https://www.prothomalony.com/

18510

bangladesh

বাংলাদেশ

সাপ লোকালয়ে, বন দখলে কারা? লাউয়াছড়া রক্ষায় জবাবদিহি কোথায়?

প্রকাশ: ২৮ অক্টোবর ২০২৬ ০৭:৪৫

 
মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জের পরিচয় শুধু চা-বাগানের সবুজে নয়। পাহাড়-টিলা, বনভূমি আর নানা প্রজাতির বন্যপ্রাণী মিলিয়ে এ অঞ্চল দেশের অন্যতম সমৃদ্ধ প্রাকৃতিক ভূখণ্ড। এই প্রকৃতিকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে পর্যটনশিল্প, তৈরি হয়েছে স্থানীয় মানুষের জীবিকা ও সম্ভাবনা। কিন্তু সেই প্রকৃতির নিরাপত্তা নিয়েই এখন উদ্বেগ বাড়ছে।
 
বনভূমি দখল, মূল্যবান গাছ কাটা, অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণ—এসব অভিযোগ নতুন নয়। এর সঙ্গে যখন লোকালয়ে সাপসহ নানা বন্যপ্রাণীর উপস্থিতির খবর সামনে আসে, তখন প্রশ্ন জাগে, প্রকৃতির স্বাভাবিক ভারসাম্য কি কোনোভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে?
 
সম্প্রতি শ্রীমঙ্গলে মাত্র চার দিনে একটি বিষধর শঙ্খিনী ও তিনটি অজগর উদ্ধার করা হয়েছে। কোনোটি বসতবাড়ির পাশে, কোনোটি সড়কের ধারে, আবার কোনোটি জালে আটকে ছিল। বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের সদস্যরা সাপগুলো উদ্ধার করে বন বিভাগের কাছে হস্তান্তর করেন। উদ্ধার হওয়া একটি অজগরকে লাউয়াছড়া বনে অবমুক্ত করা হয়।
 
চার দিনে চারটি সাপ উদ্ধার হওয়ার ঘটনা একাই বন ধ্বংসের প্রমাণ নয়। তবে এ ধরনের ঘটনা বারবার ঘটলে তা গুরুত্ব দিয়ে দেখা জরুরি। প্রাণীরা কেন লোকালয়ে আসছে, তাদের স্বাভাবিক বিচরণক্ষেত্র কতটা নিরাপদ, মানুষের বসতি ও অবকাঠামো সম্প্রসারণে তাদের চলাচলের পথ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা দরকার।
 
আর সেই অনুসন্ধানে কমলগঞ্জের ভানুগাছের পাহাড় ও লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
 
লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান কেবল একটি বন নয়; এটি দেশের গুরুত্বপূর্ণ জীববৈচিত্র্যের আশ্রয়স্থল। ১৯৯৬ সালে জাতীয় উদ্যান হিসেবে ঘোষিত এ বনাঞ্চলে রয়েছে নানা প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণী। স্থানীয় পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার পাশাপাশি জাতীয় পর্যায়েও এর গুরুত্ব অনেক।
 
কিন্তু স্বাধীনতার পর গত পাঁচ দশকে ভানুগাছের পাহাড় ও আশপাশের বনাঞ্চল ঘিরে মূল্যবান বৃক্ষ নিধন, বনজ সম্পদ লুট এবং বনভূমি দখলের অভিযোগ বারবার আলোচনায় এসেছে। বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত সংবাদেও বনভূমি দখল, গাছ কাটা ও বনের জমিতে স্থাপনা গড়ে তোলার অভিযোগ উঠে এসেছে।
 
স্থানীয়দের অভিযোগ, একসময় সংঘবদ্ধ প্রভাবশালী গোষ্ঠী আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে বনে প্রবেশ করে সেগুনসহ মূল্যবান গাছ কেটে নিয়ে গেছে। বনভূমির জায়গা দখল করে কোথাও বসতি, কোথাও রিসোর্ট, আবার কোথাও বিভিন্ন বাণিজ্যিক স্থাপনা গড়ে তোলার অভিযোগও রয়েছে।
 
এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ জরুরি। কারণ, অভিযোগগুলো সত্য হলে বিষয়টি শুধু পরিবেশ ধ্বংসের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে সরকারি সম্পদ রক্ষা, বন আইন প্রয়োগ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব পালনের প্রশ্নও।
 
এখানেই মূল প্রশ্ন: এত বছর ধরে যদি বন দখল ও মূল্যবান বৃক্ষ নিধনের অভিযোগ উঠে থাকে, তাহলে সেগুলোর তদন্ত কত দূর এগিয়েছে? কতটুকু বনভূমি দখলের অভিযোগ পাওয়া গেছে? কতটি স্থাপনার বৈধতা যাচাই করা হয়েছে? কতটি মামলা হয়েছে, কতটির নিষ্পত্তি হয়েছে, আর কতটুকু জমি উদ্ধার করা গেছে?
 
এসব প্রশ্নের উত্তর অনুমান দিয়ে নয়, নথি ও তথ্য দিয়ে দিতে হবে। বন বিভাগের কাছে এ-সংক্রান্ত হালনাগাদ তথ্য থাকা এবং তা জনসমক্ষে প্রকাশ করা জরুরি।
 
বন রক্ষার কাজ শুধু গাছ লাগানো কিংবা মাঝেমধ্যে অভিযান চালানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। সরকারি সম্পদ দখল বা বনজ সম্পদ লুটের অভিযোগ উঠলে তার সত্যতা যাচাই, অপরাধ প্রতিরোধ এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়াও রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
 
লাউয়াছড়ার বনাঞ্চল ঘিরে স্থানীয়ভাবে আলোচিত অভিযোগগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক প্রভাবের বিষয়টিও রয়েছে। অভিযোগ আছে, বনভূমি দখল ও বনজ সম্পদ আহরণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে আলোচিত কিছু ব্যক্তি বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক মহলের সঙ্গে সম্পর্ক কাজে লাগিয়ে নিজেদের প্রভাব ধরে রেখেছেন। রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলালেও তাঁদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি—এমন অভিযোগও স্থানীয়ভাবে শোনা যায়।
 
এ ছাড়া বনভূমি দখল ও বনজ সম্পদ পাচারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে আলোচিত কয়েকজনের রাজনৈতিক উত্থান, অর্থবল ও পেশিশক্তির ব্যবহার এবং জনপ্রতিনিধি হওয়ার প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। ভোট কেনা কিংবা রাজনৈতিক মনোনয়ন পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রভাব খাটানোর অভিযোগও এসব আলোচনায় উঠে আসে।
 
এ ধরনের অভিযোগ গুরুতর। কিন্তু অভিযোগ উঠলেই কাউকে অপরাধী ঘোষণা করা যায় না। আবার প্রভাবশালী ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ বলে সেটি এড়িয়ে যাওয়াও গ্রহণযোগ্য নয়। প্রয়োজন স্বাধীন তদন্ত, ভূমির রেকর্ড যাচাই, মামলার নথি পর্যালোচনা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও কর্তৃপক্ষের বক্তব্য গ্রহণ।
 
রাজনৈতিক পরিচয় বা অর্থনৈতিক সামর্থ্য কারও জন্য আইনের বাইরে থাকার সুযোগ তৈরি করতে পারে না। সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ হবে, অথচ প্রভাবশালীদের ক্ষেত্রে তা থেমে যাবে—এমন বৈষম্য আইনের শাসনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
 
সরকার কিংবা প্রশাসনের সদিচ্ছার আসল পরীক্ষা এখানেই। অভিযুক্ত ব্যক্তি যে রাজনৈতিক দলেরই হোন না কেন, তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত ও আইনানুগ ব্যবস্থা একই মানদণ্ডে পরিচালিত হচ্ছে কি না, সেটিই দেখার বিষয়।
 
বন ধ্বংসের ক্ষতি কেবল কতটি গাছ কাটা হলো, সেই হিসাব দিয়ে বোঝা যায় না। একটি বন অসংখ্য প্রাণীর আশ্রয়, খাদ্য সংগ্রহের জায়গা ও প্রজননক্ষেত্র। অনেক প্রাণীর জন্য বনাঞ্চলের এক অংশ থেকে অন্য অংশে যাওয়ার প্রাকৃতিক পথও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব জায়গা নষ্ট হলে তার প্রভাব পড়ে পুরো বাস্তুতন্ত্রে।
 
সাপের কথাই ধরা যাক। শঙ্খিনী বিষধর হলেও প্রকৃতির খাদ্যশৃঙ্খলে তার ভূমিকা রয়েছে। অজগরও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখে। সাপসহ বিভিন্ন শিকারি প্রাণী ইঁদুর ও অন্যান্য প্রাণীর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে। অথচ মানুষের চোখে সাপ প্রায়ই আতঙ্কের কারণ। লোকালয়ে দেখা গেলেই অনেক সময় তাকে মেরে ফেলা হয়।
 
কিন্তু সাপ কেন লোকালয়ে আসছে, সেই প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। বন উজাড়, ঝোপঝাড় পরিষ্কার, পাহাড়-টিলা কাটা, সড়ক নির্মাণ কিংবা অপরিকল্পিত স্থাপনার কারণে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। খাদ্য ও আশ্রয়ের খোঁজে তারা মানুষের বসতির কাছাকাছিও চলে আসতে পারে।
 
তবে শ্রীমঙ্গলে সাম্প্রতিক সময়ে উদ্ধার হওয়া প্রতিটি সাপের লোকালয়ে আসার কারণ যে আবাসস্থল সংকোচন, তা নিশ্চিতভাবে বলা যাবে না। এ জন্য প্রয়োজন মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধান ও বৈজ্ঞানিক তথ্য। কোথায় বেশি বন্যপ্রাণী উদ্ধার হচ্ছে, কোন এলাকায় বনভূমির পরিবর্তন ঘটছে, কোথায় প্রাণীদের চলাচলের পথ বিচ্ছিন্ন হচ্ছে—এসব তথ্য মিলিয়ে দেখতে হবে।
 
অর্থাৎ, সাপ উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে ছেড়ে দেওয়ার পাশাপাশি যে পরিবেশে তারা বাস করে, সেটি কতটা নিরাপদ আছে, তা নিয়েও ভাবতে হবে।
 
শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জের পর্যটনের সবচেয়ে বড় সম্পদ প্রকৃতি। চা-বাগান, পাহাড়, বনভূমি আর বন্যপ্রাণীর উপস্থিতিই এ অঞ্চলকে অন্য জায়গা থেকে আলাদা করেছে। অথচ পর্যটনের নামে যদি বনাঞ্চলের আশপাশে অপরিকল্পিত স্থাপনা গড়ে ওঠে, বনভূমি দখলের অভিযোগ উপেক্ষিত থাকে কিংবা বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে সেই উন্নয়ন শেষ পর্যন্ত পর্যটনের ভিত্তিকেই দুর্বল করবে।
 
রিসোর্ট বা পর্যটনকেন্দ্র নির্মাণ মানেই অপরাধ নয়। কিন্তু কোনো স্থাপনা সংরক্ষিত বনভূমি দখল করে গড়ে উঠেছে কি না, প্রয়োজনীয় অনুমোদন রয়েছে কি না, কিংবা পরিবেশগত বিধিনিষেধ লঙ্ঘন করছে কি না—এসব যাচাই করা অপরিহার্য।
 
লাউয়াছড়ার মতো সংবেদনশীল বনাঞ্চলের ক্ষেত্রে সীমানা নির্ধারণ, ভূমির নথি হালনাগাদ এবং বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে সরকারি রেকর্ড মিলিয়ে দেখা দরকার। বনভূমির আশপাশে গড়ে ওঠা স্থাপনাগুলোর বৈধতা ও পরিবেশগত প্রভাবও খতিয়ে দেখতে হবে। কোনো স্থাপনা অবৈধ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।
 
প্রশ্নটি উন্নয়ন হবে কি না, তা নয়। প্রশ্ন হলো, সেই উন্নয়নের সুবিধা কারা পাচ্ছে আর ক্ষতির বোঝা বইছে কারা?
 
কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যদি বনভূমি দখল করে আর্থিক সুবিধা পায়, অথচ ক্ষতিগ্রস্ত হয় জীববৈচিত্র্য, স্থানীয় পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম, তাহলে তাকে জনস্বার্থের উন্নয়ন বলা যায় না।
 
লোকালয়ে বন্যপ্রাণী দেখা গেলে উদ্ধারকাজে বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের মতো সংগঠন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। খবর পেয়ে তাদের সদস্যরা ছুটে যাচ্ছেন, প্রাণী উদ্ধার করছেন এবং বন বিভাগের কাছে হস্তান্তর করছেন। এই উদ্যোগ প্রশংসার দাবিদার।
 
কিন্তু স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের পক্ষে বন দখল বন্ধ করা, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা কিংবা বন আইন কার্যকর করা সম্ভব নয়। এসব দায়িত্ব মূলত বন বিভাগ, স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানের।
 
গত সেপ্টেম্বর মাসে শ্রীমঙ্গল ও আশপাশের এলাকা থেকে ২৭টি বন্যপ্রাণী উদ্ধারের তথ্য জানিয়েছিল বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন। এর আগে আগস্ট মাসেও শঙ্খিনী ও অজগরসহ অন্তত ১৭টি সাপ উদ্ধারের কথা জানিয়েছিল সংগঠনটি। এসব তথ্য উদ্ধারকাজের পরিধি সম্পর্কে ধারণা দেয়। তবে শুধু উদ্ধারসংখ্যা দিয়ে কোনো এলাকার বন্যপ্রাণীর মোট সংখ্যা কিংবা আবাসস্থল সংকোচনের মাত্রা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।
 
তবু এসব তথ্য সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণের যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে। কোন প্রজাতির প্রাণী কোথায়, কখন এবং কী পরিস্থিতিতে উদ্ধার হচ্ছে, তা নিয়মিত নথিভুক্ত করা হলে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করা সহজ হবে। বন বিভাগ, গবেষক ও পরিবেশবিদেরা একসঙ্গে কাজ করলে এসব তথ্য সংরক্ষণ পরিকল্পনায় কাজে লাগাতে পারবেন।
 
একই সঙ্গে বনভূমির সীমানা রক্ষা, অবৈধ দখল শনাক্ত করা, বনজ সম্পদ পাচার প্রতিরোধ এবং অভিযোগের তদন্তে দৃশ্যমান অগ্রগতি থাকতে হবে। শুধু প্রাণী উদ্ধার করে সাময়িক স্বস্তি দিলেই দীর্ঘমেয়াদি সংকটের সমাধান হবে না।
 
লাউয়াছড়া রক্ষার জন্য নতুন করে বড় বড় প্রতিশ্রুতির চেয়ে প্রয়োজন কিছু স্পষ্ট ও বাস্তব পদক্ষেপ।
 
প্রথমত, বনভূমির সীমানা ও মালিকানা-সংক্রান্ত সরকারি নথি হালনাগাদ করে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে হবে। কোথায় দখলের অভিযোগ রয়েছে, কতটুকু জমি নিয়ে বিরোধ, কোন স্থাপনা কী অনুমোদনে গড়ে উঠেছে—এসব তথ্য যাচাই করে প্রকাশ করা জরুরি।
 
দ্বিতীয়ত, মূল্যবান বৃক্ষ নিধন ও বনভূমি দখলের অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে। প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। অভিযোগের সঙ্গে প্রভাবশালী ব্যক্তি জড়িত থাকলেও তদন্ত যেন বাধাগ্রস্ত না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
 
তৃতীয়ত, বনাঞ্চলের ভেতরে ও আশপাশে গড়ে ওঠা স্থাপনাগুলোর বৈধতা এবং পরিবেশগত প্রভাব যাচাই করতে হবে। অবৈধ স্থাপনার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি বৈধ স্থাপনাগুলোও পরিবেশগত শর্ত মেনে চলছে কি না, তা নজরদারিতে রাখতে হবে।
 
চতুর্থত, বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ও চলাচলের পথ নিয়ে বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন প্রয়োজন। কোথায় প্রাণীদের আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, কোথায় মানুষের সঙ্গে সংঘাতের ঝুঁকি বাড়ছে, তা চিহ্নিত করে সংরক্ষণের অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে হবে।
 
পঞ্চমত, স্থানীয় মানুষকে বন সংরক্ষণের অংশীদার করতে হবে। বন ও বন্যপ্রাণী রক্ষায় সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের অভিযোগ জানানোর সুযোগ এবং কার্যকর প্রতিক্রিয়ার ব্যবস্থা থাকা জরুরি।
 
সবচেয়ে বড় কথা, এসব উদ্যোগের অগ্রগতি জনসমক্ষে তুলে ধরতে হবে। কতটুকু বনভূমি উদ্ধার হলো, কতটি অভিযোগ তদন্ত করা হলো, কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল রক্ষায় কী অগ্রগতি হয়েছে—এসব তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা দরকার।
 
কারণ, স্বচ্ছতা ছাড়া জবাবদিহি আসে না। আর জবাবদিহি ছাড়া বন রক্ষার প্রতিশ্রুতি শেষ পর্যন্ত কাগজেই থেকে যায়।
 
শ্রীমঙ্গলে চার দিনে চারটি সাপ উদ্ধারের ঘটনা একাই পরিবেশগত বিপর্যয়ের প্রমাণ নয়। কিন্তু লাউয়াছড়া ও ভানুগাছের পাহাড় ঘিরে দীর্ঘদিনের বনভূমি দখল, বৃক্ষ নিধন ও রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগের পাশাপাশি এ ধরনের ঘটনা গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। প্রকৃতির ওপর মানুষের চাপ কতটা বাড়ছে, আর সেই চাপ সামাল দিতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখছে—তার উত্তর খুঁজতে হবে তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে।
 
বন রক্ষার অর্থ শুধু গাছ লাগানো নয়। যে কারণে বন ধ্বংস হয়, যে কারণে সরকারি সম্পদ দখলের অভিযোগ ওঠে, যে কারণে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ঝুঁকির মুখে পড়ে—সেসব সমস্যারও সমাধান করতে হবে। আইন প্রয়োগে রাজনৈতিক পরিচয়, অর্থবল কিংবা সামাজিক প্রভাব যেন বাধা হয়ে না দাঁড়ায়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
 
লাউয়াছড়া শুধু কমলগঞ্জের নয়, শুধু শ্রীমঙ্গলের পর্যটন আকর্ষণও নয়। এটি বাংলাদেশের প্রাকৃতিক ঐতিহ্যের অংশ, অসংখ্য প্রাণের আশ্রয় এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করে যাওয়ার মতো এক অমূল্য সম্পদ।
 
আজ একটি অজগর উদ্ধার করে বনে অবমুক্ত করা যায়, একটি শঙ্খিনীকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়াও সম্ভব। কিন্তু তাদের আবাসস্থল যদি নিরাপদ না থাকে, তাহলে আগামীকাল আবারও বন্যপ্রাণী লোকালয়ে চলে আসতে পারে। তাতে প্রাণীদের যেমন ঝুঁকি বাড়বে, তেমনি মানুষের সঙ্গেও সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হবে।
 
তাই প্রশ্ন শুধু কতটি সাপ উদ্ধার হলো, তা নয়। প্রশ্ন হলো, যে বন তাদের আশ্রয় দেওয়ার কথা, সেই বনকে নিরাপদ রাখতে আমরা কী করছি? বনভূমি দখল ও বৃক্ষ নিধনের যেসব অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে উঠে আসছে, সেগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত এবং আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করা যাচ্ছে কি না?
 
লাউয়াছড়া রক্ষার লড়াই তাই শুধু পরিবেশ সংরক্ষণের লড়াই নয়। এটি সরকারি সম্পদ রক্ষা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য পরিবেশ রেখে যাওয়ার লড়াই।
 
বন বাঁচাতে হবে শুধু স্লোগানে নয়—দখলমুক্ত বনভূমি, সুরক্ষিত বৃক্ষ, নিরাপদ বন্যপ্রাণী এবং সবার জন্য সমানভাবে কার্যকর আইনের মধ্য দিয়ে।
 
   
Sangram Datta 
Bangladesh 

বাংলাদেশ থেকে আরো পড়ুন