https://www.prothomalony.com/

18223

opinion

অভিমত

সমাজ বদলাতে পরিবার থেকেই শুরু হোক সচেতনতা

প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৪:৩২

প্রতিদিন খবরের কাগজ খুললেই কোনো না কোনো অপ্রত্যাশিত ও হৃদয়বিদারক ঘটনার খবর চোখে পড়ে। কোথাও শিশু হত্যা, কোথাও ধর্ষণ, কোথাও মাদকাসক্তির কারণে অপরাধ, কোথাও বাল্যবিবাহ, আবার কোথাও চাঁদাবাজি ও সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা। প্রশ্ন জাগে,আমরা কি সত্যিই আমাদের সন্তানদের জন্য একটি নিরাপদ সমাজ রেখে যেতে পারছি?

সম্প্রতি কুমিল্লায় ১৩ বছর বয়সী স্কুলছাত্র ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের মৃত্যু সেই প্রশ্নকে আরও গভীর করে তুলেছে। অপ্রতিম বন্ধুদের সঙ্গে বের হয়েছিল। পরে তার মরদেহ উদ্ধার হয়। পুলিশি তদন্তে তার সঙ্গে বয়সে বড় তরুণদের বন্ধুত্ব এবং আইফোনসহ বিভিন্ন বিষয় সামনে এসেছে। ঘটনাটিতে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং মামলার বিচারিক প্রক্রিয়াও এগোচ্ছে।

অপ্রতিমের মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের কান্না নয়; এটি আমাদের পরিবার ও সমাজের জন্য একটি সতর্কবার্তা। একটি শিশু কার সঙ্গে মিশছে, কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে অনলাইনে যোগাযোগ করছে—এসব বিষয়ে বাবা-মায়ের সচেতন থাকা প্রয়োজন। সন্তানকে শুধু শাসন করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। তার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করতে হবে, যাতে সে ভয় না পেয়ে নিজের সমস্যা, বন্ধুত্ব ও দৈনন্দিন জীবনের কথা পরিবারের কাছে বলতে পারে।

বর্তমান সময়ে স্মার্টফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম শিশু-কিশোরদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই প্রযুক্তি কেড়ে নেওয়া নয়, বরং নিরাপদ ব্যবহার শেখানো দরকার। অপরিচিত বা বয়সে অনেক বড় মানুষের সঙ্গে বন্ধুত্ব, গোপনে দেখা করা, সন্দেহজনক অনলাইন যোগাযোগ কিংবা হঠাৎ আচরণ পরিবর্তনের মতো বিষয়গুলো পরিবারকে গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।

একই সঙ্গে মাদক আমাদের তরুণ সমাজের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ। মাদক থেকে বেরিয়ে আসার জন্য শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান যথেষ্ট নয়। পরিবারকে সন্তানের মানসিক পরিবর্তন বুঝতে হবে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে নজরদারি ও কাউন্সেলিং বাড়াতে হবে এবং সমাজকে মাদক ব্যবসার বিরুদ্ধে সম্মিলিতভাবে দাঁড়াতে হবে।

বাল্যবিবাহও আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বড় বাধা। একটি শিশুর হাতে বই থাকার কথা, অথচ অনেক ক্ষেত্রে তার হাতে তুলে দেওয়া হয় সংসারের দায়িত্ব। মেয়েদের শিক্ষা বন্ধ করে অল্প বয়সে বিয়ে দেওয়া কোনো পরিবারের ভবিষ্যৎ নিরাপদ করে না; বরং নতুন সামাজিক ও পারিবারিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

চাঁদাবাজি ও ভয়ভীতির সংস্কৃতিও সামাজিক নিরাপত্তাকে দুর্বল করে। একজন সাধারণ মানুষ যেন নিজের ব্যবসা, কর্মস্থল ও এলাকায় নিরাপদে চলাফেরা করতে পারেন,এটি নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সমাজ উভয়ের দায়িত্ব। অভিযোগ করলে হয়রানি বা প্রতিশোধের ভয় থাকবে,এমন পরিবেশ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

তবে সব দায় শুধু প্রশাসনের ওপর দিয়ে আমরা নিজেদের দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে পারি না। পরিবার হলো শিশুর প্রথম নিরাপত্তাবলয়। বাবা-মাকে সন্তানের বন্ধু হতে হবে। সন্তান কোথায় যায়, কার সঙ্গে মেশে, কী দেখে, কীভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে—এসব বিষয়ে নিয়মিত কথা বলতে হবে। একই সঙ্গে সন্তানকে এমনভাবে বড় করতে হবে, যাতে সে অন্যায় দেখলে প্রতিবাদ করতে শেখে এবং বিপদে পড়লে সাহায্য চাইতে দ্বিধা না করে।

প্রশাসনের দায়িত্ব হলো অভিযোগ দ্রুত গ্রহণ করা, শিশু ও নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অপরাধের নিরপেক্ষ তদন্ত করা এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা। আর সমাজের দায়িত্ব হলো অপরাধকে প্রশ্রয় না দেওয়া, অপরাধীকে সামাজিকভাবে রক্ষা না করা এবং ভুক্তভোগীর পাশে দাঁড়ানো।

অপ্রতিমের মতো আর কোনো শিশুর জীবন যেন আমাদের অসচেতনতা, ভুল বন্ধুত্ব বা সামাজিক অবহেলার কারণে হারিয়ে না যায়। প্রতিটি শিশুর নিরাপদে বেড়ে ওঠার অধিকার আছে। সেই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সমাজ ও রাষ্ট্র সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

কারণ একটি শিশুকে হারানোর পর শুধু শোক প্রকাশ করে লাভ নেই, শিশুটিকে হারানোর আগেই তাকে নিরাপদ রাখার ব্যবস্থা করতে হবে।
#

অভিমত থেকে আরো পড়ুন