https://www.prothomalony.com/

18366

bangladesh

বাংলাদেশ

জ্বালানি সংকটই হতে পারে রপ্তানি সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ

প্রকাশ: ০৮ অক্টোবর ২০২৬ ০৩:২২

বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প এখন এমন এক সময় পার করছে, যখন জ্বালানি সংকটকে আর শুধু বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সরবরাহসংকট হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি দেশের রপ্তানি প্রতিযোগিতা, উৎপাদন ব্যয়, আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা এবং ভবিষ্যৎ বিনিয়োগের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। তবে সংকটের মধ্যেই একটি বড় সুযোগ রয়েছে। সঠিক নীতি ও বিনিয়োগের মাধ্যমে জ্বালানি ঝুঁকি কমানো গেলে সেটিই বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের নতুন প্রতিযোগিতামূলক শক্তিতে পরিণত হতে পারে।

ঢাকাভিত্তিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান সাউথ গ্লোবাল পার্টনার্সের সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর বাংলাদেশ এনার্জি অ্যান্ড দ্য গার্মেন্ট সেক্টর প্রতিবেদনটি এ বাস্তবতাকে গুরুত্বের সঙ্গে সামনে এনেছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট, বিপরীতে সরবরাহ ২ হাজার ৭০০ থেকে ২ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ ঘাটতি প্রায় ২৬ থেকে ২৯ শতাংশ।

শিল্পের ক্ষেত্রে সমস্যাটি আরও গভীর। কারণ শুধু গ্যাসের পরিমাণ নয়, সরবরাহের চাপ ও ধারাবাহিকতাও গুরুত্বপূর্ণ। বয়লার, ক্যাপটিভ জেনারেটর, ডাইং, ফিনিশিং ও অন্যান্য তাপনির্ভর প্রক্রিয়া নির্দিষ্ট মাত্রার জ্বালানি সরবরাহ ছাড়া দক্ষতার সঙ্গে চালানো যায় না।

গাজীপুরের উদাহরণটি উদ্বেগজনক। সেখানে শিল্পের গ্যাসের চাহিদা দৈনিক প্রায় ৫৫০ মিলিয়ন ঘনফুট, অথচ সরবরাহ প্রায় ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট। শিল্পসংশ্লিষ্ট হিসাবে দেখা যাচ্ছে, গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত কারখানার উৎপাদন সক্ষমতা ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে।

এখানে আরও একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। পোশাকশিল্প মানে শুধু সেলাই কারখানা নয়। একটি পোশাক তৈরির পেছনে রয়েছে স্পিনিং, নিটিং, উইভিং, ডাইং, ওয়াশিং ও ফিনিশিংয়ের মতো একাধিক ধাপ। এর কোনো একটি ধাপে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হলে শেষ পর্যন্ত পুরো রপ্তানি আদেশই ঝুঁকিতে পড়ে।

বাংলাদেশের কারখানাগুলো এখন পর্যন্ত যথেষ্ট সহনশীলতার পরিচয় দিয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পোশাক রপ্তানি প্রায় ৩৮ দশমিক ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। ডিজেল, সৌরবিদ্যুৎ, ব্যাটারি এবং উৎপাদনসূচির পরিবর্তনের মাধ্যমে অনেক কারখানা ক্রয়াদেশ রক্ষা করেছে। কিন্তু এই সহনশীলতারও একটি মূল্য আছে।

ডিজেল গ্যাসের তুলনায় তিন থেকে চার গুণ পর্যন্ত ব্যয়বহুল হতে পারে। কিছু কারখানা জানিয়েছে, ডিজেলনির্ভর উৎপাদনে ব্যয় প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়েছে। একটি বড় রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান সময়মতো উৎপাদন ও চালান নিশ্চিত করতে মাসে প্রায় ৩ কোটি টাকা ডিজেলে ব্যয়ের কথা জানিয়েছে।

এটি শুধু অতিরিক্ত খরচের বিষয় নয়। জ্বালানি ব্যয় বাড়লে মুনাফা কমে, চলতি মূলধনের ওপর চাপ বাড়ে এবং নতুন যন্ত্রপাতি, পরিবেশগত উন্নয়ন, শ্রমিক কল্যাণ ও প্রযুক্তি বিনিয়োগের অর্থ কমে যায়। বড় শিল্পগোষ্ঠী হয়তো এই চাপ সামলাতে পারে। কিন্তু ছোট ও ঋণনির্ভর সরবরাহকারীদের জন্য এটি দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি করছে।

আরেকটি ঝুঁকি রয়েছে লজিস্টিকসে। উৎপাদন বিলম্বিত হলে নির্ধারিত জাহাজ ধরা সম্ভব নাও হতে পারে। তখন অতিরিক্ত ভাড়া, খণ্ডিত চালান, পরবর্তী জাহাজের জন্য অপেক্ষা কিংবা জরুরি বিমান পরিবহনের মতো ব্যয়বহুল বিকল্প বেছে নিতে হয়। ফলে বাংলাদেশের প্রকৃত রপ্তানি ব্যয় শুধু কারখানার উৎপাদনমূল্যে সীমাবদ্ধ থাকে না।

ইউরোপীয় বাজারের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানও আমাদের সতর্ক করছে। ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে ইউরোপীয় ইউনিয়নে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি ১৬ দশমিক ৪৩ শতাংশ কমে ৮ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন ইউরো হয়েছে। একই সময়ে ইইউর মোট পোশাক আমদানি কমেছে ৯ দশমিক ৭০ শতাংশ।

অবশ্যই এই পতনের জন্য শুধু জ্বালানি সংকটকে দায়ী করা যাবে না। ইউরোপের দুর্বল চাহিদা, পণ্যের ধরন, বাণিজ্য সুবিধা ও ক্রেতাদের কৌশলও গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু প্রতিযোগিতার পরিবেশ যে কঠিন হচ্ছে, তা স্পষ্ট।

বাংলাদেশের প্রতিদ্বন্দ্বীরাও বসে নেই। ভারত তার বড় অভ্যন্তরীণ বাজার ও তুলনামূলকভাবে সংযুক্ত সরবরাহশৃঙ্খল কাজে লাগাচ্ছে। পাকিস্তান ইউরোপীয় বাজারে জিএসপি প্লাসের সুবিধা পাচ্ছে। ভিয়েতনাম উচ্চমূল্যের পণ্য, বাণিজ্যিক সংযুক্তি এবং নির্ভরযোগ্য সরবরাহের মাধ্যমে এগিয়ে যাচ্ছে।

তাই বাংলাদেশের জন্য শুধু 'কম দামে পোশাক তৈরি' করার কৌশল আর যথেষ্ট নয়। আন্তর্জাতিক ক্রেতারা এখন দাম ছাড়াও সময়মতো সরবরাহ, কার্বন নিঃসরণ, জ্বালানি ব্যবস্থাপনা, শ্রমমান এবং সরবরাহকারীর আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনা করেন।

এই বাস্তবতায় জ্বালানি সংকটকে শিল্প আধুনিকায়নের সুযোগে পরিণত করতে হবে।

প্রথম কাজ অবশ্যই নিরবচ্ছিন্ন শিল্প উৎপাদন নিশ্চিত করা। গ্যাস অনুসন্ধান ও সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ অব্যাহত রাখতে হবে। শিল্পাঞ্চলে গ্যাসের চাপ ও বিদ্যুৎ সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতা বাড়াতে হবে। তবে শুধু প্রচলিত জ্বালানি সরবরাহ বাড়িয়ে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হবে না।

শিল্পের জ্বালানি ব্যবস্থাকে আরও দক্ষ ও বৈচিত্র্যময় করতে হবে। প্রতিটি কারখানার জন্য জ্বালানি নিরীক্ষা করা যেতে পারে। কোথায় সৌরবিদ্যুৎ কার্যকর, কোথায় বর্জ্যতাপ পুনর্ব্যবহার করা সম্ভব, কোথায় দক্ষ বয়লার বা মোটর ব্যবহার করে জ্বালানি কমানো যাবে এবং কোথায় গ্রিডের নির্ভরযোগ্যতা বাড়ানো জরুরি, তা নির্ধারণ করতে হবে।

ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশে ইতিমধ্যে ৪ হাজার ৪৯০টির বেশি নেট-মিটারযুক্ত ছাদভিত্তিক সৌরব্যবস্থা রয়েছে। এগুলোর সম্মিলিত সক্ষমতা প্রায় ২১৪ মেগাওয়াট। এই সক্ষমতা আরও বাড়ানো দরকার। তবে সৌরবিদ্যুৎকে সব সমস্যার সমাধান ভাবা যাবে না। ডাইং, ফিনিশিং ও অন্যান্য উচ্চতাপের প্রক্রিয়ার জন্য আলাদা প্রযুক্তি ও জ্বালানি সমাধান প্রয়োজন।

একই সঙ্গে বর্জ্যতাপ পুনর্ব্যবহার, দক্ষ বয়লার, আধুনিক মোটর ও উন্নত প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণের মতো তুলনামূলক কম ব্যয়ের প্রযুক্তি দ্রুত সম্প্রসারণ করা যেতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে নতুন জ্বালানি সরবরাহের চেয়ে জ্বালানি অপচয় কমানোই দ্রুত ফল দিতে পারে।

এই রূপান্তরের আরেকটি সুবিধা রয়েছে। নির্ভরযোগ্য জ্বালানি ও উন্নত প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বাংলাদেশ উচ্চমূল্যের পণ্য উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়াতে পারে। উন্নত কাপড় ও ফিনিশিংয়ের ক্ষেত্রে স্থিতিশীল তাপমাত্রা ও মান নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ জ্বালানি রূপান্তর শুধু কার্বন নিঃসরণ কমাবে না, পণ্যের মান ও মূল্যও বাড়াতে পারে।

তবে এর জন্য অর্থায়ন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। শিল্প ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের আলোচনায় ২০৩০ সালের মধ্যে পোশাক উৎপাদনের ৫০ শতাংশ কার্বনমুক্ত করতে ৬ দশমিক ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডাক্তারের প্রয়োজনের কথা বলা হয়েছে। এই অর্থ এককভাবে শিল্পমালিকদের পক্ষে জোগাড় করা সম্ভব নয়।

এখানে সরকার, ব্যাংক, উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান ও আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের যৌথভাবে এগিয়ে আসতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি ঋণ, ঋণ নিশ্চয়তা, মিশ্র অর্থায়ন এবং ক্রেতাসমর্থিত বিনিয়োগ ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। যে প্রকল্প জ্বালানি ব্যয় কমাবে এবং উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াবে, তার অর্থায়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।

ক্রেতাদেরও দায়িত্ব আছে। কম কার্বন নিঃসরণ চান, অথচ সরবরাহকারীকে বিনিয়োগের মতো পর্যাপ্ত মূল্য ও দীর্ঘমেয়াদি ক্রয় নিশ্চয়তা দেবেন না—তাহলে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন সম্ভব হবে না। টেকসই উৎপাদনের জন্য শুধু নিরীক্ষা নয়, দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যিক অংশীদারত্বও দরকার।

সরকারের নীতিতেও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন প্রয়োজন। শিল্পের জ্বালানিকে শুধু বিদ্যুৎ ও গ্যাস খাতের সমস্যা হিসেবে দেখা যাবে না। এটিকে রপ্তানি নীতির অংশ করতে হবে। কারণ একটি স্পিনিং বা ডাইং কারখানায় নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ অনেক পোশাক কারখানার রপ্তানি ক্রয়াদেশ রক্ষা করতে পারে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সহযোগিতাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ থেকে ইইউতে আমদানির প্রায় ৯৪ শতাংশই বস্ত্রপণ্য। ২০২৫ সালে বাংলাদেশের মোট পণ্যবাণিজ্যের ২১ দশমিক ৫ শতাংশ ছিল ইইউর সঙ্গে। ফলে ইউরোপের বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে জ্বালানি দক্ষতা, কার্বন হ্রাস এবং উৎপাদনের নির্ভরযোগ্যতা এখন আর বিলাসিতা নয়, বাণিজ্যিক প্রয়োজন।

বাংলাদেশের সামনে তাই একটি স্পষ্ট কৌশল থাকা দরকার। জ্বালানি সংকট সাময়িকভাবে সামলানোর পাশাপাশি আগামী পাঁচ থেকে ১০ বছরের জন্য শিল্পের জ্বালানি রূপান্তরের একটি বাস্তবসম্মত রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে। সেখানে গ্যাস, বিদ্যুৎ, সৌরশক্তি, দক্ষতা, সঞ্চয়, পরিচ্ছন্নতর তাপ এবং অর্থায়নকে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করতে হবে।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তার প্রতিষ্ঠিত পোশাকশিল্প। রয়েছে বিশাল উৎপাদন অবকাঠামো, অভিজ্ঞ শ্রমশক্তি, আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সঙ্গে দীর্ঘ সম্পর্ক এবং বিপুল পরিমাণ পোশাক উৎপাদনের সক্ষমতা। এখন চ্যালেঞ্জ হলো এই সক্ষমতাকে নির্ভরযোগ্য ও ভবিষ্যৎ-উপযোগী করা।

জ্বালানি সংকট তাই শুধু একটি ঝুঁকি নয়। সঠিকভাবে মোকাবিলা করতে পারলে এটি বাংলাদেশের শিল্পনীতির মোড় ঘোরানোর সুযোগ হতে পারে।

আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি পোশাকশিল্প গড়ে তোলা, যেখানে উৎপাদন শুধু সস্তা নয়, নির্ভরযোগ্য; শুধু বৃহৎ নয়, দক্ষ; শুধু রপ্তানিমুখী নয়, পরিবেশগতভাবে টেকসই।

বাংলাদেশ যদি এখনই সেই পথে বিনিয়োগ করতে পারে, তাহলে জ্বালানি সংকট একদিন দেশের পোশাকশিল্পের দুর্বলতার প্রতীক না হয়ে বরং তার নতুন প্রতিযোগিতামূলক শক্তির সূচনা হিসেবে বিবেচিত হবে।

লেখক: কলাম লেখক ও গবেষক
 

বাংলাদেশ থেকে আরো পড়ুন