https://www.prothomalony.com/
18230
north-america
ফিলাডেলফিয়ায় বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের বন্ধু, শান্তিকর্মী, মানবাধিকারকর্মী ও সমাজসেবী ফিলিস টেলরের জীবন ও কর্ম স্মরণে আবেগঘন এক স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। ২০ সেপ্টেম্বর রোববার অনুষ্ঠিত এ আয়োজনে তাঁর পরিবারের সদস্য, বন্ধু, সাবেক সহকর্মী, শান্তিকর্মী, সমাজকর্মী, বিভিন্ন অভিবাসী কমিউনিটির প্রতিনিধি এবং বাংলাদেশি কমিউনিটির নেতৃবৃন্দ অংশ নেন।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানে অস্ত্র সরবরাহের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে গড়ে ওঠা ঐতিহাসিক অবরোধ আন্দোলনের অন্যতম সাহসী কর্মী ছিলেন ফিলিস টেলর। স্বামী রিচার্ড টেলরসহ শান্তিকর্মীদের সঙ্গে তিনি পাকিস্তানের উদ্দেশে অস্ত্রবাহী জাহাজ ঠেকানোর অহিংস আন্দোলনে অংশ নেন। ফিলাডেলফিয়া ও বাল্টিমোর বন্দরে পরিচালিত ওই প্রতিবাদ কর্মসূচিতে ছোট নৌকা ও ক্যানো নিয়ে অস্ত্রবাহী জাহাজের গতিপথ বাধাগ্রস্ত করার মতো ঝুঁকিপূর্ণ কর্মসূচিতেও অংশ নেন তাঁরা।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এ আন্দোলন আন্তর্জাতিক সংহতির একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়। কয়েক মাস ধরে চলা প্রতিবাদ ও আন্দোলনের পর যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানে অস্ত্র রপ্তানি বন্ধ করে দেয় বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে।
তবে ফিলিস টেলরের জীবন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রতি সমর্থনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। দীর্ঘ জীবনে তিনি শান্তি, মানবাধিকার, কারাবন্দিদের অধিকার, স্বাস্থ্যসেবা এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করেছেন। নার্স ও চ্যাপলিন হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি কারাগারে স্বাস্থ্য ও মানবিক অধিকার নিয়ে কাজ করেন তিনি। যুক্ত ছিলেন বিভিন্ন সামাজিক ও মানবিক উদ্যোগের সঙ্গেও।
বর্ণবাদ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে অবস্থান ছিল তাঁর জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ১৯৬০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক অধিকার আন্দোলনে অংশ নেন ফিলিস টেলর। ফোলক্রফটে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ পরিবারের বসবাসের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনেও তিনি পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে যুদ্ধবিরোধী আন্দোলন, অভিবাসী ও শরণার্থীদের সহায়তা এবং বিভিন্ন মানবাধিকার কার্যক্রমে তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ অব্যাহত ছিল।
বাংলাদেশের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কও দীর্ঘদিন অটুট ছিল। ২০২৫ সালে ফিলাডেলফিয়া বইমেলা ও নিউইয়র্কে আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলায় প্রধান অতিথি হিসেবে অংশ নেন তিনি। সেসব আয়োজনে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি এবং তাঁর স্বামী রিচার্ড টেলরের ভূমিকার কথা তুলে ধরেন ফিলিস।
১৯৭১ সালের আন্দোলন ও ফিলিস টেলরের জীবনকে ঘিরে নির্মিত অবরোধ প্রামাণ্যচিত্রেও তাঁর সাক্ষাৎকার ও স্মৃতিচারণ স্থান পেয়েছে। পরিচালক আরিফ ইউসুফ নির্মিত ৮৫ মিনিটের এই প্রামাণ্যচিত্রে ফিলিস ও রিচার্ড টেলরসহ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে আন্দোলনে যুক্ত বিভিন্ন ব্যক্তির ভূমিকা তুলে ধরা হয়েছে।
স্মরণসভায় ফিলাডেলফিয়া ও আশপাশের বাংলাদেশি কমিউনিটির পক্ষ থেকে উপস্থিত ছিলেন ড. নিনা আহমেদ, সিটি অব লাজ, ফিলাডেলফিয়া, হবিগঞ্জ ডিস্ট্রিক্ট সোসাইটি অব পেনসিলভেনিয়ার সভাপতি কামরুল হাসান, অবরোধ প্রামাণ্যচিত্রের পরিচালক আরিফ ইউসুফ ও তাঁর পরিবার, নিউ জার্সি থেকে ওয়াশিংটন ডিসিতে আসা সৈয়দ তাজবীর ইমাম তাসবির, আপার ডারবির শাওন আহমেদ, ল্যান্সডেল থেকে নুসরাত রওশন ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা। এছাড়া বাংলাদেশি আমেরিকান কমিউনিটি ফোরাম অব পেনসিলভেনিয়ার শাওন, আরিফ ও কামরুলসহ কর্মকর্তারা এবং ফিলাডেলফিয়া পত্রিকার সম্পাদক আশরাফুল ইসলাম আরিফ উপস্থিত ছিলেন।
আলোচনায় ড. নিনা আহমেদ, আশরাফুল ইসলাম আরিফ ও নুসরাত রওশন ফিলিস টেলরের জীবন, মানবিক মূল্যবোধ এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে তাঁর ভূমিকার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন।
ড. নিনা আহমেদ বলেন, ফিলিস টেলর বাংলাদেশের নাগরিক ছিলেন না, কিন্তু ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মানুষের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা ও দুর্ভোগ তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। অন্যায়ের বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান প্রমাণ করে, মানবিকতা ও বিবেকের কোনো ভৌগোলিক সীমারেখা নেই।
স্মরণসভায় প্রফেসর ডা. জিয়াউদ্দিন উদ্দিন আহমেদের পক্ষে বক্তব্য দেন আশরাফুল ইসলাম আরিফ। তিনি বলেন, “ফিলিস টেলর শুধু বাংলাদেশের একজন বন্ধু ছিলেন না, তিনি বাংলাদেশের ইতিহাসেরও একজন অংশ। তাই তাঁর অবদান ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে আন্তর্জাতিক সমর্থনের ইতিহাসে যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা প্রয়োজন।”
ফিলিস টেলরের বন্ধু, সাবেক সহকর্মী, পরিবারের সদস্য, সমাজকর্মী ও বিভিন্ন অভিবাসী কমিউনিটির প্রতিনিধিরা স্মরণসভায় তাঁর জীবনের নানা দিক তুলে ধরেন। তাঁদের বক্তব্যে উঠে আসে শান্তি, ন্যায়, মানবিকতা এবং নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর প্রতি ফিলিস টেলরের দীর্ঘদিনের অঙ্গীকারের কথা।
ফিলিস টেলর ৪ জুন ২০২৬ সালে ৮৪ বছর বয়সে ফিলাডেলফিয়ার উইনমুরে কিস্টোনকেয়ার হসপিসে মারা যান। তাঁর মৃত্যুর পরও তাঁর জীবন ও কর্ম, বিশেষ করে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে তাঁর সাহসী অবস্থান নতুন করে স্মরণ করছে বাংলাদেশি কমিউনিটি।
স্মরণসভায় ফিলিস টেলরের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর পাশাপাশি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে তাঁর অবদান প্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাস ও বাংলাদেশি কমিউনিটির স্মৃতিতে সংরক্ষণের আহ্বান জানানো হয়।
উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন