https://www.prothomalony.com/

5948

north-america

উত্তর আমেরিকা

তাজউদ্দীন আহমদকে জানা মানেই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে জানা

প্রকাশ: ০৯ আগস্ট ২০২৩ ০৮:৩৩

সোহানা নাজনীনঃ তাজউদ্দীন আহমদরা একটি রাষ্ট্র সৃষ্টি করেছিলেন। একাত্তরের ১০ এপ্রিল স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের মাধ্যমে বাংলার ইতিহাসে প্রথম স্বাধীন একটি রাষ্ট্র হিসাবে বাংলাদেশের জন্ম হয়। মুক্তিযুদ্ধটা আমাদের কাছে নিউক্লিয়াস স্বরূপ, তাকে এড়িয়ে আমরা কিছু করতে পারবো না। আজকের প্রজন্মকে জানতে হবে যে একজন নেতা তৈরির মূল ভিত্তি হচ্ছে নৈতিকতাবোধ। ভালোর উদ্দেশ্যে ভালো কাজ করেন তাঁরা, বাহবা পাওয়ার জন্য নয়। অনেক সময় প্রতিকূল পরিবেশে দাঁড়িয়েও সত্য বলতে হয়। রাজনীতিবিদ হওয়া সহজ হতে পারে কিন্তু স্টেটসম্যান হওয়া সহজ ব্যাপার নয়, তাজউদ্দীন আহমদ একজন স্টেটসম্যান ছিলেন।

বাবা’কে নিয়ে এই আবেগঘন কথাগুলো বলেছিলেন বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ ও সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীনের কন্যা শারমিন আহমদ।
 ৩ অগাস্ট বৃহস্পতিবার প্রথম আলো উত্তর আমেরিকার ‘টক অফ দ্য উইক’ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন শারমিন আহমদ। ১৯৮৪ সাল থেকে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে বাস করছেন, ১৯৯০ সালে ওয়াশিংটন ডিসির জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফেলোশিপ ও উইমেন্স স্টাডিজ স্কলারস অ্যাওয়ার্ডসহ উইমেন্স স্ট্যাডিজে মাস্টার অব আর্টস ডিগ্রি লাভ করেন। শারমিন আহমদ-ওয়ান লাইট ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা এবং সভাপতি। ‘ওয়ান লাইট ইনস্টিটিউট’-মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক অলাভজনক একটি সংস্থা, যা বহুমুখী শিক্ষা ও অভিজ্ঞতামূলক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শান্তি-সম্প্রীতির কাজকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

শারমিন আহমদ ইউএস ডিপার্টমেন্ট অফ হেলথের একজন পরামর্শদাতা হিসাবেও যুক্ত ছিলেন। তাকে নিয়ে ওয়াশিংটন পোস্টে ফিচার হয়েছে। তার সম্পাদকীয় চিঠি এবং নিবন্ধগুলি ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল সহ বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক এবং রাজনৈতিক ফ্রন্টে, শারমিন আহমদ তার ঐতিহাসিক স্মৃতিকথা 'তাজউদ্দীন আহমদ: নেতা ও পিতা' প্রকাশ করেছেন। বইটিতে ১৯৭১ সালে দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে তাজউদ্দীন আহমদ নেতৃত্ব দিয়েছিলেন-তার জীবন ও কর্মকে চিত্রিত করা হয়েছে।  

তাজউদ্দীন আহমদ মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনের লক্ষ্যে যে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন ও কার্যক্রম পরিচালনা করেছিলেন সে সম্পর্কে শারমিন আহমদ বলেন, ‘আমার বাবা তাজউদ্দীন আহমেদ ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী এবং চার জাতীয় নেতার মধ্যে একজন। জাতির প্রাথমিক ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনে যে ইতিহাস, সেখানে তাজউদ্দীন একটি রাষ্ট্রের সৃষ্টি করেছিলেন। অথচ আমাদের দেশের নতুন প্রজন্ম এই ইতিহাস সঠিকভাবে জানে না। আমি আশা করবো শিক্ষা মন্ত্রণালয়, নীতি নির্ধারক এবং সিভিল সোসাইটি এই ইতিহাসগুলোকে দেশের স্বার্থে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থে রক্ষা করবেন। সরকার বদল হতে পারে, রাজনীতির খেলা চলতে পারে, কিন্তু এই আলোকিত মানুষদের কাছ থেকে পাওয়া নির্যাস অস্বীকার করা যাবে না। এযাবৎ যতগুলো সরকার ক্ষমতায় এসেছেন তাঁরা এই মুক্তিযুদ্ধের পর্ব, জাতির জন্ম ইতিহাস সঠিকভাবে লিপিবদ্ধ করে নাই।‘

বাবার বেড়ে ওঠা নিয়ে শারমিন আহমদ জানান, ‘তাজউদ্দীন আহমদ ছিলেন পরিবারের বড় ছেলে,  মধ্যবিত্ত পরিবারের সচ্ছল সংসারে বেড়ে উঠেছিলেন। স্কুলে সব পরীক্ষায় বরাবরই প্রথম স্থান অধিকার করেছেন। তখনকার অবিভক্ত বাংলায় সেন্ট প্রেগরি স্কুল থেকে মেধা তালিকায় ১২তম স্থান অধিকার করেন। ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায় তিনি মেধা তালিকায় চতুর্থ স্থান লাভ করেন। পরবর্তীতে এই মেধাবী ছাত্র অর্থনীতি নিয়ে  পড়ালেখা করেন। প্রশাসনের যে কোন পদেই উনি চাকরি নিতে পারতেন, কিন্তু উনি সেপথে যান নাই। বাংলাদেশ, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধিকার চেতনা প্রবাহ ও আন্দোলনের সাথে একাত্ম হয়েছিলেন। এভাবেই নিজেকে তিলতিল করে গড়েছিলেন। ২৫ মার্চে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যখন বঙ্গবন্ধুকে বন্দী করে পশ্চিম পাকিস্তানে পাঠানো হল সেইসময়ের শুন্যতা পূরণ করেছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ। একটি সাক্ষাতকারে তিনি বলেছিলেন, ‘পালিয়ে যাওয়ার পথে সাধারন মানুষের মধ্যে স্বাধীনতার যে স্পৃহা আমি দেখেছিলাম সেটাই আমাকে উদ্বুদ্ধ করেছিল একটি স্বাধীন সরকার প্রতিষ্ঠা করে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার কাজ শুরু করা।‘

একাত্তরের সেই ভয়াবহ অবস্থার মধ্যেও নিজের দেশের সম্মানের কথা ভেবেছিলেন তিনি। আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক হিসাবে ৩ এপ্রিল ইন্দিরা গান্ধির সাথে উনার দেখা হলে তিনি বলেছিলেন, ‘এই যুদ্ধ কিন্তু ভারত-পাকিস্তানের যুদ্ধ নয়, এই যুদ্ধ আমাদের যুদ্ধ। একজন বন্ধুদেশ হিসাবে আপনারা আমাদেরকে অস্ত্র, রসদ, বহির্বিশ্বের সাথে কুটনৈতিক চ্যালেঞ্জ স্থাপনের জন্যে আমাদের রেডিও স্টেশন ব্যাবহার করতে দিতে হবে।‘

তাজউদ্দীন হঠাত করে প্রধানমন্ত্রী হন নাই, এটা একটা লম্বা ডেমোক্রেটিক প্রসেস ছিল। এর মধ্যে অনেক আলোচনা, সমালোচনা ও যুক্তি ছিল। ভবিষ্যতে এই জাতি গনতন্ত্র হুমকির মুখে পড়লে সেই ডেমোক্রেটিক প্রসেস থেকে আমরা উদাহরন নিতে পারবো।

শারমিন বলেন, ইতিহাস মুক্তি পাক, সত্য আলোর মুখ দেখুক, এই আলোতে নতুন প্রজন্ম তাদের গর্বের জায়গাটা খুঁজে নিক। বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ কেন আমাদের পাঠ্যসূচীতে নেই এটা ভেবে খুব অবাক হই। পঞ্চাশ বছরেও তাজউদ্দীনের এই নৈতিক লিডারশীপ সম্পর্কে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পাঠ্যবইতে নির্দিষ্ট কোন অধ্যায় অন্তর্ভুক্ত হয়নি। তাজউদ্দীন আহমদ একটা প্রতিজ্ঞা নিয়েছিলেন, ‘দেশ যতদিন স্বাধীন না হবে ততদিন উনি পারিবারিক জীবনযাপন করবেন না।‘ মন্ত্রীসভার অন্যরাও এই প্রতিজ্ঞা করলেও একমাত্র তাজউদ্দীন এই শপথটা পালন করেছিলেন। উনার মতে মুক্তিযোদ্ধারা তাদের নিজ নিজ পরিবার ছেড়ে ফ্রন্টে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে তাহলে আমি তাদের প্রধানমন্ত্রী হয়ে কিভাবে পরিবার পরিজন নিয়ে দিন কাটাবো? উনি একসময় থাকতেন কলকাতার ৮ নম্বর থিয়েটার রোডে, যেখান থেকে মুক্তিযুদ্ধের সব নীতিনির্ধারণ হয়েছিল। সেই ঠিকানাকেও আমরা সংরক্ষণ করিনি, কোন স্মারক রাখিনি।  তাজউদ্দীন আহমদ তার প্রিয় নেতার নামে বাংলাদেশের প্রথম রাজধানী হিসাবে কুষ্টিয়ার মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলার আম্রকাননের নামকরণ করেছিলেন ‘মুজিবনগর’।“

শারমিন আহমদ 'মুক্তিযুদ্ধ ৭১’ এই সংগঠনটির সাথে জড়িত। এই সংগঠন থেকে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ছয়টি  প্রামাণ্যচিত্রের নকশা ও প্রযোজনা করা হয়েছে। এই প্রামান্যচিত্র  বানাবার পেছনে কি চিন্তা কাজ করছিল এবং ছবিগুলিতে  প্রদর্শিত মুক্তিযুদ্ধের বিশেষ ঘটনা নিয়ে জানতে চাওয়া হলে শারমিন আহমদ বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ ছিল একটা জনযুদ্ধ, এই যুদ্ধে অসংখ্য নারী যুদ্ধ করেছিলেন, প্রশিক্ষন দিয়েছিলেন। নারীরা যুদ্ধে লাঞ্ছিত হয়েছিল, মৃত্যু বরণ করেছিল। সেইসব কাহিনী নিয়ে সংকলিত কিছু করা উচিত যাতে করে সবাই জানতে পারে। মুক্তিযুদ্ধের সাথে জড়িত তাঁরা সবাই বর্ষীয়ান, অনেকেই পৃথিবী থেকে চলে গেছেন। আমরা তাদের কাছ থেকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস শুনেছি এবং তা দিয়ে প্রামান্যচিত্র তৈরি করেছি।

শারমিন আহমদ বলেন, বর্তমানে আমরা একটা লোভী সমাজে বসবাস করছি, কিন্তু সেই মুক্তিযুদ্ধের সময় মানুষ কিছু একটা দিতে এসেছিল, জীবনকে উৎসর্গ করেছিল। ‘একাত্তরের নৌ-কমান্ড’ প্রামান্যচিত্রে সেই আত্মত্যাগ ফুটিয়ে তোলা হয়েছে যা তরুণ সমাজে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। এটা ছিল মাতৃভূমিকে রক্ষার জন্যে পৃথিবীর বৃহত্তম ডুবারু আক্রমণ। কিন্তু আফসোসের বিষয় যে আমাদের দেশে এই ইতিহাস লিপিবদ্ধ হয়নি। যে ইতিহাসগুলো স্কুলের বইতে পড়ে বাচ্চারা গর্বিত হবে, আত্মত্যাগের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হবে। সামাজিক ন্যায়বিচার এবং মানবিক মর্যাদা সম্পর্কে জ্ঞাত হবে।

জলযুদ্ধ ছাড়াও আকাশে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ছিল যেখানে বৈমানিক যারা পাকিস্তান থেকে ফিরে এসে মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করলেন তাঁরা সাধারন হেলিকপ্টারকে যুদ্ধবিমানে পরিণত করেছিলেন। সেটা ছিল একটা অস্বাভাবিক অভিযান, অথচ সেই কথাগুলো ইতিহাসে নেই।

শারমিন আহমদের ব্যপক সাড়া জাগানো বই ‘তাজউদ্দীন আহমদ নেতা ও পিতা’ ছাড়াও একাধিক উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ রয়েছে। ২০০৩ সালে প্রকাশিত বাংলা - ইংরেজি দ্বিভাষিক বই “হৃদয়ে রংধনু -The Rainbow in a Heart”  মেরিল্যান্ডের মন্টগোমারী  কাউন্টি পাবলিক স্কুলের পাঠ্য হিসেবে অনুমোদিত হয়। বইটি সম্পর্কেও বিস্তারিত বলেন শারমিন আহমদ।

স্মৃতিচারণের মাধ্যমে সেদিনের “টক অফ দ্য উইক” অনুষ্ঠানটি সম্প্রচারিত হয়। অনুষ্ঠানটির সঞ্চালনায় ছিলেন সোহানা নাজনীন, কারিগরি সহযোগীতায় ছিলেন এইচ বি রিতা। প্রথম আলো উত্তর আমেরিকার এই জনপ্রিয় সম্প্রচার প্রতি বৃহস্পতিবার আমেরিকান সময় রাত নয়টায় সরাসরি প্রচারিত হয়ে থাকে।

উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন