https://www.prothomalony.com/

7061

north-america

উত্তর আমেরিকা

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৩ ০৬:০৯

২৮ অক্টোবর আর শান্ত থাকল না। সংঘাতও এড়ানো গেল না। বোঝাই যাচ্ছে, সরকারি ও বিরোধী দলের শক্তি প্রয়োগের চারণভূমি হয়ে উঠেছে রাজধানী ঢাকা। ঘটনাকে যেভাবেই ব্যাখ্যা করা হোক না কেন, বর্তমান সংকটটি হচ্ছে একদিকে সরকার পতনের আন্দোলন, অন্যদিকে বিরোধীদের ঠেকানোর আন্দোলন। এই দুইমুখী সংঘর্ষে মূলত বিপাকে পড়েছে সাধারণ জনগণ। 

রাজনীতি যদি শুধুই শক্তি প্রদর্শনের মঞ্চ হয়ে থাকে, তাহলে তা গণতান্ত্রিক রীতিনীতির বাইরে চলে যায়। আমাদের দেশে গণতন্ত্র যে ঠিকভাবে কাজ করে না, তার উদাহরণ নিকট অতীতেও রয়েছে। যে দল ক্ষমতায় যায়, তারাই যেন গণতান্ত্রিক রীতিনীতি ভুলে বসে। সে সময় বিরোধী দলকে যতটা পারা যায়, দমিয়ে রাখার অনুশীলন চলতে থাকে এবং তা-ও চলে গণতন্ত্রের নামে। নির্বাচন কাছাকাছি এলে এই সংকট ঘনীভূত হয়। অতীতেও নানা সময় এ ধরনের অস্থিতিশীল অবস্থায় পড়েছে দেশ। কোন দলের লক্ষ্য কী, সেটা জেনে জনগণ তাতে স্বতঃস্ফূর্ত অংশ নিয়েছে। কিন্তু যে দলগুলো এখন পরস্পরের সঙ্গে যুঝছে, তাদের অভীষ্ট লক্ষ্য কী, সেটাই তো পরিষ্কার হচ্ছে না। আওয়ামী লীগ বা বিএনপি আসলেই দেশের মানুষকে একটি স্থিতিশীল ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য কোন পরিকল্পনা করেছে, সেটাই জনগণের কাছে স্পষ্ট নয়।

আগামী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনীতিতে পরস্পরবিরোধী দুটি ধারার অবস্থান স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। নির্বাচনে জয়লাভের চেয়েও প্রতিপক্ষকে পরাজিত করাই উভয় শক্তির মূল লক্ষ্য, সেটি তাদের বক্তব্য থেকেই পরিষ্কার। সেখানে এক পক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন করা ছাড়া নির্বাচনে অংশ নেবে না, করতে দেবে না—এমন দাবি করে যাচ্ছে। কতটা তারা শেষ পর্যন্ত সফল হবে তা বলা মুশকিল। অন্য পক্ষ সরকারি দল ব্যর্থ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অভিজ্ঞতায় দেশকে আর ফিরিয়ে না নেওয়ার অবস্থান থেকে সাংবিধানিকভাবেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত করতেই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। নির্বাচনের আর বাকি মাত্র কয়েক মাস। সরকারের মেয়াদও আর বেশিদিন নেই। কিন্তু দুই পক্ষের অনড় অবস্থান স্পষ্ট। এর মধ্যে বিদেশি নানা শক্তির তৎপরতা প্রায় এক বছর থেকেই জোরদার করছে। ফলে এবার দেশে সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে বিদেশিদের নানা অভিমত শোনা যাচ্ছে। বিরোধী দল বিদেশিদের কথায় অনেক সময় অনেক বেশি আশাবাদী হয়ে উঠছে, আবার কখনো কখনো হতাশ হয়ে যাচ্ছে। আওয়ামী লীগ বিদেশিদের ব্যাপারে কখনো কখনো খুবই শক্ত অবস্থান নিচ্ছে, কখনো কখনো নমনীয়তা দেখাচ্ছে। এ অবস্থায় সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে সরকারের প্রতিশ্রুতি বিরোধীরা গ্রহণ করছে না, আবার সরকারও বিরোধীদের সঙ্গে সরাসরি কোনো আলোচনায় বসার পরিবেশ দেখছে না। এটাকে অনেকের কাছেই খুব একটা প্রাক-নির্বাচনী সুষ্ঠু পরিবেশ বলে মনে হচ্ছে না। তারা মনে করছে, নির্বাচন সুষ্ঠু ও অবাধ করতে সব পক্ষেরই আস্থা এবং অংশগ্রহণ কোনো না কোনোভাবে প্রয়োজন। 

সেটি নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমেই করা যেতে পারে, যদি সরকার এবং বিরোধী পক্ষ ধীরে ধীরে তাদের মত পরিবর্তন করে। তা না হলে দেশে আবার ২০০৭-এর মতো অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু একটা ঘটে যাবে না তার নিশ্চয়তা কোথায়? তেমনটি ঘটলে রাজনীতি শুধু পিছিয়ে যায় না, ধ্বংসও হয়ে যায়। সেই সময় রাজনীতিবিদদের ওপর যে স্টিমরোলার চালানো হয়েছিল তা একেবারেই অনাকাঙ্ক্ষিত ছিল। কিন্তু এটিও তো থাকবে না যদি অরাজনৈতিক শক্তি এসে মাথার ওপর চড়ে বসে অরাজনৈতিক ব্যক্তিদের দিয়ে রাজনীতির সমাধান কোনোকালেই আশা করা যাবে না। একইভাবে বিদেশিরাও বাংলাদেশের রাজনীতির সমাধান সরাসরি দেবে না। তবে তারা তাদের মতো করে যদি কিছু করে, সেটি তাদেরই স্বার্থরক্ষা করবে, বাংলাদেশের রাজনীতি বা জনগণের নয়। সুতরাং রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান প্রকৃত রাজনীতিবিদদেরই করতে হবে রাজনৈতিক জ্ঞান বুদ্ধি ও বিবেচনা থেকে। সেটি করার এখনো সময় রয়েছে।

সরকারবিরোধী বিক্ষোভের এই আকস্মিক তীব্রতার নেপথ্যে কী রয়েছে এবং দেশের মঙ্গলে তার কেমন প্রভাব পড়বে? বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক সংকট ক্রমবর্ধমান এই রাজনৈতিক অসন্তোষে অবদান রাখলেও, জনবিক্ষোভের এই মাত্রা বৃদ্ধি আওয়ামী লীগের স্বৈরাচারী শাসন ব্যবস্থার প্রতি বর্ধিত ক্ষোভ এবং ২০২৩ সালের শেষের দিকে বা ২০২৪ সালের শুরুর দিকে অনুষ্ঠিতব্য সাধারণ নির্বাচন তারা কীভাবে পরিচালনা করতে পারে সে সম্পর্কে (জনমনে) ভীতিরই প্রতিফলন। সরকার এবং বিরোধী দলের মধ্যে ক্রমবর্ধমান মুখোমুখি সংঘর্ষের ফলে আসছে মাসগুলোতে ক্রমবর্ধমান সহিংসতায় সরকার সমালোচকদের উপর নিপীড়ন আরও বাড়তে পারে, পরিস্থিতির উপর ক্ষমতাসীন দলের নিয়ন্ত্রণে দুর্বলতাও দেখা দিতে পারে। ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক সংকট অসন্তুষ্ট নাগরিকদের একটি বড় ‘গ্রুপের’ জন্ম দিতে পারে যারা তাদের অভিযোগ দাখিলের উপায় খুঁজবে, আর ক্ষমতাসীন দল সম্ভাব্য সব উপায়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করবে। 

বাংলাদেশ ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক সংকটের সম্মুখীন, যা রাজনৈতিক মতবিরোধকে আরও জটিল করে তুলেছে। সরকার আগস্টে তেল ও জ্বালানি খাতে দাম বৃদ্ধি ঘোষণা করলে রাতারাতি জ্বালানির দাম ৫০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পায়, ফলে সাম্প্রতিক বিক্ষোভের শুরু। ২০২০ সালের মার্চ মাসে করোনা মহামারি শুরুর পর প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম ক্রমবর্ধমানভাবে বাড়ার পর (জ্বালানির দাম) অভূতপূর্ব এই বৃদ্ধির ঘোষণা আসে। দেশটিতে অর্থনৈতিক সংকট নেই, আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহ এবং স্থানীয় বিশেষজ্ঞদের বারবার এমন আশ্বাস সত্ত্বেও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পতন, রেমিট্যান্সের নিম্নগামী প্রবণতা এবং বাণিজ্য ঘাটতি সামনে কঠিন সময়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে। মূল্যস্ফীতি কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চে পৌঁছেছে।

 সবমিলিয়ে, বাংলাদেশের রাজনীতি অস্থির ভবিষ্যতকেই নির্দেশ করছে যেখানে অর্থনৈতিক দুর্দশা বাড়তে থাকবে এবং সাধারণ মানুষ ক্রমাগত ক্ষতিগ্রস্ত হবে। 

জনগণ চায় এমন একটি দেশে বসবাস করতে, যেখানে থাকবে আইনের শাসন। কোনো স্বাভাবিক কাজে ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের হস্তক্ষেপের দরকার পড়বে না। আইন চলবে তার স্বাভাবিক পথে। কিন্তু দুঃখের সঙ্গে আমরা লক্ষ করছি, বছরের পর বছর আমরা দেখতে পাচ্ছি ক্ষমতাসীনদের ক্ষমতার প্রবল অপব্যবহার।

জনগণের জন্য দিক-নির্দেশনামূলক আহ্বান জানানো না হলে জনগণের পক্ষে সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। সংঘাত নয়, আলোচনার মাধ্যমে এবং নিজেদের ভুলগুলো জনগণের সামনে স্বীকার করে নিয়েই সামনের পথটা মসৃণ করে তুলতে পারে রাজনৈতিক দলগুলো। অন্য কোনোভাবে নয়। 

উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন