https://www.prothomalony.com/
17963
bangladesh
বাংলাদেশ আবারও বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের মুখোমুখি। লোডশেডিং এখন আর কেবল গ্রাম কিংবা প্রত্যন্ত অঞ্চলের সমস্যা নয়।রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন এলাকাতেও বিদ্যুৎ আসা-যাওয়ার খেলা শুরু হয়েছে। কোথাও ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ নেই, কোথাও দিনে একাধিকবার বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। দেশের কোনো কোনো গ্রামীণ এলাকায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ।১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিংয়ের খবরও এসেছে।
এটি নিছক বিদ্যুৎ-সংকট নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে গ্যাস, LNG, বৈদেশিক মুদ্রা, আমদানি, শিল্প উৎপাদন, কৃষি, কর্মসংস্থান এবং সর্বোপরি সরকারের সক্ষমতা ও ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন।
বর্তমান সংকটের তাৎক্ষণিক কারণ হিসেবে গ্যাসের ঘাটতিই সবচেয়ে বড়। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় উৎপাদন কমছে। একই সময়ে LNG সরবরাহে একের পর এক বিঘ্ন পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে। জুলাইয়ে একটি LNG টার্মিনালে দুর্ঘটনার পর গ্যাস সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। পরে সরবরাহ আংশিকভাবে ফিরলেও ঘাটতি পুরোপুরি কাটেনি।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—একটি LNG টার্মিনালের সমস্যা কেন জাতীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থাকে এতটা নাজুক করে ফেলবে?
এই প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা গত দেড় দশকে বহুগুণ সম্প্রসারিত হয়েছে। উৎপাদন সক্ষমতা বেড়েছে, বিদ্যুৎকেন্দ্র বেড়েছে, গ্রিডও সম্প্রসারিত হয়েছে। কিন্তু সক্ষমতা আর বাস্তব উৎপাদন এক জিনিস নয়। জ্বালানি না থাকলে হাজার হাজার মেগাওয়াটের বিদ্যুৎকেন্দ্রও কার্যত অচল। সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, গ্যাস, কয়লা ও তরল জ্বালানির ঘাটতির কারণে বহু বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না।
অর্থাৎ বাংলাদেশের সংকটের একটি বড় শিক্ষা হলো—শুধু বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করলেই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজন নিরবচ্ছিন্ন ও সাশ্রয়ী জ্বালানি সরবরাহ।
আর এখানেই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
দেশের নিজস্ব গ্যাসের উৎপাদন কমছে। অন্যদিকে গ্যাসের চাহিদা বাড়ছে। ফলে আমদানি করা LNG-এর ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে LNG-এর দাম, পরিবহন ব্যয়, ভূরাজনৈতিক সংঘাত এবং বৈদেশিক মুদ্রার চাপ—সবকিছু মিলিয়ে এই নির্ভরতা বাংলাদেশের জন্য ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে সাম্প্রতিক অস্থিরতা সেই ঝুঁকিকে আরও প্রকট করেছে।
সরকারের সামনে তাই দুটি প্রশ্ন একসঙ্গে দাঁড়িয়েছে। প্রথমত, এখনই কীভাবে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকট সামাল দেওয়া হবে? দ্বিতীয়ত, আগামী পাঁচ বা দশ বছরে বাংলাদেশ কীভাবে একটি স্থিতিশীল জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তুলবে?
প্রথম প্রশ্নের উত্তর জরুরি। দ্বিতীয়টির উত্তর আরও জরুরি।
কারণ লোডশেডিংয়ের সবচেয়ে বড় মূল্য শুধু সাধারণ মানুষ দেয় না। অর্থনীতিও দেয়। কারখানা বন্ধ থাকে, উৎপাদন কমে যায়, কৃষকের সেচ ব্যাহত হয়, ক্ষুদ্র ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শিল্পকারখানাকে বিকল্প হিসেবে ডিজেলচালিত জেনারেটর ব্যবহার করতে হলে উৎপাদন ব্যয় বাড়ে। নওগাঁয় সাম্প্রতিক লোডশেডিংয়ের কারণে শিল্প ও কৃষি উভয় ক্ষেত্রেই ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছে, যখন শিল্প উৎপাদন, রপ্তানি ও বিনিয়োগ ধরে রাখাই বড় চ্যালেঞ্জ। এই সময়ে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকারীদের জন্য অত্যন্ত নেতিবাচক বার্তা। যে উদ্যোক্তা জানেন না আগামীকাল তাঁর কারখানায় গ্যাস থাকবে কি না, বিদ্যুৎ থাকবে কি না—তিনি নতুন বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিতে স্বাভাবিকভাবেই দ্বিধায় পড়বেন।
সরকারকে তাই শুধু লোডশেডিংয়ের সময়সূচি ঘোষণা করলে চলবে না। জনগণকে পরিষ্কারভাবে জানাতে হবে—কতদিন এই সংকট চলবে, জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক করার পরিকল্পনা কী এবং এর জন্য কী পরিমাণ অর্থ প্রয়োজন।
স্বচ্ছতা এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিদ্যুৎ সংকটের সময়ে শহর ও গ্রামের মধ্যে বৈষম্যও যেন না বাড়ে। দীর্ঘদিন ধরে গ্রামাঞ্চলের মানুষ বেশি লোডশেডিং সহ্য করে আসছেন। অথচ রাজধানী তুলনামূলকভাবে সুরক্ষিত থেকেছে। বিদ্যুৎ ঘাটতি যদি হয়, তার বোঝা ন্যায্যভাবে ভাগ করতে হবে। হাসপাতাল, পানি সরবরাহ, কৃষি সেচ, জরুরি সেবা এবং গুরুত্বপূর্ণ শিল্পকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। একই সঙ্গে লোডশেডিংয়ের তথ্য প্রকাশে স্বচ্ছতা থাকতে হবে।
তবে সংকট মোকাবিলার সবচেয়ে বড় কাজটি দীর্ঘমেয়াদি।
দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদনে নতুন করে গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে LNG-এর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে হবে। সৌরবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার ঘটাতে হবে। আঞ্চলিক বিদ্যুৎ বাণিজ্যের সম্ভাবনাও কাজে লাগাতে হবে। জ্বালানি ব্যবস্থাকে একক উৎসের ওপর নির্ভরশীল না রেখে বহুমুখী করতে হবে।
আরেকটি বিষয় জরুরি—জ্বালানি খাতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব, অদক্ষতা ও স্বল্পমেয়াদি সুবিধার বদলে অর্থনৈতিক যুক্তি এবং জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংখ্যা কত, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই কেন্দ্রগুলো কতটা দক্ষ, কী জ্বালানিতে চলে, জ্বালানির মূল্য কত এবং দীর্ঘমেয়াদে তা অর্থনীতির জন্য কতটা টেকসই।
বর্তমান সরকার হয়তো উত্তরাধিকারসূত্রে অনেক সমস্যাই পেয়েছে। কিন্তু জনগণ সরকারকে অতীতের ব্যর্থতার ব্যাখ্যা শোনার জন্য ভোট দেয় না। তারা সমাধান চায়। অতীতের ভুলের দায় যারই হোক, বর্তমান সংকটের দায় ও দায়িত্ব বর্তমান সরকারেরই।
এই মুহূর্তে সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো—সংকটকে রাজনৈতিক বিতর্কে পরিণত না করে জাতীয় সংকট হিসেবে দেখা।
জ্বালানি নিরাপত্তা কোনো দলের বিষয় নয়। বিদ্যুৎ কোনো সরকারের অনুগ্রহ নয়। এটি নাগরিকের অধিকার ও অর্থনীতির মৌলিক অবকাঠামো।
বাংলাদেশ বহুবার সংকট মোকাবিলা করেছে। এই সংকটও সামলানো সম্ভব। কিন্তু তার জন্য দরকার তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং সবচেয়ে বেশি দরকার সৎ ও দক্ষ ব্যবস্থাপনা।
অন্ধকার ঘরে বসে শুধু আশ্বাস দিলে আলো জ্বলে না। আলো জ্বালাতে হলে জ্বালানি লাগবে, পরিকল্পনা লাগবে এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাহস লাগবে।
বর্তমান সরকারের সামনে এখন সেই পরীক্ষাই।
বাংলাদেশ থেকে আরো পড়ুন