https://www.prothomalony.com/
5516
north-america
প্রকাশ: ০৫ জুলাই ২০২৩ ০৫:৩০
সব খবরই ছাপানোর যোগ্যতা রাখে। কিন্তু খবরের কোনো অংশটুকু ছাপানো হবে তা সম্পাদক বিশেষে নির্ভর করে। মূল বিষয় হচ্ছে সংবাদটি সঠিক কিনা, সংবাদটি বস্তুনিষ্ঠ কি না। বস্তুনিষ্ঠতা কিংবা সত্যের ব্যাপারটাকে অনেকটাই অনুমান নির্ভর সাংবাদিকতা গ্রাস করে ফেলেছে। দায়িত্বশীল পত্রিকার সম্পাদকের মূল দায়িত্ব হচ্ছে সংবাদের সত্যতা সম্পর্কে যাচাই করা- সাংবাদিকতা প্রসঙ্গে এভাবে গুরুত্বপূর্ণ মতামত প্রকাশ করেন নিউইয়র্কের বিশিষ্ট সাংবাদিক ও সাপ্তাহিক পরিচয় এর সম্পাদক নাজমুল আহসান।
২৯ জুন বৃহস্পতিবার প্রথম আলো উত্তর আমেরিকার জনপ্রিয় সম্প্রচার “টক অফ দ্য উইক” অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন, নাজমুল আহসান। নিউইয়র্কে বাঙালি কমিউনিটিতে সবার পরিচিত মুখ নাজমুল আহসান কথা বলেছেন আমেরিকায় তাঁর দীর্ঘ যাত্রা ও নানা প্রাসঙ্গিক বিষয় নিয়ে।
শুরুতেই নাজমুল আহসান আমেরিকায় তার দীর্ঘ যাত্রা প্রসঙ্গে জানান। লুইজিয়ানার একটি ইউনিভার্সিটিতে বিদেশি ছাত্র হিসাবে ১৯৮১ সালের ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে তিনি নিউইয়র্কে প্রথম পা রাখেন। ১৯৮২ সালের প্রথম দিকে নিউইয়র্কের বারুক কলেজে ট্রান্সফার নিয়ে আসেন। সেখানে পড়ালেখা শেষ করে নিউইয়র্ক সিটি ডিপার্টমেন্টে বেশ কিছুদিন চাকরিও করেছেন। ১৯৯২ সালের দিকে নাজমুল আহসান “পরিচয়” পত্রিকার কাজ শুরু করেন। প্রথম দিকে 'পরিচয়' মাসিক ম্যাগাজিন আকারে বের হলেও এখন পর্যন্ত পত্রিকাটি সাপ্তাহিক আকারে প্রতি শনিবার প্রকাশিত হয়। নিউইয়র্কের অনেকগুলো পুরনো পত্রিকার মতো এই 'পরিচয়' পত্রিকা পাঠকের অফুরন্ত ভালোলাগা নিয়ে টিকে আছে। গত ৩১ বছর ধরে পত্রিকাটি তার প্রকাশ অব্যাহত রেখেছে। কোন কারনেই তার ধারাবাহিকতা নষ্ট হয়নি।
তবে করোনাকালীন সময়ে পত্রিকাটি প্রিন্টভার্সন থেকে ই-ভার্সনে চলে যায় বলে জানান, নাজমুল আহসান। তিনি বলেন, যে কোনো সংবাদপত্রের দুটো দিক আছে। সংবাদ সহ লেখালেখির দিক এবং বাণিজ্যিক দিক। পত্রিকা বেঁচে থাকার জন্যে অবশ্যই বাণিজ্যিক দিক দরকার আছে। কিন্তু পত্রিকার সংবাদের উপস্থাপনা, স্থানীয় সাংবাদিকদের সংবাদ প্রকাশের সুযোগ, লেখক-লেখিকাদের লেখা প্রকাশের সুযোগটাই মুখ্য হওয়া উচিত। তিনি বলেন, আমি নিজে কখনো 'পরিচয়' পত্রিকাকে বাণিজ্যিক ভাবে সফল পত্রিকা বানানোর চিন্তা করিনি। আমার পত্রিকায় মিথ্যা বা ভুল সংবাদ প্রকাশের জন্যে আমি কখনো দুঃখ প্রকাশ করিনি।
শুরুর দিকের সাংবাদিকতা সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে নাজমুল আহসান বলেন, আমি মূলত পঁচাত্তর সালের শেষের দিকে চট্রগ্রামে ক্রীড়া সাংবাদিকতা দিয়ে শুরু করি। ঢাকা থেকে পত্রিকা ছাপিয়ে চিটাগাং নিয়ে যেতাম। ক্রিকেট খেলার দারুণ ভক্ত ছিলাম তাই ক্রিকেটের উপরে লেখালেখি করতাম। ১৯৭৫ সালে ক্রিকেটের প্রথম ওয়ার্ল্ড কাপ সংঘটিত হয়েছিল, যা নিয়ে আমি দৈনিক বাংলায় কাভার স্টোরি লিখেছিলাম।
তিনি বলেন, সাংবাদিকতার কিছু নিয়ম নীতির মধ্য দিয়ে একজন সাংবাদিককে এগোতে হয়। বর্তমান সময়ের সাংবাদিকতায় সেগুলোর প্রয়োগ যথাযথ আছে কী-এমন প্রশ্নের উত্তরে নাজমুল আহসান বলেন, সাংবাদিকতার অনেক পরিবর্তন ও বিবর্তন হয়েছে। সাংবাদিকতার দুটো ধরন আছে, পেশাদার সাংবাদিকতা এবং শৌখিন সাংবাদিকতা। পেশাদার সাংবাদিকদের কারো না কারো কাছে জবাবদিহি করতে হয়। এখনকার সময়ে ফেসবুকীয় সাংবাদিকতা যা সোশ্যাল মিডিয়ায় লাইক-শেয়ার পাবার প্রতিযোগিতায় পরিপূর্ণ বলে তিনি উল্লেখ করেন। বানিয়ে সংবাদ প্রচার করা সাংবাদিকতার সবচাইতে ক্ষতিকর দিক বলে তিনি বলেন।
সম্পাদক ও লেখকের মধ্যে যোগাগোগ রক্ষা এবং সৌহার্দ বিনিময়ে সুসম্পর্ক বজায় রাখার ব্যাপারে নাজমুল আহসান কথা বলেছেন। তিনি বলেন, শুধু লেখকের সাথে না, সংবাদ প্রকাশনের সাথে জড়িতদের সবার সাথেই আত্মিক ও হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা প্রয়োজন। একজন লেখক তার নিজস্ব কোনো লেখা প্রকাশ হতে দেখলে ভীষণভাবে অনুপ্রাণিত বোধ করেন। এ অনুপ্রেরণার পিছনে একজন সম্পাদকের অত্যন্ত আন্তরিক উদ্যোগ থাকা উচিত। লেখকদের কোন নির্দিষ্ট পত্রিকায় আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখে তাদের মেধাকে খর্ব করা উচিত নয়। লেখকরা সব কাগজেই লিখুক, সব ধরনের পাঠকই তাকে চিনুক। একজন লেখকের প্রতি সর্বোত্তম চেষ্টা করা হচ্ছে তাকে পাঠকের কাছে পরিপূর্ণ ভাবে পৌঁছে দেয়া।
যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন নির্বাচন নিয়েও নাজমুল আহসান কথা বলেছেন। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের মতো বড় দেশ । পরিচালনা করা খুব কঠিন। নির্বাচনের অনেক সময় বাকি। প্রেসিডেন্ট হিসাবে বাইডেন পুরোপুরি সফল না, ব্যাপারটি জনগনের কাছে স্পষ্ট। মধ্যবিত্ত ও নিন্মবিত্ত মানুষের কথা বাইডেন ভাবেন। তবে ইমিগ্রেশনের প্রতি তার কিছু কিছু পদক্ষেপ ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। অভিবাসনের ক্ষেত্রে ট্রাম্পের নীতিমালার মতোই বাইডেন তার নীতিমালা অনুসরণ করছেন। দ্বিধা বিভক্তির দিকে অগ্রসর হওয়া আমরা কোন আমেরিকা দেখতে চাই, সেটাই মুখ্য বিষয়।
তিনি আরো যুক্ত করেন, নির্বাচনের আগে ভোটারদের অর্থনৈতিক অবস্থা খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি ব্যাপার। প্যান্ডেমিকের পর দ্রব্যমুল্য বৃদ্ধি পেলেও প্রায় সবকিছুর দাম আবার পূর্বের অবস্থায় ফিরে এসেছে। তাছাড়া ভোটারদের একটি বড় অংশ হচ্ছে বৃদ্ধরা। তাদের মেডিকেয়ারের সুযোগ সুবিধা কেমন আছে, সেটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হবে।
দর্শকদের প্রশ্ন ছিল, সংবাদ পরিবেশনে যে অনুমান ভিত্তিক সংবাদের কথা বলেছেন তা কি এদেশের মূলধারাতেও হয়? জবাবে নাজমুল আহসান বলেন, প্রত্যেক পত্রিকার নির্দিষ্ট কিছু অনুসারী আছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিটি বড় পত্রিকার দ্বিতীয় পৃষ্ঠায় সংশোধনী নামে একটা সেকশন আছে। প্রতিদিনই সেখানে আগের দিনের সংবাদের কিছু তথ্যগত ভুল-ত্রুটি গুলো প্রকাশ পায়। এখনও অল্প কিছু পত্রিকায় এই সংশোধনী অব্যাহত আছে।
'পরিচয়' পত্রিকাটি তার দীর্ঘযাত্রার ত্রিশ বছর পার করেছে। একটা ছোট অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সবার সাথে মত বিনিময়ের মাধ্যমে কিছু সময় কাটানোর ইচ্ছা পোষণ করেন তিনি।
এভাবেই সেদিনের “টক অফ দ্য উইক” অনুষ্ঠানটি শেষ হয়। অনুষ্ঠানটি পরিচালনার ছিলেন সোহানা নাজনীন, কারিগরি সহযোগিতায় ছিলেন এইচ বি রিতা। প্রতি বৃহস্পতিবার নিউইয়র্ক সময় রাত নয়টায় অনুষ্ঠানটি লাইভ করা হয়।
উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন