https://www.prothomalony.com/

5823

north-america

উত্তর আমেরিকা

সম্পাদকীয়/ প্রবাসীদের সেবা নিশ্চিত করতে হবে

প্রকাশ: ২৯ জুলাই ২০২৩ ০৩:৩৭

প্রবাসীদের সেবা নিশ্চিত করতে হবে বাংলাদেশের বাইরে আরেকটি বাংলাদেশ গড়ে উঠেছে। সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়া বাংলাদেশীরা তাদের কর্মে কোলাহলে দেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন দেশের বাইরে। পূর্ব থেকে পশ্চিমের যেকোন দেশে বাংলাদেশিরা এখন চিহ্নিত এক জনগোস্টি। শুধু সৌদি আরবেই বাস করেন ২৮ লাখের বেশি বাংলাদেশি। আরও বাংলাদেশিদের সে দেশে প্রবেশের সুযোগ করে দিচ্ছে সৌদি আরব। কেননা, প্রবাসী বাংলাদেশিরা সেখানে পরিশ্রমী ও দক্ষ হিসেবে বিশেষ সুনাম অর্জন করেছেন।

গত সপ্তাহে সৌদি আরবের একটি গণমাধ্যম খবর প্রকাশ করে, বাংলাদেশের দক্ষ কর্মী এবং বিনিয়োগে আগ্রহী ব্যক্তিদের জন্য সে দেশের দরজা উন্মুক্ত; অর্থাৎ চাকরির জন্য শুধু শ্রমিক নন, বিনিয়োগকার‍ীরাও সুযোগ পাবেন সেখানে ব্যবসা করার। সৌদি আরবে অবকাঠামো, ভবন নির্মাণ, কৃষি, বস্ত্র, মাছ ধরা এবং খামারের মতো অসংখ্য খাতে বাংলাদেশি শ্রমিকেরা যেমন কাজ করতে পারবেন, তেমনি বিনিয়োগকারীরাও তাঁদের অর্থ লগ্নি করতে পারবেন।

সেখানকার ‘নিওম’ শহরের মতো বেশ কিছু মেগা প্রকল্পের জন্য বর্তমানে সৌদি আরবে বিপুল জনশক্তির প্রয়োজন। আর সে জন্যই দেশটির কর্তৃপক্ষ বিদেশি কর্মী, বিশেষ করে বাংলাদেশিদের আরও বেশি সুযোগ দিচ্ছে। এ ক্ষেত্রে অবশ্য পেশাদারেরা অগ্রাধিকার পাবেন।

বাংলাদেশ থেকে অনেক শ্রমিক যান প্রবাসে কাজ করতে, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে। এগুলোর মধ্যে আবার সৌদি আরবেই যান বেশিসংখ্যক মানুষ। অনেক পাড়া-মহল্লায় খোঁজ নিলে দেখা যাবে, প্রতিবেশীদের মধ্যে কেউ না কেউ সৌদি আরবে বাস করছেন কাজের উদ্দেশ্যে।

রাষ্ট্রদূত এসা আল-দুহাইলান অনুরোধ করেন, বাংলাদেশ থেকে যেন প্রশিক্ষণ দিয়ে সৌদি আরবে দক্ষ কর্মী পাঠানো হয়। এতে উপকার দুই দেশেরই। সেখানে বসবাসরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের কর্মদক্ষতার প্রশংসা করে ধন্যবাদ জানিয়েছেন তিনি এবং এ-ও স্বীকার করেছেন যে তাঁরা সৌদি আরবের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক বিদেশে গেলে দেশেরও লাভ বৈকি। অর্থনীতিতে শুধু বিদেশকে নয়, দেশকেও প্রবাসীরা সমৃদ্ধ করেন। তাঁদের পাঠানো অর্থ দিয়ে দেশে তাঁদের সংসার যেমন চলে, তেমনি দেশটা সচল রাখতেও সাহায্য করে। এখানে রেমিট্যান্সের বিষয়টা আর ব্যাখ্যা না করলেও চলে।

দুঃখজনক হলেও এটা সত্য যে অনেক ক্ষেত্রে এই প্রবাসীদের যথাযথ সম্মান দেওয়া হয় না। বিমানবন্দরে তাঁদের হয়রানি বা প্রতারণার শিকার হওয়ার ঘটনা প্রায়ই গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। বিমানবন্দরের কোনো কোনো অসাধু কর্মকর্তা প্রবাসীদের মালপত্র থেকে কোনো না কোনো জিনিস সরিয়ে নেন, অথবা বিমানবন্দর চত্বরে থাকা প্রতারক চক্র তাঁদের কোনো একটা ফাঁদে ফেলে হাতিয়ে নেয় মোটা অঙ্কের অর্থ। কিন্তু এ রকম আচরণ তাঁদের প্রাপ্য নয়।

শুধু ধন্যবাদ দিলেই চলবে না, তাঁদের নিরাপত্তাটাও নিশ্চিত করতে হবে—শুধু প্রবাসী কর্মীদের জন্য না, নির্বিশেষে সবার জন্য, সবখানে। এমন বাংলাদেশ চাওয়াটা নিশ্চয়ই অন্যায় কিছু নয়?

বাংলাদেশের বাইরে যেকন দেশে প্রবাসীদের কাছে প্রশ্ন করলেই তাদের সন্তোষের কথা জানা যায়। যাদের রেমিট্যান্স যোদ্ধা বলে গালভরা ভুলই দেই আমরা, রাষ্ট্র কি তাদের সমস্যা দেখভাল করছে। বিদেশ গমনের সময় পাসপোর্ট করা থেকে শুরু করে বিমানবন্দরে আশা যাওয়া নিয়ে প্রবাসীদের হেনস্তা ও হয়রানি বন্ধ করা যায়নি। বিদেশে কষ্টকর শ্রম দিয়ে প্রবাসীরা নির্ভিঘ্নে দেশে ফিরতে পারেন না। ইতালি সহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে  প্রথম আলো উত্তর আমেরিকার প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন আতংকের সব খবর। পুলিশ ভেরিফিকেশনের জন্য প্রবাসে থাকা লোকজনের আত্মীয় স্বজনের কাছ থেকে অর্থ আদায় করা হচ্ছে। দেশে অর্থ ছাড়া কোন পুলিশ ভেরিফিকেশন পাওয়া যায় না। এসব নিয়ে সরকারি লোকজনের সাথে কথা বলে কোন উত্তর পাওয়া যায় না। বিমানবন্দরের যাত্রী হয়রানীর ঘটনাকে তারা বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে উল্লেখ করেন।

গত সপ্তাহে এক সভায় প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী ইমরান আহমদ বলেছেন, বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও দেশ প্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে প্রবাসীদের সর্বোচ্চ সেবা নিশ্চিত করতে হবে। এই অর্থ বছরে বৈদেশিক কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পেয়েছে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, এর ফলে রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

গত সপ্তাহে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সভা কক্ষে সিনিয়র সচিব ড. আহমেদ মুনিরুছ সালেহীন-এর সভাপতিত্বে মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন দপ্তর এবং সংস্থাসমূহের সাথে বার্ষিক কর্মসম্পাদন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের মহাপরিচালক মো. হামিদুর রহমান, জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো’র মহাপরিচালকের পক্ষে অতিরিক্ত মহাপরিচালক আ.স.ম আশরাফুল ইসলাম এবং বাংলাদেশ ওভারসীজ এমপ্লয়মেন্ট এন্ড সার্ভিসেস লিঃ (বোয়েসেল) এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মল্লিক আনোয়ার হোসেন। সভায় বলা হয়েছে, স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে বৈদেশিক কর্মসংস্থানে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে কাজে গতিশীলতা আনতে হবে। প্রবাসীদের কল্যাণে সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে দপ্তরসমূহের সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীকে দেশের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করতে হবে।

প্রবাসীদের জন্য প্রবাস মন্ত্রণালয় আছে। বিমানবন্দরে হয়রানী হলে, থানা পুলিশে প্রবাসীদের জন্য সেবা না পাওয়া গেলে, ঘুষ দিয়ে পাসপোর্ট অফিসের দালালের পেছনে ঘুরঘুর করলে প্রবাসীদের দেখভালের কেউ আছে বলে মনে হয় না। এ নিয়ে কতৃপক্ষের সাথে কথা বললে, তারা অভিযোগ এড়িয়ে যেতে ভালোবাসেন। শুনতে হয়, এ আমার বিভাগের কাজ নয়, আমার মন্ত্রণালয়ের কাজ নয়।

প্রবাসীদের সব সেবা দেখভালের জন্য একক সেবাকেন্দ্র কি গঠন করা যায় না? স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর হয়ে গেছে। দেশে শাসন অপশাসন নিয়ে সাধারণ প্রবাসীদের উৎকণ্ঠা থাকে। প্রবাসীরা চান দেশে সুশাসন আসুক। প্রবাসীদের জন্য ন্যুনতম দুর্নীতিহীন সেবা নিশ্চিত করতে না পারাটা কোন অজুহাত হিসেবে দেখার আর সুযোগ নেই। এ নিয়ে শুধু কড়া অবস্থান নিলেই হবে না। দেশের স্বার্থে প্রবাসীদের সত্যিকারের মর্যাদা দেয়ার কোন বিকল্প হতে পারে না।  
 

উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন