https://www.prothomalony.com/
7857
north-america
রাজনীতি আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বেশ কিছু নিজস্ব চরিত্র রয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম-নির্ভর আন্দোলনের। কোনো নির্দিষ্ট ইস্যুতে খুব অল্প সময়ে মানুষ জড়ো করতে পারা সে সব চরিত্রগুলোর মধ্যে অন্যতম।
ইন্টারনেট ব্যবহারে তরুণদের সংখ্যার আধিক্যের কারণে, আন্দোলনের প্রথমদিকে জড়ো হওয়া মানুষদের মধ্যে তরুণদের উপস্থিতি থাকে সিংহভাগ। পরে আন্দোলনের খবর ব্যক্তি, পত্রিকা ও টিভি চ্যানেল মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ইস্যুর ধরন বুঝে বহু শ্রেণি-পেশা ও বয়সের মানুষ আন্দোলনে শামিল হয়।
প্রথাগত আন্দোলনের যে কঠিন ধাপটা পার করতে হয়, সেটা হলো কোনো ইস্যুতে মানুষকে একত্রিত করা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দ্বারা পরিচালিত আন্দোলনে যে পরিমাণ মানুষ অল্প কয়েকদিনে একত্র হয় সে সংখ্যক মানুষ কোন প্লাটফর্মের নিচে নিয়ে আসতে প্রথাগত আন্দোলনের মাধ্যমে মাসের পর মাস, এমনকি বছরও লেগে যায়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নির্ভর আন্দোলনে প্রাথমিকভাবে অভাবনীয় সাফল্য পাওয়ার পর সময়ের অতিবাহনের সঙ্গে সঙ্গে আন্দোলনের শক্তিতে দুর্বলতা জমতে শুরু করে। দুর্বলতা প্রকট আকারে রূপ নেয় যখন আন্দোলন দমনে নিয়োজিত পক্ষ ক্রমাগত বহুমুখী ব্যবস্থা গ্রহণ করে। ফলে আন্দোলনে একসময় দেখা দেয় নির্জীবতা।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো যোগাযোগের একটি দুর্দান্ত ব্যবহারযোগ্য সেট, যা জনমত প্রকাশের বিষয়টিকে গণতান্ত্রিক করেছে। কিন্তু কিছু বিবেকবর্জিত রাজনীতিক, যাঁরা এসব মাধ্যমকে নিজের স্বার্থ উদ্ধারের অস্ত্র হিসেবে দেখেন, তাঁদের হাতে পড়ে এগুলো নিজেরাই গণতন্ত্র হারিয়ে ফেলছে। মিথ্যা তথ্যের ভিত্তিতে আপনি যদি একবার ভুল লোককে ভোট দিয়েই ফেলেন, পরবর্তী নির্বাচনের আগ পর্যন্ত আপনি এ ব্যাপারে আর কিছুই করতে পারবেন না।
বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এখন মিছিল-সমাবেশের চেয়ে বেশি সক্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। তথ্যপ্রযুক্তির ক্রমবর্ধমান প্রসারের সুযোগে দলগুলো এখন ফেসবুক, ইউটিউবের মতো প্ল্যাটফর্মেও অর্থ ও সময় ব্যয় করছে। এতে প্রচলিত একমুখী যোগাযোগব্যবস্থার বদলে কর্মী ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে দলগুলোর বহুমুখী যোগাযোগ গড়ে উঠছে। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে দলগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার আরও বাড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।
গত কয়েক মাসে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সমাবেশগুলোতে মানুষের উপস্থিতি যা ছিল তার চেয়ে অনেক বেশিসংখ্যক মানুষ ওই সব সমাবেশ দেখেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সম্প্রচার হওয়ার সুবাদে। বিভিন্ন সংবাদ সম্মেলনের বক্তব্যও প্রচারিত হচ্ছে এসব মাধ্যমে। আগে বিভিন্ন স্থানে পোস্টার লাগিয়ে প্রচার চালানো হলেও এখন সেগুলো ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে সামাজিক মাধ্যমে।
অন্যদিকে যেসব কর্মী-সমর্থক দলগুলোর সভা-সমাবেশে যোগ দিতে পারেন না, তাঁরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমাবেশের দৃশ্য সরাসরি দেখতে পান। সেই সঙ্গে নিজের মন্তব্য জুড়ে দেওয়ারও সুযোগ থাকছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন বড় একটি নিয়ামক হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য। শুরুতে প্রযুক্তির পরিবর্তন কেউ মানতে চায় না। পরে আস্তে আস্তে এটি গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও তা-ই হয়েছে। গ্রামের একজন মানুষও এখন খুব সহজেই এই মাধ্যমে তথ্য পাচ্ছেন।
দলগুলোর ফেসবুক পেজের চিত্র সোশাল মনিটরিং প্ল্যাটফর্ম ক্রাউডট্যাংগেল থেকে পাঁচটি প্রধান রাজনৈতিক দলের তথ্য নিয়ে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। দলগুলো হলো বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), জাতীয় পার্টি (জাপা), বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। এর মধ্যে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর ফেসবুক পেজ ভেরিফায়েড।
২০১৩ সালের ৩০ আগস্ট খোলা আওয়ামী লীগের ফেসবুক পেজে অনুসারী ৩৩ লাখ। বিএনপির ফেসবুক পেজে অনুসারী ২১ লাখ। পেজটি খোলা হয় ২০১৯ সালের ১৩ জুন। ২০১৪ সালের ২০ জুন খোলা জামায়াতের ফেসবুকে অনুসারী ২০ লাখ। ২০১৫ সালের ৬ এপ্রিল খোলা সিপিবির ফেসবুকে অনুসারী ১৯ হাজার।
কয়েকটি দল অন্যান্য মাধ্যমেও সক্রিয়।
সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া এখন দলের শীর্ষ নেতারা সরাসরি দেখতে বা শুনতে পাচ্ছেন। ফেসবুকে দেওয়া বিভিন্ন পোস্টে সমর্থনের পাশাপাশি নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ায়ও দেখা যায়।
আওয়ামী লীগের পোস্টগুলোতে ১২ লাখ ১৯ হাজার ৭২৬ প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। বিএনপির পোস্টগুলোতে প্রতিক্রিয়া আছে ৯৮ লাখ ২৬ হাজার ৬৩৪।
ডিজিটাল মিডিয়া একটি চলমান ধারা। এখানে কোনো খরচ হচ্ছে না। পোস্টার লাগাতে গেলে টাকা খরচ হবে, শ্রম যাবে। অনেক ক্ষেত্রে সেটি কেউ ছিঁড়ে ফেলে। কিন্তু ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে এই সমস্যা নেই। এখানে সহজে অনেক কিছু বলা যাচ্ছে।
ভার্চুয়াল জগতের প্রভাব বাড়ছে রাজনীতিতে। তরুণ প্রজন্ম ব্যাপকভাবে সাইবার নির্ভর হচ্ছে। নানা মাধ্যমের মধ্যে ফেসবুকের ব্যবহারই সবচেয়ে বেশি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটা একদিকে যোগাযোগ ব্যবস্থাকে সহজ করছে। কিন্তু, এর খারাপ দিকও আছে। এর কারণে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ কমে যেতে পারে। সামাজিক গণমাধ্যমে ঐক্যের চেয়ে বিভেদ বেশি ছড়ায়- বলছেন বিদেশি গবেষকরা।
সামাজিক গণমাধ্যম একটা ‘নতুন মিডিয়া’। মালিকপক্ষের নীতি, বিদ্যমান আইন অথবা গ্রাহকদের প্রতিক্রিয়ার ভয়ে অনেক বিষয় মূলধারার গণমাধ্যম প্রচার করে না। কিন্তু, ফেসবুক ব্যবহারকারীদের বাধ্যবাধকতা না থাকায় তারা অনেক তথ্য প্রচার করছে। এটা একদিকে মূল ধারার গণমাধ্যমকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। অন্যদিকে এটা মূলধারার গণমাধ্যমগুলোর খবরের জন্য অন্যতম সোর্স হয়ে দাঁড়িয়েছে। গণমাধ্যমের এই গবেষক আরো বলেন, সোশাল মিডিয়ার কোনো নির্দিষ্ট সীমানা নেই। এটা রাষ্ট্রীয় সীমানার গতানুগতিক ধারণাকে বদলে দিয়েছে। এক দেশের বিষয়ে অন্য দেশের মানুষ মত প্রকাশ করতে পারছে। এক দেশের ইস্যুতে অন্য দেশের নাগরিকরা ক্যাম্পেইনও করছে। আবার বিভিন্ন বিষয়ে প্রবাসী নাগরিকরা বা প্রবাসী বিশেষজ্ঞরাও মতামত দিতে পারছে। তবে, দুঃখজনকভাবে অনেকে একে খারাপ কাজে ব্যবহার করছে। সামাজিক গণমাধ্যমের সৃজনশীল ব্যবহার নিশ্চিত করতে ব্যবহারকারীদের এসব বিষয়ে সচেতন হওয়ার পরামর্শ দেন এই শিক্ষক।
উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন