https://www.prothomalony.com/
18382
opinion
খতীব, নূরে মদীনা জামে মসজিদ, সীতাকুণ্ড, চট্টগ্রাম।
প্রকাশ: ১১ অক্টোবর ২০২৬ ২৩:৪৫
বৃক্ষ ও প্রাণীকুল একে অপরের জীবনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। প্রাণীদের বেঁচে থাকার প্রধান উপকরণ অক্সিজেন বৃক্ষ থেকেই উৎপন্ন হয়, আর প্রাণীজগতের বর্জিত কার্বন ডাই অক্সাইড গ্রহণ করে বৃক্ষ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে। তাই ইসলাম বৃক্ষরোপণের গুরুত্ব ও তার অন্তর্নিহিত তাৎপর্য বিশদভাবে বর্ণনা করেছে। এই নিবন্ধে সে বিষয়ে আলোকপাত করা হলো।
গাছ মানুষের রিযিকের উৎসমূল। আল্লাহ বলেন, আমরা আকাশ থেকে পরিমাণমতো বৃষ্টি বর্ষণ করি এবং তা দিয়ে তোমাদের জন্য খেজুর ও আঙুরের বাগান সৃষ্টি করি, যাতে রয়েছে প্রচুর ফল-ফলাদি, আর আমরা সিনাই পর্বতে যয়তুন বৃক্ষও সৃষ্টি করেছি যা থেকে তেল উৎপন্ন হয় (সূরা মুমিনুন: ১৮-২০)। গবাদিপশুর জীবিকাও বৃক্ষ-লতা থেকে উৎপন্ন হয়— আল্লাহ বলেন, আমরা ঊষর ভূমিতে পানি প্রবাহিত করে শস্য উৎপাদন করি, যা থেকে ভক্ষণ করে গবাদিপশু ও মানুষ নিজেরাও (সূরা সাজদা: ২৭)। বৃষ্টির মাধ্যমে আল্লাহ শস্য ও ঘনপল্লবিত উদ্যান সৃষ্টি করেন (সূরা নাবা: ১৪-১৬), আর ফসল ও ফলমূল যে সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর অনুগ্রহ তা তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন— তোমরা কি উৎপন্ন করো, না আমরাই উৎপন্নকারী (সূরা ওয়াকিয়া: ৬৩-৬৭)। সূরা কাফে আল্লাহ পাহাড়-পর্বতের পাশাপাশি নয়নাভিরাম উদ্ভিদরাজিকে বান্দাদের জন্য উপদেশ ও জীবিকা হিসেবে উল্লেখ করেছেন (সূরা কাফ: ৭-১১)।
বৃক্ষরাজি আল্লাহর শৈল্পিক নৈপুণ্যের প্রকাশক। একই মাটি ও পানিতে বিভিন্ন ফল-ফুলের উদ্ভিদ জন্মানো আল্লাহর বিশাল অনুগ্রহের প্রমাণ— আল্লাহ বলেন, মানুষ তার খাদ্যের দিকে লক্ষ্য করুক, কীভাবে আমরা ভূমি বিদীর্ণ করে শস্য, আঙুর, যয়তুন ও খেজুর উৎপন্ন করি (সূরা আবাসা: ২৪-৩২)। বৃক্ষরাজি আল্লাহর গুণগানও করে— আল্লাহ বলেন, আকাশ-পৃথিবীতে যা কিছু আছে, সূর্য, চন্দ্র, নক্ষত্র, পর্বত, বৃক্ষলতা সবই আল্লাহকে সিজদা করে (সূরা হজ্জ: ১৮), আর লতাগুল্ম ও বৃক্ষরাজি সিজদাবনত (সূরা আর-রহমান: ৬)। জান্নাতের আপ্যায়নও হবে ফলমূল দিয়ে— কাঁটাবিহীন কুল গাছ ও কাঁদি ভরা কলা গাছের বাগানে প্রচুর ফলমূল থাকবে, যা শেষ হবে না (সূরা ওয়াকিয়া: ২৭-৩৩)।
বৃক্ষরোপণের শরয়ি গুরুত্বও অপরিসীম। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার সময়ও যদি তোমাদের হাতে একটি চারা থাকে, তবে সামর্থ্য থাকলে তা রোপণ করে দাও (মুসনাদে আহমাদ: ১৩০০৪)। বৃক্ষরোপণ সদকার অনন্য মাধ্যম— আবুদ্দারদা রাযিয়াল্লাহু আনহু বর্ণিত হাদিসে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি এমন বৃক্ষরোপণ করল যা থেকে কোনো মানুষ বা প্রাণী খেল, তাতে তার জন্য সদকা রয়েছে (মুসনাদে আহমাদ: ২৭৫৪৬)। এমনকি রোপিত বৃক্ষের ফল চুরি হয়ে গেলেও তা সদকা হিসেবে গণ্য হয়— নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, যা কিছু চুরি হয়, হিংস্র পশু বা পাখি খায়, সবই তার জন্য সদকা (সহিহ মুসলিম: ১৫৫২)।
বৃক্ষরোপণকে সদকায়ে জারিয়া বা প্রবাহমান দান হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে। আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহু বর্ণিত হাদিসে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, মৃত্যুর পর সাতটি আমলের সওয়াব কবরে জারি থাকে, তার মধ্যে একটি হলো ফলবান বৃক্ষরোপণ (বায়হাকি, শুআবুল ঈমান: ৩১৭৫)। মুমিনের উপমা দিতে গিয়ে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সবুজ বৃক্ষের সাথে তুলনা করেছেন, যার পাতা ঝরে পড়ে না এবং মলিন হয় না, যা দ্বারা খেজুর গাছ বোঝানো হয়েছে (সহিহ বুখারি: ১৩১, সহিহ মুসলিম: ২৮১১)।
অপ্রয়োজনে বৃক্ষ নিধন সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি বিনা প্রয়োজনে কুল বৃক্ষ কর্তন করবে, আল্লাহ তাকে অধোমুখে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন (সুনানে আবু দাউদ: ৫২৩৯)। আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু ইয়াজিদ বিন আবি সুফিয়ানকে শামে প্রেরণের সময় বিনা প্রয়োজনে ফলবান বৃক্ষ কর্তন করতে নিষেধ করেছিলেন (বায়হাকি: ১৮৬১৬)। নির্বিচারে বৃক্ষ নিধনকারীরা আল্লাহর ক্রোধের শিকার হয়— আল্লাহ বলেন, যখন সে ক্ষমতায় আসে তখন পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি ও শস্য-প্রাণী বিনাশের চেষ্টা করে, অথচ আল্লাহ অশান্তি পছন্দ করেন না (সূরা বাকারা: ২০৫)।
আল্লাহ পৃথিবীতে প্রতিটি বস্তু পরিমিতভাবে সৃষ্টি করেছেন (সূরা হিজর: ১৯), আর বৃক্ষরাজি ও প্রাণীজগৎ পরস্পর নির্ভরশীল। সূরা আর-রহমানে আল্লাহ সূর্য-চন্দ্রের নির্ধারিত কক্ষপথ, ফলমূল ও খেজুর বৃক্ষের কথা উল্লেখ করে এই ভারসাম্যপূর্ণ সমন্বয়ের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন এবং জিজ্ঞাসা করেছেন, তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের কোন কোন নিয়ামতকে অস্বীকার করবে (সূরা আর-রহমান: ৫, ১০-১৩)।
বৃক্ষ কেবল পরিবেশগত প্রয়োজনীয়তাই নয়, বরং এটি একজন মুসলিমের জন্য ইবাদত ও সদকায়ে জারিয়ার এক অনন্য মাধ্যম। তাই প্রতিটি মুসলিমের উচিত ইসলামের দিকনির্দেশনা অনুযায়ী বৃক্ষরোপণ করা এবং তার যথাযথ পরিচর্যা করা, যাতে ইহলৌকিক কল্যাণ ও পারলৌকিক মুক্তি উভয়ই অর্জিত হয়। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সকলকে বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে পরিবেশ রক্ষা ও সদকায়ে জারিয়া অর্জনের তাওফিক দান করুন। আমীন।
অভিমত থেকে আরো পড়ুন