https://www.prothomalony.com/
18350
north-america
প্রকাশ: ০৭ অক্টোবর ২০২৬ ০৩:২২
নির্বাচনের দিন এখনো চার সপ্তাহ দূরে। অথচ আমেরিকার ব্যালটবাক্স আর ডাকঘরের খামে ভোট জমতে শুরু করেছে অনেক আগেই। সোমবার পর্যন্ত জানা গেছে, ইতিমধ্যে দশ লাখেরও বেশি ব্যালট পড়ে গেছে। বিভিন্ন জরীপ মডেলের হিসাবে ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদ ফিরে পাওয়ার ‘চমৎকার অবস্থানে’ আছে। সিনেটেও তারা এগিয়ে।
জরীপর পূর্বাভাসে প্রতিনিধি পরিষদ ডেমোক্র্যাটদের হাতে যাওয়ার সম্ভাবনা ৭৬ শতাংশ। সিনেটের ক্ষেত্রে ৫৬ শতাংশ। অর্থাৎ ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন নিয়ে প্রশ্নটা আর ‘ওয়াশিংটনের ক্ষমতার ভারসাম্যে কোনো বদল আসবে কি না’ নয়; প্রশ্ন হলো, সেই বদল কতটা গভীর হবে, কোন চেম্বারে ঘটবে, এবং ক্ষমতার নতুন বিন্যাসে ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের বাকি দুই বছর কেমন কাটবে।
পটভূমিটা আগে মনে করা যাক। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ট্রাম্প যখন হোয়াইট হাউসে ফিরলেন, তাঁর অনুমোদনের হার ছিল পঞ্চাশের কোঠায়। আজ সেই সংখ্যাটা ঠেকেছে ঊনচল্লিশে। এনবিসি নিউজের পোলিং গড়ে তাঁর সমর্থন ৩৯ শতাংশ, অসমর্থন ৫৯; সিলভার বুলেটিনের গড়ে সমর্থন ৩৭.৪ শতাংশ, যা দ্বিতীয় মেয়াদে তাঁর সর্বনিম্ন। মার্কেট ল স্কুলের জরিপে ৪০-৬০। ওহাইওতে নিউইয়র্ক টাইমস ও সিয়েনার সাম্প্রতিক জরিপে তিনি দাঁড়িয়ে আছেন ৩৮ শতাংশে। ৬০ শতাংশ অসমর্থনের মুখে।
আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচনের পুরোনো সূত্র হলো, হোয়াইট হাউসের বাসিন্দার দল প্রায় সব সময়ই হারে। মূল বাসিন্দার জনপ্রিয়তা যত তলানিতে নামে, হারের মাত্রা তত বাড়ে। কিন্তু এবার একটা তির্যক সূক্ষ্মতাও আছে। সাধারণ কংগ্রেসনাল ব্যালটে ডেমোক্র্যাটদের এগিয়ে থাকার ব্যবধান আগস্টে এমারসন কলেজের জরিপে নেমে এসেছে ৭.৭ পয়েন্টে, জুলাইয়ে যা ছিল ১১.৪; রিয়েলক্লিয়ারপলিটিক্সের গড়ে সেপ্টেম্বরের শুরুতে ব্যবধান ছিল ৫.৮।
২০১৮ সালে ট্রাম্পের প্রথম মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ডেমোক্র্যাটদের লিড ছিল আরও জোরালো। এবার ট্রাম্প অজনপ্রিয় হলেও ডেমোক্র্যাটরা নিজেদের ভাবমূর্তির সংকট কাটিয়ে উঠতে পারেননি। অর্থাৎ ভোটারের রাগটা যতটা ডেমোক্র্যাটদের প্রতি ভালোবাসা থেকে, তার চেয়ে বেশি ট্রাম্পের প্রতি বিরক্তি থেকে।
প্রতিনিধি পরিষদের লড়াইয়ের আসল নাটক ঘটেছে ব্যালটের আগেই, মানচিত্রের টেবিলে। ২০২৫ সালের আগস্টে ট্রাম্পের তাগিদে টেক্সাস রিপাবলিকানরা নতুন মানচিত্র আঁকলেন, লক্ষ্য পাঁচটি বাড়তি আসন। জবাবে ক্যালিফোর্নিয়ার ডেমোক্র্যাটরা গভর্নর নিউজমের নেতৃত্বে গণভোটে গেলেন।
গত নভেম্বরে প্রায় ৬৪ শতাংশ ভোটে পাশ হওয়া সেই মানচিত্র ডেমোক্র্যাটদের পাঁচটি আসনের সম্ভাবনা দিল। মিসৌরি, নর্থ ক্যারোলাইনা ও ওহাইও যোগ করল আরও চারটি রিপাবলিকান-ঘেঁষা আসন; ফ্লোরিডা এপ্রিলে যোগ করল আরও চারটি। এরপর ২৯ এপ্রিল সুপ্রিম কোর্ট ৬-৩ রায়ে লুইজিয়ানা বনাম কালাইস মামলায় ভোটাধিকার আইনের দ্বিতীয় ধারাকে এমনভাবে সংকুচিত করল যে বিচারপতি এলিনা কেগান লিখলেন, ধারাটি কার্যত ‘মৃত অক্ষর’। তার পরপরই লুইজিয়ানা, টেনেসি ও আলাবামায় রিপাবলিকানরা কৃষ্ণাঙ্গ-সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনগুলো ভাঙার তোড়জোড় শুরু করলেন।
ডেমোক্র্যাটদের পাল্টা চালটি অবশ্য মুখ থুবড়ে পড়েছে: ভার্জিনিয়ার ভোটাররা এপ্রিলের গণভোটে মধ্যবর্তী পুনর্বিন্যাসের পক্ষে রায় দিলেও (প্রায় ৫১.৬ শতাংশ ভোটে) রাজ্যের সুপ্রিম কোর্ট মে মাসে সেই সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করেছে, ফলে পুরোনো মানচিত্রই বহাল। রিপাবলিকানদের নিট লাভ কত, তা নিয়ে হিসাবের গরমিল আছে। বিভিন্ন ট্র্যাকার ও বিশ্লেষণে সংখ্যাটা আট থেকে বারোর মধ্যে ঘুরছে, আর বেশ কিছু মানচিত্র এখনো আদালতের কাঠগড়ায়। ট্রাম্প নিজে দাবি করেছিলেন, কালাইস-পরবর্তী পুনর্বিন্যাসে রিপাবলিকানরা কুড়িটিরও বেশি আসন পাবে। সেই হিসাব বাস্তবে মেলেনি।
আশ্চর্যের কথা হলো, এত কারসাজির পরও পূর্বাভাসগুলো ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে। পোলিওয়েভের মডেলে ডেমোক্র্যাটরা ২২৩-২১২ আসনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাচ্ছে (জয়ের জন্য দরকার ২১৮)। ডিসিশন ডেস্কের তালিকায় ‘টস-আপ’ আসনের মধ্যে আছে পেনসিলভানিয়ার ৮, ওহাইওর ৭, নর্থ ক্যারোলাইনার ১ ও ১১, টেক্সাসের ১৫ ও ৩৫, আইওয়ার ২, মিশিগানের ১০ এবং নিউইয়র্কের ১৭ নম্বর ডিসট্রিক্ট।
রাজনৈতিক ভাষ্যকার এড কিলগোর মে মাসেই যুক্তি দিয়েছিলেন, ডেমোক্র্যাটদের জরিপ-লিড শেষ পর্যন্ত রিপাবলিকানদের গেরিম্যান্ডারিংয়ের সুবিধাকে ছাপিয়ে যাবে। পাঁচ মাস পর অন্তত অধিকাংশ পূর্বাভাসদাতা তাঁর পক্ষেই দাঁড়িয়ে আছেন। তবে ‘অধিকাংশ’ মানে ‘সবাই’ নয়। ২৪ শতাংশ সম্ভাবনার ফাঁক দিয়ে মাইক জনসনের স্পিকারশিপ বেঁচে যেতেও পারে।
সিনেটের চড়াইটা অনেক খাড়া। বর্তমান ৫৩-৪৭ বিন্যাসে (দুই স্বতন্ত্র সদস্য ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে) ডেমোক্র্যাটদের চাই নিট চারটি আসন। কারণ ৫০-৫০ হলে ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্সের টাই-ভাঙা ভোটে রিপাবলিকানরাই থাকবে। লড়াই চলছে ৩৫টি আসনে, যার তেইশটি রিপাবলিকানদের হাতে। সবচেয়ে সম্ভাবনাময় নর্থ ক্যারোলাইনা। যেখানে থম টিলিস অবসরে যাওয়ায় সাবেক গভর্নর রয় কুপার রিপাবলিকান মাইকেল হোয়াটলির বিরুদ্ধে গড়ে প্রায় নয় পয়েন্টে এগিয়ে। ওহাইওর বিশেষ নির্বাচনে শ্যারড ব্রাউন সিনেটর জন হাস্টেডকে চ্যালেঞ্জ করছেন। গড়ে তিন পয়েন্টের কিছু বেশি লিডে।
টেক্সাসে প্রাইমারিতে সিনেটর কর্নিনকে হারিয়ে আসা কেন প্যাক্সটনের মুখোমুখি ডেমোক্র্যাট জেমস তালারিকো। নিউইয়র্ক টাইমস ও সিয়েনার জরিপে ছয় পয়েন্টে এগিয়ে। আলাস্কায় মেরি পেলটোলা নিউইয়র্ক টাইমসের জরিপে সিনেটর ড্যান সালিভানের চেয়ে সাত পয়েন্টে এগিয়ে। যদিও অন্যান্য গড়ে ব্যবধান দুই পয়েন্টের কম। মেইনে সুসান কলিন্সের সামনে এখন ডেমোক্র্যাট ট্রয় জ্যাকসন, যিনি যৌন অসদাচরণের অভিযোগে বিপর্যস্ত গ্রাহাম প্লাটনারের জায়গায় এসেছেন। ব্যবধান প্রায় শূন্য, আর সিএনএনের তথ্য অনুযায়ী আগামী দশ দিনে তাঁদের চারটি বিতর্ক হবে।
আইওয়ায় অ্যাশলি হিনসন ও জশ তুরেক প্রায় সমান সমান। কানসাসে, যে রাজ্য চুরানব্বই বছর কোনো ডেমোক্র্যাটকে সিনেটে পাঠায়নি, জরিপ বলছে টাই। উল্টো পিঠে ডেমোক্র্যাটদের নিজেদের ঘর সামলাতে হবে মিশিগান, জর্জিয়া ও নিউ হ্যাম্পশায়ারে, আর ইনসাইড ইলেকশনস অক্টোবরের শুরুতে মিশিগানকে ‘টস-আপ’ থেকে সরিয়ে রিপাবলিকানদের দিকে হেলানো হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ফলে সিনেটের হিসাব সরু সুতোয় ঝুলছে। ডিসিশন ডেস্ক বলছে, দুই কক্ষই ডেমোক্র্যাটদের হাতে যাওয়ার সম্ভাবনা ৫৩ শতাংশ। ডেমোক্র্যাট হাউস ও রিপাবলিকান সিনেটের ‘বিভক্ত’ ফল ২৩ শতাংশ। অন্যদিকে পোলিওয়েভের মডেলে সিনেট ৪৯-৪৯-এর মতো এমন এক অচলাবস্থায় থামছে। যেখানে ভ্যান্সের ভোটই শেষ কথা। পূর্বাভাসদাতাদের এই মতভেদই সবচেয়ে সৎ সংবাদ: সিনেট এখনো কারও নয়।
তাহলে ক্ষমতার ভারসাম্য বদলালে ঠিক কী বদলাবে? প্রথমত, কমিটির সভাপতির চেয়ার, আর তার সঙ্গে সমন জারির ক্ষমতা। ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদ জিতলে ট্রাম্প, তাঁর পরিবার ও প্রশাসনের বিরুদ্ধে ব্যাপক তদন্তের প্রস্তুতি নিচ্ছে। হাকিম জেফরিস, যিনি স্পিকার হওয়ার সারিতে, ট্রাম্প-পরিবারের সম্পদবৃদ্ধিকে সামনে এনে ‘দুর্নীতির মূল্য’ চোকানোর কথা বলছেন। ইমপিচমেন্ট ‘টেবিলের বাইরে নয়’, তবে প্রগতিশীল শিবিরের চাপ সত্ত্বেও লক্ষ্য হিসেবে ক্যাবিনেটের লোকজনই বেশি সম্ভাব্য। কারণ সিনেটে দুই-তৃতীয়াংশ ছাড়া প্রেসিডেন্টকে অপসারণ অসম্ভব।
হোয়াইট হাউস যে সমন উপেক্ষা করবে, সেই আশঙ্কাও ডেমোক্র্যাটরা করছেন। দ্বিতীয়ত, টাকার ক্ষমতা। কংগ্রেস সরকারি অর্থায়ন বাড়িয়ে রেখেছে ১১ ডিসেম্বর পর্যন্ত। ওই তারিখের মধ্যে নতুন সরকার-তহবিল বিল না হলে আবারও শাটডাউন ঘনাবে, আর এই কংগ্রেসের আমলেই আমেরিকা দেখেছে ৪৩ দিনের রেকর্ড শাটডাউন। তারপর হোমল্যান্ড সিকিউরিটি দপ্তরের ৭৬ দিনের আরেকটি, যা শেষ হয়েছে এপ্রিলে।
নির্বাচনে জিতলে ডেমোক্র্যাটরা ডিসেম্বরের দরকষাকষিতে ধীরে চলার প্রলোভনে পড়বেন। ২০১৮ সালে ডেমোক্র্যাটরা হাউস জেতার পর ডিসেম্বরের শেষ থেকে জানুয়ারির শেষ পর্যন্ত গড়ানো শাটডাউন সেই ইতিহাসের সাক্ষী। তৃতীয়ত, আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে ক্ষমতার বদল হবে প্রধানত আটকে দেওয়ার। গড়ে তোলার নয়। ট্রাম্পের ভেটো আর সিনেটের নিয়ম মিলিয়ে ডেমোক্র্যাটদের হাউস আইন পাশ করে ফেলতে পারবে না। কিন্তু রিপাবলিকানদের এজেন্ডা, যেমন ইরান যুদ্ধের তহবিল বা সদ্য স্থগিত থাকা ক্রিপ্টোকারেন্সি বিল, তা-ও আর সহজে পার পাবে না। যদি সিনেটও ডেমোক্র্যাটদের হাতে যায়, তাহলে বিচারক ও ক্যাবিনেট কর্মকর্তাদের নিয়োগ-অনুমোদনের চাবিকাঠিও চলে যাবে তাদের হাতে, যেটা বদলের মাত্রাকে সম্পূর্ণ ভিন্ন স্তরে নিয়ে যাবে।
অভিবাসন-প্রশাসনের নীতি বদলানোর ক্ষমতা কংগ্রেসের নেই, সেটা এক্সিকিউটিভ শাখার হাতে। কিন্তু অভিবাসন ও কাস্টমস এনফোর্সমেন্টের বাজেট, নজরদারি-শুনানি আর আইসিই-র কার্যক্রমের ওপর চাপ সৃষ্টির ক্ষমতা কংগ্রেসের হাতে। হোমল্যান্ড সিকিউরিটি দপ্তরের ৭৬ দিনের শাটডাউন দেখিয়েছে, ডেমোক্র্যাটরা এই লড়াইয়ে কতদূর যেতে প্রস্তুত। হাউস হাতবদল হলে সেই চাপ শুধু বাড়বে। যদিও তাতে ডিপোর্টেশন আপনাআপনি থেমে যাবে না। এই পার্থক্যটা পাঠকের কাছে স্পষ্ট থাকা ভালো, কারণ নির্বাচনী মরসুমে আশার দাম প্রায়ই প্রতিশ্রুতির চেয়েও বেশি দেওয়া হয়।
সব পূর্বাভাসের গায়েই অবশ্য ‘যদি’ নামের ছোট অক্ষরের সতর্কবার্তা লেগে থাকে। জরিপ আবারও ভুল করলে সেই ভুল যে ডেমোক্র্যাটদের পক্ষেই যাবে, তা ধরে নেওয়ার কোনো কারণ নেই। ভোটদানের হার, মানচিত্র নিয়ে আদালতের শেষ মুহূর্তের রায়, ট্রাম্পের নিজস্ব রাজনৈতিক চাপ—সবই অনিশ্চয়তার উপাদান। ডেমোক্র্যাটদের জন্য আরেকটি অস্বস্তিকর সত্য হলো, জয় এলেও সেটা আসবে জনসমর্থন বাড়িয়ে নয়, বরং প্রেসিডেন্টের প্রতি বিরক্তির ধার ধরে। এ ধরনের জয়ে ম্যান্ডেট যত সংকীর্ণ, দায়িত্ব তত দীর্ঘ।
যে ব্যবস্থায় ভোটাররা নেতা বাছাই করার আগেই নেতারা ভোটার বাছাই করে ফেলেন, যেখানে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের একটি রায় রাতারাতি কয়েকটি রাজ্যের মানচিত্র বদলে দেয়, সেখানে ৩ নভেম্বরের ব্যালট আসলে কার কণ্ঠ? এই নির্বাচনে ক্ষমতার ভারসাম্য সত্যিই হেলবে কি না, তার উত্তর দেবে আমেরিকার ভোটাররা। কিন্তু ভারসাম্য বলতে আমরা আসলে কী বুঝি, দাঁড়িপাল্লা, না যে হাত দাঁড়িপাল্লা ধরে আছে সেই হাত, সে প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার দায় রয়ে যাবে আমাদের সবারই।
উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন