https://www.prothomalony.com/
18394
north-america
প্রকাশ: ১৩ অক্টোবর ২০২৬ ০৩:১৫
যুক্তরাজ্যে আশ্রয় আবেদনের জন্য জাল নথি, সাজানো ছবি ও মনগড়া প্রমাণ তৈরির অভিযোগে বাংলাদেশিসহ দক্ষিণ এশীয় কয়েকজনের নাম সামনে আসা গভীর উদ্বেগের বিষয়। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত ৬ অক্টোবর লন্ডনের বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে বাংলাদেশি সংগীতশিল্পী সাজ্জাদ মিয়াসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে ব্রিটিশ অভিবাসন কর্তৃপক্ষ। পরে সাজ্জাদ মিয়া জামিনে মুক্তি পেয়েছেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তদন্তের এই পর্যায়ে অভিযোগকে প্রমাণিত অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। তবে ঘটনাটি আশ্রয়প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা, অভিবাসনসেবার নৈতিকতা এবং প্রবাসী বাংলাদেশি সম্প্রদায়ের সুনাম নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছে।
আশ্রয় মানুষের মৌলিক নিরাপত্তা ও মর্যাদার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি অধিকার। নিজ দেশে নিপীড়ন, সহিংসতা কিংবা নির্দিষ্ট পরিচয়ের কারণে গুরুতর ঝুঁকির মুখে পড়া মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধান করতে পারেন। আন্তর্জাতিক সুরক্ষার এই ব্যবস্থা শুধু আইনি কাঠামো নয়; এটি মানবিক দায়িত্বেরও প্রকাশ। কিন্তু কোনো ব্যক্তি বা চক্র যদি অর্থের বিনিময়ে জাল প্রত্যয়নপত্র, সাজানো ছবি কিংবা মনগড়া সম্পর্কের প্রমাণ তৈরি করে এই ব্যবস্থার সুযোগ নিতে চায়, তবে তা প্রকৃত আশ্রয়প্রার্থীদের জন্যও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। কারণ প্রতারণার ঘটনা সামনে এলে বৈধ আবেদনকারীদের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও অযৌক্তিক সন্দেহ তৈরি হতে পারে।
প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তদন্তকারীদের সন্দেহ, পূর্ব লন্ডনের বাংলাদেশি এলজিবিটি সংগঠন ‘আপনজন’-এর সঙ্গে যুক্ত একটি চক্র অর্থের বিনিময়ে আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য জাল প্রমাণ তৈরির কাজে জড়িত ছিল। এ অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ করবে তদন্ত ও আদালত। কোনো সংগঠনের সঙ্গে কারও সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠলেই সংগঠনটির সব সদস্য বা সংশ্লিষ্ট সম্প্রদায়ের মানুষকে দায়ী করা যায় না। একইভাবে, কোনো অভিযুক্ত ব্যক্তির জাতীয়তা দিয়ে একটি দেশের মানুষের চরিত্র বিচার করাও অনুচিত। আইনের শাসন নিশ্চিত করতে হলে অভিযোগের বিচার হতে হবে নিরপেক্ষভাবে, ব্যক্তির পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়, প্রমাণের ভিত্তিতে।
তবে অভিযোগের গুরুত্ব খাটো করে দেখারও সুযোগ নেই। প্রতিবেদনে মোবাইল ফোন, অলংকার ও কয়েক হাজার পাউন্ড নগদ অর্থ জব্দের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এসব জিনিস জব্দ হওয়া নিজে থেকেই অপরাধ প্রমাণ করে না। কিন্তু তদন্তে যদি প্রমাণিত হয় যে অর্থের বিনিময়ে পরিকল্পিতভাবে ভুয়া নথি ও মিথ্যা সাক্ষ্য তৈরি করা হয়েছে, তাহলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। আশ্রয়প্রক্রিয়াকে ব্যবসায়িক প্রতারণার মাধ্যমে কাজে লাগানো শুধু অভিবাসন কর্তৃপক্ষকে বিভ্রান্ত করে না। এটি ঝুঁকিতে থাকা মানুষের অসহায়ত্বকে পুঁজি করারও শামিল।
এ ধরনের অভিযোগ নতুন নয়। এর আগে বিবিসির একটি অনুসন্ধানেও কয়েকজন বাংলাদেশি ও পাকিস্তানি অভিবাসন পরামর্শদাতার বিরুদ্ধে জাল নথি এবং মনগড়া প্রমাণ ব্যবহার করে আশ্রয় আবেদন সাজানোর অভিযোগ সামনে এসেছিল। বিভিন্ন সময়ে একই ধরনের অভিযোগ প্রকাশিত হলে প্রশ্ন ওঠে। আশ্রয়প্রার্থীদের সহায়তার নামে পরিচালিত পরামর্শসেবাগুলোর ওপর যথেষ্ট নজরদারি রয়েছে কি না। আইন ও নৈতিকতার সীমা অতিক্রম করে কেউ যদি অর্থ উপার্জনের জন্য মিথ্যা কাহিনি তৈরি করেন। শুধু ব্যক্তিগত অপরাধের বিচার করলেই চলবে না; এমন প্রতারণার সুযোগ তৈরি হওয়া ঠেকাতেও কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
এখানে যুক্তরাজ্যের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে প্রবাসী বাংলাদেশি সমাজেরও দায়িত্ব। আশ্রয়প্রক্রিয়ায় সহায়তা দেওয়ার নামে কে কী ধরনের সেবা দিচ্ছেন, তাঁদের যোগ্যতা ও অনুমোদন আছে কি না, তাঁরা কী প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন—এসব বিষয়ে সতর্কতা জরুরি। ‘নিশ্চিত আশ্রয়’, ‘বিশেষ ব্যবস্থায় অনুমোদন’ কিংবা ‘প্রমাণ তৈরি করে দেওয়ার’ মতো প্রতিশ্রুতি দিয়ে কেউ অর্থ দাবি করলে সম্ভাব্য আবেদনকারীদের সতর্ক হওয়া উচিত। বৈধ আবেদন কখনোই কৃত্রিম প্রমাণ তৈরির ওপর নির্ভর করা উচিত নয়। আবেদনকারীদের উচিত সত্য তথ্য দেওয়া এবং প্রয়োজন হলে স্বীকৃত ও যোগ্য আইনজীবী বা অভিবাসন পরামর্শকের সহায়তা নেওয়া।
একই সঙ্গে যুক্তরাজ্যে অভিবাসন পরামর্শসেবার ওপর কার্যকর নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন। অননুমোদিত ব্যক্তিদের মাধ্যমে আইনি পরামর্শ প্রদান, জাল নথি তৈরি কিংবা দুর্বল আবেদনকারীদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের অভিযোগ দ্রুত তদন্ত করতে হবে। অভিযোগ জানানোর সহজ ব্যবস্থা, আবেদনকারীদের জন্য নির্ভরযোগ্য তথ্য এবং উপযুক্ত আইনি সহায়তার সুযোগ বাড়ানো জরুরি। কোনো প্রতারণার ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি অপরাধের শিকার বা প্রতারণার ঝুঁকিতে থাকা মানুষদেরও সুরক্ষা দিতে হবে। কারণ সব আবেদনকারী আইনের জটিলতা বোঝেন না; কেউ কেউ ভুল তথ্য, ভয় কিংবা অসহায়ত্বের কারণে প্রতারকদের ফাঁদে পড়তে পারেন।
এই আলোচনায় এলজিবিটি পরিচয়ের বিষয়টিও বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে। যৌন অভিমুখিতা বা লিঙ্গপরিচয়ের কারণে নিপীড়নের ঝুঁকিতে থাকা মানুষের জন্য আশ্রয়প্রক্রিয়া অনেক সময় জীবনরক্ষাকারী হয়ে ওঠে। তাঁদের অভিজ্ঞতা যাচাই করার প্রয়োজন থাকতে পারে, কিন্তু তা করতে গিয়ে প্রকৃত আবেদনকারীদের অপমান, বৈষম্য কিংবা সামষ্টিক সন্দেহের মুখে ঠেলে দেওয়া চলবে না। কোনো ব্যক্তি ভুয়া পরিচয় বা মিথ্যা প্রমাণ ব্যবহার করেছেন বলে অভিযোগ উঠলে তার দায় ওই ব্যক্তির। কোনো পরিচয়ভিত্তিক সম্প্রদায়ের নয়। প্রতারণা দমনের নামে প্রকৃত নিপীড়িত মানুষদের অধিকার ক্ষুণ্ন করা হলে তা হবে আরেক ধরনের অবিচার।
প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য বিষয়টি সুনামের প্রশ্নও বটে। যুক্তরাজ্যে বহু বাংলাদেশি শিক্ষা, ব্যবসা, সংস্কৃতি, স্বাস্থ্যসেবা ও নানা পেশায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। কয়েকজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ দিয়ে সেই অবদানকে অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু এমন অভিযোগের পুনরাবৃত্তি হলে বাংলাদেশি সম্প্রদায়ের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই সামাজিক সংগঠন, কমিউনিটি নেতা, গণমাধ্যম এবং দায়িত্বশীল নাগরিকদের উচিত গুজব না ছড়িয়ে সত্যনিষ্ঠ তথ্য প্রচার করা, আইনসম্মত অভিবাসনপথ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো এবং প্রতারণার বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান নেওয়া।
সবশেষে, এই ঘটনায় দুটি নীতি সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রতারণার বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা এবং অভিযুক্ত ব্যক্তির ন্যায়বিচারের অধিকার। তদন্তের ভিত্তিতে অপরাধ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। আর প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত কাউকে দোষী ঘোষণা করা যাবে না। একই সঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে, প্রতারণার অভিযোগ যেন বৈধ আশ্রয়প্রার্থী, এলজিবিটি মানুষ কিংবা পুরো বাংলাদেশি সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে বৈষম্যের অজুহাত না হয়ে ওঠে।
আশ্রয়ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষার দায়িত্ব সবার। সত্যনিষ্ঠ আবেদন, পেশাগত সততা, কার্যকর নজরদারি এবং নিরপেক্ষ বিচার—এই চারটি ভিত্তি শক্তিশালী করা গেলে প্রতারণা প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে। কারও অপরাধের দায় পুরো সম্প্রদায়ের ওপর চাপিয়ে নয়, বরং অপরাধীকে প্রমাণের ভিত্তিতে শনাক্ত করে এবং প্রকৃত আশ্রয়প্রার্থীদের অধিকার সুরক্ষিত রেখেই যুক্তরাজ্যের আশ্রয়প্রক্রিয়ায় আস্থা বজায় রাখতে হবে।
উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন