https://www.prothomalony.com/
18341
north-america
এয়ারপোর্ট থেকে যখন আমাদের বাস সিভিটাভেচ্ছিও সমুদ্রবন্দরের দিকে যাত্রা শুরু করলো, জানালা দিয়ে বিশাল জলাশয় দেখা যাচ্ছিল। ড্রাইভার জানালেন, “লিউনার্দো এয়ারপোর্টটাটাইবার নদী এবং টাইরেনিয়ান সাগরের ঠিক সঙ্গমস্থলে অবস্থিত।যদিও নদীতে বাঁধ দেয়ারকারনে নদীর মুখটা অনেকটাই ঢাকা পড়ে গেছে।তবে টাইবারের স্রোতধারা রোম শহর থেকেটাইরেনিয়ান পযন্ত বয়ে যেতে কোনো বাঁধা পড়েনি।”
বাস যখন টাইবারের মোহনা পেরিয়ে, সমুদ্রের পাশ্ববর্তী হাইওয়ে ধরে এগুতে শুরু করলো, আমাদের গাইড হাসিমুখে সবাইকে সম্ভাষণ জানালেন। যাত্রা প্রস্তুতিকালে বাস ড্রাইভারের সাথে তিনিও সবার কাগজপত্র পরীক্ষার কাজে সহায়তা করছিলেন। মাইক হাতে দাঁড়ানোর পরে, এতক্ষণে, তার ভূমধ্যসাগরীয় লাবন্যমাখা মুখখানা আমার নজরে এলো।
“আচ্ছা মনে করে দেখুনতো, আপনারা রোমের এমন কোনো রাজার গল্প শুনেছেন কিনা, রাজ্যেযখন দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছিল, মানুষ, গবাদি পশু, ঘরবাড়ি, গাছপালা, পুড়ে ছাই হয়েযাচ্ছিল, কিন্তু রাজা তখন নির্বিকার মনে বাঁশি বাজাচ্ছিলেন।” আমাদের গাইড খুব নাটকীয় ভঙ্গীতে তার গল্প শুরু করলেন।
“জানি, আপনারা বলবেন, এই গল্পতো আমরা সেই ছোটবেলা থেকেই শুনে আসছি। হ্যা, আমিও এভাবেই শুনেছি। বহুকাল ধরে গল্পটা এভাবেই চলে আসছে। আপনারা এসেছেন, সেইঅদ্ভুত রাজার দেশে।
আমি সোফিয়া। আমাদের রোম নিয়ে গল্পের শেষ নেই — পুরো শহরটাই গল্প দিয়ে তৈরি। আমার জন্ম এই গল্পের শহরেই। আপনাদের গাইড হিসেবে, এক ঘন্টার এই যাত্রাপথে, গল্পেগল্পে আমরা রোমের রহস্য উন্মোচনের চেষ্টা করবো।
আসলে কী হয়েছিলো জানেন? সম্রাট নিরোর রাজত্বকালে, রোমে ভয়াবহ আগুন লাগে। সেইআগুনে প্রায় ৬ দিন ধরে শহর পুড়ছিল। হাজার হাজার মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়ে।কিন্তু আয়রনিহল, নিরো তখন রোমে ছিলেন না। খবর পেয়ে তিনি তাড়াতাড়ি রোমে ফিরে আসেন।আর বাঁশিবাজানো? তখন-তো বাঁশি আবিস্কারই হয়নি।
ফিরে এসে তিনি আগুন নেভানোর উদ্যোগ নেন।গৃহহীনদের আশ্রয় এবং খাবারের ব্যবস্থাকরেন। কিন্তু অহংকার, ক্ষমতারদম্ভ এবং পারিবারিক হত্যাকাণ্ডের কারনে নিরোর জনপ্রিয়তা খুব কম ছিল। একারনেই নিরোর বিরুদ্ধে এটা ছিল রোমানদের একটা রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা। যুগের পর যুগ ধরে চলা এই প্রোপাগান্ডাই কালক্রমে মিথে পরিনত হয়েছে।
সোফিয়া তার গল্প থামিয়ে, বোতল থেকে পানি পান করলো। বললো, “এই বাসে আপনারা প্রায়ষাট জন টুরিস্ট আছেন। আপনারা এসেছেন পৃথিবীর নানাপ্রান্ত থেকে। আমাদের দায়িত্ব হচ্ছেআপনাদের ভাইকিং শীপের ডকে পৌঁছে দেয়া। রোম নগরীর দর্শনীয় স্থানগুলো ঘুরে দেখানোরযেহেতু সুযোগ নেই, তাই আজ আমরা বাসের ভেতরেই রোমান হলিডে উদযাপন করবো।আপনারা কি আধুনিক রোমের গল্প শুনতে চান, নাকি প্রাচীন রোমের মিথোলজিক্যাল গল্পশুনতে চান? “
যাত্রীদের সবাই দেখলাম পৌরাণিক গল্পের প্রতিই আগ্রহী বেশী। আমি নিজেও পৌরাণিক গল্পভালোবাসি। তাই আমিও পৌরাণিক গল্পে আগ্রহ প্রকাশ করলাম।কিন্ত সোফিয়ার গল্প শুরু হল ‘রোমান হলিডে’ মুভি দিয়ে।
“এই সেই রোম নগরী, অড্রে হেপবার্ন এবং গ্রেগরি পেক যেখানে তাদের বিখ্যাত মুভি রোমানহলিডের শুটিং করেছিলেন। আমেরিকান সাংবাদিক জো ব্র্যাডলি এবং রাজকুমারী অ্যানেরমতোই রোম’ও এই সিনেমার একটা প্রধান চরিত্র।রাজকুমারী অ্যান তার দৈনন্দিন জীবনেররাজকীয়প্রথায় হাফিয়ে উঠেছিলেন। তাই সে পালিয়ে এসে রোমের সাধারণ মানুষের মতো একটাদিন কাটাতে চেয়েছিলেন। ঘটনাচক্রে তার সাথে দেখা হয়ে যায় আমেরিকান সাংবাদিক জোব্র্যাডলির সাথে। তারা একত্রে আনন্দময় একটা দিন কাটান। যা একজন রাজকুমারির জীবনেসম্পূর্ণ অবাস্তব এবং অসম্ভব।”
সোফিয়া এবার হাসতে হাসতে বললো, “ রোমান হলিডে সিনেমা কোনো মিথ নয়, কিন্তু এইগল্পেও মিথ জড়িয়ে আছে। রোমান কিংবদন্তির কারনেই ‘রোমান হলিডে’ মুভির কিছু দৃশ্যও কিংবদন্তিতে পরিনত হয়েছে। ‘বোক্কা দেল্লা ভেরিতা’র সান্তা মারিয়া গির্জায় একটি পাথরের মূর্তী আছে।এই মূর্তী নিয়ে পৌরাণিক বিশ্বাস হল— কোনো মিথ্যাবাদী যদি তার হাত পাথরেরমুখে প্রবেশ করায়, তাহলে পাথরের মুখ সেই হাতটি কামড়ে ধরে। তাহলে সে সমাজে মিথ্যাবাদী হিসেবে পরিচিত হয়ে যায়। সিনেমায় গ্রেগরি পেক সেই পাথরের মুখের অভ্যন্তরে হাত ঢুকিয়েযন্ত্রনার ভান করেন। যেনো পাথরের মুখ তার হাতখানা কামড়ে ধরেছে। রোমান হলিডে সিনেমার জনপ্রিয়তার কারনেই হয়তো সেই গির্জার বাইরে টুরিস্টদের লম্বা লাইন লেগে থাকে।কারণ সবাই গ্রেগরি পেকের মতো মূর্তির মুখে হাত ঢুকিয়ে ছবি তুলতে চান। আপনারা আবারকখনো রোমে এলে, অবশ্যই কয়েকদিন থাকবেন। রোম ঘুরে দেখবেন এবং বোক্কা দেল্লাভেরিতা’র নামটা অবশ্যই বাকেট লিস্টে রাখবেন।”
রোমে’র নামকরনের গল্পটাও খুব অভিনব। রোম নগরীর নামকরণের পেছনে একটা জনপ্রিয় কিংবদন্তি আছে।ট্রয়যুদ্ধের পর রাজপুত্র ইনিয়াস রাজকন্যা রিয়া সিলভিয়াকে নিয়ে ইতালিতেআসেন। যুদ্ধদেবতা মার্সের সাথে রিয়া’র বিয়ে হয়।রিয়া’র দুই যমজ ছেলে জন্ম হলে তাদের নামরাখা হয়, রোমুলাস এবং রেমাস।
কিন্তু দৈবক্রমে শিশু অবস্থায় তাদেরকে টাইবার নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। একটি মা নেকড়েভাসমান শিশুদের বাঁচায় এবং নিজের দুধ খাইয়ে বড় করে তোলে। কিন্তু বড় হয়ে দুই ভাইয়েরভেতরে মতান্তর ঘটলে, রোমুলাস তার ভাই রেমাসকে হত্যা করেন। রোমুলাস একটা শহর গড়েতোলেন এবং নিজের নাম অনুসারে শহরটির নাম রাখেন রোম। তাই রোমের প্রতীক আজওসেই নেকড়ে ও দুই শিশু।
শহর বানানোর পর রোমুলাস দেখলেন শহরে শুধু পুরুষ, কোনো নারী নেই। তিনিউদ্দেশ্যপূর্ণভাবেই একটা উৎসবের আয়োজন করেন এবং পাশ্ববর্তী সাবিনগোষ্ঠির নারীদেরদাওয়াত করেন। তারপর সেই মেয়েদের জোর করে অবরুদ্ধ করে রাখেন।পরে এই দুই গোত্রেরনারীপুরুষের মাধ্যমেই রোমে পরিবারপ্রথা শুরু হয়। রোমান সাম্রাজ্যে হত্যা, ষরযন্ত্র এবংক্ষমতাদখলের মতো নৃশংসতা থাকলেও ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, রোমানরাই বিশ্ব সভ্যতারসূচনা করেছিল।
পথে যেতে যেতে ছোট ছোট কয়েকটা শহর পড়ল। একদিকে মানুষের বসতি, পাইন গাছ, আর বাঁদিকে বয়ে চলেছে টাইরেনিয়ান সাগর। ততক্ষণে সোফিয়ার বর্ননায় উঠে এসেছেন সম্রাটজুলিয়াস সিজার এবং সুন্দরী ক্লিউপেট্টা। সিজার ছিলেন রোমান সাম্রাজ্যের সর্বময় নেতা।সিজার জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত এই রোমেই কাটিয়ে গেছেন।
জুলিয়াস সিজারের সাথে প্রেমের সম্পর্কের কারনেই মিশরের রানী ক্লিউপেট্টা রোমে বসবাসশুরু করেছিলেন। তিনি থাকতেন টাইবার নদীর ওপারে, ট্রাস্টেভেরে এলাকার। সিজারেরবাগানবাড়িতে। বিদেশী ক্লিউপেট্টার রোমে বসবাসকে রোমানরা পছন্দ করেনি। তাই সিজার খুনহওয়ার পরপরই তিনি রোম ছেড়ে মিশরে ফিরে যান।
জুলিয়াস সিজার খুন হওয়ার পর রোম দুই ভাগ হয়ে যায়। পূর্ব অংশের শাসক হন মার্কঅ্যান্টনি। তিনি রোম পুনর্গঠনে ক্লিওপেট্রার কাছে সাহায্য চান। এভাবেই রোমের ইতিহাসেক্লিওপেট্রার দ্বিতীয় অভিষেক ঘটে। রোম এবং ক্লিওপেট্টা অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িয়ে যান।
ক্লিওপেট্রার সাথে প্রথম দেখাতেই অ্যান্টনি তার প্রেমে পড়ে যান।কিন্তু এই প্রেমিক যুগলের জীবনের শেষঅংকটা ছিল সিজারের মতোই করুন। ক্লিওপেট্রার সাথে সম্পর্কের কারণেঅ্যান্টনির জনপ্রিয়তাও কমে যায়। অগাস্টাসের সাথে যুদ্ধে পরাজিত হয়ে এবং ক্লিওপেট্রারমৃত্যুর গুজবে অ্যান্টনি দিশাহারা হয়ে আত্মহত্যা করেন। ক্লিওপেট্রাও অ্যান্টনির মৃত্যুর খবরপেয়ে আত্মহত্যা করেন।
রোমিও-জুলিয়েট, লাইলি-মজনুর প্রেমের উপাখ্যানের মতোই আমার চোখের সামনেক্লিওপেট্টা-অ্যান্টনির ছবি ভাসতে লাগলো। মনে পড়ে গেলো, রাজকীয় পোশাক, সোনার মুকুটপরা, মিশরের রানী ক্লিওপেট্রারূপী এলিজাবেথ টেলর সিংহাসনে বসে আছেন। তার বুকের উপর কেউটে সাপটি ধরা। তারপর ধীরে ধীরে সিংহাসনে এলিয়ে পড়লেন রানী। রানীর মতোইরাজকীয় মৃত্যুবরণ।এভাবেই রোমের বিখ্যাত প্রেমের ইতি ঘটল।
কিছুক্ষণের জন্য আমরা যেনো রোমের পৌরাণিক আমলে হারিয়ে গিয়েছিলাম। ততক্ষণেআমাদের ট্যুরবাস সিভিটাভেচ্ছিও সমুদ্রবন্দরে এসে দাঁড়িয়েছে। ড্রাইভার বাস থামাতেই সোফিয়া বললো, “আমরা গন্তব্যে পৌঁছে গেছি। সিভিটাভেচ্ছিও বন্দরের যেখানে আমরা দাঁড়িয়ে আছি, ১৯০০ বছর আগে ঠিক এখানেই রোমান জাহাজ ভিড়তো। তাকিয়ে দেখো, এখন তোমাদের ভাইকিং সি সেখানেই নোঙ্গর করে দাঁড়িয়ে আছে।”
আমরা একে একে বাস থেকে সবাই নামলাম। তাকিয়ে দেখি, একদিকে মাইকেলেঞ্জেলোর দূর্গ, আরেকদিকে ভাইকিং সি’র বিশাল সাদা জাহাজ।
সোফিয়া দূর্গটি দেখিয়ে বললো, “পাঁচশো বছর আগে জলদস্যুদের আক্রমণ ঠেকাতে এই দুর্গটিতৈরি করা হয়েছিল। বন্দরের পাহাড়ার জন্য বানানো হলেও এখানেও পড়েছিল কালজয়ী একশিল্পীর ছোঁয়া। এই দুর্গের ছাঁদের নকশার কাজ করেছিলেন মাইকেলেঞ্জেলো। মাইকেলেঞ্জেলো শুধু একজন ভাস্কর নন। তিনি একটা যুগের নাম। তিনি পাথর কেটে এমন মূর্তী তৈরি করতেন, যেনো পাথরের ভেতর, কেউ খুঁজে বের করার অপেক্ষায় মানুষটা এতদিন ঘুমিয়ে ছিলো। এইশিল্পী বিয়ে করেননি। একা থাকতেন। লিখতেন, ছবি আঁকতেন, পাথর খুঁড়ে মূর্তী গড়তেন।এভাবেই তার দীর্ঘজীবনের সমাপ্তি ঘটে। রোমেই তার জন্ম। রোমেই মারা যান।
কী ক্ষণস্থায়ী আমাদের এই জীবন। টাইরেনিয়ান সাগরের একই জল, একই পথ, একই বন্দর — সময়ের পরিক্রমায় শুধু যাত্রী বদলে গেছে।
উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন