https://www.prothomalony.com/
18235
new-york
প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১৪:১০
রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানের একমাত্র পথ তাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণভাবে নিজ দেশ মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন। তবে সে প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমারে নিরাপদ ও অনুকূল পরিবেশ তৈরি হওয়া জরুরি। বর্তমান পরিস্থিতি সেই পথকে কঠিন করে তুললেও বাংলাদেশ এ সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য কাজ করে যাচ্ছে।
একই সঙ্গে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের বিশেষ করে ক্যাম্পে বেড়ে ওঠা শিশু-কিশোরদের শিক্ষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণের আওতায় আনার প্রয়োজনীয়তাও নতুন করে সামনে এসেছে। বিশাল এই জনগোষ্ঠীকে বছরের পর বছর মৌলিক শিক্ষা ও দক্ষতা থেকে বাইরে রাখা হলে ভবিষ্যতে তা শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্যও আরও বড় মানবিক ও সামাজিক সংকট তৈরি করতে পারে।
নিউইয়র্কে এক আলোচনায় এমন মতামত উঠে এসেছে সরকারের প্রতিনিধি, রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে কাজ করা সরকারি কর্মকর্তা, বেসরকারি সংগঠন এবং বাংলাদেশি-আমেরিকান কমিউনিটির প্রতিনিধিদের বক্তব্যে।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনকে কেন্দ্র করে মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে হিউম্যান কনসার্ন ইন্টারন্যাশনালের আয়োজনে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে এ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনায় প্রধান অতিথি ছিলেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী প্রবীণ রাজনীতিবিদ এম ইকবাল হোসেইন এমপি। তাঁর সঙ্গে নিউইয়র্ক সফর করছেন শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান।
আলোচনায় রোহিঙ্গা সংকটের বর্তমান পরিস্থিতি, আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়া, প্রত্যাবাসনের সম্ভাবনা, ক্যাম্পে জন্ম নেওয়া নতুন প্রজন্মের ভবিষ্যৎ এবং বাংলাদেশের সামনে তৈরি হওয়া দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
প্রতিমন্ত্রী এম ইকবাল হোসেইন বলেন, রোহিঙ্গা সমস্যার স্থায়ী সমাধানের কোনো বিকল্প নেই। তাঁদের নিজ দেশে নিরাপদ প্রত্যাবাসনই একমাত্র পথ। তবে তিনি বলেন, যে পরিস্থিতির কারণে রোহিঙ্গারা মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন, সেই পরিস্থিতির পরিবর্তন না হলে প্রত্যাবাসন বাস্তবায়ন করা কঠিন। মিয়ানমারের বর্তমান পরিস্থিতি বাংলাদেশের জন্য বিষয়টিকে আরও জটিল করে তুলেছে। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, একই সঙ্গে বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের নিয়ে সরকারের চিন্তাভাবনার পরিধিও বাড়ছে।
বিশেষ করে ক্যাম্পে বসবাসরত শিশু-কিশোরদের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন তিনি। প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, রোহিঙ্গাদের ন্যূনতম শিক্ষার সুযোগ এবং কারিগরি প্রশিক্ষণের আওতায় আনার বিষয়ে সরকার পদক্ষেপ নেওয়ার কথা ভাবছে। দীর্ঘ সময় ধরে ক্যাম্পে অবস্থানরত এই জনগোষ্ঠীকে কোনো ধরনের শিক্ষা বা দক্ষতার বাইরে রাখা হলে ভবিষ্যতে তাদের নিজেদের জীবন যেমন অনিশ্চিত হবে, তেমনি এর প্রভাব পড়তে পারে বৃহত্তর সমাজ ও আন্তর্জাতিক পরিসরেও। মন্ত্রী নিজে ওটি সম্প্রতি এ বিভাগের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন এবং সমস্যাটি নিয়ে ঐকান্তিক কাজ কাজ করার জন্য তিনি তাঁর প্রতিশ্রুতির কথা উল্লেখ করেছেন।
আলোচনার শুরুতে হিউম্যান কনসার্ন ইউএসএর প্রধান নির্বাহী মাসুম মাহবুব বলেন, রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলের আগ্রহ আগের তুলনায় অনেকটাই কমে এসেছে। একই সঙ্গে মানবিক সহায়তার পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা এখন শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, পুরো বিশ্বের জন্য একটি দীর্ঘস্থায়ী মানবিক সংকট। মাসুম মাহবুব বলেন, এবারের জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে রোহিঙ্গা সংকটকে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান আন্তর্জাতিক এজেন্ডা হিসেবে তুলে ধরা জরুরি। সংকটটি যত দীর্ঘায়িত হবে, এর মানবিক ও সামাজিক ঝুঁকিও তত বাড়বে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন। হিউম্যান কনসার্নের মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের নিয়ে বাংলাদেশে যে মানবিক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা দ্রুত আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। তাঁর মতে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আবারও এই সংকটের দিকে ফেরানো জরুরি।
রোহিঙ্গা সংকটের বর্তমান পর্যায়ের শুরু থেকেই মাঠপর্যায়ে কাজ করা শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান আলোচনায় সংকটটির বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনের কোনো বিকল্প নেই। তবে কবে এবং কীভাবে সেই প্রত্যাবাসন সম্ভব হবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
মিজানুর রহমান বলেন, যুক্তরাষ্ট্র রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দায়িত্ব নেওয়ার পর মার্কিন সহায়তা সংকুচিত হলেও যুক্তরাষ্ট্র এখনো রোহিঙ্গা মানবিক সহায়তার ক্ষেত্রে অন্যতম বড় দাতা।
মার্কিন জনগণের করের অর্থ থেকে পরিচালিত মানবিক সহায়তার জন্য তিনি বাংলাদেশি-আমেরিকানদের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের জনগণকে ধন্যবাদ জানান। একই সঙ্গে বাংলাদেশি-আমেরিকানদের আরও সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী বাংলাদেশিদের নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী এই মানবিক সংকটে আরও ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে। মিজানুর রহমানের বক্তব্যের সবচেয়ে উদ্বেগজনক অংশ ছিল রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বেড়ে ওঠা শিশু-কিশোরদের ভবিষ্যৎ নিয়ে। তিনি বলেন, ক্যাম্পে জন্ম নেওয়া বিপুলসংখ্যক শিশু ও কিশোর এখনো মৌলিক শিক্ষার আওতায় আসতে পারেনি। প্রতিদিনই নতুন শিশু জন্ম নিচ্ছে, যাদের ভবিষ্যৎ পরিচয় ও নাগরিকত্ব নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
অর্থের সংকটের কারণে সরকার ও বেসরকারি সংস্থাগুলো বর্তমানে রোহিঙ্গাদের জীবনধারণের মৌলিক প্রয়োজন মেটানোতেই বেশি গুরুত্ব দিতে বাধ্য হচ্ছে। খাদ্য, আশ্রয়, স্বাস্থ্য ও অন্যান্য জরুরি সহায়তার বাইরে শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নের মতো দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়ছে। কিন্তু এই বাস্তবতার মধ্যেই ভবিষ্যতের আরেকটি সংকট তৈরি হচ্ছে বলে সতর্ক করেন তিনি।
মিজানুর রহমান বলেন, একটি বিশাল জনগোষ্ঠী যদি বছরের পর বছর শিক্ষা ও দক্ষতা থেকে বঞ্চিত থাকে, তাহলে তাদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। মাদক, অপরাধ কিংবা বিভিন্ন অপশক্তির প্রভাবের ঝুঁকিও তখন বাড়তে পারে। তাঁর মতে, রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের প্রস্তুতির পাশাপাশি তাদের মানবিক মর্যাদা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সক্ষমতা তৈরির বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। এই জায়গায় হিউম্যান কনসার্নের মতো বেসরকারি সংগঠনগুলোর সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও পরিচালিত কার্যক্রমকে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন তিনি।
আলোচনায় অংশ নিয়ে নিউজার্সির ফ্র্যাঙ্কলিন টাউনশিপের কাউন্সিলওম্যান শেপা উদ্দিন বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী বাংলাদেশি-আমেরিকানদের রোহিঙ্গা সংকট সম্পর্কে আরও জানার প্রয়োজন রয়েছে। তিনি বলেন, দূর থেকে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন দেখে সংকটটির কিছুটা ধারণা পাওয়া গেলেও সরাসরি সরকারি কর্মকর্তা ও মাঠপর্যায়ে কাজ করা সংগঠনের প্রতিনিধিদের কাছ থেকে আলোচনায় অংশ নিয়ে পরিস্থিতির গভীরতা সম্পর্কে নতুন করে ধারণা পাওয়া যায়। তাঁর মতে, সংকটটি যতটা আন্তর্জাতিক সংবাদে দৃশ্যমান, বাস্তব পরিস্থিতি তার চেয়েও কঠিন হতে পারে। বাংলাদেশের সরকারি সংস্থা, বেসরকারি সংগঠন এবং বাংলাদেশি-আমেরিকান কমিউনিটির সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
নাগরিক সংগঠক জালাল উদ্দিন বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের ভয়াবহতা নিয়ে তিনি এর আগে বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন তথ্য জানলেও সরকারি কর্মকর্তা এবং হিউম্যান কনসার্নের মতো সংগঠনের কাছ থেকে সরাসরি শুনে বিষয়টির গভীরতা সম্পর্কে তিনি আরও উদ্বিগ্ন হয়েছেন।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনকে ঘিরে নিউইয়র্কে যখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানেরা জড়ো হয়েছেন, ঠিক সেই সময়েই বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘদিনের এই সংকট নিয়ে এমন আলোচনা অনুষ্ঠিত হলো।
আন্তর্জাতিক মঞ্চে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের প্রশ্নটি আবার সামনে আনার চেষ্টা করছে বাংলাদেশ।যদিও এবারে প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে দৃশ্যমান কোন সেমিনার বা আলোচনা দৃশ্যমান হয়নি। কক্সবাজারের ক্যাম্পগুলোতে বেড়ে উঠছে এমন একটি প্রজন্ম, যারা মিয়ানমার দেখেনি, বাংলাদেশকেই তাদের একমাত্র পরিচিত বাস্তবতা হিসেবে জানে। এই দ্বৈত বাস্তবতাই হয়তো রোহিঙ্গা সংকটের সবচেয়ে কঠিন দিক।
একদিকে প্রত্যাবাসন—যার জন্য নিরাপদ ও অনুকূল পরিবেশ প্রয়োজন। অন্যদিকে অপেক্ষারত একটি প্রজন্ম—যাদের শৈশব কেটে যাচ্ছে ক্যাম্পে, শিক্ষার সুযোগ সীমিত, ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত।
আলোচনায় বক্তাদের বক্তব্যে তাই একটি বিষয় বারবার ফিরে এসেছে—প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক চাপ ও কূটনৈতিক উদ্যোগ যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রত্যাবাসন না হওয়া পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের মানবিক মর্যাদা, শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনাও প্রয়োজন।
রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান শেষ পর্যন্ত মিয়ানমারেই। কিন্তু সেই সমাধানের অপেক্ষায় বাংলাদেশে বেড়ে ওঠা একটি পুরো প্রজন্মকে অন্ধকারে রাখা যায় না—নিউইয়র্কের এই আলোচনায় সেটিই ছিল সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা।
আলোচনায় আরও উপস্থিত ছিলেন প্রথম আলো উত্তর আমেরিকার সম্পাদক ইব্রাহীম চৌধুরী, নির্বাহী সম্পাদক মনজুরুল হক, প্রতিবেদক মনীষা দত্ত, আবু চৌধুরী, আব্দুল হাইসহ সাংবাদিক, নাগরিক সংগঠক ও কমিউনিটির বিভিন্ন পর্যায়ের প্রতিনিধিরা।
নিউইয়র্ক থেকে আরো পড়ুন