https://www.prothomalony.com/

17965

bangladesh

বাংলাদেশ

প্রান্তিকের স্বপ্নভঙ্গের পরের রাজনীতি

প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৬ ০৩:২৭

বৈষম্যহীন মানবিক সমাজ। সমতা ও সমদৃষ্টির সমাজ। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে যাদের জন্ম, তাদের স্বপ্নের সমাজে এসব উপাদান টগবগ করত। মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের সংবিধানে কি অযাচিতভাবে মূলনীতি হিসেবে 'সমাজতন্ত্র' এসেছিল? জনআকাঙ্ক্ষায় কি অন্তর্ভুক্তিমূলক মানবিক সমাজের এজেন্ডা ছিল না? এখন যেমন ধর্ম এসেছে রাজনীতিতে, তখন উদ্দাম আকাঙ্ক্ষার স্রোতে সমতা, সাম্য ও মানবিকতা এসেছিল তরুণদের হৃদয়ের গহিনে।

স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্রলীগ খুব বেশি সুবিধা করতে পারেনি। তরুণদের আকাঙ্ক্ষার মানবিক সমাজ গড়ার জন্য সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়ে ছাত্ররা আস্থা রেখেছিল সমাজতন্ত্রকে ধারণ করা ছাত্রসংগঠনগুলোর ওপর। সে কারণে 'ছাত্র ইউনিয়ন' এর ওপর আস্থা ছিল তরুণ শিক্ষার্থীদের। এরপর 'জাসদ ছাত্রলীগ' সারাদেশে তরুণদের বুকে ঝড় তোলে। সে ঝড় কতটুকু ছাত্ররাজনীতিকে ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করতে পেরেছিল, সে মূল্যায়ন না হয় ভিন্নভাবে করা যেতে পারে। তবে গবেষণায় না গিয়েও এটা বলা যায়, স্বাধীন বাংলাদেশে তরুণ সমাজ সাম্য, মৈত্রী ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে একটি দেশ গড়তে চেয়েছিল। ইতিহাসের পাতা থেকে নয়, পঞ্চাশের শেষ অথবা ষাটের দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত যাদের জন্ম, তাদের জীবন-অভিজ্ঞতা পাঠ করলেই সেই সত্য উন্মোচন করা সহজ হয়।

চব্বিশের জুলাই আন্দোলনে বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার আকাঙ্ক্ষার কথা শুনে পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের অনেকেই আগ্রহের সঙ্গে আন্দোলনটি অনুসরণ ও সমর্থন করতে থাকেন। আন্দোলনের শুরুতেই আমরা শুনতে পাই, "বঙ্গবন্ধুর বাংলায়, বৈষম্যের ঠাঁই নাই", "আমার সোনার বাংলায় বৈষম্যের ঠাঁই নাই" এসব স্লোগান বদ্ধ সমাজকে অনেকটা চমকে দেয়। নড়েচড়ে ওঠে সাধারণ মানুষ, শিক্ষিত মধ্যবিত্ত স্বাপ্নিক তরুণ ও প্রবীণের দল। এবার কি তবে প্রকৃত অর্থে বৈষম্য নিরসন হতে যাচ্ছে? আশায় বুক বাঁধে অনেক আবেগী, সহজ-সরল নাগরিক। যৌবনে যারা বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন, তাদের অনেকেই ভেবেছিলেন সাম্যবাদী নজরুলের স্বপ্নের কালবৈশাখী বোধ হয় এলো। অনেকেই 'জয়ধ্বনি' দেওয়া শুরু করলেন, কেউ উচ্চস্বরে, কেউ-বা নিম্নস্বরে। দূর থেকে তারা 'নৃত্যপাগল' তরুণদের আকাঙ্ক্ষা আন্তরিক কৌতূহল নিয়ে পর্যবেক্ষণ শুরু করলেন রাজপথের দিকে তাকিয়ে। রাজপথেও তখন নজরুলের গান বাজছে: "তোরা সব জয়ধ্বনি কর/তোরা সব জয়ধ্বনি কর/ ঐ নূতনের কেতন ওড়ে কালবোশেখীর ঝড়/ তোরা সব জয়ধ্বনি কর.../ আস্ল এবার অনাগত প্রলয়-নেশায় নৃত্য-পাগল/ সিন্ধু-পারের সিংহ-দ্বারে ধমক হেনে ভাঙল আগল।"

আগল তাহলে ভাঙতে যাচ্ছে! সাতচল্লিশ-পূর্ব বিপ্লবীদের অনেকেই আগল ভাঙতে চেয়েছিলেন। সত্তর ও আশির দশকের দ্বিমেরু বিশ্বে দেশে দেশে আমরা আগল ভাঙার রাজনীতি দেখেছি। তবে আগল শেষ পর্যন্ত ভাঙেনি। আগল ভাঙার রাজনীতিতে যারা নিবেদিত ছিলেন, তাদের অনেকেই হতাশ হয়ে নিজের আদর্শের বিপরীত পথে হেঁটে হেঁটে হারিয়ে গেছেন।

চব্বিশের আন্দোলনের যারা পরিকল্পনা করেছিলেন, তারা জানতেন মধ্যবিত্ত বাঙালি পাগল হয় আগল ভাঙার গানে। পরিকল্পনা যেভাবে করা উচিত ছিল, ঠিক সেভাবেই করা হয়েছিল। হৃদয়হরণ করা গ্রাফিতি আঁকা হয়েছিল দেয়ালে দেয়ালে। এখনও মনে আছে, একটি ছোট গাছের ডালে কয়েকটি পাতা; পাতায় লেখা ছিল, "হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী"। ডালের নিচে লেখা: "পাতাগুলো ছেঁড়া যাবে না।" এই যে মহামিলনের, মহাসৌহার্দ্যের বার্তা দেয়ালে দেয়ালে এঁকে দেওয়া হয়েছিল, সে বার্তা হৃদয় ছুঁয়ে গেছে।

এই আন্দোলনের গানগুলোর দিকে খেয়াল করুন, মোহিনী চৌধুরীর সেই অমর গান: "মুক্তির মন্দির সোপান তলে কত প্রাণ হলো বলিদান।" গানটি শুনলে হৃদয়ের কোণে জমে থাকা নিষ্প্রভ আগুন জ্বলে ওঠে।

"কত বিপ্লবী বন্ধুর রক্তে রাঙা/বন্দীশালার ওই শিকল ভাঙা/ তারা কি ফিরিবে আজ সু-প্রভাতে/যত তরুণ অরুণ গেছে অস্তাচলে.../ যারা স্বর্গগত তারা এখনও জানেন/স্বর্গের চেয়ে প্রিয় জন্মভূমি।"

আহা, স্বর্গের চেয়েও প্রিয় জন্মভূমি! এরকম সংগীতের বাণী যখন দেশপ্রেমিক বাঙালির কর্ণকুহরে প্রবেশ করে, তখন তাদের চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরে, না হয় তারা মিছিলে ছোটেন। আন্দোলনের শুরুতে মধ্যবিত্ত প্রগতিকামী বাঙালি ভেবেছিল চণ্ডীদাসের সেই অমর বাণী, কিংবা রামপ্রসাদ ও আব্দুল হাকিমের অকৃত্রিম দেশপ্রেমের ধারাবাহিকতায় রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের মানবধর্মের পুনরুত্থান হলো বুঝি আবার।

ন্যায্যতাভিত্তিক, মানবিক সমাজ গড়ার প্রত্যয় বুকে ধারণ করে ঢাকার দেয়ালে আজও ম্লান হয়ে লেখা আছে: "বিপ্লব শেষে তুমিও যদি স্বৈরাচারী হয়ে যাও, বিপ্লব তোমার পিছু ছাড়বে না।" কথাটি তখনো মিথ্যে মনে হয়নি; এখনো কিংবা ভবিষ্যতেও মনে হবে না।

নারী শিক্ষার্থীদের সাথে নিয়ে, শুধু সাথে নয়, সামনে রেখে "এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি" কিংবা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের "তীরহারা এই ঢেউয়ের সাগর পাড়ি দেবো রে" গান গেয়ে আকাশ-বাতাস বিদীর্ণ করে দেওয়া হয়েছিল মিছিলে মিছিলে। এরপর বিস্ময় নিয়ে দেখা গেল, তীরে নৌকা ভেড়ার পর পরই নারীদের যেন পেছনে ঠেলে দেওয়া হলো! ধীরে ধীরে নারী আবার প্রায় 'অবরোধবাসিনী' হয়ে গেল এবং তাঁদের স্বর নিচে নেমে এলো।

আর গান? বাউলদের আখড়ায়, বাউলগানের আসরে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হলো। "তীরহারা এই ঢেউয়ের সাগরের" মতো গান আর মিছিলে শোনা গেল না। গণতন্ত্রের মুক্তির জন্য যে দেশে সাতচল্লিশের পর থেকে আন্দোলন শুরু হয়েছিল, সে দেশে গণতন্ত্রের মুক্তির লড়াইকে একপ্রকার আইসিইউতে পাঠিয়ে দেওয়া হলো। গণমাধ্যমগুলোতে আঘাত করা শুরু হলো। প্রথম আলো, ডেইলি স্টারসহ যারা ভিন্নমত পরিবেশন করত, তাদের মুখ বন্ধ করার চেষ্টা দেখা গেল। বাঙালির অহংকারের প্রতিষ্ঠান ছায়ানট ও উদীয়মান সাংস্কৃতিক কেন্দ্রগুলোতে আঘাত এলো। বিপ্লবের মূল বার্তার সঙ্গে বিপ্লবোত্তর কর্মকাণ্ডের কোনো সাদৃশ্য খুঁজে না পেয়ে হতাশ হলেন অরাজনৈতিক, শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বাঙালিরা।

আন্দোলনের শুরুতে আমরা কোনো উগ্র ধর্মীয় বার্তা খুঁজে পাইনি। অথচ পাঁচ আগস্টের পর দেখা গেল একদল লোক ধর্মের নামে অমানবিক আচরণ করছে। প্রান্তিক মানুষেরা যেন ধীরে ধীরে সরে গেল আন্দোলন থেকে। আমরা অন্তর্বর্তী সরকারের মধ্যে এক বিস্ময়কর নির্লিপ্ততা ও উদাসীনতা দেখতে পেলাম।

প্রথম আলো বা ডেইলি স্টার অফিসে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পৌঁছানোর আগেই সেখানে প্রবীণ সাংবাদিকেরা ছুটে গেলেন। আকুতি জানালেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আমরা দেখতে পেলাম সেই বিখ্যাত ইংরেজি প্রবাদের মতো আচরণ করতে 'ডাক্তার আসিবার পূর্বে রোগী মারা গেল'। অর্থাৎ অগ্নিকাণ্ড বা হামলার ঘটনা শেষ হওয়ার পর তাদের উপস্থিতি দেখা গেল। ঘটনার পর কেবল বলা হলো, "যোগাযোগের অনেক চেষ্টা করা হয়েছে।" তবে কার্যকর যোগাযোগের কোনো স্পষ্ট চিহ্ন নাগরিক সমাজ খুঁজে পেল না।

পাঁচ আগস্টের পর আমরা বৈষম্য নিরসনের স্লোগান আর শুনতে পেলাম না। বৈষম্য নিরসনের উপায় নিয়ে কোনো সেমিনার বা সিম্পোজিয়ামের আয়োজন চোখে পড়ল না। পথে-প্রান্তরে কোনো মিছিল নেই, অগ্নিঝরা কোনো বক্তব্যও নেই। বৈষম্য নিরসনের দাবি যেন দারিদ্র্যের মতো জাদুঘরে চলে গেল! আমাদের বয়সী মানুষ, যারা ষাটের দশকে জন্ম নিয়েছেন, তারা জীবনভর ঠকতে ঠকতে অধিক শোকে পাথর হয়ে গেছেন। যারা অষ্টপ্রহর সমতার সমাজের স্বপ্ন দেখে প্রান্তিক মানুষের সঙ্গে মিশে গিয়েছিলেন, তারা আজ বিস্ময়ে বিমূঢ়।

আন্দোলনের প্রতিশ্রুতি যদিও নেতৃত্বদানকারীরা বিস্মৃত হয়েছেন, প্রান্তিক মানুষেরা কিন্তু মোটেই বিস্মৃত হননি। আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে যারা ছিলেন, তাদের আবার পেছনে ফিরে তাকাতে হবে। জনআকাঙ্ক্ষাকে মূর্ত করার জন্য তারা কী প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন আর বাস্তবে এখন কী ঘটছে, তা মেলানো প্রয়োজন। নিছক সরকার পরিবর্তনের জন্য এ দেশে অনেক আন্দোলন-অভ্যুত্থান হয়েছে; আন্দোলন শেষে শূন্যতা বুকে নিয়ে মানুষ ফিরে গেছে। বারবার প্রত্যাখ্যাত হলে আর একটি বিপ্লব অপেক্ষা করে প্রত্যাখ্যানকারীদের সামনে কথাটি চব্বিশের আন্দোলনের সময় দেয়ালে দেয়ালে লেখা ছিল।

হাসন রাজা, লালন, রাধারমণ আর শাহ আব্দুল করিমের দেশের মানুষ আমরা। বড়ই কোমল আমাদের হৃদয়, আবার যুগপৎ কঠিনও বটে। আমরা আর অস্থিরতা চাই না; অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি ও শোষণ-বঞ্চনাহীন সমাজই আমাদের একমাত্র আকাঙ্ক্ষা। এই আকাঙ্ক্ষার কথা প্রান্তিক মানুষেরা হয়তো দেয়ালে লিখতে পারে না, তবে মনের গহিনে লালন করে।

এবার উদ্ভট উটের পিঠ থেকে নেমে সমাজ ও রাষ্ট্রকে বুঝিয়ে দিতে হবে এর আসল মালিকানা, প্রান্তিক মানুষের মালিকানা। শত শত বছরের আকাঙ্ক্ষিত শোষণহীন ও বৈষম্যমুক্ত রাষ্ট্র গড়ে তুলতে না পারলে সামনে মহা বিপদের সংকেত শোনা যেতে পারে। আন্দোলনের সময় লেখা সেই গ্রাফিতির বাণীটি আমাদের মনে রাখা উচিত: "বিপ্লব শেষে তুমি যদি স্বৈরাচার হয়ে যাও, বিপ্লব তোমার পিছু ছাড়বে না।" এই কথাটি মনে রাখার দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়, দেশের সকল নাগরিকের।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও উন্নয়ন গবেষক
 

বাংলাদেশ থেকে আরো পড়ুন