https://www.prothomalony.com/
7329
north-america
রাজনৈতিক অস্থিরতায় সংকট থেকে আরো সংকটে অর্থনীতি
অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর—এই তিন মাস জাতীয় নির্বাচনের সময়। রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়ছে। নির্বাচনের সময়ে এমনিতেই ব্যবসা-বাণিজ্যের গতি শ্লথ থাকে। দেখা দেয় নানা ধরনের অনিশ্চয়তা।
দেশে চলমান অবরোধ-হরতালকে কেন্দ্র করে সহিংস রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ফলে প্রাণ হারাচ্ছে নিরীহ মানুষ। নষ্ট হচ্ছে দেশের সম্পদ। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে আমদানি-রপ্তানি। সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় আরো বাড়ছে জিনিসপত্রের দাম। আর্থিক খাতগুলো ছাড়িয়ে শিক্ষাসহ সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা বিভিন্নভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে।
উচ্চ মূল্যস্ফীতি কমাতে ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ধরে রাখতে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে পারেনি বাংলাদেশ। বর্তমানে দেশের অর্থনৈতিক সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে আছে অর্থনীতির এই দুই প্রধান সূচক।
জানুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় জাতীয় নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত নীতিনির্ধারক ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক আর কোন নতুন পদক্ষেপ নিবে না। কারণ, এই সময়ের মধ্যে কোনো ব্যবস্থার কারণে দেশের অর্থনীতিতে স্বল্পমেয়াদী চাপ সৃষ্টি করতে পারে এমন কোনো পদক্ষেপ নিতে চায় না তারা। কিন্তু অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সরকার উদ্যোগ নিতে নির্বাচনের শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করলে দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে। তারা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, গুরুত্বপূর্ণ কিছু ব্যবস্থা নিতে নির্বাচন পর্যন্ত অপেক্ষা করা দেশের জন্য আরও সংকট ডেকে আনতে পারে। কারণ, ইতোমধ্যে বৈশ্বিক নানা কারণে দেশের অর্থনীতি চাপের মধ্যে আছে। যেমন- রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে পণ্যের উচ্চমূল্য ও বৈদেশিক মুদ্রার মজুত কমেছে।
বৈশ্বিক এই সংকটে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা থমকে যায়। ডলার সংকটে স্থবির হয়ে পড়ে শিল্পের কাঁচামাল, জ্বালানি আমদানিসহ বৈদেশিক লেনদেন। এলএনজি ও গ্যাসের সংকটে অভ্যন্তরীণ শিল্প উৎপাদন কমতে থাকে। খাদ্য মূল্যস্ফীতি এক যুগের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছে।
সর্বশেষ গাজায় ইসরায়েলি হামলা বৈশ্বিক ব্যবস্থায় আরো অনিশ্চয়তা যোগ করেছে। এই নাভিশ্বাস ওঠা পরিস্থিতিতে দেশজুড়ে রাজনৈতিক কর্মসূচি হিসেবে অবরোধ-হরতাল, ভাঙচুর-আগুন অর্থনীতির জন্য অশনিসংকেত। এই পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে অর্থনীতি গভীর সংকটে পড়বে বলে মনে করেন ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা।
এই পরিস্থিতিতে সবার আগে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও সংকট সমাধানে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। এতে কম আয়ের মানুষ গভীর সংকট থেকে রেহাই পাবে। অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগ যতটা সম্ভব তৈরি করতে হবে। আবার এই সময়ে অসাধু ব্যবসায়ীরা যাতে সুযোগ নিয়ে মূল্যস্ফীতি বাড়াতে না পারে, সেদিকেও নজর রাখতে হবে।
এমন বিরূপ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের অর্থনীতির টিকে থাকার ক্ষমতা এবং সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা অনেক বড় চ্যালেঞ্জ হবে। তাই অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের স্বার্থে স্থিতিশীল পরিবেশ আশা করছেন ব্যবসায়ীরা।
বলারই অপেক্ষা রাখে না, অর্থনীতির স্থিতিশীল অগ্রগতির জন্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অপরিহার্য। আমরা যদি বিশ্ববাস্তবতার দিকে নজর দেই, সহজেই দেখতে পাই বিষয়টি। রাজনৈতিক অস্থিরিতা এবং অনিশ্চয়তা কোন দেশের অর্থনীতির জন্যই মঙ্গল নিয়ে আসেনি। নাজুক অবস্থায় পড়া প্রতিটি দেশই রাজনৈতিক সংঘাতের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এমন বাস্তবতায় আমাদের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় রাজনৈতিক সমঝোতা জরুরী নয়, অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সম্প্রতি বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের এই সভায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অর্থমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরদের বৈঠকে ইসরাইল-হামাস যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
আইএমএফ প্রধান ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা বলেন, আইএমএফ যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং তেল বাজারে এর প্রভাব নিয়ে খুব ঘনিষ্ঠভাবে নজর রাখছে। তিনি বলেন, যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব সম্পর্কে এখনই মন্তব্য করা কঠিন, তবে বিশ্ব অর্থনীতির বর্তমান পরিস্থিতিতে এটি একটি নতুন সংকট।
জর্জিয়েভা বলেন, আইএমএফের বিশ্ব অর্থনৈতিক পূর্বাভাসে ইতিমধ্যেই দুর্বল বিশ্ব অর্থনীতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এই পূর্বাভাস যুদ্ধের আগে প্রকাশিত হলেও যুদ্ধের প্রভাব বিবেচনা করে ২০২৩ সালের জন্য বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৩.০ শতাংশ থেকে ২.৯ শতাংশে কমিয়ে আনা হয়েছে। আইএমএফের প্রধান অর্থনীতিবিদ পিয়ের-অলিভিয়ার গোরিনচাস বলেন, আইএমএফের গবেষণায় দেখা গেছে, তেলের দাম ১০ শতাংশ বাড়লে বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ০.১৫ শতাংশ পয়েন্ট এবং মুদ্রাস্ফীতি ০.৪ শতাংশ পয়েন্ট বাড়তে পারে। আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থা (আইইএ) বৃহস্পতিবার জানায়, যুদ্ধের কারণে তেল সরবরাহে বিঘ্ন ঘটার ঝুঁকি সীমিত, তবে প্রয়োজনে তেল বাজারে হস্তক্ষেপ করতে তারা প্রস্তুত।
আইএমএফের মধ্যপ্রাচ্য ও মধ্য এশিয়া বিভাগের পরিচালক জিহাদ আজুর বলেন, তেলের দাম এখনও সেপ্টেম্বর মাসের তুলনায় কম। তিনি বলেন, যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব সম্পর্কে এখনই স্পষ্ট ধারণা পাওয়া কঠিন, তবে এই পরিস্থিতি খুবই জটিল। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগান বন্দি ইসরাইলি জিম্মিদের মুক্তি দেওয়ার জন্য হামাসের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছেন। তুরস্কের বেসরকারি টিভি চ্যানেল হাবেরতুর্ক প্রথম এই খবর প্রকাশ করেছে।
শুধু দেশের মধ্যেই রাজনৈতিক বিরোধ ও সহিংসতা নয়, আন্তর্জাতিক এসব বিষয়ের প্রভাব বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এরমধ্যেই স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। সামনে এসব পরিস্থিতি আরও সংকটের অশনি সংকেত দিচ্ছে।
একটি দেশ ন্যুনতম কিছু বিষয় নিয়ে ঐক্যবদ্ধ না হলে , সে দেশের টেকসই উন্নয়ন বাঁধাগ্রস্থ হতে বাধ্য। টানা রাজনৈতিক বিরোধের মধ্য দিয়েও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। এ উন্নয়নের কার্যকারণ ব্যাখ্যা করে আমাদের আরও এগিয়ে যাওয়ার সমস্ত সুযোগ আমারা বন্ধ করতে পারি না। পেরিয়ে আসা মহামারি, উইক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরিতা, ফিলিস্তিনিদের উপর ইসরাইলের হামলা এক নতুন বিশ্ব পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের মতো নবীন অর্থনীতির দেশকে সতর্ক পদক্ষেপেই এগিয়ে যাওয়ার কোন বিকল্প নেই। আমাদের উন্নয়নের টেকসই অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে হলে রাজনৈতিক সমস্যাগুলোর সমাধান নিজেদের খোঁজতে হবে। বাংলাদেশের ভবিষ্যত এসব পদক্ষেপের উপরই নির্ভর করছে।
উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন