https://www.prothomalony.com/
18396
north-america
প্রকাশ: ১৩ অক্টোবর ২০২৬ ০৪:১৬
সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের বিমানবন্দরে একের পর এক হামলা। পাঁচ দিনে চারবার আঘাত, প্রাণহানি, শত শত আহত মানুষ, বন্ধ বিমানবন্দর আর বাতিল ফ্লাইট। নিহতদের মধ্যে দুজন বাংলাদেশি। ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ যে সৌদি আরবের দোরগোড়ায় নতুন করে আগুন জ্বালাচ্ছে, তা আর অস্বীকার করার উপায় নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ। ওয়াশিংটন এখন হুতিদের বিরুদ্ধে সৌদি অভিযানে সরাসরি যোগ দেওয়ার কথাও ভাবছে।
একটি আঞ্চলিক সংঘাত কীভাবে একের পর এক দেশকে টেনে নিয়ে যায়, রিয়াদের সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ তারই বিপজ্জনক উদাহরণ। এখানে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ আছে, সৌদি আরবের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আছে, ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের হিসাব আছে। আছে হরমুজ প্রণালি ও লোহিত সাগরের নৌপথ, বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে অনিশ্চয়তা।
তবে এসব ঘটনার মধ্যে সবচেয়ে বেদনাদায়ক খবরটি বাংলাদেশের মানুষের জন্য। রিয়াদের বিমানবন্দরে প্রাণ হারানো ১৩ জনের মধ্যে দুজন বাংলাদেশি। যুদ্ধের ভূরাজনৈতিক হিসাবের বাইরে এই দুজন মানুষের মৃত্যু আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আন্তর্জাতিক সংঘাতের মূল্য অনেক সময় দিতে হয় এমন মানুষকে, যাঁদের হাতে যুদ্ধ শুরুর বা থামানোর কোনো ক্ষমতাই নেই।
গত পাঁচ দিনে রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে ঘিরে হামলার ঘটনা সৌদি আরবের নিরাপত্তাব্যবস্থার ওপর নতুন প্রশ্ন তুলেছে। সৌদি আরব ও তার মিত্রদের অভিযোগ, এসব হামলার পেছনে রয়েছে ইয়েমেনের ইরানপন্থী হুতি গোষ্ঠী।
শনিবারের হামলাটি ছিল সবচেয়ে প্রাণঘাতী। সৌদি কর্তৃপক্ষের প্রাথমিক হিসাবে ১২ জন নিহত ও ৩০৯ জন আহত হন। পরে রিয়াদে ভারতীয় দূতাবাস জানায়, আহত এক ভারতীয় নাগরিকের মৃত্যু হয়েছে। এতে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১৩। রোববার সন্ধ্যায় বিমানবন্দরের অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটের টার্মিনাল ৩ ও ৪-এ আবার হামলার খবর আসে। এতে একজন পাকিস্তানি নাগরিক নিহত ও ১১ জন আহত হন। সোমবার সৌদি প্রতিরক্ষা বাহিনী তিনটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আকাশেই ধ্বংস করার দাবি করে।
বিমানবন্দর বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কয়েক শ ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। যাত্রীদের দুর্ভোগের পাশাপাশি এর প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও বিমান চলাচলেও। রয়টার্সকে দেওয়া এক যাত্রীর বর্ণনায় শনিবারের হামলার ভয়াবহতার কিছুটা চিত্র পাওয়া যায়। তিনি জানান, জানালার বাইরে আকাশ চিরে দ্রুতগতিতে কিছু একটা ছুটে যেতে দেখেছিলেন। এরপরই প্রস্থান-গেটের কাছে ছাদের একটি অংশ ভেঙে পড়ে।
নিহতদের মধ্যে চারজন সৌদি নাগরিক ছাড়াও ছিলেন দুজন বাংলাদেশি এবং যুক্তরাষ্ট্র, মিসর, জর্ডান, ফিলিস্তিন, সিরিয়া ও সুদানের একজন করে নাগরিক। মিসরের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন নিহতদের একজনকে ২৮ বছর বয়সী বিমানবালা আজ্জা রামজি হিসেবে শনাক্ত করেছে। তিনি ফ্লাইনাসে কর্মরত ছিলেন।
রিয়াদের হামলার পর সৌদি আরব হুতিদের বিরুদ্ধে কঠোর জবাব দেওয়ার অঙ্গীকার করেছে। হামলাকে তারা যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বর্ণনা করেছে। নিরাপত্তাঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় দেশটির স্কুলগুলো অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
হুতিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি টেলিগ্রামে দাবি করেছেন, তাঁদের হামলা সৌদি আরবের আগ্রাসনের জবাব। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, আগের ২৪ ঘণ্টায় সৌদি আরব হুতি-নিয়ন্ত্রিত এলাকায় ১২০টির বেশি বিমান হামলা চালিয়েছে। এই দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা না গেলে একে হুতিদের বক্তব্য হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে।
জাতিসংঘের ইয়েমেনবিষয়ক বিশেষ দূত হ্যান্স গ্রুন্ডবার্গ বিমানবন্দরে হামলাকে গুরুতর উত্তেজনা বৃদ্ধি হিসেবে বর্ণনা করেছেন। পাকিস্তান, কানাডা, মালয়েশিয়া ও জাপানের পক্ষ থেকেও নিন্দা জানানো হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী পেনি ওং নাগরিকদের সৌদি আরবে ভ্রমণের পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনার পরামর্শ দিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যও নতুন ভ্রমণ সতর্কতা জারি করেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হামলাকে ভয়াবহ বলে বর্ণনা করেছেন। সৌদি আরবের অনুরোধ সত্ত্বেও এত দিন হুতিদের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক অভিযানে যোগ দেওয়ার বিষয়ে সতর্ক অবস্থানে থাকা ওয়াশিংটন এবার সেই অবস্থান পরিবর্তনের কথা ভাবছে। ট্রাম্প সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে কথা বলার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন বলেও খবর এসেছে।
যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি যুদ্ধে জড়ালে পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। হুতিদের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের অভিযান আরও জোরদার হতে পারে। কিন্তু এর বিপরীতে লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচল, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাত আরও জটিল হয়ে ওঠার আশঙ্কাও রয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতি বুঝতে হলে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধের দিকে ফিরে তাকাতে হয়। ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে হুতিরা রাজধানী সানা দখল করে নেয়। পরের বছর মার্চে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন একটি জোট ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের পক্ষে সামরিক অভিযান শুরু করে। এরপর বছরের পর বছর ধরে সংঘাত চলেছে। হুতিরা সৌদি শহর, বিমানবন্দর ও তেলস্থাপনাকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটও ইয়েমেনে বিমান হামলা চালিয়েছে।
এই সংঘাতের পেছনে ইয়েমেনের ক্ষমতার লড়াই যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে সৌদি আরব ও ইরানের আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা। সৌদি আরব হুতিদের ইরানের সমর্থনপুষ্ট শক্তি হিসেবে দেখে। অন্যদিকে হুতিরা নিজেদের ইয়েমেনের রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায় এবং সৌদি হস্তক্ষেপকে তাদের বিরুদ্ধে আগ্রাসন বলে বর্ণনা করে।
২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় একটি যুদ্ধবিরতি ও উত্তেজনা প্রশমনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তাতে সহিংসতা অনেকটাই কমেছিল, যদিও ইয়েমেনের রাজনৈতিক সংকটের স্থায়ী সমাধান হয়নি। সাম্প্রতিক সংঘাতের নতুন বিস্তার সেই ভঙ্গুর স্থিতিশীলতাকে আরও দুর্বল করে দিয়েছে। ইয়েমেনের যুদ্ধকে কেবল সৌদি আরব বনাম হুতি সংঘাত হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়বে না। ইয়েমেনের ভেতরে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতা রয়েছে। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের কর্তৃত্বও দেশটির সর্বত্র সমান নয়। ফলে কোনো একটি পক্ষের সামরিক সাফল্য মানেই যুদ্ধের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি নয়।
এবার এই সংঘাতের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইরানের যুদ্ধ। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সামরিক সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তাব্যবস্থাকে এমনিতেই অস্থিতিশীল করেছে। হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনা আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ও বাণিজ্যকে অনিশ্চয়তার মুখে ফেলেছে।
সৌদি আরবের জন্য বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে তেল রপ্তানির বিকল্প পথের গুরুত্ব বেড়ে যায়। সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চল থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে তেল পরিবহনের ব্যবস্থা রয়েছে। ফলে লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব প্রণালি সৌদি অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কিন্তু এই পথও নিরাপদ নয়।
ইয়েমেনের হুতিরা লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলকে নিজেদের সামরিক ও রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। অতীতে তাদের হামলার কারণে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজকে বিকল্প পথে চলাচল করতে হয়েছে। দীর্ঘ পথ ঘুরে জাহাজ চলাচলের ফলে পরিবহন ব্যয় ও সময় বেড়ে যায়। জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তাও বাজারে চাপ তৈরি করে।
সৌদি আরবের জন্য তাই হরমুজের পাশাপাশি বাব আল-মান্দেবের নিরাপত্তাও এখন কৌশলগত প্রশ্ন। একটি নৌপথে বাধা তৈরি হলে অন্য পথের ওপর নির্ভরতা বাড়ে; আর সেই পথও সংঘাতের আওতায় এলে সংকট বহুগুণে বেড়ে যায়। এই কারণেই ইয়েমেনের সংঘাত আর শুধু একটি দেশের গৃহযুদ্ধের বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল, তেলের বাজার এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কৌশল।
লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে বাব আল-মান্দেব প্রণালি। এই পথ দিয়ে ইউরোপ, এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করে। সুয়েজ খাল হয়ে ইউরোপে যাওয়া বহু জাহাজের জন্য এটি অপরিহার্য প্রবেশপথ।
হুতিদের সামরিক সক্ষমতা ও ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এই প্রণালিকে ঘিরে তাদের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। তবে প্রণালিটি সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া এবং সেখানে জাহাজ চলাচলকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলা এক বিষয় নয়। হুতিদের পক্ষে কতটা সময় ধরে এবং কী মাত্রায় নৌপথ বন্ধ রাখা সম্ভব, তা নির্ভর করবে তাদের সামরিক সক্ষমতা, প্রতিপক্ষের প্রতিরোধ এবং আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর প্রতিক্রিয়ার ওপর।
হুতিদের রাজনৈতিক ব্যুরোর সদস্য মোহাম্মদ আল-বুখাইতি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, সৌদি আরব ইয়েমেনের ওপর অন্যায্য অবরোধ চাপিয়ে রেখেছে। হুতিদের বক্তব্য অনুযায়ী, সৌদি আরবকে তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকার ওপর থেকে অবরোধ তুলে নিতে হবে। অন্যদিকে সৌদি আরব ও তার মিত্ররা হুতিদের হামলাকে নিজেদের নিরাপত্তার জন্য সরাসরি হুমকি হিসেবে দেখছে।
দুই পক্ষের এই বিপরীত অবস্থানের মধ্যে সমঝোতার সুযোগ কোথায়, সেটিই বড় প্রশ্ন। সৌদি আরব যদি সামরিক অভিযান বাড়ায়, হুতিরা সমুদ্রপথে হামলা আরও বাড়াতে পারে। আবার হুতিদের হামলা বাড়লে সৌদি আরব ও তার মিত্রদের পাল্টা পদক্ষেপও তীব্র হতে পারে। এভাবে প্রতিশোধের চক্র সংঘাতকে আরও বিস্তৃত করতে পারে।
সৌদি আরবের হাতে আধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা রয়েছে। তবু ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোনের কিছু হামলা লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছে গেলে প্রশ্ন ওঠে—এত শক্তিশালী প্রতিরক্ষা থাকা সত্ত্বেও এমন ঘটনা ঘটছে কেন? এর একটি উত্তর হলো, কোনো আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাই শতভাগ সফলতার নিশ্চয়তা দেয় না। আক্রমণকারী একাধিক দিক থেকে, বিভিন্ন উচ্চতায় এবং ভিন্ন ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করলে প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়ে। কিছু ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা গেলেও অন্য কোনোটি ফসকে যেতে পারে।
দ্বিতীয়ত, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ব্যবহারের ক্ষেত্রেও কৌশলগত অগ্রাধিকার গুরুত্বপূর্ণ। সৌদি আরবকে একই সময়ে ইরানের সম্ভাব্য হামলা, ইয়েমেন থেকে আসা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন এবং গুরুত্বপূর্ণ তেলস্থাপনা ও বিমানবন্দর রক্ষার বিষয় বিবেচনা করতে হয়। একটি নির্দিষ্ট ধরনের হুমকি মোকাবিলায় তৈরি ব্যবস্থা অন্য ধরনের আক্রমণের বিরুদ্ধে একই রকম কার্যকর নাও হতে পারে।
তৃতীয়ত, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার সরঞ্জামের মজুদ সীমাহীন নয়। দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ চললে ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যবহার বাড়ে এবং নতুন সরঞ্জাম সংগ্রহের ওপর চাপ তৈরি হয়। সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা মজুদে ঠিক কতটা ঘাটতি রয়েছে, তা নির্ভরযোগ্য তথ্য ছাড়া নিশ্চিত করে বলা যায় না। তবে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের সরবরাহ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
তবে হুতিদের সামরিক সক্ষমতাকেও অতিরঞ্জিত করা ঠিক হবে না। সৌদি আরবের তুলনায় তাদের সামরিক ও অর্থনৈতিক সম্পদ সীমিত। তাদের পক্ষে বড় আকারের স্থায়ী যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া কঠিন হতে পারে। কিন্তু একটি বা দুটি সফল হামলাও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম দখল করতে পারে, বিমানবন্দর বন্ধ করে দিতে পারে এবং বিনিয়োগকারী ও যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করতে পারে। অর্থাৎ, সামরিক শক্তিতে পিছিয়ে থেকেও হুতিরা অর্থনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তাদের কৌশলের কার্যকারিতা বিচার করতে হলে শুধু ধ্বংস হওয়া লক্ষ্যবস্তুর সংখ্যা নয়, হামলার ফলে তৈরি হওয়া নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সংকটও বিবেচনা করতে হবে।
ইয়েমেনের ভেতরে স্থলপথের লড়াইয়ের পরিস্থিতিও স্পষ্ট নয়। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেনি সরকারের সামরিক বাহিনী অগ্রগতির দাবি করছে। সৌদি বিমান-সহায়তায় বড় অভিযান চলার খবরও এসেছে। কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রের বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্যে অগ্রগতির মাত্রা নিয়ে অসংগতি রয়েছে। কোনো কোনো এলাকায় নিয়ন্ত্রণ বদলালেও তা স্থায়ীভাবে ধরে রাখা কঠিন হতে পারে। ইয়েমেনের ভূপ্রকৃতি, দীর্ঘদিনের সংঘাত, স্থানীয় রাজনৈতিক বিভাজন এবং বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর উপস্থিতি সামরিক অভিযানকে জটিল করে তুলেছে।
এদিকে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বাড়ছে। জাতিসংঘের তথ্যের উদ্ধৃতি দিয়ে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে। তবে নির্দিষ্ট সময়সীমা ও পরিসংখ্যানের হালনাগাদ উৎস যাচাই না করে নতুন সংখ্যা নিশ্চিতভাবে বলা সমীচীন নয়। এতটুকু স্পষ্ট যে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের বোঝা বহন করছেন ইয়েমেনের সাধারণ মানুষ—যাঁদের অনেকেই বহু বছর ধরে নিরাপত্তাহীনতা, খাদ্যসংকট ও বাস্তুচ্যুতির শিকার।
ওয়াশিংটন যদি সৌদি আরবের সঙ্গে সরাসরি সামরিক অভিযানে যোগ দেয়, তাহলে সংঘাতের পরিধি আরও বড় হতে পারে। হুতিরা যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে পাল্টা হামলা বাড়াতে পারে, লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা আরও ঝুঁকিতে পড়তে পারে এবং ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের সঙ্গে ইয়েমেনের সংঘাতের ব্যবধান কমে আসতে পারে।
এখানে সৌদি আরবের হিসাবও জটিল। একদিকে দেশটিকে নিজেদের বিমানবন্দর, তেলস্থাপনা ও নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যদিকে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ অর্থনীতি, বিনিয়োগ, পর্যটন ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগের ওপর চাপ তৈরি করতে পারে। সামরিক শক্তি দিয়ে তাৎক্ষণিক হামলা প্রতিহত করা সম্ভব হলেও স্থায়ী নিরাপত্তার জন্য রাজনৈতিক সমাধান জরুরি।
ইরানও এই পরিস্থিতির বাইরে নয়। হুতিদের সঙ্গে তেহরানের সম্পর্ক আঞ্চলিক কূটনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে হুতিদের প্রতিটি সামরিক সিদ্ধান্ত সরাসরি ইরানের নির্দেশে হচ্ছে—এমন দাবি করার আগে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ প্রয়োজন। তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক লক্ষ্য ও ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ বাস্তবতাও বিবেচনায় রাখতে হবে।
অতএব, এই সংঘাতকে কেবল ইরান বনাম সৌদি আরব বা যুক্তরাষ্ট্র বনাম হুতি হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এখানে স্থানীয় ক্ষমতার লড়াই, আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, আন্তর্জাতিক জ্বালানি নিরাপত্তা এবং বড় শক্তিগুলোর সামরিক হিসাব একসঙ্গে কাজ করছে।
সৌদি আরবে কর্মরত বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশির জন্য পরিস্থিতিটি সরাসরি উদ্বেগের। তাঁরা সেখানে কাজ করেন, পরিবার চালানোর জন্য অর্থ পাঠান এবং দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখেন। সৌদি আরবের বিমানবন্দর ও আকাশপথ অনিরাপদ হয়ে পড়লে তাঁদের কর্মস্থলে যাতায়াত, দেশে ফেরা, নতুন কর্মীদের যাত্রা এবং পরিবারের কাছে অর্থ পাঠানোর ওপর প্রভাব পড়তে পারে।
সৌদি আরব কত বড় পাল্টা অভিযান চালাবে, যুক্তরাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত সরাসরি যুদ্ধে নামবে কি না, ইরানের সঙ্গে সংঘাতের কূটনৈতিক সমাধানের কোনো পথ খুলবে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো অনিশ্চিত। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার: ইয়েমেনের দীর্ঘদিনের গৃহযুদ্ধ এখন আর দেশটির সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সৌদি আরবের নিরাপত্তা, ইরানের আঞ্চলিক অবস্থান, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ভূমিকা এবং বিশ্ববাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ।
এই সংঘাতের প্রতিটি নতুন ধাপ অন্য একটি সংকটকে উসকে দিতে পারে। রিয়াদের বিমানবন্দরে হামলা তারই সতর্কসংকেত। একদিকে ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে মানুষের প্রাণ যাচ্ছে, অন্যদিকে সমুদ্রপথ ও জ্বালানি সরবরাহের নিরাপত্তা নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ। আর এসবের মাঝখানে রয়েছেন সাধারণ মানুষ—ইয়েমেনের যুদ্ধবিধ্বস্ত পরিবার থেকে শুরু করে সৌদি আরবে জীবিকার সন্ধানে যাওয়া বাংলাদেশি শ্রমিক পর্যন্ত।
মধ্যপ্রাচ্যের এই জট খুলবে সামরিক শক্তির প্রদর্শনে, নাকি কূটনৈতিক সমঝোতায়—সেটিই এখন দেখার বিষয়। কিন্তু যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, তার মূল্য তত বেশি দিতে হবে এমন মানুষকে, যাঁরা এই সংঘাতের সিদ্ধান্ত নেওয়ার টেবিলে কখনোই বসতে পারেন না।
উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন