https://www.prothomalony.com/

18352

north-america

উত্তর আমেরিকা

ক্রিস্টা পাইক: মৃত্যুদণ্ডের শেষ মুহূর্তে যে নিঃশ্বাস থামেনি

প্রকাশ: ০৭ অক্টোবর ২০২৬ ০৩:৩৪

কখনো কখনো মৃত্যুর আয়োজন এত নিখুঁত হয় যে, সেখানে জীবনের জন্য কোনো জায়গা থাকার কথা নয়। সময় নির্ধারিত, কক্ষ প্রস্তুত, সাক্ষী উপস্থিত, ওষুধ প্রস্তুত, আদালতের শেষ দরজাটিও বন্ধ। তারপরও কোথা থেকে যেন একটি নিঃশ্বাস এসে সব হিসাব এলোমেলো করে দেয়।

৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬। টেনেসির নাশভিলের রিভারবেন্ড ম্যাক্সিমাম সিকিউরিটি ইনস্টিটিউশন। সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত নামছে। পঞ্চাশ বছরের ক্রিস্টা পাইককে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার আয়োজন চলছে। প্রায় তিন দশক ধরে তিনি মৃত্যুসেলে। সেই দীর্ঘ অপেক্ষার শেষে রাষ্ট্র এবার তাঁর জীবন শেষ করতে এসেছে।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্র তাঁকে হত্যা করতে পারেনি। গার্নিতে বাঁধা পাইক মৃত্যুকক্ষের ভেতর থেকে জানিয়েছিলেন, তাঁর বাহুতে প্রচণ্ড ব্যথা হচ্ছে, একটি জায়গা দপদপ করছে। তারপর শুরু হলো ইনজেকশন। পর্দা নামল। কিছুক্ষণ পর উঠল। আবার নামল। পর্দার ওপাশ থেকে ভেসে আসতে লাগল নিঃশ্বাসের শব্দ। ঘুমের মতো শব্দ। নাক ডাকার মতো শব্দ। কখনো শরীর নড়ছে।
অর্থাৎ—যাঁকে হত্যা করার জন্য রাষ্ট্রের এত আয়োজন, তিনি তখনও বেঁচে আছেন।

সাক্ষীদের বের করে দেওয়া হলো। জরুরি যানবাহন ছুটে এলো। পরে তাঁর আইনজীবীরা আদালতে জানালেন, দুই ডোজ পেন্টোবারবিটাল দেওয়ার পরও পাইকের শ্বাস-প্রশ্বাস ও হৃৎস্পন্দন ছিল। তাঁকে কারাগার থেকে হাসপাতালে নেওয়া হলো।

ঘটনাটির শুরু অবশ্য ৩০ সেপ্টেম্বর নয়। যেতে হয় ১৯৯৫ সালের ১২ জানুয়ারির সেই রাতে। নক্সভিলের জব কর্পস-এর ক্যাম্পাসে পরিচয় হয়েছিল ১৮ বছরের ক্রিস্টা পাইক এবং ১৯ বছরের কোলিন স্লেমারের। পাইক এসেছিলেন পশ্চিম ভার্জিনিয়া থেকে। স্লেমার ফ্লোরিডা থেকে। দুজনেরই সামনে ছিল জীবন। বয়স এমন, যখন ভবিষ্যৎ মানে অনেকগুলো সম্ভাবনা—কোনো শেষ অধ্যায় নয়।

কিন্তু সেই রাতে স্লেমারের জন্য ভবিষ্যৎ বলে আর কিছু থাকেনি। প্রসিকিউশনের ভাষ্য অনুযায়ী, পাইকের মনে সন্দেহ জন্মেছিল—স্লেমার তাঁর প্রেমিক তাদারিল শিপের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করছেন। সেই সন্দেহ, ঈর্ষা এবং প্রতিশোধের পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত স্লেমারকে একটি নির্জন এলাকায় নিয়ে যায়। সেখানে তাঁকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।

এই হত্যাকাণ্ডের বিবরণ এতটাই নৃশংস যে তা পুনরাবৃত্তি করার প্রয়োজন নেই। তাঁর তারুণ্যের সেই জীবন আর ফিরে আসেনি।
পাইক ধরা পড়লেন। বিচার হলো। জুরি তিন ঘণ্টারও কম সময়ে তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করল। ১৯৯৬ সালের মার্চে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলো। শিপ পেলেন যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, আর শ্যাডোলা পিটারসন প্রসিকিউশনের সঙ্গে সহযোগিতা করে প্রবেশন পান।
পাইকের জীবনে শুরু হলো আরেক জীবন—মৃত্যুর অপেক্ষার জীবন।

প্রায় ত্রিশ বছর। এই দীর্ঘ সময়ে তাঁর আইনজীবীরা বারবার বলেছেন, তাঁর শৈশব ছিল নির্যাতন, ট্রমা ও অস্থিরতায় ভরা। তাঁরা দাবি করেছেন, শাস্তি নির্ধারণের সময় এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জুরির সামনে যথেষ্টভাবে আসেনি। আরও বলেছেন, বিচার শুরুর আগে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের একটি সম্ভাব্য সমঝোতার কথাও উঠেছিল, কিন্তু তা যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি। অন্যদিকে, কারাগারে থাকাকালীন পাইক নিজেও আরেক বন্দিকে শ্বাসরোধ করার চেষ্টায় দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন এবং অতিরিক্ত ২৫ বছরের সাজা পেয়েছিলেন।

অর্থাৎ গল্পটি সাদা-কালো নয়। একদিকে একজন তরুণীকে নির্মমভাবে হত্যা করার দায়ে দণ্ডিত একজন নারী। অন্যদিকে, সেই অপরাধের বহু বছর পর নিজের অতীত নিয়ে অনুতপ্ত ও পরিবর্তিত হওয়ার দাবি করা একজন বৃদ্ধতর মানুষ। একটি সত্য অন্যটিকে মুছে দেয় না। ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৫-এ টেনেসি সুপ্রিম কোর্ট পাইকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের তারিখ ঠিক করেছিল—৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আইনি লড়াই চলেছে। ২২৬ পৃষ্ঠার ক্লেমেন্সি আবেদন করা হলো। জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরাও তাঁর দীর্ঘ একাকী কারাবাস ও নির্যাতনমূলক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলেন। কিন্তু ২৮ সেপ্টেম্বর গভর্নর বিল লি তাঁর ক্ষমা প্রার্থনা প্রত্যাখ্যান করলেন।

রাষ্ট্র বলল—সাজা বহাল থাকবে। কিন্তু তখন আরেকটি অস্বস্তিকর ঘটনা সামনে। এই বছরই টেনেসিতে টনি ক্যারুথার্সের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছিল। এক ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে শিরায় প্রবেশের পথ খুঁজে না পাওয়ায় সেই প্রক্রিয়া বন্ধ করতে হয়েছিল। ফলে পাইকের দিনটি যত এগিয়ে আসছিল, ততই প্রশ্ন উঠছিল—রাষ্ট্র কি এবার প্রস্তুত?

রাষ্ট্রের উত্তর ছিল—হ্যাঁ। গত ৩০ সেপ্টেম্বর সকাল ১০টায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার কথা। কিন্তু ঠিক এক ঘণ্টা আগে ষষ্ঠ সার্কিট আপিল আদালত নতুন একটি আবেদন বিবেচনা করতে সাময়িক স্থগিতাদেশ দেয়। কয়েক ঘণ্টা পর মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট সেই স্থগিতাদেশ তুলে নেয়।

দরজা আবার খুলে গেল। সন্ধ্যার পর মৃত্যুকক্ষ প্রস্তুত হলো। তারপর সেই অদ্ভুত দৃশ্য। দুই ডোজ ওষুধ দেওয়া হলো।
তবু মানুষটি বেঁচে রইলেন। কারাগার কর্তৃপক্ষ বলল, নির্ধারিত প্রটোকলের প্রতিটি ধাপ অনুসরণ করা হয়েছে। প্রটোকলে অতিরিক্ত কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগও ছিল না।  কিন্তু একটি প্রটোকল যখন জীবন্ত মানুষের নিঃশ্বাসের সঙ্গে মুখোমুখি দাঁড়ায়, তখন প্রশ্নটা শুধু প্রটোকলের থাকে না।

পাইককে হাসপাতালে নেওয়া হলো। কয়েকদিন তিনি অচেতন ছিলেন, ভেন্টিলেটরে ছিলেন। তাঁর আইনজীবীরা বলেছিলেন, তিনি গুরুতর অবস্থায় আছেন। আর ৬ অক্টোবর এসে তাঁরা জানালেন—ক্রিস্টা পাইক এখন সচেতন এবং কথা বলছেন। তাঁর দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক অবস্থার পূর্বাভাস অবশ্য এখনও পরিষ্কার নয়।

এর মধ্যে টেনেসির গভর্নর বছরের বাকি সময়ের সব মৃত্যুদণ্ড স্থগিত করেছেন এবং পুরো ঘটনার একটি স্বাধীন তৃতীয় পক্ষের তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। কয়েক দিনের মধ্যে রাজ্যের কারেকশন ডিপার্টম্যান্টের কমিশনার ফ্রাঙ্ক স্ট্রাডাও পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন। রাষ্ট্রের জন্য এটি নিঃসন্দেহে একটি প্রশাসনিক ব্যর্থতা।কিন্তু প্রশ্নটি তার চেয়েও বড়।

মৃত্যুদণ্ডের উদ্দেশ্য যদি হয় রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে একটি নির্ধারিত, নিয়ন্ত্রিত ও আইনসম্মত মৃত্যু নিশ্চিত করা, তাহলে সেই মৃত্যুও যদি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়—তখন রাষ্ট্রের হাতে কী থাকে? একটি ব্যর্থ ইনজেকশন? একজন জীবিত বন্দি? একটি স্বাধীন তদন্ত?
নাকি আরও গভীর কোনো প্রশ্ন?

কোলিন স্লেমারকে যখন হত্যা করা হয়েছিল, তখন তাঁর সামনে দ্বিতীয় কোনো সুযোগ ছিল না। তাঁর জীবন থেমে গিয়েছিল সেখানেই। সেই অপরাধের জন্য ক্রিস্টা পাইক প্রায় ত্রিশ বছর মৃত্যুর অপেক্ষায় থেকেছেন। এখন রাষ্ট্র নিজেই একটি দ্বিতীয় সুযোগের মুখোমুখি।
এই দ্বিতীয় সুযোগ পাইকের জন্য নয়—রাষ্ট্রের নিজের জন্য।

একজন মানুষকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত রাষ্ট্র নিতে পারে—আইন তাকে সেই ক্ষমতা দিয়েছে। কিন্তু সেই ক্ষমতা প্রয়োগের পদ্ধতি যখন ব্যর্থ হয়, তখন প্রশ্নটি শুধু এই নয় যে, “কোথায় ভুল হয়েছিল?” আরও বড় প্রশ্নটি হলো— একটি রাষ্ট্র যখন একটি জীবন শেষ করতে চায়, তখন তার নিজের হাতে সেই জীবন শেষ করার কতটা নিশ্চিততা থাকা উচিত? সেই নিশ্চিততা যদি না থাকে—তাহলে মৃত্যুদণ্ড কি শুধু একটি সাজা, নাকি রাষ্ট্রের নিজের কাছেও একটি অসমাপ্ত প্রশ্ন?

উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন