https://www.prothomalony.com/
18385
north-america
জেএফকে থেকে সিভিটাভেচ্ছিও সমুদ্রবন্দর। জেটল্যাগের ক্লান্তি, রহস্যময় রোমান সাম্রাজ্য পরিক্রমা—সব মিলিয়ে একটা ঘোরের ভেতর আমাদের ‘রোমান হলিডে’ শেষ হল। বাস চালক রাফায়েলে সারাক্ষণ হুইলে ব্যাস্ত থাকায় তার সাথে আমাদের সেভাবে কথা হয়নি। বিদায়কালে রাফায়েলে হাসিমুখে বললেন—‘তোমাদের নিরাপদে বন্দরে পৌঁছাতে পেরেছি, এবার আমাদের দায়িত্ব শেষ। তোমাদের সমুদ্রযাত্রা নিরাপদ এবং আনন্দময় হোক। শুভকামনা রইলো। গুডবাই!’
‘লং গুডবাই’ বলাই সঙ্গত। এই মানুষগুলোর সাথে জীবনে আর কখনো দেখা হওয়ার সম্ভাবনা কম।প্রতিটি যাত্রারই একটা গন্তব্য থাকে।আমাদের পরবর্তী গন্তব্য ভাইকিং। যাত্রীদের অভ্যর্থনা জানানোর জন্য সাদা রঙের বিশাল জাহাজটির প্রবেশপথে লাল গালিচা পাতা রয়েছে। মাথার উপরে ভাইকিং লেখা বড় ব্যানার বাতাসে দুলছে। বেশ জমকালো আয়োজন। জীবনে প্রথম সমুদ্রভ্রমণে যাচ্ছি, ভাবতেই শরীরে শিহরণ খেলে গেলো।
ভেতরে প্রবেশ করার পরপরই শুরু হল আমাদের এমবার্কেশন পক্রিয়া। সিকিউরিটি চেকিংয়ের মুখোমুখি হলাম। এটা ডেক A, যেখানে যাত্রীদের সিকিউরিটি চেক-ইন, চেক-আউট, সহ অন্যান প্রয়োজনীয় কাজ সম্পন্ন হয়।নানাবিধ ফর্মালিটি এবং নিরাপত্তা তল্লাসির পর সামনে এগুতেই আরও একটা রিসেপশন ডেস্কে দাঁড়াতে হল। ডেস্কে কর্তব্যরত স্টাফ পাসপোর্ট দেখতে চাইলেন।বললেন, ‘এরপর আর আপনাকে পাসপোর্ট ব্যাবহার করতে হবে না।’ একটা স্বয়ংক্রিয় ক্যামেরার দিকে তাকাতে বলে, তিনি আমার হাতে একটা ‘কি-কার্ড’ ধরিয়ে দিলেন। বললেন, ‘এই ‘স্টেটরুম কার্ড’টা এখন আপনার আইডি। যে ক’দিন ‘ভাইকিং সি’ ক্রুজে অবস্থান করবেন, স্টেটরুম, জিম কিংবা সাউনার লকার-চাবি হিসেবে এই স্টেটরুম কার্ড ব্যাবহার করতে হবে।প্রতিবার শীপে চেক-ইন, চেক-আউটের সময়ও স্টেটরুম কার্ড স্ক্যান করতে হবে। সবশেষে তিনি ‘ওয়েলকাম টু ভাইকিং সি’ বলে সম্ভাষণ জানালেন।
করিডোর ধরে এগোতেই দেখলাম, লিফ্টের পাশে কয়েকজন স্টাফ সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছেন। দু’জনের হাতে বাস্কেটভর্তি সাদা তোয়ালে। রোল করা, থরেথরে সাজানো। পাশেই আরেকটা খালি বাক্স, ব্যাবহৃত তোয়ালে রাখার জন্য। একপাশে একটি বড় বাক্সে পানির বোতল। দুজন স্টাফ সবার হাতে একটা করে বোতল তুলে দিলেন। আমরা সেই ভেজা এবং উষ্ণ তোয়ালে দিয়ে হাত-মুখ মুছে নিলাম। ঠান্ডা পানিতে চুমুক দিলাম। পথের ক্লান্তি খানিকটা কেটে গেলো।
পরবর্তী গন্তব্য ডেক-টু। লিফ্ট থেকে বের হতেই দেখি, চমতকার সাজানো-গোছানো করিডোরে ‘ওয়েলকাম ড্রিংক’ অথাৎ ট্রেভর্তি শ্যাম্পেনের গ্লাস নিয়ে কয়েকজন স্টাফ দাঁড়িয়ে আছেন। তারা আমাদের হাতে শ্যাম্পেনের গ্লাস তুলে দিয়ে অভ্যর্থনা জানালেন। এ-হেন মধুর আপ্যায়নের পর আমাদেরকে একটা বড় সিটিং এরিয়ায় নিয়ে বসানো হল।
একজন স্টাফ জানালেন, যাত্রা শুরুর আগে ‘ভাইকিং সি’ যাত্রীদের নিরাপত্তা প্রশিক্ষণের জন্য একটা ম্যান্ডেটরি সেফটি ড্রিলের আয়োজন করে থাকে। যেহেতু সমুদ্রযাত্রায় নিরাপত্তার বিষয়টি খুব গুরুত্বপূর্ণ।তাই তিনি একটা লাইফজ্যাকেট হাতে নিয়ে হাতেকলমে লাইফজ্যাকেট পরার নিয়মকানুন দেখালেন। ইমার্জেন্সি সিগন্যাল, যাত্রীদের মাস্টার স্টেশন, লাইফবোট সম্পর্কে বিস্তারিত বুঝিয়ে বললেন। তারপর দেয়ালের বড় পর্দার টেলিভিশনটি চালু করে দিয়ে ধারনকৃত ডেমোটি দেখতে অনুরোধ করলেন। প্রয়োজনে আরও ভালো করে বোঝার জন্য স্টেটরুমের টিভিতে ভিডিওটা বারবার দেখার অনুরোধ জানালেন।
আমরা ঠাণ্ডা স্যাম্পেনে চুমুক দিতেদিতে, জরুরী অবস্থায় নিজের নিরাপত্তার জন্য কী কী করনীয় সেই বিষয়গুলো জেনে নিলাম।
সেফটি ড্রিল শেষ হতেই প্রশিক্ষক মারিয়া বললেন, এখন আপনারা ইচ্ছেমতো জাহাজের প্রতিটি ডেক, লাউন্জ, পুল এবং ক্যাফে ঘুরেফিরে দেখতে পারেন। দুপুর একটায় সাততলার ডেকে ‘ওয়াল্ড ক্যাফে’র ডাইনিং হলে আপনাদের জন্য লান্চের ব্যাবস্থা রয়েছে। দুপুর দুটো নাগাদ আপনাদের জন্য বরাদ্ধকৃত স্টেটরুম খুলে দেয়া হবে। ইতোমধ্যে আপনাদের লাগেজ যারযার দরজার সামনে রাখা থাকবে।এনজয় ইউরসেল্ফ!’
নিরাপত্তা কোচিংক্লাস শেষ হতেই মনোযোগী ছাত্ররা স্বাধীনমত ঘুরতে বেরিয়ে পড়ল। নিউ ইয়র্ক থেকে সিভিটাভেচ্ছিও সমুদ্রবন্দরে পৌঁছানোর দীর্ঘযাত্রা এবং এমবার্কেশনের নানা পক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাওয়ার পরে আমার এবং বাবুলের গায়ে আর কোনো জীবনীশক্তি অবশিষ্ট ছিল না। এ-মূহুর্তে ঘুরেফিরে জাহাজ দেখার পরিবর্তে পেটপুরে দু’টো খেয়ে, নিজেদের জন্য বরাদ্ধকৃত রুমে যাওয়ার জন্যই আমরা ব্যাকুল হলাম।
আমরা সোজা সাততলার ওয়ার্ল্ড ক্যাফে রেস্টুরেন্টে রওনা হলাম। পৃথিবীর সর্বত্রই ওয়ার্ল্ড ক্যাফে খুব জনপ্রিয় রেস্টুরেন্ট। পূর্বঅভিজ্ঞতা থাকায় ওদের খাবার এবং পরিবেশনা সম্পর্কে ধারণা ছিল। রেস্টুরেন্টে ঢোকার মুখেই একজন রিসেপসনিস্ট আমাদের অভ্যর্থনা জানালেন। তার ডেস্কের পাসেই হাত ধোঁয়ার বেসিন। এবং বাস্কেটে সেইরকম রোল করা উষ্ণ তোয়ালে। হাইজিনের ব্যাপারে এদের সতর্কতা ভালো লাগলো। হ্যান্ডওয়াশ দিয়ে ভাল করে হাত ধুঁয়ে, উষ্ণ তোয়ালেতে হাতমুখ মুছে ভেতরে ঢুকলাম।
এটা জাহাজের পেছনের দিক। বিশাল আয়তনের রেস্টুরেন্ট। বৃহতকলেবরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসার আয়োজন।সাজসজ্জা খুব সিম্পল। সোজা লাইন, ফাঁকা জায়গা বেশি। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। ভাইকিং নরওয়ের কম্পানি। তাই সাজসজ্জাও স্ক্যান্ডিনেভিয়ান স্টাইলের।
জাহাজের একদম শেষপ্রান্তে একটা সুইমিংপুল। সেখানে ওনেকগুলো ‘সান লাউঞ্জার’ পাতা রয়েছে। প্রতিটি সান লাউঞ্জারে প্রয়োজনীয় সংখ্যক তোয়ালে ভাঁজ করে রাখা। আউটডোরে বসে খাওয়ার ব্যাবস্থা রয়েছে। পুলের সামনেই একটা পুল গ্রিল। জাহাজের দুইধারেও উন্মুক্ত বসার আয়োজন। রেস্টুরেন্টের চারপাশে এবং পুল এরিয়ায় আমাদের ইতস্তত ঘোরাফেরা দেখে একজন স্টাফ হাসিমুখে এগিয়ে এলেন। ভদ্রলোককে সাউথ ইন্ডিয়ান বলেই মনে হল। তার বুক পকেটের নেম ট্যাগে রাজেশ নায়ার নামটা জ্বলজ্বল করছিল। কেরালা অন্চলের খুব কমন সাউথ ইন্ডিয়ান নাম।
হেসে বললাম, ‘রাজেশ, আপনি সম্ভবত কেরালার লোক, তাই না?’
মনে হল রাজেশ খুব হাসিখুশি মানুষ। আকর্ণ হাসি দিয়ে সন্মতিসূচক মাথা নাড়লেন। উনি জানতে চাইলেন, আমরা পশ্চিমবঙ্গের লোক কিনা।
হেসে বললাম, ‘পশ্চিমবঙ্গ নয়; পূর্ববঙ্গের। বাংলাদেশের।’
সে অবাক হল— ‘আপনারা বাংলাদেশ থেকে ভাইকিং ক্রুজে এসেছেন?’ ‘আমরা নিউ ইয়র্ক থেকে এসেছি’
রাজেশ হাসলেন। বললেন, ‘তাহলে ঠিক আছে। বাংলাদেশের খুব কম প্যাসেন্জারই ক্রুজে দেখেছি কিনা!’ ইতোমধ্যেই বেশ ক’জন ইন্ডিয়ান স্টাফ দেখেছি উল্লেখ করতেই তিনি জানালেন, ‘ভাইকিং সহ প্রায় সব বড় ক্রুজ লাইনেই হোটেল ডিপার্টমেন্টে — বিশেষ করে রেস্টুরেন্ট, কিচেন, হাউসকিপিং এ প্রচুর ভারতীয় স্টাফ কাজ করেন।এর মধ্যে কেরালা, গোয়া, তামিলনাড়ু থেকে আসা সাউথ ইন্ডিয়ানদের সংখ্যাই বেশি। কারণ ওখানে অনেক ভালো হোটেল ম্যানেজমেন্ট কলেজ আছে। এই লাইনে অনেক আগে থেকেই ভারতীয়রা কাজ করছেন।তাই আত্মীয়-স্বজন, জানাশোনা পরিচিতরা সহজেই কাজ পেয়ে যায়।’
আমরা বেজায় ক্লান্ত ছিলাম। তাই রাজেশের সাথে কথা বলতে বলতে, সুইমিংপুলের ধারে একটা টেবিলে দুজনে বসে পড়লাম। কাঁধের উপর থেকে ব্যাকপ্যাক দুটো নামিয়ে রেখে এতক্ষণে হাল্কা হলাম।
রাজেশ বললেন, ‘ডাইনিং ওপেন হলে আপনারা চাইলে ভেতর থেকে খাবার এনে আকুয়াভিট টেরেসে বসেই খেতে পারবেন। অনেক গেস্টরাই ‘আল ফ্রেস্কো ডাইনিং’ পছন্দ করেন।’
রাজেশের মুখে ইতালিয়ান শব্দ দু’টো অসাধারণ লাগলো। বুঝলাম, এই খোলা ডেকের নাম হল ‘আকুয়াভিট টেরেস’। আর খোলা আকাশের নিচে বসে খাওয়া হল ‘আল ফ্রেস্কো ডাইনিং’।
প্রতিবেশী দেশের মানুষ পেয়ে রাজেশ মনখুলে গল্প করতে লাগলেন। আমিও খোলামনেই অভিযোগ করলাম, ‘আমরা ভেবেছিলাম, জাহাজে উঠেই রুমে গিয়ে আরাম করে শাওয়ার করবো। তারপর একটু রেস্ট নিয়ে খেতে আসবো। এখন পুরো উল্টো হচ্ছে। জাহাজে উঠতেই এত্তো হ্যাপা। এখন রুমের জন্য অপেক্ষা। এদিকে শরীর আর চলছেই না। খুব ক্লান্ত লাগছে!’
রাজেশ বিব্রত মুখে বললো, ‘আপনাদের জন্য কি করতে পারি বলুন? চা বা কফি খাবেন?’
চায়ের কথায় বাবুল নড়েচড়ে বসল— ‘চা হলেতো খুবই ভালো হয়।’
রাজেশ বাবু একটা ট্রেতে দ্রুত দুইকাপ চা নিয়ে ফিরে এলেন। আমরা খুব কৃতজ্ঞবোধ করলাম।বারবার ধন্যবাদ জানালাম।
রাজেশ এবার নিজের থেকেই ভাইকিং সি’র সিস্টেমটা আমাদের কাছে ব্যাখা করার চেষ্টা করলেন, ‘সিস্টেম অনুযায়ী আজকের দিনটা হল জাহাজের ‘টার্নঅ্যারাউন্ড ডে’। ‘টার্নঅ্যারাউন্ড ডে’তে সকালে একদল যাত্রী নামে; আরেকদল ওঠে। ওঠানামার এই পালাবদলের মাঝখানটা ক্রুদের সবচেয়ে ব্যস্ততম সময়। টার্নঅ্যারাউন্ড নামের এই যজ্ঞ সারাদিন ধরেই চলে।
সমুদ্র-ভ্রমণের শেষদিন সকাল থেকে শুরু হয় ডিসএমবার্কেশন। জাহাজ সকাল আট’টার দিকে পোর্টে নোঙ্গর করে। ডিসএমবার্কেশনের নিয়মমত গেস্টরা সকাল ৯টার মধ্যে কেবিন ছেড়ে দিয়ে লিভিংরুম বা উইন্টার গার্ডেনে অপেক্ষা করেন। সকাল ৬টা থেকেই আমরা তাদের জন্য শেষ-ব্রেকফাস্ট পরিবেশন করি। সকাল ১০টার মধ্যে ৯৩০ জন পুরনো গেস্টকে তাদের ৯৩০ টা লাগেজ সহ পর্যায়ক্রমে এয়ারপোর্টে ড্রপঅফ করা হয়।
দুপুর ১২টা পর্যন্ত জাহাজ প্রায় খালি থাকে। এই সময়টায় ক্লিনিং, লন্ড্রি, খাবার লোডিং করা হয়। সকাল ১১টায় শুরু করে, বিকেল ৪ টা পর্যন্ত নতুন গেস্টদের এয়ারপোর্ট থেকে পিকআপ করা হয়। দুপুর ১২টার দিকে যাত্রীরা জাহাজে পৌঁছাতে শুরু করে। বিকেল ৫টা পর্যন্ত বোর্ডি চলে। ৯৩০ জন নতুন যাত্রীর সাথে ৯৩০টা লাগেজ জাহাজে ওঠে। সেই লাগেজ সর্ট করে আলাদা আলাদা ডেকে গেস্টদের রুমে পৌঁছাতে হয়।যাতে গেস্টদের আগেই লাগেজগুলো তাদের দরজায় পৌঁছে যায়।
অন্যান্য ক্রুজ লাইনের মতোই ভাইকিং সি ক্রুজেও এটি একটা প্র্যাকটিক্যাল অপারেশনাল চ্যালেঞ্জ। এই অল্প সময়ের মধ্যে পুরো জাহাজ এবং স্টেটরুমগুলো পরিস্কারপরিচ্ছন্ন করা, শতশত টন খাবার ও জ্বালানি লোড করা, সমস্ত নিরাপত্তা পরীক্ষা সম্পন্ন করার জন্য ক্রু-দের কর্মদক্ষতা এবং নিখুঁত সমন্বয় প্রয়োজন হয়। তাই সকালে আসা নতুন গেস্টদের বোর্ডিং দিলেও দুপুর ২টার আগে কেবিন দেয়া সম্ভব হয় না।’
কথা প্রসঙ্গে জানলাম, রাজেশ ‘ভাইকিং সি ওয়াল্ড ক্যাফে’র ম্যানেজার। বলাবাহুল্য এটি একটা ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ পোস্ট।অনেক দায়দায়িত্বতো বটেই।বললাম, ‘এই-যে, প্রতিদিন এতো-এতো মানুষের সাথে আপনার পরিচয় হয়, তারপর তারা চলে যান। এটা কেমন লাগে? ক’জনের কথা আপনার মনে থাকে?’
রাজেশ কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর উদাসভাবে হাসলেন। রাজেশের অভিব্যক্তিটা যেনো রবীন্দ্রনাথের 'পোস্টমাস্টার' গল্পের শেষ লাইনটার মতো—"জীবনে এমন কত বিচ্ছেদ, কত মৃত্যু আছে, ভাবিয়া (ফিরিয়া) ফল কি। পৃথিবীতে কে কাহার।"
উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন