https://www.prothomalony.com/
6519
canada
দিনটা ছিল দুহাজার বাইশ সালের অক্টোবর মাসের প্রথম দিন। টরন্টো ডাউনটাউনের আকাশচুম্বী সারি সারি বাড়ির মাঝে অবস্থিত শহরের অন্যতম সাংস্কৃতিক পীঠস্থান টরন্টো হারবার ফ্রন্ট সেদিন মুখরিত হয়েছিল বাংলা ভাষায় উচ্চারিত শব্দে। উচ্চারিত হয়েছিল সেই ভাষা যে ভাষার জন্য আজ থেকে একাত্তর বছর আগে বাংলাদেশের ঢাকা শহরে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি প্রাণ দিয়েছিল তরতাজা যুবকরা। আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো সেই একুশে ফেব্রুয়ারিতেই ইন্টারন্যাশনাল মাদার্স ল্যাঙ্গুয়েজ ডে পালিত হয় সারা পৃথিবী জুড়ে। তেতাল্লিশতম টরন্টো ইন্টারন্যাশনাল ফেস্টিভ্যাল অফ অথারস-এর আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠানে তাই পৃথিবীর অন্যান্য ভাষার সাথেই সমমর্যাদায় বাংলা ভাষাকে বিশ্বের দরবারে পৌঁছে দিতে আমরা দশ জন বাঙালি লেখক পোঁছে গেছিলাম সেদিন। উদযাপন করেছিলাম বাংলা ভাষা। হৃদয়ের অন্তস্হল থেকে যে আবেগ উৎসারিত হয় – সেই আবেগ বিচ্ছুরিত হচ্ছিল আমাদের চোখে মুখে আর আমাদের উচ্চারিত বাংলা শব্দে।
কানাডা এবং টরন্টোনিবাসী বাংলা ভাষার অক্ষর শ্রমিকরা একত্রিত হয়ে এমন একটি আন্তর্জাতিক মঞ্চে পৌঁছে যেতে পেরেছিলাম যে মানুষটির সাংগঠনিক দক্ষতায় তিনি গায়েত্রী গ্যামি অ্যাওয়ার্ড এবং নালন্দা পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক গবেষক সর্বজনশ্রদ্ধেয় সুব্রত কুমার দাস। টিফার বিশ্ব দরবারে বাঙালি লেখকদের নিয়ে বিভিন্ন আলোচনা চক্র আয়োজন করার পেছনে মূল পুরোধা তিনিই ।
২০২২ সালের টরন্টো ইন্টারন্যাশনাল ফেস্টিভ্যাল অফ অথরস (টিফা)-এর তেতাল্লিশতম বার্ষিক অনুষ্ঠানে গতবছর ২২ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের পর থেকে ২ অক্টোবর পর্যন্ত দশদিনব্যাপী সাহিত্য সমাবেশে বাঙালি লেখকেরা অংশ নিয়েছিলেন হারভার ফ্রন্টের ওপেন স্টেজে। সেদিনের অনুষ্ঠানে World in Other Words: Bengali Stories in Canada - এই শিরোনামে লেখক ও গবেষক সুব্রত কুমার দাসের তত্বাবধানে লেখিকা রুমানা চৌধুরী ও ভাস্বতী ঘোষ তাঁদের লেখালেখির অভিজ্ঞতা ও অনুবাদ প্রসঙ্গে বক্তব্য পেশ করেছিলেন। এরপর দ্বিতীয় পর্বে World in Other Words: Bengali Readings শিরোনামের অনুষ্ঠান পর্বে আবারও সুব্রত কুমার দাসেরই সঞ্চালনায় বাংলাদেশ ও কলকাতার আরও ছয়জন বাঙালি লেখক ভজন সরকার, আকতার হোসেন, শুজা রশীদ, শ্রেয়সী বোস দত্ত, বাদল ঘোষ এবং আমি দেবাঞ্জনা মুখার্জি ভৌমিক আমাদের লেখা গদ্য, স্বরচিত বাংলা কবিতা এবং তার অনুবাদ পাঠ করে শুনিয়েছিলাম উপস্থিত নানা ভাষার দর্শক ও শ্রোতাদের। হারবার ফ্রন্টের উন্মুক্ত মঞ্চে সবুজ গালিচার মত ঝকঝকে লনে রৌদ্রকরোজ্জ্বল দিনে টরন্টো সিএন টাওয়ারকে সাথী করে আমরা শ্রোতাদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছিলাম আমাদের বাংলা ভাষার প্রতি ভালোবাসাকে। বাংলাদেশ এবং ভারতবর্ষ থেকে কয়েক হাজার মাইল দূরে বাংলাভাষার জয়গান শুনে দর্শকদের করতালিতে আমরা উজ্জীবিত হয়েছিলাম বারবার। আমাদের আন্তরিক প্রচেষ্টায় বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের জয় ঘোষণা করাই ছিল আমাদের একমাত্র উদ্দেশ্য।
এই আনন্দযজ্ঞে আবার এই বছরেও সামিল হওয়ার জন্য আমরা সবাই উৎসাহিত বোধ করেছিলাম। আর তারই ফলস্বরূপ এই বছর টিফার চুয়াল্লিশতম বার্ষিক আয়োজনে আবারও নতুন এগারো জন বাঙালি লেখক উদযাপন করবেন বাঙালি ও বাংলা ভাষাকে। আর আমরা যারা গত বছর মঞ্চে ছিলাম, বাংলা ভাষার প্রতি সেই একই আবেগ আর উৎসাহ নিয়েই থাকবো দর্শকাসনে।
এবছর এই আন্তর্জাতিক লেখক উৎসব শুরু হবে ২১ সেপ্টেম্বর। ১১জন বাঙালি কবি-লেখক টিফা মঞ্চে তিনটি পর্বে অংশ নেবেন। উৎসবের চতুর্থ দিন ২৪ সেপ্টেম্বর রবিবার সকাল সাড়ে এগারোটায় ‘রাইটিং অ্যাজ অ্যা প্যাশন’ শিরোনাম পর্বে যে তিন বাঙালি লেখক কথা বলবেন তাঁরা হলেন পণ্ডিতজন ড. দিলীপ চক্রবর্তী, কবি ও ছোটগল্পকার রোকসানা লেইস এবং প্রাবন্ধিক সুধীর সাহা। দুপুর ১টায় একটি সেশন রয়েছে কানাডায় বসবাসকারী বাঙালিদের নিয়ে যারা ইংরেজি ভাষায় সাহিত্য চর্চা করেন। ‘বেঙ্গলিজ ইন ক্যানলিট’ পর্বে যে বাঙালিরা থাকছেন তাঁরা হলেন কবি কে. গান্ধার চক্রবর্তী, ঔপন্যাসিক আরিফ আনোয়ার এবং কবি লাবণি ইসলাম। উল্লেখ করা যেতে পারে যে এই তিনজন লেখকেরই রয়েছে কানাডা থেকে প্রকাশিত ইংরেজি গ্রন্থ। বিকেল সাড়ে চারটায় ‘রিডিং বেঙ্গলি পোয়েমস’ পর্বে যে চার বাঙালি কবি অংশ নেবেন তাঁরা হলেন শেখর গোমেজ, আন্জুমান রোজী, শিউলি জাহান এবং কাজি হেলাল। এবারে বাঙালি লেখক-কবিদের অংশগ্রহণে তিনটি আয়োজনই অনুষ্ঠিত হবে Brigantine Patio (235 Queens Quay West Toronto ON M5J 2G8) ঠিকানায়।
আগের বারের মতোই এবারও তিনটি আয়োজনই উন্মুক্ত। টিফার আয়োজকদের পক্ষে সকল সাহিত্যানুরাগীকে উপস্থিত থাকতে অনুরোধ জানানো হয়েছে এই আয়োজনে আমিও চাইবো আমার মত টরন্টো ও আশপাশের শহরের বন্ধুরাও পৌঁছে যাবেন বাংলা ভাষার এই মহাযজ্ঞে। আগ্রহীদের জন্য বিস্তারিত লিঙ্ক এখানে দিয়ে রাখছি –https://festivalofauthors.ca/event
কানাডার সরকারি ভাষা ইংরেজি ও ফরাসির সাথে এবছর যে ভাষাগুলোর সাহিত্যিকেরা নিজের ভাষাকে নিয়ে দাঁড়াবেন আন্তর্জাতিক এই সাহিত্য উৎসবে সেগুলোর মধ্যে আরবি এবং তামিলের সাথে রয়েছে বাংলা। বহুভাষার এই মিলন মেলায় জয় হোক মাতৃভাষার, মাতৃভাষায় রচিত সাহিত্য চর্চার।
কানাডা থেকে আরো পড়ুন