https://www.prothomalony.com/

9995

north-america

উত্তর আমেরিকা

বিশ্বকাপ ক্রিকেট : যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ও আমাদের প্রত্যাশা

প্রকাশ: ১২ জুন ২০২৪ ১০:১৩

চার-ছক্কা, নাচ-গান, উচ্ছ্বাস, হৈ-হুল্লোড়। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের পরতে পরতে রোমাঞ্চ। আর এবারের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ নিয়ে ভক্ত-সমর্থকদের আগ্রহ বেশিই। কারণ, এবার চার-ছক্কার উচ্ছ্বাসে ভাসছে মার্কিন মুল্লুকও। অর্থ-বাণিজ্য, সমর শক্তিতে গ্রহের ‘সুপার পাওয়ার’ যুক্তরাষ্ট্রকে জড়িয়ে নিয়ে স্বপ্ন দেখছে হয়তো খেলাটির অভিভাবকরাও। 

সাত বছর পর ১৬ দল নিয়ে আয়োজন হয় বিশ্বকাপের। সর্বশেষ ২০২২’র আসর পর্যন্ত অপরিবর্তিত ছিল সংখ্যাটা। এবারের বিশ্বকাপ হচ্ছে ২০ দল নিয়ে। শুধু সংখ্যাই নয়, পরিবর্তন হয়েছে খেলাটির ধরনেও। সুইং প্লেন, হিটিং আর্কস, ইন্টেন্ট, ইমপ্যাক্ট এবং লং লিভার নিয়ে আলোচনা।

যুক্তরাষ্ট্রে ক্রিকেট খুব জনপ্রিয় নয়। আমেরিকান ফুটবল (এক ধরনের রাগবি), বাস্কেটবল, বেসবল, আইস হকির সামনে এক সময় যেমন কম জনপ্রিয় ছিল ফুটবল বা সকার। ইংলিশ ফুটবল তারকা ডেভিড বেকহ্যাম স্থানীয় লীগে (মেজর সকার লীগ) ক্লাব কিনে নিয়ে মার্কিনিদের চোখ ফিরিয়েছেন ফুটবলের দিকে। আর তার দল ইন্টার মায়ামিতে ফুটবলের মহাতারকা লিওনেল মেসি যোগ দেয়ার পর বলা যায়, এখন যুক্তরাষ্ট্রে ফুটবলের জয়জয়কার। তেমনি যুক্তরাষ্ট্রে ক্রিকেটের জাগরণে ভূমিকা রেখেছেন শান্তরা! বিশ্বকাপের আগমুহূর্তে বাংলাদেশের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি সিরিজ জিতেছে মার্কিনিরা। এতে ক্রিকেট নিয়ে দেশটিতে আগ্রহ বাড়ারই কথা! টানা দুই হারে সিরিজ খোয়ানোর পর শেষ ম্যাচে যুক্তরাষ্ট্রকে ১০ উইকেটে পরাজিত করে শান্তর দল। পরে বাংলাদেশ দলের অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত বলেন, ‘ম্যাচটি ভালোভাবে জিতেছি। বিশ্বকাপে সাহায্য করবে, আত্মবিশ্বাস দেবে। আমরা এখন জানি কন্ডিশন কেমন হতে পারে এবং আশা করছি সামনে ভালো করতে পারবো।’

ডালাসে দুই উত্তর আমেরিকার দেশের ম্যাচ দিয়ে শুরু হয়ে গেল টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ। আমেরিকা দাপুটে ব্যাটিং দিয়ে কানাডাকে হারিয়ে দিলো ২০২৪ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে। প্রথম ম্যাচেই আমেরিকার অ্যারন জোন্স টি-টোয়েন্টি ব্যাটিং দিয়ে মুগ্ধ করেছেন ডালাসের দর্শকদের, ১০টি ছক্কা হাঁকিয়েছেন তিনি। আমেরিকার মাটিতে এই ক্রিকেট প্রদর্শনীর প্রথম দিনে মাঠে ও টেলিভিশনের দর্শকরা আনন্দ প্রকাশ করেছে।

এবারের বিশ্বকাপে কিছু স্বকীয় বিষয় রয়েছে, যা একে অন্য বিশ্বকাপ থেকে আলাদা করেছে। ডালাসের যে মাঠে কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র ম্যাচ খেললো এটি ছিল বেজবল মাঠ, এই মাঠ ছিল টেক্সাসের বেজবল দল টেক্সাস এয়ার হগসের হোম ভেন্যু। এটাকে এখন সুদৃশ্য ক্রিকেট স্টেডিয়ামে রূপান্তরিত করা হয়েছে।

বিশ্বকাপ উপলক্ষ্যে সারাবিশ্ব যখন ক্রিকেট নিয়ে চিন্তায় মগ্ন, তখনই ক্রিকেটের এই উৎসবে জঙ্গি হামলার হুমকি দিয়েছে পাকিস্তানের উগ্রবাদী সংস্থা  ‘প্রো-ইসলামিক স্টেট (দাইশ) এই হুমকি দিয়েছে। পাকিস্তানের একটি সংবাদমাধ্যমে তারা দাবি করেছে যে বিশ্বকাপ চলাকালীন নাশকতা হবে। ক্রিকেট বিষয়ক ওয়েবসাইট ক্রিকবাজ এমন হুমকির কথা প্রকাশ্যে এনেছে। 

বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতির দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু তার ক্রিকেটীয় ঐতিহ্য, সংস্কৃতি খুঁজতে গেলে ইতিহাসের পাতা উল্টোতে হয় অনেক এবং দিনশেষে আপনাকে হতাশ হয়ে ফিরতে হবে! সেই দেশে প্রথমবার আইসিসির কোনো বৈশ্বিক আসর বসতে যাচ্ছে। লক্ষ্য ক্রিকেটের বিশ্বায়ন। সৌজন্যে করপোরেট পুঁজি। সঙ্গে উপমহাদেশীয় অভিবাসীদের বাঁধভাঙা ক্রিকেটীয় আবেগ। যা দিয়ে মার্কিনিদের বোঝানো অন্তত ক্রিকেট নামের খেলাটায় মোড়লগিরি করার ক্ষমতা তাদের নেই! বরং তাদের মাটিতে অন্যরা ‘দাদাগিরি’ করে দেখাবেন।

মার্কিন অর্থনীতি যতই শক্তিশালী হোক তার বিনিয়োগ ক্রিকেটে হবে এমনটা আশা করা অবশ্য বাড়াবাড়ি। ক্রিকেট মাঠের লড়াইয়ের চেয়ে তাদের অর্থনীতি সবল রাখতে মধ্যপ্রাচ্যে কিংবা ইউক্রেন-রাশিয়া লড়াইয়ে বিনিয়োগ অনেক বেশি লাভজনক। মার্কিন প্রশাসন সেটাই করছে এবং করবে।

মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। এই তিন স্টাম্পের ওপর বিশ্বকাপের বেল! এটাকে ঠিক রাখার সবচেয়ে আঠালো সুপারগ্লু হচ্ছে টেলিভিশন। ক্রিকেটের বড় বাজার ভারত আর উপমহাদেশের বাকি দেশগুলোর দর্শকদের ওপর নির্ভর করবে বিশ্বকাপের টিআরপি। এই অঞ্চলের মানুষের কথা মাথায় রেখে সূচি ঠিক করা হয়েছে। বিজ্ঞাপনদাতা বলা হউক আর আইসিসির পার্টনার বলা হউক তা মূলত উপমহাদেশীয়। ক্রিকেট অর্থনীতির চাকা ঠিক রাখতে তারাও সম্ভাব্য সবকিছু করবে।

তবে প্রবাসি বাঙালির বিশ্বকাপ আবর্তিত হবে বাংলাদেশ দলকে ঘিরে। এই দলটা কতদূর যেতে পারবে তা সময় ই বলে দিবে। বল মাঠে গড়ানোর আগে বাংলাদেশ ‘ফেবারিট’! কিন্তু খেলাটা ক্রিকেট আর দলটা বাংলাদেশ। আগাম কিছু বলা কঠিন।

একটা ব্যাপারে একটু আশাবাদী হতে চান দেশের বেশিরভাগ মানুষ। তা হলো- ক্রিকেটের মধ্য দিয়ে আধুনিক স্মার্ট এক বাংলাদেশকে মার্কিনিদের সামনে তুলে ধরা। মার্কিন মুলুকে প্রবাসী বাংলাদেশিরা এবার যদি একটু জোরেশোরে ‘বাংলাদেশ’ শব্দটা উচ্চারণ করছেন, সেটা হলো বাংলাদেশের বড় প্রাপ্তি। কারণ ক্রিকেট এখন আধুনিক দেশের উচ্চাকাঙ্খার প্রতীকও। আর ক্রিকেটাররা সেই উচ্চাকাঙ্খা বয়ে চলেন।

আইপিএলের ব্র্যান্ড ভ্যালু এখন ১০.৭ বিলিয়ন ডলার। আমেরিকার ন্যাশনাল বাস্কেটবল অ্যাসোসিয়েশন অর্থাৎ এনবিএ ১০ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি ব্র্যান্ড ভ্যালু নিয়ে পেছনে পড়ে গেছে। আইপিএলের প্রতি ম্যাচের মিডিয়া সত্ত্ব এখন যেখানে ১৬.৮ মিলিয়ন ডলার, সেখানে এনবিএতে তা মাত্র ১.১ মিলিয়ন ডলার।

আমেরিকায় ক্রিকেট নোঙর ফেলার একটা মওকা খুঁজছিল। আইপিএলের আকর্ষণ বেঁধে দিল সেতু। তাই প্রথমবারের মতো সেখানে আয়োজিত হয়েছে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ। সবকিছুর পেছনে আসলে ওই পুঁজি, মুনাফা। ক্ষতি কি, আইসিসি যদি পৃথিবীর অর্থনৈতিক রাজধানী ও সবচেয়ে প্রভাবশালী দেশটিতে পায়ের নিচে মাটি পেয়ে যায় সবদিক দিয়েই ভালো। ক্রিকেট বিস্তৃত হলো, ফুলে ফেঁপে উঠলো কোষাগার। একেবারে রাজযোটক যাকে বলা যায়।

যুক্তরাষ্ট্রের বেশিরভাগ ক্রিকেট ভেন্যুর সঙ্গে বেসবলের সম্পর্ক আছে। ডালাসের প্রেইরি ভিউ ক্রিকেট স্টেডিয়াম যেমন প্রকৃতপক্ষে বেসবলের মাঠ। বেসবল খেলাটির সঙ্গে ক্রিকেটেরও কিছু মিল আছে। বেসবলে ব্যাট দিয়ে বল হিট করাটাই দর্শন। ওখানেও রান করতে হয়। বেসবলের হোমরান (এইচআর) যেন ক্রিকেটের ছক্কা। বেসবলেও ক্রিকেটের মতো বোলার (পিচার) ব্যাটাররাই খেলে। এই খেলাতেও একইসঙ্গে মাঠের বিচারক থাকেন দুই আম্পায়ার।

সুতরাং বেসবলের দেশে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের বিশ্বকাপটা বেশ জমবে ভালো। নয়টি সহযোগী সদস্যসহ বেশির ভাগ দলের কাছেই এটা উপভোগ্য হওয়ার কথা।

যুক্তরাষ্ট্রের মতো বেসবল, বাস্কেটবলের দেশে ক্রিকেটের বিশ্বকাপ দেখে যারা অবাক হচ্ছেন, তাদের এই ইতিহাসটা স্মরণ করিয়ে দেয়া যেতে পারে। বিশ্বের প্রথম অফিসিয়াল ক্রিকেট ম্যাচটি কিন্তু হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রেই। ভেন্যু সেই ‘বিগ অ্যাপল’ বলে পরিচিত নিউ ইয়র্কের ম্যানহাটন। ১৮৪৪ সালের সেই ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা। ১৮৬০ দশকে গৃহযুদ্ধের আগ পযর্ন্ত যুক্তরাষ্ট্রের মানুষের বিনোদনের অন্যতম মাধ্যমই ছিল ক্রিকেট।|

তারপর সেখানে কিভাবে যেন শিকড় গাড়লো বেসবল, বাস্কেটবল, আমেরিকান ফুটবল। আসলে জীবনযুদ্ধে রুজিরোজগারের পেছনে ছুটতে গিয়ে তখন মানুষের হয়তো মনে হয়েছিল ক্রিকেটটা বড্ড লম্বা। এত সময় কোথায় ওটা দেখার? সময় কম, রোমাঞ্চ ও উত্তেজনা আছে, আবার টাকা আসবে- এমন কোনো সংক্ষিপ্ত খেলার দিকেই ছোটে আমেরিকানদের মন। টি-২০ ক্রিকেট এই মানসিকতার সঙ্গে যায়। একদা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যভুক্ত দেশগুলো যেমন ইংল্যান্ড, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা, দক্ষিণ আফ্রিকার অভিবাসীরা খেলাটিকে এগিয়ে নিতে বড় ভূমিকা রাখবে, এটা ভেবেই নেয়া যায়।

টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটটা বাংলাদেশের কাছে আর আনন্দের নয়। এ অতি জটিল সমীকরণে জীবন-মরণের মতো সিরিয়াস বিষয়। জন্মক্ষণ আর বর্তমান বাস্তবতায় টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটই পৃথিবীর কাছে এখন দাঁড়িয়ে আছে মেরুব্যবধানে। এটাই হয়তো ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ-ভাষা, এতেই হয়তো নিহিত ক্রিকেটের অস্তিত্ব।

বাংলাদেশের সমর্থকেরা প্রতিবারই আশায় বুক বাঁধে। একটা সুন্দর আসরের পরিসমাপ্তি দেখার জন্য শত-সহস্র চোখ পলকহীন তাকিয়ে থাকে টেলিভিশনের দিকে। তবে দুঃখজনকভাবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ফলাফল ‘আশায় গুড়েবালি’। এই যখন অবস্থা, তখন প্রশ্ন থেকেই যায়, ‘ঠিক কতটুকু আশা করা উচিত বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের কাছ থেকে?

একটা দলের প্রাণ হতে পারেন তরুণ খেলোয়াড়েরা। কোচের গোপন অস্ত্র, তুরুপের তাস কিংবা ট্রামকার্ড—যা-ই বলি না কেন, সব ক্ষেত্রে তরুণেরাই হতে পারেন ভরসার জায়গা। তারুণ্যনির্ভর বাংলাদেশ দল অতীতের ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এই বিশ্বকাপে ভালো ফল করবে বলেই আমরা আশাবাদী। বাংলার দামাল ছেলেদের বিশ্বকাপ মাতানো দেখার অপেক্ষায় কোটি কোটি ক্রিকেটপ্রেমী বাঙালি। বিজয় আসবেই!
 

উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন