওয়ান নেহায়া: ৬/১৪৪)। কুরআনেও বলা হয়েছে, সেজদাসমূহ একমাত্র আল্লাহর জন্য, তাঁর সাথে অন্য কাউকে ডেকো না (সুরাতুল জিন: ১৮)। নবী ওফাতের পূর্বেও সতর্ক করে গেছেন যেন কেউ কবরকে সেজদার জায়গা না বানায় (মুসলিম: ৫৩২, ইবনে হিব্বান: ৬৪২৫, সহিহুল জামে: ২৭৪৫), আর মুয়াত্তা মালেকে এসেছে কিয়ামতের দিন আল্লাহর সবচেয়ে কঠিন গোস্বা তাদের উপরই হবে যারা নবির কবরকে সেজদার জায়গা বানিয়েছে (মুয়াত্তা মালেক: ৫৭০, আহমদ: ৭৩৫৮)।

ইতিহাসের আলোকে পৃথিবীতে শিরকের সূচনা হয়েছিল আদম ও নুহ আলাইহিমাস সালামের মধ্যবর্তী সময়ে। সে যুগে ওয়াদ্দা, সুয়াআ, ইয়াগুস, ইয়াউক ও নাসরা নামের পাঁচজন পরম ধার্মিক বুজুর্গ ছিলেন (সুরা নুহ: ২৩)। তাঁদের ওফাতের পর শয়তান মানুষরূপে ভক্তদের কাছে এসে পরামর্শ দেয়, তাঁদের স্মৃতি ধরে রাখতে অবয়বে মূর্তি বানিয়ে ইবাদতখানায় রাখা হোক। প্রথম প্রজন্ম স্মারক হিসেবে রাখলেও পরবর্তী প্রজন্মের মনে শয়তান কুসংস্কার ঢুকিয়ে দেয় যে পূর্বপুরুষরা এই মূর্তিরই উপাসনা করতেন— এভাবেই মানব ইতিহাসে প্রথম মূর্তিপূজা ও শিরকের অনুপ্রবেশ ঘটে (মারিফুল কুরআন: সুরা নুহ: ২৩)। ইবাদতগত শিরকের আরেক প্রচলিত রূপ আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নামে মান্নত করা; মান্নত কেবল আল্লাহর নামেই হতে পারে, পীর-মাজারের নামে মান্নত সম্পূর্ণ নাজায়েজ ও গোমরাহি।

পরকালে শিরকের শাস্তি সবচেয়ে ভয়াবহ ও চিরস্থায়ী। আল্লাহ ঘোষণা করেছেন, কুফরি ও শিরককারীদের জন্য জাহান্নামের পোশাক প্রস্তুত এবং তাদের মাথায় ফুটন্ত পানি ঢেলে দেওয়া হবে (সুরা হজ: ১৯-২২)। মুশরিক অবস্থায় মৃত্যুবরণকারীদের ওপর আল্লাহ, ফেরেশতা ও সমগ্র মানবজাতির লানত এবং তারা চিরকাল জাহান্নামে থাকবে (সুরা বাকারা: ১৬১-১৬২)। জীবন বিপন্ন হলেও ঈমানের প্রশ্নে আপস করা যাবে না; নবী বলেছেন, আল্লাহর সাথে শরিক করো না যদিও তোমাকে হত্যা বা জ্বালিয়ে দেওয়া হয় (মুসনাদে আহমদ: ২২০৭৫, সহিহুত্ তারগিব: ৫৭)। এর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ফেরাউনের কন্যাদের চুল বিন্যাসকারী দাসী হযরত মাশেতা বিনতে ফেরাউন, যিনি গোপনে মুসা আলাইহিস সালামের দ্বীন গ্রহণ করেছিলেন। ফেরাউনের প্রভুত্ব অস্বীকার করায় তাঁর চোখের সামনে পাঁচ সন্তানকে ফুটন্ত তেলে নিক্ষেপ করা হয়; ছয় মাসের দুগ্ধপোষ্য শিশুটিকে ছিনিয়ে নেওয়ার সময় অলৌকিকভাবে শিশুটি কথা বলে মাকে ধৈর্যের সান্ত্বনা দেয়, এরপর মাশেতাকেও একই পরিণতি বরণ করতে হয় (ইবনে কাসির, সুরা তাহরিম: ১১; ইবনে হিব্বান: ২৯০৪)। নবী মেরাজের রাতে এই মহীয়সী নারী ও তাঁর সন্তানদের কবর থেকে জান্নাতি সুঘ্রাণ পেয়েছিলেন (আহমদ: ২৮২১, মুসতাদরাক: ৩৮৩৫)।

শিরকমুক্ত খাঁটি তাওহীদি বিশ্বাসই পরকালে মুক্তির একমাত্র চাবিকাঠি। তাই ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজজীবন থেকে শিরকের সব অন্ধকার দূর করে কুরআন-সুন্নাহর আলোয় একনিষ্ঠভাবে এক আল্লাহর ইবাদতে আত্মনিয়োগ করাই একজন মুমিনের কর্তব্য। আল্লাহ আমাদের সবাইকে শিরকের এই মহামারি থেকে হেফাজত করুন। আমীন।

অভিমত থেকে আরো পড়ুন