https://www.prothomalony.com/
8259
north-america
নতুন সরকার, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আর পশ্চিমা কূটনীতি
নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করার পর প্রথম কূটনৈতিক লড়াইয়ে জয়ী হল। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের নির্বাচনকেন্দ্রিক লড়াইয়ের দুটি প্রেক্ষাপট ছিল। প্রথমত, নির্বাচন অনুষ্ঠান করা। দ্বিতীয়ত, এই নির্বাচনে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।
নির্বাচনের পরপরই প্রথম স্বীকৃতি পাওয়া গিয়েছিল চীন, রাশিয়া এবং ভারতের কাছ থেকে। নির্বাচনের পরপরই তিনটি দেশ সরকারকে অভিনন্দন জানাই। ১১ জানুয়ারী নতুন সরকার গঠিত হওয়ার পরপরই একের পর এক বিভিন্ন দেশ বাংলাদেশকে অভিনন্দন জানাতে থাকে। এমনকি ইউরোপিয় ইউনিয়ন নতুন সরকারকে অভিনন্দন জানান। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যদিও নির্বাচনকে ত্রুটিপূর্ণ হিসাবে বলেছে, নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়নি বলে দাবি করেছে। কিন্তু তারপরও ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার ডি হাস বঙ্গভবনে শপথের অনুষ্ঠানে গিয়েছিলেন এবং বিভিন্ন মন্ত্রীদের সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক করছেন। এরকম বাস্তবতায় বাংলাদেশের নির্বাচন এবং নতুন সরকারের স্বীকৃতি সঙ্কট কেটে গেছে। সবচেয়ে বড় কথা হল জাতিসংঘের মহাসচিব বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে টানা চতুর্থবার প্রধানমন্ত্রী হওয়ায় অভিনন্দন জানিয়েছেন। এর মধ্য দিয়ে সমস্ত সঙ্কট এবং সংশয় কেটে গেল।
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের জয়কে আমলে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) মতো পশ্চিমা শক্তিগুলো। তারা বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে নতুন সরকারের সঙ্গে কাজ করবে।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র ম্যাথু মিলার গত সোমবার রাতে এক বিবৃতিতে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের জনগণ এবং গণতন্ত্র, শান্তিপূর্ণ সমাবেশের স্বাধীনতা এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতার জন্য তাদের আকাঙ্ক্ষাকে সমর্থন করে। যুক্তরাষ্ট্র দেখেছে, গত ৭ জানুয়ারি সংসদ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন জিতেছে আওয়ামী লীগ।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলেন, সামনের দিনগুলোতে, একটি উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিকের জন্য অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিকে এগিয়ে নিতে, বাংলাদেশে মানবাধিকার ও নাগরিক সমাজের সমর্থনে, জনগণের সঙ্গে জনগণের এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরো গভীর করতে বাংলাদেশের সঙ্গে অংশীদারিতে যুক্তরাষ্ট্র অঙ্গীকারবদ্ধ।
আর বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ প্রসঙ্গে মুখপাত্র বলেন, যুক্তরাজ্য ও বাংলাদেশ একটি ঐতিহাসিক ও গভীর বন্ধুত্বের বন্ধনে আবদ্ধ। দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে টেকসই রাজনৈতিক সমঝোতা ও সক্রিয় নাগরিক সমাজ গড়ে তোলার পরিবেশ তৈরি করা অপরিহার্য।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) গতকাল মঙ্গলবার রাতে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলেছে, ইইউ গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, মানবাধিকার ও আইনের শাসনের ভিত্তিতে ইইউ-বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারি পুনর্ব্যক্ত করেছে। নির্বাচনে বড় সব দল অংশ না নেওয়ায় ইইউ দুঃখিত।
নতুন সরকারের রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নে আইন অনুযায়ী বাংলাদেশকে সমর্থন দেবে চীন। কমনওয়েলথ মহাসচিব বাংলাদেশের জনগণ ও কমনওয়েলথ পরিবারের সব সদস্যের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহ প্রকাশ করেন।
সরকারকে যেমন বৈশ্বিক চাপ সামাল দিতে হবে তেমনি দেশীয় চাপও সামাল দিতে হবে। মোটকথা এই সরকারের সামনে অর্থনীতি, কূটনীতি ও রাজনীতির চ্যালেঞ্জ থাকবে।
ভূ-রাজনৈতিক ও ভূ-অর্থনৈতিক বিষয়টি নিয়ে এখন আলোচনা না করাই ভালো। এটি পরিস্থিতি বুঝে পদক্ষেপ নিতে হবে। তবে এখন মনে হচ্ছে বড় ধরনের কোনো নিষেধাজ্ঞা আসবে না। সরকারকে এ বিষয়ে সতর্কতার সঙ্গে পদক্ষেপ নিতে হবে।
সরকাররের ওপর পশ্চিমাদের চাপ আপাত দৃষ্টিতে কমছে না বলেই মনে হচ্ছে। এখন দেখার বিষয় সরকার কীভাবে বৈশ্বিক চাপ সামাল দেয়। দেশের অর্থনীতি স্থিতিশীল রাখতে এবং দ্রব্যমূল্যের দাম সহনীয় রাখতে বাংলাদেশের বৈশ্বিক সহায়তা ও বিদেশি বিনিয়োগ দরকার। এছাড়া রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়াতে হবে। অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থার ওপর যদি মানুষের আস্থা তৈরি না হয়, তাহলে বিনিয়োগ আসবে না, রেমিট্যান্স কমবে। তখন সমস্যাগুলোর সমাধান কঠিন হয়ে যাবে।
নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে পশ্চিমাদের প্রশ্ন থেকেই যাবে। এ পরিস্থিতিতে সরকারকে যেমন বৈশ্বিক চাপ সামালাতে হবে, তেমনি রাজনৈতিক চাপও থাকবে। পশ্চিমাদের চাপ কেমন হবে তা এখনো পরিষ্কার নয়। কে, কোন ধরনের চাপ দিতে পারে সেটি প্রকাশ না করা পর্যন্ত অর্থনীতিতে এক ধরনের অদৃশ্য চাপও থাকবে। দৃশ্যমান চাপের চেয়ে অদৃশ্য চাপ মোকাবিলা করা কঠিন।
ভারসাম্য রক্ষা করাটা বাংলাদেশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তবে সরকার যে সেটি করতে পেরেছে, এটিও মানতে হবে। কোনো কোনো জায়গায় কিছু ছাড় দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়ন করা যায় কি না, সরকার তা বিবেচনায় নেবে। এ ক্ষেত্রে ভারতেরও একটি সহায়ক ভূমিকা থাকবে। কোনো অবস্থাতেই পশ্চিমাদের সঙ্গে বিরোধে যাওয়ার সুযোগ নেই, সেটি সামাল দেওয়ার সক্ষমতা বাংলাদেশের নেই। অবশ্যই তাদের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন করতে হবে। অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরতে হবে। আরও মেগা প্রজেক্ট নেওয়া বন্ধ করতে হবে। এখন যেগুলো আছে সেগুলোর সক্ষমতা নিয়ে এগোতে হবে। আমরা শুধু অর্থনীতির দিকেই নয়, মানসিক দিক দিয়েও পশ্চিমের সঙ্গে যুক্ত। ফলে তাদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক ভালো রাখতে হবে। এটির কোনো বিকল্প নেই। আর অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে, এখন নির্বাচন হয়ে গেছে, আমরা দেখছি, সমাজ ও রাজনীতি গভীরভাবে বিভক্ত হয়ে গেছে, সমঝোতায় আসতে হবে। দৃষ্টিটা আরও মানবিক করতে হবে।
নতুন সংসদে জনগণের ইচ্ছার কতটা প্রতিফলন হয়েছে, এ নিয়ে রয়েছে সমালোচনা। নির্বাচন কমিশন ৪১ দশমিক আট শতাংশ ভোটার উপস্থিতির কথা বললেও এ নিয়েও বিরোধীরা প্রশ্ন তুলেছেন। নির্বাচনের ফল প্রকাশের পরপরই বিভিন্ন দেশের পক্ষ থেকে আসতে শুরু করে বার্তা। সেই বার্তাতেও রয়েছে স্পষ্ট বিভাজন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া এমনকি জাতিসংঘ এবং জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থার পক্ষ থেকেও নির্বাচন ও বাংলাদেশের গণতন্ত্র নিয়ে কঠোর বার্তা এসেছে। অন্যদিকে, রাশিয়া, চীন, ভারত, পাকিস্তান, জাপান, ইন্দোনেশিয়া, কাতারসহ বেশকিছু দেশ টানা চতুর্থবারের মতো নির্বাচনে জেতায় শুভেচ্ছা জানিয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে।
আন্তর্জাতিক মেরুকরণে বাংলাদেশের অবস্থান কোথায় যেতে পারে, পোশাক রপ্তানি এবং রেমিট্যান্সের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল বাংলাদেশের অর্থনীতি কী ধরনের ঝুঁকিতে পড়তে পারে?
অর্থ-বাণিজ্য এবং কূটনৈতিক সংকটই নতুন সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এই দুই খাত বাংলাদেশের ক্ষেত্রে গভীরভাবে পরস্পর সম্পর্কিত।
উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন