https://www.prothomalony.com/

18567

north-america

উত্তর আমেরিকা

নীল ঢেউয়ের পর: ওয়াশিংটনে ক্ষমতার ভারসাম্য ফিরল

প্রকাশ: ০৫ নভেম্বর ২০২৬ ০৬:৫৩

যে টেক্সাসে বত্রিশ বছর কোনো ডেমোক্র্যাট রাজ্যব্যাপী নির্বাচনে জয়ের মুখ দেখেননি, সেই টেক্সাসেই মঙ্গলবার রাতে জেমস তালারিকো সিনেটের আসন আর জিনা হিনোজোসা গভর্নরের দপ্তর ছিনিয়ে নিয়েছেন। কানসাস, যাকে প্রায় এক শতাব্দী ধরে রিপাবলিকানদের অলঙ্ঘ্য দুর্গ ভাবা হতো, সেখানেও ফাটল ধরেছে। আর মেইনে প্রায় তিন দশকের সিনেটর, বহু ঝড় পেরিয়ে আসা সুসান কলিন্স হার মেনেছেন ডেমোক্র্যাট ট্রয় জ্যাকসনের কাছে। এই তিনটি বাক্যই বলে দেয়, ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচন পেন্ডুলামের চেনা দুলুনি ছিল না। এ ছিল এমন এক ভূমিকম্প, যার কম্পন পৌঁছেছে সেই মানচিত্রের কোণেও, যেখানে ডেমোক্র্যাটরা সাধারণত প্রচারে যাওয়ার সময়টুকুও বাঁচিয়ে রাখেন।

সংখ্যার ভাষায় ছবিটা এমন। সিএনবিসির প্রক্ষেপণ অনুযায়ী প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটরা অন্তত ২৫০টি আসন পাচ্ছে, সিবিএসের হিসাবে ২৫১ থেকে ২৬৮; নির্বাচনের আগে ছিল ২১৮–২১৪, রিপাবলিকানদের সামান্য এগিয়ে। সিনেটে ৫৩–৪৭-এর রিপাবলিকান আধিপত্য উল্টে দিয়ে ডেমোক্র্যাটরা সাতটি আসন ছিনিয়ে নিয়েছে: আইওয়া, কানসাস, ওহাইও, মেইন, নর্থ ক্যারোলাইনা, সাউথ ক্যারোলাইনা ও টেক্সাস। নর্থ ক্যারোলাইনায় রয়ে কুপার জিতেছেন ঊনষাট শতাংশের কাছাকাছি ভোটে। এনবিসির গণনায় সিনেটের চিত্র দাঁড়িয়েছে ৫৪–৪৪, যদিও আলাস্কা, কলোরাডো ও মিসিসিপির মতো কিছু ফল লেখার সময় পর্যন্ত গণনাধীন, তাই চূড়ান্ত সংখ্যায় অদলবদল হতে পারে।

কেন এমন হলো? অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের বিশ্লেষণে তিনটি সুতো একসঙ্গে পাকিয়ে উঠেছে: আকাশছোঁয়া দ্রব্যমূল্য ও জ্বালানির দাম, ইরান যুদ্ধ, আর সরকারি দুর্নীতি নিয়ে ভোটারের অস্বস্তি। বুথফেরত জরিপে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অনুমোদন-হার ছিল মাত্র ৩৮ শতাংশ, যা মধ্যবর্তী নির্বাচনের ইতিহাসে কোনো প্রেসিডেন্টের জন্য সর্বনিম্ন হওয়ার পথে। অথচ প্রায় প্রতিটি দিন র‍্যালি করে ট্রাম্প শেষ মাসটি কাটিয়েছেন সমর্থকদের উজ্জীবিত রাখতে; ঢেউ ঠেকানো গেল না। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স পরাজয়ের দায় চাপিয়েছেন ইরান যুদ্ধের ঘাড়ে, যা এক অর্থে স্বীকারোক্তিও: যুদ্ধের হিসাব শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটনে নয়, মুদি দোকানের দামের তালিকায় মেটে।

তবে এই রায়কে ডেমোক্র্যাটদের আদর্শিক অভিষেক ভেবে নিলে ভুল হবে। ইতিহাসের নিয়মই হলো, ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের দল মধ্যবর্তীতে হারে, গড়ে কয়েক ডজন আসন। রিপাবলিকানরা যুক্তি দিতে পারেন, এ ক্ষোভ যুদ্ধকালীন অস্থিরতা ও মূল্যস্ফীতির, যা সময়ের সঙ্গে কমলে ২০২৮-এ হাওয়া ঘুরতেও পারে। এই বিশ্লেষণে সত্যের অংশ আছে: ভোটারের প্রচারণার কেন্দ্রে ছিল ‘সাশ্রয়ী জীবন’, কোনো বিস্তৃত আদর্শিক কর্মসূচি নয়। কিন্তু সত্যের অন্য অংশটিও অস্বীকার করা কঠিন: যে রাজ্যগুলো দুই বছর আগে ট্রাম্পকে দুই অঙ্কের ব্যবধানে জিতিয়েছিল, সেখানেও মানুষ এবার বিপরীত বোতাম টিপেছে। এ কেবল স্বাভাবিক মধ্যবর্তী ক্ষয় নয়।

এখন প্রশ্ন, জয়ের পরের দিনগুলো কেমন হবে। ডেমোক্র্যাটদের হাতে আসছে তদন্তের ক্ষমতা ও সমন জারির অধিকার, আর সিনেটের নিয়ন্ত্রণ মানে ট্রাম্পের মনোনীত বিচারক বা কর্মকর্তাদের নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে যাওয়া; সুপ্রিম কোর্টে শূন্যপদ তৈরি হলে সেই লড়াই হবে মহাকাব্যিক। হাকিম জেফ্রিজ স্পিকার পদের জন্য দাবি জানিয়েছেন, মাইক জনসন সংখ্যালঘু নেতার পদে দাঁড়াবেন না বলে জানিয়েছেন, আর চাক শুমার সম্ভবত সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতার চেনা চেয়ারে ফিরছেন। আশ্বাসের কথা, ট্রাম্প সিএনবিসিকে বলেছেন, তিনি ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে ‘অনেক বিষয়েই’ কাজ করতে পারেন এবং ফলাফল মেনে নিচ্ছেন। গণতন্ত্রের এই সাধারণ সৌজন্যটুকু আজকের পৃথিবীতে আর সাধারণ থাকে না; তাই স্বস্তি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সতর্ক থাকাও জরুরি। ভেটোর ক্ষমতা প্রেসিডেন্টের হাতেই থাকছে, ফলে আইন পাসের চেয়ে তদারকির জোরই হবে নতুন কংগ্রেসের প্রধান অস্ত্র, আর অচলাবস্থার ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে।

আমাদের নিজেদের জন্য, অর্থাৎ নিউইয়র্ক-নিউ জার্সির বাংলাদেশি-আমেরিকান সমাজের জন্য, এ রায়ের অর্থ কী? অভিবাসন প্রয়োগ, টিপিএস বাতিল, আদালত-চত্বরে গ্রেপ্তারের যে আতঙ্ক আমাদের জনপদে দীর্ঘদিন বাস করছে, কংগ্রেসে এবার সেগুলোর জবাবদিহি চাওয়ার মতো মানুষ থাকবে। আমাদের নিউজার্সিতেই রিপাবলিকান টম কিন হেরেছেন, যা বলে দেয় এই ঢেউ কেবল বিদূরের টেক্সাসে নয়, আমাদের দরজার সামনেও এসে ঠেকেছিল। তবে নীতি বদলাতে সময় লাগে, প্রশাসনের ক্ষমতা অটুট থাকে, আর প্রতিশ্রুতি ও প্রণয়নের মাঝখানে বিস্তর দূরত্ব। প্রত্যাশা ও বাস্তবতার সেই ব্যবধান ভুলে গেলেই আজকের আনন্দ কাল হতাশায় পাল্টে যেতে পারে।

শেষ পর্যন্ত একটি প্রশ্ন ঘুরেফিরে আসে, যার উত্তর কোনো এক্সিট পোলেই লেখা নেই। ভোটার কি আসলে কাউকে জেতান, নাকি শুধু কাউকে শাস্তি দেন? দুই বছর আগে যে মানুষ একদলকে ক্ষমতা দিয়েছিল, আজ সেই মানুষই তা কেড়ে নিয়েছে; মাঝখানে বদলেছে দলের চরিত্র নয়, মানুষের পকেট আর ধৈর্য। যদি এই সত্যিই হয়, তবে নতুন কংগ্রেসের সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা কেবল ট্রাম্পকে সামলানো নয়; পরীক্ষা হলো, প্রতিশোধের এই সংক্ষিপ্ত ম্যান্ডেটকে স্থায়ী আস্থায় রূপ দেওয়া যায় কি না। নাকি ২০২৮-এ সেই একই ভোটার একই বোতাম আবার উল্টো দিকে টিপবে।

উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন