https://www.prothomalony.com/

18364

bangladesh

বাংলাদেশ

জাহাজভাঙা শিল্পে সনদ আছে, নিরাপত্তা নেই

প্রকাশ: ০৮ অক্টোবর ২০২৬ ০৩:১১

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারীতে 'ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং' ইয়ার্ডে অন্যান্য দিনের মতোই কাজ চলছিল। ২০ জন শ্রমিক 'এমভি রাসি' নামের একটি বিশাল ট্যাংকার জাহাজ কাটছিলেন ১৪ আগস্ট ২০২৬। জাহাজটির ওজন ৩০ হাজার ৭৭০ টন। প্রায় দেড় বছর ধরে সেটি কাটার কাজ চলছিল। শেষ দিকে একটি ট্যাংক কাটতে গিয়ে হঠাৎ জাহাজের ভেতরে আটকে থাকা বিষাক্ত গ্যাস বেরিয়ে আসে। প্রথমে দুজন শ্রমিক জ্ঞান হারান। তাদের বাঁচাতে ছুটে যান আরও দুজন, তারাও অচেতন হয়ে পড়েন। এমনকি ফোরম্যান ও মাস্ক পরা নিরাপত্তাকর্মীরাও রক্ষা পাননি। ঘটনায় নয়জন শ্রমিকের মৃত্যু হয় সঙ্গে সঙ্গে। গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন আরও ১১ জন।
 
ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা জানিয়েছেন, জাহাজ কাটার আগে সেটিকে গ্যাসমুক্ত করা হয়নি। শ্রমিকদের জন্য অক্সিজেন সিলিন্ডার ছিল না, ছিল না কোনো চিকিৎসকও। অথচ শিপ ইয়ার্ডে তিনটি অ্যাম্বুলেন্স দাঁড়িয়ে ছিল। এতে মনে হচ্ছে, এখানে একটা কিছু ঘটবে তা মালিকপক্ষ আগেই বুঝতে পেরেছন। তাই আহতদের চিকিৎসার চেয়ে মৃতদেহ সরানোর প্রস্তুতি আগেভাগেই নেওয়া হয়েছিল?
 
বিস্ফোরক অধিদফতরের সূত্র অনুযায়ী, জাহাজের ব্যালাস্ট এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছিল প্রাণঘাতী গ্যাস হাইড্রোজেন সালফাইড। উচ্চ ঘনত্বে এই গ্যাস মানুষকে দ্রুত অচেতন করে দিতে পারে। প্রশ্ন হলো, একটি ট্যাংকার ভাঙার আগে গ্যাসমুক্ত করার যে বাধ্যতামূলক প্রক্রিয়া, সেটি কেন মানা হলো না?
 
উত্তর খুঁজতে গেলে ফেরদৌস স্টিলের আগের রেকর্ডের দিকে তাকাতে হয়। মাত্র দেড় মাস আগে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদফতর এই শিপ ইয়ার্ড পরিদর্শন করে নিরাপত্তার নানা ঘাটতি পেয়েছিল, যার কারণে মামলাও হয়েছিল। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতেই একই অধিদফতর প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি অভিযোগের সত্যতা পেয়েছিল। এর মধ্যে ছিল শ্রমিকদের ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন না করা, ঝুঁকি মূল্যায়ন প্রতিবেদন জমা না দেওয়া এবং ওভারটাইমের পাওনা পরিশোধ না করা। বারবার নোটিশ পাঠানো হলেও প্রতিষ্ঠানটি কোনো জবাব দেয়নি। শেষ পর্যন্ত জুলাই মাসে বাধ্য হয়ে শ্রম আদালতে মামলা করে অধিদফতর। এতে প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার ও ব্যবস্থাপকের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। সেই মামলা এখনো চলমান।
 
মামলা চলার মধ্যেও প্রতিষ্ঠানটি কীভাবে কাজ চালিয়ে যায়, সেই প্রশ্নও স্থানীয়দের মধ্যে উঠেছে। আরও অবাক করার বিষয় হলো, নয়জন শ্রমিকের মৃত্যুর পরও কারখানা কর্তৃপক্ষ তাদের বক্তব্য বদলায়নি। গণমাধ্যমের কাছে তাদের প্রতিনিধি দাবি করেছেন, শুক্রবার কারখানা বন্ধ থাকে। সেদিন যারা কাজ করছিলেন, তারা নাকি নিরাপত্তা বিভাগের লোকজন। অথচ শ্রম আইন অনুযায়ী শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটির দিন এবং আট ঘণ্টার বেশি কাজ করালে ওভারটাইম দেওয়া বাধ্যতামূলক। এই দুই নিয়মের কোনোটিই ফেরদৌস স্টিলে মানা হতো না।
 
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো, এই বিতর্কিত কারখানাটি বাংলাদেশের একটি 'সবুজ জাহাজভাঙা কারখানা' (গ্রিন ইয়ার্ড) হিসেবে সনদপ্রাপ্ত। এই সনদ দেয় বাংলাদেশ জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ বোর্ড। সেখানে শ্রমিকের নিরাপত্তা, পরিবেশ সুরক্ষা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার নানা শর্ত মানার কথা। দেশে নিবন্ধিত ৮৪টি জাহাজভাঙা কারখানার মধ্যে ২৩টিকে এই সনদ দেওয়া হয়েছে। সেই তালিকায় ফেরদৌস স্টিলের নাম থাকায় সনদ দেওয়ার পুরো প্রক্রিয়াটিই এখন বিতর্কের সৃষ্টি করেছে।
 
সনদ দেওয়ার সময় যে যাচাই-বাছাই হওয়ার কথা এবং সনদ পাওয়ার পর যে নিয়মিত তদারকি প্রয়োজন, এই দুইয়ের মধ্যে যে বড় ফারাক রয়েছে, সীতাকুণ্ডের ঘটনাটি তা স্পষ্ট করেছে। একবার সনদ পাওয়ার পর যদি বছরের পর বছর সেটি পুনর্মূল্যায়নের বাইরে থাকে, তাহলে ওই সনদ নিরাপত্তার নিশ্চয়তা না হয়ে শুধু প্রচারের হাতিয়ারে পরিণত হতে পারে। আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা অর্জনের উপায় হিসেবেও এই সনদ ব্যবহার হতে পারে।
 
ঘটনার পর জাহাজভাঙা শিল্প মালিক সমিতি নিহতদের পরিবারকে ১০ লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ এবং আহতদের চিকিৎসার দায়িত্ব নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব কারখানা পরিদর্শন করে কার্যক্রম বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। মালিক সংগঠন বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএসবিআরএ) পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটিও গঠন করেছে। কমিটি খতিয়ে দেখবে, জাহাজটি গ্যাসমুক্ত করা হয়েছিল কি না এবং গ্যাসমুক্ত করার সনদ ছিল কি না।
 
আমাদের দেশে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে ক্ষতিপূরণ দেওয়া আর তদন্ত কমিটি গঠন করা স্বাভাবিক বিষয়। অতীতেও এমনটা হয়েছে। বলা যায়, এটি এখন একধরনের আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়েছে। অবশ্য এতে সাময়িকভাবে জনরোষ কমে, কিন্তু মূল সমস্যার সমাধান হয় না।
 
জাহাজভাঙা শিল্পের ইতিহাস দেখলে বোঝা যায়, এই শিল্প এক দেশ থেকে আরেক দেশে সরে গেছে। এর বড় কারণ ছিল পরিবেশ ও শ্রম আইনের দুর্বল প্রয়োগ। যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউরোপের কয়েকটি দেশে একসময় এই ব্যবসা রমরমা ছিল। কিন্তু জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ বাড়তে থাকায় ধীরে ধীরে সেখানে এ শিল্প বন্ধ হয়ে যায়। এরপর চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়াতেও এই শিল্পের পরিসর কমে আসে। পরে দক্ষিণ এশিয়ার উপকূলে—ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে এর বিস্তার ঘটে।
 
জাহাজভাঙায় এখন বিশ্বে ভারতের পরই বাংলাদেশের অবস্থান। প্রশ্ন হচ্ছে, উন্নত বিশ্ব যে ঝুঁকি নিজেদের দেশে রাখতে চায়নি, সেই ঝুঁকি কেন প্রতিবছর আমাদের শ্রমিকদের বহন করতে হবে? এই শিল্প এক দেশ থেকে অন্য দেশে সরে যাওয়ার পেছনে মূলত সস্তা শ্রম ও দুর্বল নজরদারির বিষয়টি কাজ করে।
 
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের হিসাবে, ২০১৫ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত এই দশ বছরে জাহাজভাঙা শিল্পে ১৩৭ জন শ্রমিক প্রাণ হারিয়েছেন। শুধু ২০১৯ সালেই মারা গিয়েছিলেন ২৩ জন। মৃত্যুর ঘটনাগুলোতে প্রায় একই কারণ সামনে আসে—নিরাপত্তা সরঞ্জামের অভাব, প্রশিক্ষণের ঘাটতি, দ্রুত উদ্ধারব্যবস্থা না থাকা এবং নিয়মিত পরিদর্শনে গাফিলতি।
 
২০১৮ সালের জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ আইন এবং ২০১১ সালের বিধিমালায় শ্রমিকের নিরাপত্তার কথা বলা হয়েছে। তারপরও বাস্তবে শ্রমিকের জীবন কেন এতটা অরক্ষিত, সেই প্রশ্ন বারবার সামনে আসে। আইন থাকা আর আইন প্রয়োগ হওয়া—এই দুইয়ের মধ্যে যে বড় ফারাক, প্রতিটি দুর্ঘটনাই আমাদের তা নতুন করে দেখিয়ে দেয়। অথচ এই ব্যবধান কমানোর কার্যকর উদ্যোগ খুব একটা দেখা যায় না।
 
প্রতিটি ঘটনার পর তদন্ত কমিটি হয়, ক্ষতিপূরণের ঘোষণা আসে, কিছুদিন আলোচনা চলে। এরপর ধীরে ধীরে বিষয়টি আড়ালে চলে যায়। এই ঘটনাটিও একদিন হয়তো আলোচনার বাইরে চলে যাবে।
 তাই আমরা বলব, সীতাকুণ্ডের এই মৃত্যু কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়; এটি একটি ব্যবস্থার ব্যর্থতা। যে ব্যবস্থায় আইন আছে, কিন্তু প্রয়োগ নেই। সনদ আছে, কিন্তু যথাযথ যাচাই নেই। মামলা চলছে, কিন্তু কার্যক্রম বন্ধ হচ্ছে না। এই ফাঁকগুলো বন্ধ না হলে আরও একটি জাহাজ, আরও একটি ইয়ার্ড, আরও কিছু শ্রমিকের নাম যুক্ত হবে এই মৃত্যুর তালিকায়।
 
শ্রমিকের জীবন রক্ষার দায়িত্ব শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের নয়, রাষ্ট্রেরও। তাই তদারকি সংস্থার হাতে সরাসরি কাজ বন্ধ করার ক্ষমতা থাকতে হবে। নিয়ম ভাঙলে মালিকদের লাইসেন্স বাতিলের বাস্তব ঝুঁকিও থাকতে হবে। তা না হলে জাহাজভাঙা শিল্পে দুর্ঘটনা ও মৃত্যুর ঘটনা কমবে না; বরং মৃত্যুর তালিকা আরও দীর্ঘ হবে।
 
লেখক: কথাসাহিত্যিক, পরিবেশ ও জলবায়ুবিষয়ক কলামিস্ট
 

বাংলাদেশ থেকে আরো পড়ুন