https://www.prothomalony.com/
18345
north-america
প্রকাশ: ০৭ অক্টোবর ২০২৬ ০২:১৯
মিশিগানকে শুধু 'মটর সিটি' বললে রাজ্যটির প্রতি কিছুটা অবিচারই করা হয়। ফোর্ড, জিএম আর ডেট্রয়েটের নাম নিলে ঠিকই অটোমোবাইলের জন্মভূমির ইতিহাস মনে পড়ে। কিন্তু পাঁচটি বিশাল হ্রদের নীল জলরেখায় চারদিক থেকে ঘেরা এই রাজ্য তার চেয়েও বড় এক গল্প বলে থাকে। একটু সাহিত্য করে বললে, এটি গ্রেট লেকের বুকে দাঁড়িয়ে থাকা এক আলাদা আমেরিকা। যেখানে শরতে লাল, কমলা আর হলুদ পাতার ভেতর দিয়ে গাড়ি চালাতে চালাতে মনে হয়, ডেট্রয়েটের প্রকৌশলীরা গাড়ি বানিয়েছিলেন। প্রকৃতি যে তাঁদের চেয়েও বড় নকশাকার।
মিশিগান রাজ্যের আরেকটি বড় অধ্যায় অভিবাসনের। একসময় ইউরোপ থেকে আসা শ্রমিকেরা ডেট্রয়েটের কারখানায় ঘাম ঝরিয়েছেন। পরে এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ এশিয়া ও আফ্রিকার অভিবাসীরা এসে রাজ্যের সামাজিক ও অর্থনৈতিক চেহারা বদলে দিয়েছেন। সবচেয়ে দৃশ্যমান উদাহরণ ডিয়ারবর্ন। যেখানে আমেরিকার পুরোনো শিল্পসভ্যতা আর নতুন অভিবাসী আমেরিকা পাশাপাশি হাঁটে।
২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্প ডিয়ারবর্নে জিতেছিলেন। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের বরাতে যা ২০০০ সালের পর কোনো রিপাবলিকান প্রার্থীর প্রথম জয় বলে বলা হয়। গাজা ও মধ্যপ্রাচ্যনীতি নিয়ে হতাশ আরব-আমেরিকান ভোটারদের একটি অংশ সেবার ডেমোক্র্যাটদের কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন। বার্তাটি স্পষ্ট ছিল: মিশিগানের মুসলিম ও আরব-আমেরিকান ভোটাররা আর কোনো দলের স্থায়ী সম্পত্তি নন। পিউ রিসার্চ সেন্টারের ২০২৩–২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, মুসলিম আমেরিকানদের ৫৩ শতাংশ ডেমোক্র্যাটদের দিকে ঝুঁকেন। ৪২ শতাংশ রিপাবলিকানদের দিকে, ফলে ব্যবধান আগের চেয়ে অনেক সংকীর্ণ।
এই পরিবর্তনের সবচেয়ে নাটকীয় প্রতীক এখন আবদুল এল-সাইয়েদ। সাবেক স্বাস্থ্য কর্মকর্তা এই প্রগতিশীল মুসলিম ডেমোক্র্যাট ৫ আগস্ট ২০২৬ সালে অত্যন্ত অল্প ব্যবধানে প্রাইমারিতে কংগ্রেসওম্যান হ্যালি স্টিভেন্সকে হারিয়ে সিনেট মনোনয়ন জিতেছেন। নভেম্বরে জিতলে তিনিই হবেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম মুসলিম সিনেটর। তাঁর জয় মুসলিম, আরব, তরুণ ও প্রগতিশীল ভোটারদের বাড়তে থাকা রাজনৈতিক ওজনেরও এক বড় সংকেত। কিন্তু সেই জয়ের পরপরই শুরু হয়েছে আক্রমণ।
রিপাবলিকানরা তাঁর পূর্ণ নাম 'আবদুর রহমান মোহাম্মদ এল-সাইয়েদ' ব্যবহার করে বিজ্ঞাপন ছেড়েছে। তাঁকে 'সবচেয়ে উগ্রপন্থী' প্রার্থী বলেছে। কেউ কেউ সন্ত্রাসবাদের সঙ্গেও জুড়ে দিয়েছেন। যদিও এসব দাবির পক্ষে প্রমাণ হাজির করা হয়নি। এল-সাইয়েদের নিজের জবাব ছিল, তিনি সারা জীবন মিশিগানে 'আবদুল' হয়েই বড় হয়েছেন। এই রাজ্য আবদুল হওয়ার জন্য পৃথিবীর সেরা জায়গা।
সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব অর্গানাইজড হেইটের হিসাবের বরাতে টাথআউটের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রাইমারির পর মুসলিমবিরোধী পোস্ট বেড়েছে বিশগুণ। মিশিগানের একটি জরিপে ৫৭.২ শতাংশ ভোটার বলেছেন, গত দুই বছরে মুসলিম আমেরিকানদের বিরুদ্ধে ইসলামোফোবিয়া বেড়েছে, ৫৮.৭ শতাংশ বলেছেন ইহুদিবিদ্বেষও বেড়েছে। অর্থাৎ ধর্মীয় পরিচয় আর রাজনীতির সংঘাত এখানে নির্বাচনী প্রচারের ভাষা পেরিয়ে মানুষের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার অংশ হয়ে উঠছে।
এই রাজ্যের ভোটারকে তাই এক বাক্যে বোঝা কঠিন। যিনি সকালে গাড়ির কারখানায় কাজ করেন, বিকেলে মসজিদে যান আর সন্ধ্যায় সন্তানের স্কুলের খবর নেন। নির্বাচনের দিন তিনি দুই দলের প্রতিশ্রুতিরই হিসাব করেন। মিশিগান তাই আমেরিকার 'পার্পল স্টেট'গুলোর এক গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। যেখানে নীল আর লাল দুই রঙেরই শক্তি আছে।
২০১৬ সালে রাজ্যটি অল্প ব্যবধানে ট্রাম্পকে বেছে নেয়। ২০২০ সালে যায় জো বাইডেনের দিকে, আর ২০২৪ সালে আবার ট্রাম্পের দিকে। এবারের সিনেট লড়াইয়ে এল-সাইয়েদের সামনে রিপাবলিকান প্রার্থী সাবেক কংগ্রেস সদস্য মাইক রজার্স। জরিপগুলো বলছে প্রতিযোগিতা প্রায় সমানে সমান। মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটির সমীক্ষায় (১০–২০ আগস্ট) নিবন্ধিত ভোটারদের মধ্যে এল-সাইয়েদ ৪৮–৪৪ শতাংশে এগিয়ে। এমারসন কলেজের ১২–১৪ সেপ্টেম্বরের জরিপে ৪৮–৪৬। ম্যারিস্ট পোলের ২৪–২৭ সেপ্টেম্বরের জরিপে নিবন্ধিত ভোটারদের মধ্যে ৫১–৪৪। ফক্স নিউজের ২৪–২৮ সেপ্টেম্বরের জরিপে সম্ভাব্য ভোটারদের মধ্যে মাত্র ৫০–৪৯। ফক্সের জরিপ আরও জানাচ্ছে, আগস্টে যেখানে রজার্স চার পয়েন্টে এগিয়ে ছিলেন, সেখানে এখন চিত্র উল্টে গেছে।
গভর্নরের দৌড়ে ডেমোক্র্যাট জসলিন বেনসন প্রতিটি জরিপেই রিপাবলিকান জন জেমসের চেয়ে তুলনামূলক বেশি ব্যবধানে এগিয়ে আছেন। তবু মিশিগানের ভোটাররা শেষ মুহূর্তে মত বদলাতে পারেন। ২০২৪ সাল তা দেখিয়েছে, আর অর্থনীতি, জীবনযাত্রার ব্যয়, অভিবাসন, গাজা ও মধ্যপ্রাচ্যনীতি এবং ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকাণ্ড সবই শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত ঘুরিয়ে দিতে পারে।
দুই দলের সামনেই তাই কঠিন প্রশ্ন। ডেমোক্র্যাটরা কি শ্রমিক শ্রেণির পুরোনো ভোটার, কৃষ্ণাঙ্গ ভোটার, তরুণ প্রগতিশীল, মুসলিম ও আরব-আমেরিকান ভোটার এবং শহরতলির মধ্যপন্থীদের একই ছাতার নিচে ধরে রাখতে পারবেন? রিপাবলিকানদের জন্য ট্রাম্পের কঠোর অভিবাসননীতি ও সাংস্কৃতিক যুদ্ধের রাজনীতি যেমন একটি অংশকে উজ্জীবিত করে। তেমনি অন্য অংশকে দূরে ঠেলে দেওয়ার ঝুঁকিও তৈরি করে। মিশিগানের রাজনীতি তাই অনেকটা ডেট্রয়েটের গাড়ির মতো: ইঞ্জিন শক্তিশালী, স্টিয়ারিংও হাতের কাছে, কিন্তু রাস্তা সবসময় সোজা নয়।
শরতের পাতা এখানে কথা বলে, কারখানার চিমনিও বলে, মসজিদের আজান আর ইউনিয়নের পুরোনো স্মৃতিও বলে। নির্বাচনের মৌসুমে সবাই কথা বলে, কিন্তু শেষ কথাটা বলে কেবল ভোটের বাক্স। প্রশ্ন হলো, সেই বাক্স থেকে যে উত্তর বেরোবে, তা কি শুধু একটি রাজ্যের নয়, একটি বদলে যাওয়া আমেরিকার ভবিষ্যৎই বলে দেবে?
উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন