https://www.prothomalony.com/

18222

new-york

নিউইয়র্ক

 এক সপ্তাহে দুই বাংলাদেশি, এক মঞ্চ—প্রশ্নটা ঘরের ভেতরেই

প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৪:৩১

নিউইয়র্কের জাতিসংঘ সদর দপ্তর। একই ভবন। একই সপ্তাহ। একই মঞ্চের দুই পাশে দুই বাংলাদেশি।
একজন গ্যাভেল হাতে সভাপতির আসনে—জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি ড. খলিলুর রহমান। অন্যজন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান—বিশ্বের ১৯৩টি সদস্যরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের সামনে নিজের দেশের প্রতিনিধিত্ব করতে নিউইয়র্কে। দৃশ্যটি নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির আসনে একজন বাংলাদেশি বসেছেন—চার দশক পর আবার। ১৯৮৬–৮৭ সালে এই দায়িত্ব পালন করেছিলেন বাংলাদেশের কূটনীতিক ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী। এবার সেই আসনে ড. খলিলুর রহমান। ২ জুনের নির্বাচনে তিনি ৯৯ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন।

এটি বাংলাদেশের কূটনৈতিক ইতিহাসে অবশ্যই একটি বড় অর্জন। কিন্তু নিউইয়র্কে দাঁড়িয়ে এই দৃশ্যের দিকে তাকালে শুধু গর্বের অনুভূতি দিয়ে থেমে থাকা যায় না। বরং কিছু প্রশ্নও জেগে ওঠে।

কারণ এবারের জাতিসংঘ অধিবেশনের মূল প্রতিপাদ্যই—‘আস্থা পুনর্গঠন, পরিবর্তন ব্যবস্থাপনা’। খলিলুর রহমান অধিবেশনের শুরুতেই বলেছেন, আস্থা চেয়ে নেওয়া যায় না; সিদ্ধান্ত, প্রতিশ্রুতি এবং মানুষের জন্য দৃশ্যমান ফলাফলের মধ্য দিয়ে আস্থা অর্জন করতে হয়। কথাটি জাতিসংঘের জন্য যেমন সত্য, রাষ্ট্রের জন্যও তেমনই। এমনকি একটি সরকারের জন্যও। সেখানেই নিউইয়র্কের এই ছবিটি বাংলাদেশের জন্য অন্য একটি আয়না হয়ে ওঠে।

বিশ্বের সবচেয়ে বড় বহুপক্ষীয় মঞ্চে বাংলাদেশ আস্থা পুনর্গঠনের কথা বলছে। একই সময়ে বাংলাদেশ নিজেই রাজনৈতিক পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় অতিক্রম করছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান নিয়ে বিতর্ক, নির্বাচন, বিচারব্যবস্থা, প্রশাসন এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতি—সবকিছু নিয়েই দেশের ভেতরে নানা প্রশ্ন আছে।

বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশ কী বলছে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ—দেশের মানুষ নিজেদের রাষ্ট্র সম্পর্কে কী অনুভব করছে। কারণ আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে আস্থা যেমন একটি সম্পদ, রাষ্ট্রের নাগরিক আস্থাও তেমনি একটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে খলিলুর রহমানের দায়িত্ব অবশ্য বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি পরিচালনা করা নয়। তিনি ১৯৩টি সদস্যরাষ্ট্রের সভাপতিত্ব করছেন, কোনো একটি দেশের নয়। তাঁর দায়িত্বের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বহুপক্ষীয় সংলাপ, সমঝোতা, শান্তি, উন্নয়ন, মানবাধিকার এবং জাতিসংঘের প্রতি আস্থা পুনর্গঠন।  কিন্তু তাঁর এই দায়িত্ব বাংলাদেশের জন্য একটি প্রতীকী প্রশ্ন তৈরি করবেই। আমরা কি আন্তর্জাতিক মঞ্চে যে মূল্যবোধের কথা বলি, দেশের ভেতরেও তার চর্চা করতে পারি? প্রশ্নটি কাউকে অভিযুক্ত করার জন্য নয়। বরং নিজেদের দিকে তাকানোর জন্য।

খলিলুর রহমানের বক্তব্যে শান্তি, উন্নয়ন ও মানবাধিকারের পাশাপাশি যে বিষয়টি বারবার এসেছে, সেটি হলো আস্থা। তাঁর উদ্বোধনী বক্তব্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা—আস্থা শুধু চাওয়া যায় না, অর্জন করতে হয়।
এই কথাটিই বাংলাদেশের জন্য হয়তো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। একটি রাষ্ট্রের নাগরিক যদি তার নির্বাচন ব্যবস্থার ওপর আস্থা রাখে, বিচার চাইতে গিয়ে বিচার পাবে বলে বিশ্বাস করে, প্রশাসনের কাছে গেলে ন্যায়সংগত আচরণ পাবে বলে মনে করে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে ভাবতে পারে—তবেই রাষ্ট্রের ভিত শক্ত হয়।

রাষ্ট্রের শক্তি শুধু তার অর্থনীতিতে নয়। শুধু তার সেনাবাহিনীতে নয়। শুধু তার কূটনৈতিক সাফল্যেও নয়। রাষ্ট্রের আসল শক্তি অনেক সময় দেখা যায় একজন সাধারণ নাগরিকের মনে—সে তার রাষ্ট্রকে কতটা বিশ্বাস করে।
এই জায়গায় রোহিঙ্গা সংকটের প্রসঙ্গটিও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের কথা বলে আসছে। খলিলুর রহমানও সহিংসতার পরিবর্তে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমাধানের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।

বাংলাদেশের এই অবস্থান আন্তর্জাতিক পরিসরে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এখানেও একটি বৃহত্তর শিক্ষা আছে।
সহিংসতা কোনো সমস্যাকে স্থায়ীভাবে সমাধান করে না—এই নীতিটি শুধু সীমান্তের ওপারের সংকটের জন্য নয়, রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। রাজনীতি যদি প্রতিশোধের ভাষায় কথা বলে, সমাজ বিভক্ত হয়। রাজনীতি যদি সংলাপের ভাষায় কথা বলে, সমাজের জন্য জায়গা তৈরি হয়। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের শক্তি তার প্রতিপক্ষকে কতটা চুপ করাতে পারে, তাতে নয়; বরং ভিন্নমতকে কতটা জায়গা দিতে পারে, তাতে।
নিউইয়র্কে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের জন্য এই কথাটিও মনে রাখা জরুরি।

আরেকটি বিষয় এবারের অধিবেশনে বিশেষভাবে সামনে এসেছে—প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভবিষ্যৎ।
জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশনের আলোচনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার শাসন, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন এবং বৈশ্বিক ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন গুরুত্ব পাচ্ছে। খলিলুর রহমান তাঁর নির্বাচনী বক্তব্যেও বলেছেন, প্রশ্নটি কেবল আমরা এসব প্রযুক্তি ব্যবহার করব কি না তা নয়; বরং কীভাবে এগুলোকে ন্যায়সঙ্গত ও বিচক্ষণভাবে পরিচালনা করা হবে।
বিশ্ব যখন আগামী দশকের প্রযুক্তিগত বাস্তবতা নিয়ে ভাবছে, বাংলাদেশকেও সেই আলোচনায় থাকতে হবে।
কিন্তু তার জন্য শুধু প্রযুক্তি কিনলেই হবে না। প্রতিষ্ঠানকে আধুনিক করতে হবে। শিক্ষাকে আধুনিক করতে হবে।
তথ্য ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে হবে। ডিজিটাল অধিকার ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নিয়ে নীতিমালা তৈরি করতে হবে। প্রযুক্তিকে যেন নাগরিকের ওপর নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার না বানিয়ে নাগরিকের সক্ষমতা বাড়ানোর উপায় করা যায়—সেই চিন্তাও দরকার।

এখানেই বিশ্বমঞ্চ আর ঘরের মঞ্চের মধ্যে যোগসূত্র তৈরি হয়। জাতিসংঘের এই অধিবেশন বাংলাদেশের জন্য আরেকটি কারণেও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের একজন নাগরিক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ রাজনৈতিক মঞ্চের সভাপতির আসনে। আর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী সেই মঞ্চে দেশের বক্তব্য তুলে ধরছেন। একটি দেশের জন্য এর মধ্যে গর্বের জায়গা আছে। এটি বাংলাদেশের কূটনৈতিক সক্ষমতারও একটি স্বীকৃতি।

খলিলুর রহমানের নির্বাচনের সময় জাতিসংঘের ১৯৩টি সদস্যরাষ্ট্র ভোট দিয়েছে। তিনি ৯৯ ভোট পেয়েছেন। এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ বহুপক্ষীয় কূটনীতিতে নিজের একটি দৃশ্যমান অবস্থান তৈরি করেছে।
এ অর্জনকে ছোট করে দেখার কোনো কারণ নেই। কিন্তু অর্জনের সঙ্গে দায়িত্বও আসে। একজন বাংলাদেশি যখন জাতিসংঘের সভাপতির আসনে বসেন, তখন সেই আসনে শুধু একজন ব্যক্তি বসেন না—সেখানে একটি দেশের নামও থাকে।

সেই নামের সঙ্গে যুক্ত হয় আমাদের প্রত্যাশা। আর সেই কারণেই নিউইয়র্কের এই দৃশ্য আমাদের একটু থামিয়ে দেয়। আমরা কি শুধু বিশ্বকে দেখানোর জন্য ভালো রাষ্ট্র হতে চাই? নাকি নিজেদের নাগরিকের জন্যও ভালো রাষ্ট্র হতে চাই? বিশ্বমঞ্চে আমরা যদি বলি—আস্থা প্রয়োজন, তাহলে দেশের মানুষ যেন নিজের রাষ্ট্রের ওপর আস্থা রাখতে পারে, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।

যদি বলি মানবাধিকার গুরুত্বপূর্ণ, তাহলে সেই অধিকার দেশের প্রতিটি মানুষের জন্য সমান হতে হবে। যদি বলি শান্তি প্রয়োজন, তাহলে রাজনৈতিক মতভেদ মেটানোর সংস্কৃতিও তৈরি করতে হবে। যদি বলি সংস্কার প্রয়োজন, তাহলে সংস্কার যেন শুধু বক্তৃতার শব্দ না হয়ে প্রতিষ্ঠানের বাস্তব পরিবর্তন হয়। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতির গ্যাভেল একদিন অন্য কারও হাতে চলে যাবে। এটাই নিয়ম। একটি অধিবেশন শেষ হবে, আরেকটি শুরু হবে। আস্থার প্রশ্নের কোনো বার্ষিক অধিবেশন নেই। এটি প্রতিদিনের। প্রতিটি আদালতে। প্রতিটি নির্বাচনে।
প্রতিটি সরকারি দপ্তরে। প্রতিটি নাগরিকের জীবনে।

নিউইয়র্কে এই সপ্তাহে দুই বাংলাদেশি একই মঞ্চের দুই পাশে দাঁড়িয়েছেন। একজন বিশ্বকে নেতৃত্ব দেওয়ার দায়িত্বে। অন্যজন বাংলাদেশের নেতৃত্ব নিয়ে বিশ্বমঞ্চে। দৃশ্যটি আমাদের গর্বিত করে। কিন্তু গর্বের পাশাপাশি একটি প্রশ্নও রেখে যায়। জাতিসংঘের মঞ্চে যে ‘আস্থা পুনর্গঠন’-এর কথা বলা হচ্ছে, সেই আস্থার সবচেয়ে বড় পরীক্ষাগার তো শেষ পর্যন্ত নিউইয়র্ক নয়। ঢাকা। দেশের মানুষ। নিজের ঘর।

গ্যাভেল একদিন নামিয়ে রাখতে হয়। অধিবেশন একদিন শেষ হয়। ক্যামেরাও একসময় অন্য দিকে ঘুরে যায়।
কিন্তু নাগরিকের মনে জমে থাকা প্রশ্ন থেকে যায়। বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের কণ্ঠ কতটা জোরালো—তার উত্তর হয়তো নিউইয়র্কে পাওয়া যাবে। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ তার রাষ্ট্রের কণ্ঠ কতটা বিশ্বাস করে—তার উত্তর খুঁজতে হবে ঘরের ভেতরেই। সেই উত্তরটাই শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের আসল কূটনৈতিক শক্তি।
 

নিউইয়র্ক থেকে আরো পড়ুন