https://www.prothomalony.com/

6278

entertainment

বিনোদন

নৃত্যের উজ্জ্বল নক্ষত্র লায়লা হাসান

প্রকাশ: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৩ ০৮:২৮

ভোরের সুর্য উকি দিয়ে আস্তে আস্তে তার আলোর দ্যুতি ছড়িয়ে দেয় পৃথিবীতে। তেমনি একজন শিল্পী তার মেধা, দক্ষতা, বিনয় দিয়ে আলোর দ্যুতি ছড়ান মানুষের মাঝে। দেশ থেকে বিদেশ সব জায়গায়। ২১ পদক প্রাপ্ত, একজন মুক্তিযোদ্ধা লায়লা হাসান তেমন একজন শিল্পী। একজন কোরিওগ্রাফার, নৃত্যশিল্পী, উপস্থাপক এবং অভিনয় শিল্পী।

শুধু অভিনয়, নাচ বা উপস্থাপনায় নয়, তার বিনয় এতটাই মুগ্ধ করে যে, অবাক হতে হয়। একজন মানুষ যাকে নৃত্যের গুরুজি বলা হয়, যে অনেকের আইকন সে মানুষটা কি করে এত সাধারনভাবে মিশে যায় সবার সাথে ! এই যে বিনয়, স্নিগ্ধ হাসিমাখা মুখে কথা বলা এটা তার অনন্য অসাধারণ গুণ। এই সাধারন মার্জিত কথা বলার কারনেই অন্যদের থেকে অনায়াসে আলাদা মনে হয়। একজন শিল্পী থেকে হয়ে উঠেন প্রিয় শিল্পী।

২৬ আগস্ট ২০২৩ ওয়াশিংটন বই মেলাতে যখন আমার সাথে প্রথম দেখা হল, জিজ্ঞেস করলাম কেমন আছেন ? খুব সহজ সাবলীল ভাবে বললেন ভালো। তুমি কেমন আছো, কখন এলে ? যেন অনেক দিনের চেনা। কত কাছের, কত আপন। অথচ এই প্রথম আমার সাথে দেখা। আমার অনেক সৌভাগ্য যে অনেক শিল্পী, লেখক, অভিনেত্রীর সাথে কথা বলার সুযোগ হয়েছে। কিন্তু প্রথম দেখাতে এমন বিনয়ী হাসি দিয়ে কাউকে কথা বলতে দেখিনি। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা তো থাকেই পারিবারিক শিক্ষাটাও আচরণের মধ্যে প্রকাশ পায়। লায়লা হাসানের মধ্যে তাই প্রকাশ পেয়েছে।



শ্রদ্ধেয় এই মহীয়সী লায়লা হাসানের জন্ম ব্রাহ্মণবাড়িয়া নবীনগরে নানা খানবাহাদুর আলি আহমেদ খানের বাড়ীতে। ফুলের মত শিশুটির নাম রাখা হয় রোজি। নামটি রেখেছিলেন বাংলাদেশের বিখ্যাত পল্লী সঙ্গীত সম্রাট আব্বাসউদ্দীন আহমদ। পুরো নাম লায়লা নার্গিস। গ্রামের বাড়ী বিক্রমপুর। বাবা এম এ আউয়াল, মা লতিফা খান। বাবা-মা দুজনেই ছিলেন চাকুরীজীবী। মা ছিলেন প্রথম মুসলিম মহিলা কাস্টমস কর্মকর্তা, বাবা ছিলেন কুমিল্লা কোটবাড়ী কো-অপারেটিভ কলেজের প্রিন্সিপাল। শৈশব কেটেছে ঢাকার ওয়ারিতে। সাত ভাই বোনের মধ্যে লায়লা হাসান মেজো। উনার মা লতিফা খানের কথা জিজ্ঞেস করতেই বললেন, আমার মা চাকুরির পাশাপাশি ভীষণ সংসারীও ছিলেন।

আমি জানতে চাইলাম, তাহলে কি নাচ আপনার রক্তে মিশে ছিল ?

খুব সহজসুলভ হাস্যোজ্জ্বল ভাবে বলেন হয়তো। আমার মনে নেই, মায়ের কাছে শুনেছি আমি যখন খুব ছোট, বয়স দুই-কি তিন হবে তখন থেকে হেলেদুলে নেচে নেচে হাঁটতাম। এত ছোট ছিলাম যে, প্রথম যখন স্টেজে নাচ করতে গেলাম আমাকে দেখা যায় না বলে টেবিল এনে তার ওপরে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়েছিল। সেই থেকে শুরু। আসলে বাবা, মা দুজনেই ছিলেন সংস্কৃতি মনা। যার ফলে সহযোগিতা পেয়েছি পরিবারের কাছ থেকে। বুলবুল ললিতকলা একাডেমিতে ভর্তি হয়েছিলাম। পাশাপাশি পাড়ায় চাঁদের হাটের সদস্য ছিলাম। খেলাঘর অনুষ্ঠানে যেতাম।

লায়লা হাসান কথা বলছিলেন খুব গোছানোভাবে। আমি মুগ্ধ হয়ে শুনছিলাম।

অসাধারন এই নৃত্যসারথি লায়লা হাসান প্রখ্যাত নৃত্যশিল্পী মণিবর্ধন মহাশয়, অজিত সান্যাল, বাবু রাম সিংহ, জিএ মান্নান এবং শমর ভট্টাচার্য্য প্রমুখের কাছে শিক্ষাগ্রহণ করেন। এগিয়ে গেছেন অনায়াসে। আশির দশকে বিটিভিতে ছোটদের নাচ শেখার অনুষ্ঠান 'রুমঝুম' এর মাধ্যমে তাঁর সুনাম ছড়িয়ে পরে চারদিকে।

আপনার শৈশব কেটেছে ঢাকা ওয়ারিতে, কেমন ছিল সে সময়টা ?

একটু দম নিয়ে থেমে বললেন, চমৎকার ছিল। বাবা-মা, নানা- নানী, মামা-মামী, ভাই-বোন, সবাইকে নিয়ে যৌথ পরিবারে থেকেছি। নানা আলী আহমেদ রাজনীতি করতেন। মামা বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ খান সরোয়ার মুর্শিদ, মামী রাজনীতিবিদ নুরজাহান মুর্শিদ। আসলে ঐ সময় পুরো এলাকাতেই, শিক্ষিত সংস্কৃতিমনা লোকেরা বসবাস করতেন। সেখানে বেগম সুফিয়া কামাল, শেরে বাংলার এ কে ফজলুল হকও ছিলেন। রাজনৈতিক পরিবেশ এবং একটা ঐতিহ্য মন্ডিত সংস্কৃতি, শিক্ষার আবহের মধ্যে বড় হয়েছি।

আমাদের দুজনের কথার মাঝে অনেকে এসে এই শ্রদ্ধেয়ার সাথে কথা বলছিলেন, ছবি তুলছিলেন। তিনি ফাঁকে ফাঁকে আমার সাথে কথা বলছিলেন চমৎকার ভাবে।

তিনি নারী শিক্ষা মন্দির বিদ্যালয়ে পড়াশোনা শুরু করে পরবর্তী সময় কামরুন্নেসা স্কুল থেকে মাধ্যমিক, সেন্ট্রাল উইমেন্স কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক এবং ইডেন কলেজ থেকে বিএ পাস করেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শনে এমএ পাস করেন।

লায়লা হাসান ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পী ছিলেন। পাকিস্তানি বাহিনীরর নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন। আবৃত্তি নৃত্যের মাধ্যমে তিনি তার প্রতিবাদের উদ্দিপনা অব্যাহত রেখেছিলেন। এভাবেই একজন দেশ প্রেমিক প্রতিবাদী যোদ্ধা ইতিহাসের অংশ হয়ে গিয়েছেন। শুধু পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে নয়, জীবনের প্রতি ক্ষেত্রেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়ে গেছেন তিনি। তাই তো জীবনের প্রতি ক্ষেত্রে সাফল্যের সাথে এগিয়ে গেছেন।

চমৎকার এই নৃত্যসারথি লায়লা হাসান শুধু নৃত্য নয়, পাশাপাশি টেলিভিশন নাটকেও অভিনয় করেন। বিটিভির প্রযোজক নওয়াজিশ আলি খানের ধারাবাহিক 'রত্নদ্বীপ ' এ অভিনয় করেন।(যা মাইকেল মধুসূদন দত্তের 'মেঘনাদবধ কাব্য' রূপান্তরিত করে নাম করণ করা হয়েছিল' রত্নদ্বীপ')। এছাড়া মুস্তাফা মনোয়ার প্রযোজিত ও নির্দেশিত বিটিভির শ্রেষ্ঠ দুটি নাটকে অভিনয় করে গর্বিত ও আত্মতৃপ্তি লাভ করেন। নাটক দুটি হচ্ছে - এক, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'রক্তকরবী'। দ্বিতীয়টি হচ্ছে - উইলিয়াম শেক্সপিয়রের The Taming of The Shrew, যা বাংলায় রূপান্তর করেছিলেন শহীদ বুদ্ধিজীবী মুনীর চৌধুরী, নামকরণ করেন 'মুখরা রমণী বশীকরণ'। শুধু অভিনয়ে থেমে থাকননি, করেছেন পরিচালনাও। আবদুল্লাহ আল মামুন প্রযোজিত 'মন পবনের নাও' এগারো পর্বের নাটকে নৃত্যনাট্যের পরিচালক ছিলেন লায়লা হাসান। চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেছেন। শুধু তাই নয় নৃত্যশিল্প বিষয়ের ওপর তাঁর লেখা বই 'হৃদয়ে বাজে নূপুর' গ্রন্থ প্রকাশ পায় ১৯৯৬ সালে।

আমরা বলি আমাদের সংস্কৃতি অঙ্গনে লায়লা হাসান একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র। যিনি আপন মহিমায় তাঁর কর্ম দিয়ে উজ্জ্বল হয়ে আছেন। যে ক্ষেত্রেই পা রেখেছেন এঁকে গেছেন সাফ্যল্যের রেখা। তিনি ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দে সাংস্কৃতিক সংগঠন 'নটরাজ' প্রতিষ্ঠা করেন। এই নৃত্য গুরুজি বাংলা একাডেমি এবং ওয়েস্ট বেঙ্গল ডান্স ফেডারেশনের আজীবন সদস্য। তিনি এশিয়াটিক সোসাইটির সদস্য এবং 'বাংলাদেশ নৃত্যশিল্পী সংঘের সাবেক সভাপতি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক সিনেট সদস্য ।

বলা যায় জীবনের প্রতি ক্ষেত্রে সময়টা কাজে লাগিয়েছেন সুন্দরভাবে। শুধু বাইরে নয় ঘরে ও তিনি একজন গোছানো সংসারী মানুষ। বিয়ে হয়েছে আরেক গুণী মানুষ, অসাধারণ ব্যক্তিত্ব ২১ শে পদক ও স্বাধীনতা পুরস্কারপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ হাসান ইমাম এর সাথে । তখন তিনি লায়লা নার্গিস থেকে হয়ে যান লায়লা হাসান। শ্বশুরবাড়িতে যৌথ পরিবারের মাঝে থেমে থাকেনি তাঁর সাংস্কৃতিক পথ চলা।

জানতে চেয়েছিলাম বর্তমানে যেখানে প্রতি নিয়ত সংসার ভাঙছে সেখানে এই দীর্ঘ দাম্পত্য জীবনে পাশাপাশি আছেন দুজন । কিভাবে সম্ভব ?

বললেন, দুজনের মাঝে পারস্পারিক শ্রদ্ধা, বিশ্বাস আর সহযোগিতা ছিল, তাই সম্ভব হয়েছে । লায়লা হাসান এখনো সংসারের কাজ করেন নিজ হাতে ।

এক ছেলে স্বাক্ষর দুই মেয়ে সঙ্গীতা , রুমঝুম তারা সবাই শিক্ষকতার সাথে জড়িত । বর্তমানে ছেলে স্বাক্ষরের কাছে আছেন ওয়াশিংটন, ডিসি তে । ছেলের বউ নাদিয়ার সাথে চমৎকার বন্ধুতপূর্ণ সম্পর্ক। এক জীবনে আর কি চাই। খ্যাতি, মানুষের ভালোবাসা, শ্রদ্ধা কি নেই তাঁর জীবনে। কাজের স্বীকৃতি হিসাবে লায়লা হাসান জীবনে বহু সম্মাননা পেয়েছেন, তার মধ্যে বাচসাস পুরস্কার ২০০১, কাজী মাহবুব উল্লাহ বেগম জেবুন্নেচ্ছা ট্রাস্ট স্বর্ণ পদক পুরস্কার (২০০১), একুশে পদক (২০১০) অন্যতম ।

পরিশেষে জানতে চেয়েছিলাম নতুন প্রজন্মের জন্য আপনার কিছু বলার আছে ?

বললেন, আমাদের ভাষা, আমাদের মুক্তিযুদ্ধ চেতনা বোধ আরো সমন্বিত করতে হবে বঙ্গবন্ধুর আদর্শে। ছড়িয়ে দিতে হবে নতুন প্রজন্মের মাঝে।

এদের হাতেই অর্পন করে যেতে হবে ঐতিহ্য, সংস্কৃতি। তাদেরকে শেকড়ের সন্ধান দিতে হবে, আমাদের নববর্ষ, বইমেলা, পহেলা বৈশাখ, পান্তা ইলিশ, এগুলো ছড়িয়ে দিতে হবে তাদের মাঝে, কারন এরাই আমাদের বাংলাদেশ। বলেন, দেশে এবং প্রবাসে ব্যস্ত জীবনের মাঝেও যারা এসব নিয়ে কাজ করেন তাদের আন্তরিক অভিবাদন জানাই এবং আগামী প্রজন্মের জন্য ভালোবাসা।

আসলে এমন গুণী মানুষকে নিয়ে অল্প কথায় লিখে শেষ করা সম্ভব নয়। যতটুকু পেরেছি লেখার চেস্টা করেছি। সবচেয়ে ভালো লেগেছে তাঁর মত এমন মানুষের দেখা পেয়ে।

বিদায় নিয়ে ফিরে আসার সময় বললেন, তুমি ভালো থেকো। আন্তরিক শুভেচ্ছা তোমাকে। বললাম, আপনার জীবনের পথ চলা এগিয়ে যাক, এই কামনা করি।

বিনোদন থেকে আরো পড়ুন