https://www.prothomalony.com/

8412

north-america

উত্তর আমেরিকা

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ০৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৪ ০৪:৪৪

একুশ এক অহর্নিশ অনির্বান শিখা


শুরু হলো ভাষার মাস। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি রাজপথে যারা জীবন উৎসর্গ করেছিলেন, তাদের অমলিন স্মৃতি স্মরণের মাস এই ফেব্রুয়ারি। আজ সকালে যে সূর্যের উদয় হলো, তাতে মিশে আছে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি/আমি কি ভুলিতে পারি’র করুণ সুর। বাঙালির কাছে এই মাস ভাষার মাস; দেশপ্রেমে উজ্জীবিত হওয়ার মাস। তাই তো বাঙালি জাতি পুরো ফেব্রুয়ারি মাসজুড়ে ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা জানাবে ভাষাশহীদদের।

ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে ফেব্রুয়ারি ছিল ঔপনিবেশিক প্রভুত্ব ও শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে বাঙালির প্রথম প্রতিরোধ এবং জাতীয় চেতনার প্রথম উন্মেষকাল।১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে দুর্বার আন্দোলনে সালাম, জব্বার, শফিক, বরকত ও রফিকের রক্তের বিনিময়ে বাঙালি জাতি পায় মাতৃভাষার মর্যাদা এবং আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেরণা। তারই পথ ধরে শুরু হয় বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন এবং একাত্তরে নয় মাস পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত হয় স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ।

বস্তুত ফেব্রুয়ারি মাস একদিকে শোকাবহ হলেও অন্যদিকে আছে এর গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। কারণ পৃথিবীর একমাত্র জাতি বাঙালি যারা, ভাষার জন্য এ মাসে জীবন দিয়েছিল।ভাষার জন্য বাংলার দামাল সন্তানদের আত্মত্যাগ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায় ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর। এদিন ইউনেস্কো ২১ ফেব্রুয়ারি দিনটিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ ঘোষণা করে। এর মধ্যদিয়ে একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে এখন বিশ্বের দেশে দেশে পালিত হয়।

ভাষা আন্দোলনের মাস ফেব্রুয়ারির প্রথম দিন থেকেই শুরু হচ্ছে নানা কর্মসূচি। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার আবার হয়ে উঠবে জমজমাট।

আমাদের সবচাইতে বড় স্বস্তি এইখানে যে, নূতন প্রজন্মের মধ্যে এখনো প্রতিবছর একুশ আসে নূতন এক শিহরনে। এই শিহরন যেন প্রজন্ম হতে প্রজন্ম বয়ে বেড়াচ্ছে,  তা কখনো পুরাতন হবার নয়। কোনো ভাষার ফ্রেমে যেন যথার্থভাবে আটকানো যায় না কিংবা প্রকাশ করা যায় না এর অভাবিত নবতর অনুভবকে। কী বিস্ময়! বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া প্রতিটি মানুষ একুশের চেতনার ভিতর হতে তার শৈশব-কৈশোর-যৌবন পার করে বাঙালি-বাংলা ভাষা আর বাংলাদেশকে ভালোবাসে এক অদৃশ্য শপথগ্রহণের মধ্য দিয়ে । এই কারণে একুশ এখনো বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকে রুখবার সবচাইতে বড় শক্তি।

 একুশ এক অহর্নিশ অনির্বাণ শিখা, যার কারণে ঘোর কালো অমানিশাতেও পথভ্রষ্ট হয় না বাংলাদেশ। তারপরও গুরুতর একটি আক্ষেপ যে রয়ে যায় তা অস্বীকার করবার উপায় নেই। সেই আক্ষেপটি হলো, দেশ স্বাধীন হবার ৫২ বছর কেটে গেছে ; কিন্তু আজও অফিস-আদালত ও উচ্চশিক্ষাসহ সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রচলন হয়নি। বলা আবশ্যক যে, সর্বস্তরে বাংলা চালুর অর্থ কোনোভাবেই ইংরেজি বা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক ভাষাকে অবজ্ঞা বা অবহেলা করা নয়। প্রতিযোগিতাময় এই বিশ্বে আমাদের অবশ্যই বিশ্ব নাগরিকের যোগ্যতা অর্জন করিতে হইবে। কিন্তু নিজেকে—নিজের শিকড়কে অস্বীকার বা উপেক্ষা করিয়া তা কখনোই সম্ভবপর নয়।

একুশ এখন মহিরুহ। এটা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ যে, একুশ প্রতি বছর ছাপিয়ে যাচ্ছে  নিজের উচ্চতাকে। একুশে আমাদের ঐক্যবদ্ধই শুধু করছেনা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হতেও শিখাচ্ছে। একুশের আরও এক বড় শিক্ষা হলো, জনগণের আন্দোলন ও আত্মত্যাগ কখনোই বিফলে যায় না।


বাঙালির মহান মুক্তিযুদ্ধে, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে, জাতির স্বকীয়তা, সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে ভাষা আন্দোলন সব সময় আলোকবর্তিকার মতো মূর্ত হয়ে ওঠে। এখনো জাতির যেকোনো ক্রান্তিকালে ভাষা আন্দোলন আমাদের প্রেরণা হয়ে দেখা দেয়। 

প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ভাষা আন্দোলন জাতির বীরত্বপূর্ণ ঐতিহ্যের পরিচয় তুলে ধরে। ভাষা আন্দোলন তাই বাঙালির কাছে চির প্রেরণার প্রতীক।

বায়ান্নর আগুনঝরা সেই দিনগুলো বিশ্বের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে, থাকবে। ভাষাশহীদদের স্মৃতিবিজড়িত ফেব্রুয়ারি এ দেশের মানুষের চেতনায় এক অনির্বাণ বাতিঘর। এই আলোর স্পর্শে অন্যায়ের কাছে মাথানত না করার এবং প্রবল দেশাত্মবোধের অন্যরকম এক আবেগ ও উদ্দীপনায় জেগে ওঠে সর্বস্তরের মানুষ। ফেব্রুয়ারির সবচেয়ে বড় কর্মযজ্ঞ মাসব্যাপী বইমেলা শুরু হচ্ছে আজ। এই মেলার উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ভাষা আন্দোলনের মাস ফেব্রুয়ারির প্রথম দিন থেকেই শুরু হবে নানা কর্মসূচি। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার নানান সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে হয়ে উঠবে মুখর। এই মাসেই আয়োজিত হয় জাতীয় কবিতা উৎসব। প্রকাশিত হয় অনেক স্মরণিকা, শুধু রাজধানী ঢাকায় নয়; জেলা শহরগুলোতেও। সংবাদপত্রগুলোতে ফেব্রুয়ারির প্রথম দিন থেকেই রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন ও বাংলা ভাষাবিষয়ক লেখালেখি শুরু হয়। সম্প্রচারমাধ্যমেও শুরু হয় নানা ধরনের অনুষ্ঠান প্রচার। এসব উদ্যোগ-আয়োজনের বাহ্যিক আড়ম্বরের পাশাপাশি চিন্তাভাবনার জগতে কিছুটা হলেও সাড়া পড়ে। ফেব্রুয়ারি শুধু ভাষার মাস নয়, আত্মপ্রত্যয়ে উজ্জীবিত হওয়ারও মাস। এই মাসে আমাদের চেতনাকে শানিত করতে হবে, মাতৃভাষার প্রতি প্রকৃত ভালোবাসা জাগিয়ে তুলে আলিঙ্গন করতে হবে বাঙালিত্বকে। শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়, প্রাত্যহিক জীবনেও তার প্রয়োগ ঘটানো জরুরি।

উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন